


রোমিলা কিন্তু কবিতার প্রতি নিবেদিত-প্রাণ। তাই কবিতার মাধ্যমেই, বা তাঁর প্রিয়তম কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ছন্দোবদ্ধ ঘোষণা থেকেই তিনি তাঁর ইতিহাসবোধের প্রথম মন্ত্রটি সযত্নে তুলে নিয়েছেন। এই দিকপাল উর্দু কবি লিখেছিলেন, ‘বলো, বলো যে সত্য এখনও জীবিত। যে সত্য বলার, তা বলে দাও নির্দ্বিধায়।’ সত্যের প্রতি এই অবিচল নিষ্ঠা রোমিলারও একান্ত অঙ্গীকার। উপরন্তু ইতিহাসের এই নিখাদ সত্যটিকে অটুট-অক্ষয় রাখার জন্যই তিনি ইতিহাসের নামে সুপরিকল্পিত মিথ্যাচার এবং কল্পকথা ও পুরাণকে বর্জন করেছেন আপস না করে।
‘ইতিহাসের দিগন্তকে এই ক্ষণিক-মুহূর্ত এবং এই সংকীর্ণ পরিসর অতিক্রম করতে হবে’
–রোমিলা থাপার
দুই সর্বোত্তম, গোয়েটে ও রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিভাষ্য পাঠের পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, তৃতীয় কোনও মেমোয়ার– সে যেই লিখুক না কেন, আমি পড়ব না। কারণ যে-ই লিখুক, সে গোয়েটের ‘কবিতা ও সত্য’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’-র অত্যাশ্চর্য উৎকর্ষের কাছাকাছি পৌঁছতে পারবে না। এই দু’টি চিরস্মরণীয় গ্রন্থের ভাষাশৈলী এবং বিষয়বৈচিত্র; এ দু’টির পৃষ্ঠাগুলিতে ব্যক্তি ও সমাজের ভিতর স্থাপিত স্পন্দমান, দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক; সর্বোপরি, এই দু’জনের উপস্থাপিত নান্দনিক দর্শন যার ভিত্তি সৃজনসর্বস্ব মানবিকতা– আমি আর কোন স্মৃতিচয়নে পাব?

বেশ কয়েকবছর আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল থাকি। তারপর, ২০২১ সালে, আমার পথপ্রদর্শক অর্মত্য সেন-এর মোমোয়ার ‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ হাতে আসে। এই বইটি আমি না পড়ে থাকতে পারিনি। ৪৫০ পৃষ্ঠা জুড়ে লেখক কী মায়াজাল সৃষ্টি করেছেন, যদিও তিনি সমাজবিজ্ঞানী অর্থাৎ গোয়েটে ও রবীন্দ্রনাথের মতো কবি নন। প্রতিশ্রুতি ভাঙলাম আবার গত জুন মাসের মাঝামাঝি, যখন বন্ধু নবীন কিশোর, সীগাল প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, আমাকে পাঠিয়ে দিলেন ইতিহাসের সম্রাজ্ঞী এবং অর্মত্য সেনের পরম বন্ধু রোমিলা থাপারের মেমোয়ার। বইয়ের নিরাভরণ শিরোনামটি দেখেই চকে উঠেছিলাম– ‘জাস্ট বিইং’ অর্থাৎ ‘মাত্র জীবনধারণ’। এ কী বিস্ময়কর বিনয়! ৭০০ পৃষ্ঠার এই বইটি তিন রাত জেগে পড়া শেষ করলাম! এর গঠনশৈলী অনবদ্য, নির্ভার কিন্তু দ্যুতিময়, এবং বিষয়ের প্রাচুর্য সব সীমারেখা অতিক্রম করে। সেই লাহোরের শৈশবকালের মধুময় দিনগুলি, তারপর যৌবনে ইংল্যান্ডে অক্লান্ত জ্ঞানান্বেষণ, পরের পর্বে জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য নক্ষত্রের সঙ্গে ইতিহাস বিভাগ গঠন এবং ছাত্রছাত্রীদের নিরলস শিক্ষাদান– আরও কত কী! না, আমাকে বেছে নিতেই হয়েছে এবং আমি এই প্রবন্ধের জন্য বেছে নিয়েছি সেই অপরিহার্য বিষয়টি– সম্রাজ্ঞীর প্রণীত ইতিহাসতত্ত্ব বা historiography বা ইতিহাসের যথাযোগ্য প্রকৃতি-নির্ণয়।

রোমিলা কিন্তু কবিতার প্রতি নিবেদিত-প্রাণ। তাই কবিতার মাধ্যমেই, বা তাঁর প্রিয়তম কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ছন্দোবদ্ধ ঘোষণা থেকেই তিনি তাঁর ইতিহাসবোধের প্রথম মন্ত্রটি সযত্নে তুলে নিয়েছেন। এই দিকপাল উর্দু কবি লিখেছিলেন, ‘বলো, বলো যে সত্য এখনও জীবিত। যে সত্য বলার, তা বলে দাও নির্দ্বিধায়।’ সত্যের প্রতি এই অবিচল নিষ্ঠা রোমিলারও একান্ত অঙ্গীকার। উপরন্তু ইতিহাসের এই নিখাদ সত্যটিকে অটুট-অক্ষয় রাখার জন্যই তিনি ইতিহাসের নামে সুপরিকল্পিত মিথ্যাচার এবং কল্পকথা ও পুরাণকে বর্জন করেছেন আপস না করে।
এ প্রসঙ্গেই মনে আসে, দুই কৃতী বাঙালির নির্ভীক শপথ। কবি শঙ্খ ঘোষ তাঁর কাব্যসমগ্রের ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘কবির দায়িত্ব মাত্র একটি সত্য বলা’ এবং তাঁরও আগে স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার বলেছিলেন, ‘ইতিহাসবিদের আদর্শ সত্যের সন্ধান ও অনুধাবন, আর কিছু নয়।’

ফয়েজের মাধ্যমে সত্যের প্রতি অঙ্গীকার উচ্চারণের পরে, রোমিলা যাত্রা করেন তাঁর অন্য এক প্রিয় কবি টি এস এলিয়টের বৃত্তে। বিশ্বদৃষ্টির বিচারে এই খ্রিস্টীয় কবি এবং অজ্ঞেয়বাদী রোমিলা দুই ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা। কিন্তু রোমিলা তো সংকীর্ণ নন। তিনি প্রতিটি পুষ্প থেকে মধু আহরণ করতে প্রস্তুত। তাই তাঁর ইতিহাসচিন্তার নির্যাস যা অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের টানাপোড়েন ও সমন্বয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, তারই কাব্যময় বিবরণ তিনি খুঁজে পান এলিয়টের সেই অবিস্মরণীয় পঙ্ক্তিগুলিতে:
Time Present and time past
Are both perhaps present in time future
And time future contained in time Past.
[Four Quartets]
এই লিরিকাল স্বগতোক্তির তন্ময় বিশ্লেষণ করেছেন রোমিলা নিজে– ‘The Voice you hear in these pages is that of my limited reflections. Yet it is my voice. Through time, it evokes the past, touches on the present and hunts at the future.’ [প্রোলোগ, পৃ. ১৯]।

এভাবেই ইতিহাসতত্ত্বের যাত্রা শুরু, কবিতাকে আশ্রয় করে। এরপরেই তিনি বলেন যে, ইতিহাস কোনও বিচ্ছিন্ন, স্বয়ংসম্পূর্ণ খণ্ড নয়, যা অন্য সবকিছু থেকে বিচ্যুত। পক্ষান্তরে, ইতিহাস এক মরমী অভিজ্ঞতা যা সমাজবিজ্ঞানের অন্যান্য ধারাগুলির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে যুক্ত; তদুপরি তার পাঠ্যক্রমে সৃজনসাহিত্য, পুরাতত্ত্ব এবং নৃতত্ত্বেরও অনিবার্য স্থান রয়েছে। অর্থাৎ তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন আন্তর্বিষয়াদির বুনোটের উপর, ইংরেজিতে যাকে বলে Interdisciplinary Scholarship। অন্যান্য বিষয়গুলি ক্রমাগত আলো বিকিরণ করবে ইতিহাসের উপর আর এর সুফল, তাঁর ভাষায়, ‘The Growing interaction of history with social sciences enlarged historical studies beyond the narrative of dynasties.’ [পৃ. ২৪১]। এই বহুমুখী অধ্যয়নের থেকেই নিরন্তর প্রশ্ন উত্থিত হয়– যে প্রশ্ন জ্ঞানতত্ত্ব বা Epistemology-কে স্বতশ্চল করে রাখে। আমরা প্রশ্ন করি, তা রোমিলাকে প্রতিধ্বনি করে: ‘বৈদিক সমাজের মানুষ যদি agro-pastoralist হয়, তাহলে তাদের সঙ্গে একই সময়ের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী agro-pastoralist-দের সাদৃশ্য কি ছিল, বা ভিন্নতা?’ (পৃ. ২৪১)

এই আদ্যন্ত প্রশ্নাকুল, অনুসন্ধানী মন নিয়ে তাঁর ইতিহাসচেতনাকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে তিনি এগিয়ে যান পুরাতত্ত্বের দিকে। সে এক অবিরাম যাত্রা, ভারতের নানা প্রান্তে, চিনে, ইংল্যান্ডে, মেক্সিকোয়। মন্দির-স্মৃতিস্তম্ভ-প্রাসাদ-ধ্বংসাবশেষ তিনি খুটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেন। একই নিঃশ্বাসে, তিনি জনগণ এবং ইতিহাসবিদদের পুরাতত্ত্বের সর্বনাশা অপব্যবহার নিয়ে সতর্ক করেন। অর্থাৎ যে অপব্যবহার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নির্দেশে মিথ্যাকে সত্য বলে বিজ্ঞাপিত করে, একটি বিশেষ রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে বদ্ধপরিকর। অমার্জনীয় ভাষায় এই ঘোর অনৈতিহাসিক প্রয়াসকে কশাঘাত করে তিনি লিখেছেন, “For me, the insistence of these established (পড়ুন ‘রাষ্ট্রপেষিত’) archaeologists working for government but refusing to object to the destruction of a historical moment was the theatre of the absurd.” [পৃ. ৪১৩]।
এই প্রান্তর থেকে আর একটি অগ্রপদক্ষেপ নিলেই আমরা পৌঁছব তাঁর ইতিহাসতত্ত্বের হৃদস্পন্দনে, যা হল ‘dissent’ বা বিরোধিতা। বন্ধু অর্মত্য সেন যাকে বলেন ‘heterodoxy’, রোমিলাই আমাদের শিখিয়েছেন যে মতানৈক্য, মতান্তর, বিরোধ, তর্ক (এমনকী উত্তপ্ত) ইতিহাসের অন্তরকে সতেজ, সজীব রাখে। এই যুক্তিকে সম্মানস্থাপন করে তিনি শ্রমণ এবং ব্রাহ্মণদের ভিতর অন্তহীন বিতর্কের উপর বারবার আলোকপাত করেছেন। আনন্দের সঙ্গে জানিয়েছেন যে স্বনামধন্য পতঞ্জলি বলেছিলেন, ‘এই দুই গোষ্ঠীর ভিতর বিবাদ এমনকী সংঘাতের সঙ্গে তুলনীয় সর্প ও নকুলের সম্পর্ক।’ [পৃ. ৩৫০] তাঁর এই গ্রন্থের সঙ্গে তাঁরই লেখা অনবদ্য ‘Voices of dissent’ পড়লেই রোমিলার ইতিহাসতত্ত্বের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস বাঙ্ময় হয়ে ওঠে।

Dissent বা বিরোধিতাকে উপযুক্ত স্থান দেওয়ার পরেই, নিজস্ব ছন্দে, তাঁর সামগ্রিক বিশ্বদৃষ্টি নির্মিত হয়– উত্তরণের বিশ্বদৃষ্টি যার পরতে পরতে ধ্বনিত মাঙ্গলিক জাতীয়তাবাদ এবং চূড়ান্ত মানবিক লক্ষ্য।
ইতিহাস-চেতনাকে সর্বাঙ্গীণ জনআদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। তিনি বলেন, “I have all my life spoken and written in favor of a democratic, secular society and preferably broadly socialist in structure” [পৃ. ৬৮৯] এই কল্যাণ কামনাই তাঁর ইতিহাসতত্ত্বের প্রথম ও শেষ কথা।

এহেন স্ফটিকস্বচ্ছ মানচিত্র অঙ্কনের পরেও ইতিহাসবিদ অহেতুক কল্পনাবিলাস এবং সহজলভ্য ভবিষ্যতের দিকে অঙ্গুলি তোলেননি। তাঁর ইতিহাসচেতনাই তাঁকে সুরম্য প্রতিবন্ধক ও দুরূহ পক্ষের অস্তিত্ব সম্পর্কে তীক্ষ্ণভাবে সচেতন করে তুলেছে। চারিদিকের প্রবল অন্তরায়ের দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি বলেছেন, বই-এর শেষে– ‘We still have a long way to go to become a practicing democracy, despite our claim of adherence to the Constitution.’ [পৃ. ৬৮৯]
প্রিয় শিক্ষক, প্রিয় ইতিহাসবিদ, আমরা আপনার এই প্রতিবন্ধকাকীর্ণ পথের সহযাত্রী।
Just Being (A Memoir)
Romila Thapar
Seagule Books
1499/-
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved