Robbar

প্রথম বাঙালি মহিলা ইলাস্ট্রেটর

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 9, 2026 4:13 am
  • Updated:July 9, 2026 4:13 am  

এক সাক্ষাৎকারে সুখলতা বলেছিলেন: ‘মেয়েদের মধ্যে আমিই বোধহয় প্রথম নিজের বই নিজে চিত্রিত (illustrate) করি, বিশেষত বাঙালি মেয়েদের মধ্যে।’ এ দাবির সত্যতা অনস্বীকার্য। তথাপি তাঁর অবদানের মূল্যায়ন করা বা এর জন্যে সুখলতাকে কোনও আলাদা স্বীকৃতি দেওয়ার কথা মনে হয়নি আজও। আর দ্বিতীয় কথাটি তো সার্বিকভাবে সত্য। মেয়েদের গুরুত্ব না দেওয়া তো সামাজিক অভ্যাস। কাজেই প্রচারবিমুখ মিতভাষী সুখলতার এই অনন্য অবদানের মূল্যায়ন হয়নি আজও। বরং বলা ভালো, চিত্রশিল্পী বা ইলাস্ট্রেটর, কমিক স্ট্রিপ আঁকিয়ে সুখলতাকে আমরা মনে রাখিনি। তাঁর লেখা অধিকাংশ বইয়ের নতুন সংস্করণে আজ অন্য লোকেদের অলংকরণ চোখে পড়ে। আর এভাবেই বিস্মরণের ধুলোয় ঢাকা পড়ে যায় সেইসব পথিকৃৎ রেখাগুলো, হারিয়ে যায় এক নীরব কিন্তু সুসংহত শিশুশিক্ষার, শিশু মনোরঞ্জন কৃত্যের উৎসমুখ।

স্বাতী ভট্টাচার্য

৬.

‘যা এঁকেছি সংসারের কাজকর্মের ভিতরে, কেবল আঁকবার অনুরাগেই এঁকেছি। অনেক অনেক ভুলক্রটি আছে তাতে। যা সুন্দর তা মুগ্ধ করে আমাকে এবং তাকে রঙে-রেখায় ফুটিয়ে তুলতে ইচ্ছা হয়।’

আজীবন এই ইচ্ছাকে সযত্নে লালন করেছিলেন সুখলতা রাও। তুলি ধরলেই ছবি বেরয়, কলম তুললে হয়ে যায় গান, গল্প। জীবন-সায়াহ্নে অশক্ত শরীরে বলেছেন, ‘এখনও ইচ্ছা হয়, কিন্তু শক্তি নেই।’ তাঁর লেখা ‘নিজে পড়’, ‘নিজে শেখ’ দিয়ে সেই শিশুবেলাতেই বহু প্রজন্মের বাঙালির তাঁর সঙ্গে আলাপ। তাঁর অনুবাদের সূত্রেই বিদেশি রূপকথার সঙ্গে পরিচয়, অথচ সেই ছোটবেলা থেকেই ছবির সঙ্গে তাঁর গভীর-গোপন ভালোবাসার কথা অনেকেরই হয়তো জানা নেই তেমনভাবে। বাইরের জগতে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি কথার মাধ্যমে নয়, কর্মের ক্ষেত্রে, সমাজসেবার ক্ষেত্রে, আর তাই হয়তো নিজের মনের মতো করে ছবি এঁকেছেন সারাজীবন। জলরঙে দৃশ্যচিত্র এঁকেছেন– কখনও পাহাড়ের কোলে বসে, কখনও সমুদ্রের ধারে; কখনও বা বিদেশি শিল্পীর শিক্ষিত পারদর্শিতা দেখে সাময়িকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন; কিন্তু ছবি যে তার প্রাণের আবেগ, তার দাবি অস্বীকার করবেন সাধ্য কি তাঁর! তাই কাজের মাঝে মাঝে,সব দায়িত্ব কর্তব্যের চাহিদা মিটিয়ে তুলে নিয়েছেন রং তুলি। এই তাগিদের সূত্র কিন্তু তাঁর শৈশবে, তাঁর পরিবারে।

বিধুমুখী, সুখলতার মা, ছিলেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর মেজ মেয়ে। হ্যাঁ, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর পত্নী, প্রথম মহিলা বাঙালি ডাক্তার কাদম্বিনী ছিলেন তাঁর দিদিমা। সুখলতার পাঁচ-ছয় মাস বয়সেই ১৩ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের (এখন বিধান সরণি) বাড়িতে উঠে আসে উপেন্দ্রকিশোরের সংসার। তিনতলা বাড়ির বাইরের দিকে ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়। ভিতরে বসতবাড়ি। প্রথমে ওঁরা থাকতেন তিনতলায়। সুখলতা লিখেছেন–

‘বারান্দায় একটা পোষা চন্দনা খাঁচায় ঝোলানো থাকত। উপেন্দ্রকিশোর খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে বেহালা বাজালে চন্দনা ঘাড় কাত করে শুনত আর নিজে নিজে টুং টুং শব্দ করত!’

পরে ওঁরা সবাই নেমে এলেন দোতলায়। তিনতলায় রইলেন দ্বারকানাথ আর কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। গড়পারের সেই বাড়িতে কাছাকাছি মামা-মাসীদের সঙ্গে ছবি এঁকে, নাটক লিখে ও অভিনয় করে, গল্প পড়ে লিখে আর শুনিয়ে, আনন্দের হাওয়ায় পাল তুলে কেটেছিল শৈশব-কৈশোরের দিনগুলি। সুখলতার পরের ভাইবোন সুকুমার, সুনির্মল, সুবিনয়, পুণ্যলতা, শান্তিলতা ছাড়াও ছিলেন লীলা মজুমদারের মা তাঁদের সুরমা মাসী, তিনিও ছোট তখন।

ঠাকুরবাড়ির মতোই মুক্তচিন্তাচর্চার প্রাণকেন্দ্র ছিল এই রায়বাড়ি। বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্মাণের এই ভাবনঘরে আসা যাওয়া লেগেই থাকত বঙ্গ সংস্কৃতির উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কদের। বেহালা বাজান উপেন্দ্রকিশোর, ছবি আঁকাতেও তাঁর দক্ষতা প্রশ্নাতীত। ছোটদের জন্যে ‘ছোটদের রামায়ণ’, ‘মহাভারত’ ছাড়াও ‘টুনটুনির বই’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ এর মতো অসংখ্য শিশুপাঠ্য গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। প্রতিটি গল্পের সঙ্গে রয়েছে তাঁরই আঁকা চমৎকার সব ছবি! গল্প পড়ার আগেই সেইসব ছবির পাখনায় ভর করেই পাড়ি জমানো যায় কল্পনার জগতে। তাঁর তত্ত্বাবধানেই চলে বাড়ির ছোটদের পড়াশুনো, ছবি আঁকা বা গানবাজনার চর্চা। যেমন খেলা তেমন যে কাজ, আনন্দ সর্বকাজে।

এহেন আদ্যন্ত শিল্পী পিতা উপেন্দ্রকিশোরের প্রভাব তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান সুখলতার জীবনের মূল সুরটি বেঁধে দেবে সেটাই তো স্বাভাবিক। কেবল পিতা হিসেবে নয়, শিল্পী হিসেবে, শিক্ষাগুরু হিসেবে, তিনি ছিলেন সুখলতার জীবনের ধ্রুবতারা। সুখলতা তখন খুবই ছোট, ভীষণ অসুস্থ, দুর্বল শরীর চোখ মেলবারও ক্ষমতা নেই। আদরের হাসির বিছানার পাশে বসে বাঁশি বাজাচ্ছেন উপেন্দ্রকিশোর, ওই সময়টুকুই মেয়ের মধ্যে দেখা যাচ্ছে জীবনের ক্ষীণ স্পন্দন, যেন সুরের প্রবাহ জাগিয়ে তুলছে তার প্রাণ। এই অসুখের ধাক্কা সামলাতে বহুদিন লেগেছিল সুখলতার, ছোট বোন পুণ্যলতা তাঁর স্মৃতিকথায় জানাচ্ছেন, ‘হাঁটাচলা, কথা বলা, সব ভুলে গেছিলেন, আবার সব ধীরে ধীরে নতুন করে শিখেছিলেন’ তিনি। এক বছরের ছোট সুকুমার তখন বড় হচ্ছে, তারই জুড়িদার হয়ে যেন জীবনের প্রথম পাঠটি আবার ঝালিয়ে নিলেন শিশু সুখলতা।

সেই ছোটবেলা থেকেই মিতভাষী, কিন্তু দায়িত্বশীল মেয়ে তিনি। বয়েসের তুলনায় একটু যেন গম্ভীর। বাইরের চঞ্চলতার অভাব ভেসে যায় সৃজনশীল নানা উদ্ভাবনে, শুধু গল্প লেখা আর ছবি আঁকাই নয়, একটু বড় হয়ে পর্দা টাঙিয়ে পুতুল নাটক দেখিয়ে ভাইবোনদের তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি।

সুখলতা রাও

‘বছরখানেকের ছোট ভাই সুকুমার অবিরল চঞ্চল, নানারকম দুষ্টুমি মাথায় ঘোরে তাঁর। সুখলতার যে আরশোলার ভয় ভালোভাবেই জানে সে, ঈষৎ আত্মমগ্ন, মাত্রই বছরখানেকের বড় দিদিকে মাঝেমাঝেই আরশোলার ভয় দেখানোতেই তার মজা। এমনকী পুরো শব্দ উচ্চারণ করতেও হবে না ‘ডুলির নীচে লাল মত ওটা কি’ বলাই যথেষ্ট… ভাতের থালা ফেলে ছুট দেবেন সুখলতা। এমনই সব হাসি-আনন্দের স্মৃতিরা ভিড় করে আসে ছোটবোন পুণ্যলতার স্মৃতিকথায়। পড়তে পড়তে সামনে ভেসে ওঠে সেযুগের আদ্যন্ত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বড় হয়ে ওঠা শিশুমুখগুলি। 

বাবা তাদের আদর্শ, বাবার মতোই গল্প-ছবিতে মনের ভাবনার প্রকাশ করা অনায়াসে আয়ত্ব হয়ে যায় তাদের, বিশেষত সুখলতা আর সুকুমারের। ছবি আঁকতে খুব ভালো লাগে তাঁর। খুব ছোটবেলা থেকেই শ্লেট ভরে ‘নানা রূপকথার ছবি নিজের মনে’ বিভোর হয়ে আঁকতেন। বাবা এনে দেন রং-তুলি-কাগজ– যখন যা লাগে। পাশে বসে দেখিয়ে দেন কীভাবে আঁকতে হবে ছবি। ভুল হলে শুধরে দেন। ছবির রঙে কল্পনার সজীব রং মিশিয়ে নিজস্ব জগত তৈরি করে ছোট মেয়েটি। যখন ছবি আঁকতে ‌মন বসে না‌, হাতে তুলে নেন বই।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

পিতার সাহচর্যে ও শিক্ষায় গড়ে উঠেছিল এক আগ্রহী মন, বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগও ছিল বাড়ির মধ্যেই। বিলিতি পত্রপত্রিকায় ছবি দেখেই বড় হয়ে ওঠা। বিশেষত এই সব বইয়ের রেখাচিত্রগুলি সুখলতার বিশেষ প্রিয়। ছোটবেলা থেকেই ছবির মধ্যে তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন এক ভালোবাসার জানলা। তাঁর ছবিতে ফুল, পাতা নানা দৃশ্যচিত্রের মতোই উঠে আসত মানুষের ছবি। রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারভুক্ত না হবার দরুন সৃজন-স্বাধীনতা পেলেও, সেকালে মেয়েদের পক্ষে তো আর ইজেল ঘাড়ে বাইরে বেরিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য আঁকার সুযোগ ছিল না। তাই বোধহয় ‘দৃশ্যের চেয়ে মানুষের ছবি আঁকার দিকেই মন যায় প্রথমে’, পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তিনি। আর এজন্যেই অল্পবয়স থেকে মানুষ বসিয়ে আঁকার চেষ্টা করতেন। অথচ সমস্যা সেখানেই, বাড়িতে ছোট ছেলেমেয়েদের অভাব ছিল না মোটেই, কিন্তু মডেল হিসেবে পোজ দিতে তাদের বেজায় আপত্তি। একবার তাঁর এক ছোটভাই তো কেঁদেই ফেলল। সবাই তো আর তাঁর মতো শান্ত নয়, কাজেই এতক্ষণ একভাবে বসে থাকা তাদের ছিল‌ না-পসন্দ।

ভালো লাগত তেলরঙের ছবি। বিদেশি ছবির সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছিল অল্পবয়স থেকে। উপেন্দ্রকিশোর তেলরঙে নিসর্গদৃশ্য আঁকতেন। বয়স যখন ১৩-১৪, ইচ্ছে হল অয়েল কালারে পোর্ট্রেট আঁকার। তাঁদের পাশের বাড়িতেই থাকতেন শশীকুমার হেশ, সরকারি আর্ট স্কুলের সুযোগ্য ছাত্র, ইতালি-ফেরত শিল্পী। সুখলতার আঁকা ছবির প্রশংসাও করেছিলেন তিনি। কিন্তু যথেষ্ট আগ্রহ থাকলেও তেলরঙে ‘মানুষের ছবি’ আঁকা শেখা তাঁর হয়নি। শিখবেন কী করে রিয়ালিস্টিক ছবি আঁকার প্রথম শর্তই তো অ্যানাটমি স্টাডি। আর সে যুগের মেয়েদের পক্ষে তো তা ছিল অকল্পনীয়। এমনকী আর্ট স্কুলেও তখন মেয়েদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। আগ্রহ ছিল দৃশ্যচিত্র আঁকার, পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে সেই শখ খানিক পূরণ হত। নতুবা‌ সেকালের দস্তুর অনুসারে ইজেল ঘাড়ে করে ল্যান্ডস্কেপ পেন্টিং করার সুবিধা বা সুযোগ কোনওটাই ছিল না তাঁর। কাজেই তৈলচিত্রে মানুষের প্রতিকৃতি আঁকার শখ তাঁর অপূর্ণই রয়ে গেছে আজীবন। মহিলা হিসেবে কারও কাছে ওই প্রয়োগ-কৌশল শেখার সৌভাগ্য যেমন হয়নি বটে; কিন্তু ঠাকুরবাড়ি বিশেষত রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার সুবাদে এবং পরবর্তীকালে স্বামীর আন্তরিক ইচ্ছা ও উৎসাহে ঘরে-বাইরে কখনওই ছবি আঁকার ব্যাপারে তাঁকে উৎসাহিত করার লোকের অভাব হয়নি। 

গল্পের বই, রঙিন অলংকরণ: সুখলতা রাও

সৌভাগ্য– সুখলতা ব্রাহ্মসমাজ-ভুক্ত হওয়ায় সমকালীন আর পাঁচজন মেয়ের থেকে স্বপ্নপূরণের একটু বেশি সুযোগই পেয়েছিলেন তাঁরা। ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ে রীতিমতো আঁকার ক্লাস হত। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ড্রইংয়ের শিক্ষাটা ভালো হওয়াতে পরবর্তীকালে নিজের এবং অন্যান্যদের বইয়ের জন্যে ছবি আঁকতে সুবিধা হয়েছিল অনেকটাই। ছবি আঁকবার অভ্যাস আজীবনই বজায় রেখেছিলেন তিনি। সঙ্গে চলেছে পড়াশুনার চর্চাও। ম্যাট্রিক পাশ করে ভর্তি হলেন বেথুন কলেজে।

১৯০৭ সালে ওড়িশা নিবাসী সিভিল সার্জন জয়ন্ত রাওয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। আরেক সংস্কৃতিমনস্ক পরিবার। জয়ন্ত রাও-এর বাবা ছিলেন ওড়িশার প্রখ্যাত কবি মধুসূদন রাও। পরবর্তীকালে নিজের সমস্ত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে লিখেছেন বহু বই, পরিচিতি লাভ করেছেন সমাজদরদী, কল্যাণব্রতী নাগরিক হিসেবে। নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, কিন্তু সেসবের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর প্রথম পরিচিতি– তাঁর শিল্পীসত্তা। অথচ জীবনের প্রথম উল্লেখযোগ্য পুরস্কার কিন্তু তিনি পেয়েছিলেন শিল্পী হিসেবেই। ১৯০৬-এ পেয়েছিলেন ‘ভারতীয় কারিগরি ও কৃষি প্রদর্শনী’-তে মহিলা বিভাগে সেরা ছবির জন্যে পদক। সেটি ছিল অয়েল কালারে আঁকা সূর্যাস্তের দৃশ্য। ১৯১০-এ পুরস্কার এল, জলরঙে আঁকা ছবির জন্যে, ‘দ্য বেস্ট অরিজিনাল ওয়াটার কালার পেন্টিং’-এর জন্যে। সংযুক্ত প্রদেশসমূহ আয়োজিত সেই প্রদর্শনীতে তিনি পেয়েছিলেন ব্রোঞ্জ মেডেল। এরপরে নিজেই জানাচ্ছেন তিনি আর কোনও প্রতিযোগিতায় ছবি পাঠাননি। তাঁর জলরঙের ছবিতে সে যুগের বেঙ্গল স্কুলের শিল্পীদের ছায়াপাত সহজেই চোখে পড়ে। সে যুগের রীতি অনুযায়ী, জলরঙের মাধ্যমে পুরাণ ও রামায়ণ-মহাভারতের ঘটনা অবলম্বনে তাঁর চারুকলা চর্চা বিস্তার লাভ করে। বেঙ্গল স্কুল হিসেবে সমধিক পরিচিত এই শিল্পধারা প্রকৃতপক্ষে ছিল বিদেশি শাসকদের ভারতীয় শিল্পের প্রবহমান ধারাটিকে নস্যাৎ করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক মাধ্যম। সেজন্যেই বিষয় হিসেবে প্রাত্যহিক জীবন যেমন উঠে আসে, তেমনই উঠে আসে প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষগুলোর মননে, জীবনে জড়িয়ে থাকা পৌরাণিক কাহিনির অনুষঙ্গ। এই শিকড়ের সন্ধানে যাত্রার শামিল হয়েছিলেন সেকালের অনেক শিল্পীর মতো সুখলতা রাও-ও। তাঁর সেই অল্পবয়সের মুগ্ধতার কথা ধরা দেয় তাঁর স্মৃতিচারণে– ‘সাজাহানের মৃত্যু, সতী, কার্তিকেয়, কৈকেয়ী, অভিসারিকা প্রভৃতি ছবি আমার এত ভাল লাগে যে, আমি এ ধরণের ছবি আঁকাতে আমার সামান্য শক্তি নিয়োগ করি। এই পদ্ধতিতে আঁকা ছবির একটি বিশেষ সৌন্দর্য অছে এবং এতে মনের ভাবই প্রধান হয়ে প্রকাশিত হয়।’ 

গল্পের বই, অলংকরণ: সুখলতা রাও

ভাবপ্রধান ছবির প্রতি এই মুগ্ধতা, তাঁর সামাজিক আদর্শভাবনা এবং সর্বোপরি নব্যবঙ্গীয় ‌ধারার শিল্পীদের পৌরাণিক বিষয় নিয়ে ছবি আঁকার প্রবণতা হয়তো তাঁর পৌরাণিক চরিত্রের প্রতি আকর্ষণের কারণ; হয়তো বা বড় হওয়ার পথে বাবার দৌলতে এসব গল্পের সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্যও তাঁকে এই সমস্ত বিষয় নিয়ে ছবি আঁকতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

ছোটবেলায় পাশ্চাত্য শিল্পের সঙ্গে সুগভীর পরিচয় তাঁকে পশ্চিমি শিল্প সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলেছিল। কেবলমাত্র তেলরঙে ছবি আঁকা শেখার ইচ্ছা প্রকাশ নয়, মার্জিত রুচিশীল পশ্চিমি দৃশ্যচিত্র এবং প্রি-রাফেলাইটদের চিত্রশিল্প তাঁকে টানত অনেক বেশি। এদেশে তখন সদ্য আবিষ্কৃত অজন্তার ছবি নিয়ে তোলপাড়। নন্দলাল বসু, অসিত হালদাররা অজন্তা ও বাগ গুহার ছবি কপি করছেন সেখানে গিয়ে। অজন্তার ছবিগুলি কিন্তু প্রাথমিকভাবে মন কাড়েনি সুখলতার। তবে একথাও মনে রাখতে হবে, তখন ব্রিটিশ বা ইউরোপীয় ছবির আঙ্গিকে আঁকা ছবির প্রতি মুগ্ধতা ও সেই শিল্পের শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে অপরিসীম বিশ্বাস ছিল স্বাভাবিক। বেঙ্গল স্কুলের ছবির সমালোচনায় অনেক পত্রপত্রিকাও ছিল সরব। ও সি গাঙ্গুলীর ‘রূপম’ পত্রিকার পাতায় ‘aesthetics of young India’ বিষয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক তো সবারই জানা। সেই বিতর্কে সুকুমার রায় পাশ্চাত্য শিল্পের সম্বন্ধে যে কথাগুলি লেখেন– তার সারবত্তা আজও প্রাসঙ্গিক, কাজেই সুখলতার এ সমর্থন অস্বভাবিক নয়। দ্বিতীয়ত সুখলতার মোটেই পছন্দ হয়নি অজন্তা চিত্রের সুন্দরীদের, মূলত তাদের বেশবাসের স্বল্পতার কারণে। ব্রাহ্ম পরিবারে বড় হবার সুবাদে, পোশাক-আশাক নিয়ে ভিক্টোরিয় রক্ষণশীল ভাবনার আবহে বড় হয়েছিলেন তাঁরা। সে প্রেক্ষিতেও এই ভাবনার উৎস খোঁজা যেতে পারে। ‌ 

নন্দলাল বসুর ছবি অবশ্য খুবই ভালো লাগত তাঁর। ‘[নন্দলালের] ছবি এত ভালো লাগে যে আমি ওই ধরনের ছবি আঁকতে আমার সামান্য শক্তি নিয়োগ করি। ওয়াটার কালারে কতগুলি অরিজিনাল ছবি আঁকি’, পরবর্তীকালে বলেছিলেন তিনি। তাঁর ‘পূজারিণী’ ছবি দেখে যেমন স্বভাবতই মনে পড়ে নন্দলাল বসুর সুপরিচিত ‘নটির পূজা’ ছবিটির কথা। এইটি ছাড়াও ‘প্রবাসী’ ও ‘মডার্ন রিভিউ’-তে তাঁর আরও বেশ কয়েকটি ছবি ছাপা হয়েছিল। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের এই প্রয়াস তাঁকে যে কতখানি উৎসাহিত করেছিল– জীবন সায়াহ্নেও সে আনন্দের কথা উল্লেখ করতে ভোলেননি তিনি।

নন্দলাল বসু

বিবাহ-পরবর্তী জীবনে তাঁর দৃশ্যচিত্র আঁকার শখ খানিকটা হলেও পূরণ হয়েছিল। তাঁর কথায় জানতে পারি, অন্ডালে তাঁর স্বামী সিভিল সার্জেন তখন– ‘গভীর জঙ্গলে, মহানদী যেখানে দুই পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়েছে, যাকে সাতকোশিয়া গণ্ড বলে সেখানে বসেও ছবি’ এঁকেছেন, কিন্তু সে সবই তেলরঙে। পুরীর সমুদ্রের কিছু ছবিও এঁকেছিলেন। তাঁর কথায় ‘পুরীর অধিকাংশ ছবিই দিনে বা রাতে দেখা সমুদ্রের স্মৃতি অবলম্বন করে আঁকা।’ এ সবই তেলরঙে আঁকা দৃশ্যচিত্র। অনুমান করা যায়, এ পদ্ধতিতে বাবাকে কাজ করতে দেখে, ও বিদেশি ছবি দেখার সুবাদে তেলরঙের প্রতি একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল, যা ওই মাধ্যমে ছবি আঁকার দক্ষতা বৃদ্ধির কারণ।

তাঁর জলরঙের ছবিতে দৃশ্যচিত্র যেমন আছে, তেমনই রয়েছে পুরাণ-আশ্রিত চিত্রাবলি। সেগুলির অধিকাংশই আবার নারীকেন্দ্রিক। এই ছবিগুলি নিয়মিত প্রকাশ পেত ‘প্রবাসী’, ‘মডার্ন রিভিউ’, ‘ভারতবর্ষ’ ইত্যাদি মাসিক পত্রিকার পাতায়। এর মধ্যে একক নারীর ছবি বেশি হলেও সেগুলিতে রয়েছে কাহিনির প্রচ্ছন্ন বিন্যাস। তাঁর সব লেখার মধ্যেই এক সদর্থক মানসিকতার প্রকাশ রয়েছে, রয়েছে খানিক নীতিবাদী মনোভাবও। তাঁর ছবিতেও তাই উঠে আসে সেই নারীরা– ‘যাদের ত্যাগ আর অপ্রাপ্তির বেদনা আছে, কিন্তু সেই যন্ত্রণার অন্তর্বয়ানে কোথাও না কোথাও মিশে গেছে তেজস্বিতার পদক্ষেপ।’

তাই শ্রীমতী, সাবিত্রী, বেহুলা, সতী অনায়াসেই নতুন আলোয় ধরা দেয় তাঁর ছবিতে। তাঁরা পৌরাণিক চরিত্র হলেও তাঁদের পোশাক-আশাক সেকালের গেরস্ত বাঙালি মেয়েদের মতো। তারা আপাত-দুর্বল, কিন্তু দৃঢ়চেতা,জীবনের কঠিন আঘাত তাদের যন্ত্রণাবিদ্ধ করে কিন্তু তাদের মনোবল ভাঙতে পারে না। জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে তাঁরা চরম সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলেন। তাঁরা আত্মসমাহিত, কিন্তু সিদ্ধান্তে অবিচল। আর তাই তাঁর আঁকা সতীকে ঘিরে থাকে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা।

সতী, সুখলতা রাও

আবার রবীন্দ্রনাথের ‘পূজারিণী’ কবিতার শ্রীমতীকে তিনি এঁকেছেন একটিমাত্র প্রদীপ হাতে, অজাতশত্রুর আদেশ অমান্য করে স্তূপের সামনে শেষ অর্ঘ্য নিবেদনরতা। শ্রীমতীর ছবিটি সম্পূর্ণ নব্যবঙ্গীয় রীতিতে আঁকা। অস্তসূর্যের লালিমা মাখা আকাশের প্রেক্ষিতে শ্বেতবসনা শ্রীমতীর কোমল আত্মনিবেদনের ভঙ্গিটি মধুর রসসিক্ত।

পূজারিণী, সুখলতা রাও

তাঁর ‘পূজারিণী’ নামের এই ছবিটি রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের পত্রিকাতে ছাপা হলে উৎসাহিত হয়ে তিনি নব্যবঙ্গীয় শৈলীতে ছবি আঁকায় মনোনিবেশ করেন– একথা তিনি নিজেই বলেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘নটির পূজা’ কবিতার বিষয়টি সে যুগে চিত্রকরদের একটি প্রিয় বিষয় ছিল। সুখলতাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু তিনিই প্রথম মহিলা শিল্পী যার ছবি ‘মডার্ন রিভিউ’-তে ছাপা হয়েছিল। তার এই ছবিটি যে জনপ্রিয় হয়েছিল তা অনুমান করা যায়! সিস্টার নিবেদিতা এই ছবিটির একটি সমালোচনা লেখেন। সেখানে তিনি দু’-একটি সাজেশন দিলেও মূলত ছবিটির প্রশংসাই করেন। তিনি ছবিটির মধ্যে এক গভীর সম্ভাবনা দেখেছিলেন– ‘a composition that has much promise… there is a suggestion of silence and a great space’। ছবিটির শান্তভাব তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। তবে তাঁর মনে হয়েছিল: ‘…very little of the stupa is seen hence it is the Pujarini who is prominent and not the one who is worshipped.’

তবে তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি ১৯৩০ সালে প্রকাশিত ‘বেহুলা’ বইটি। ১২টি ছবি দিয়ে সাজানো এই ইংরেজি বইটি মনসামঙ্গলের কাহিনির ইংরেজি রূপান্তর। জলরঙে আঁকা এই ছবিগুলি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভারী পছন্দ হয়েছিল।

বেহুলা, সুখলতা রাও

বইটির জন্যে একটি ভূমিকাও লিখে দেন তিনি। এই ভূমিকায় অবশ্য তাঁর ছবির কোনও উল্লেখ নেই কিন্তু রবীন্দ্রনাথের লেখা উদ্ধৃত করে মডার্ন রিভিউ পুস্তক সমালোচনায় লিখল,  বেশ মোটা কাগজে বইটি ছাপা হয়েছে। আরও লিখল: ‘The pictures by the authoress have been finely reproduced.’ কিন্তু ছবির গুণগত মান নিয়ে কোনও মন্তব্য নেই সেখানে। ১৯৩৩ সালে ইউ রয় এন্ড সন্স থেকে ছাপা এই বইটির ঝকঝকে ছাপা ও উজ্জ্বল ছবিগুলি প্রকাশনার উৎকর্ষের সূচক, তবে এই উৎকর্ষতা এদের কাছে প্রত্যাশিতও বটে। 

পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, যে ছবিটি তাঁর নিজের কাছে সবচেয়ে ভালো লাগে, সেটি হচ্ছে ‘স্বামীর কঙ্কালের আলিঙ্গনরতা বেহুলা’। দেখতে দেখতে মনে হয় জীবন যেন মরণের সঙ্গে একই সূত্রে গাঁথা। বেহুলার বিষণ্ণ মুখচ্ছবি দর্শকের মনেও এক করুণ আবহ সৃষ্টি করে। বারোটি জলরঙের ছবিতে শোভিত এই বইটি সেযুগে বিশেষভাবে সারা ফেলেছিল, কারণ পরিবারের ও স্বামীর প্রতি দায়বদ্ধতা, গৃহকোণের নিরাপত্তা ইত্যাদি যেসব মূল্যবোধ স্বদেশি আবহাওয়ায় খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল– তার প্রতিফলন বেহুলার কাহিনি ও এই ছবিগুলোর মধ্যে ছায়া ফেলে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভূমিকায় এই বিষয়গুলির ওপরেই জোর দিয়েছিলেন–

‘It gives us the picture of an ideal wife her heroic sacrifice and conjures the atmosphere of home life in its utmost majesty, touching simple hearts with the beauty and depth of its sentiments’

ধ্রুব, সুখলতা রাও

পৌরাণিক বিষয় নিয়ে তাঁর আঁকা ছবিগুলির মধ্যে অন্যতম ধ্রুব এবং শচী ও ঐন্দ্রিলা। সবক’টি ছবিতেই এ ধরনের শান্তভাবের প্রকাশ ঘটে তবে সর্বাঙ্গ আবৃত করা পোশাকের বাহুল্য অনেক ছবির ক্ষেত্রেই বেশ বেমানান লাগে। তার সব নারী চরিত্রই আপাদমস্তক আবৃত, শুধু হাত এবং পায়ের পাতা ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান নয়। ফলে পৌরাণিক চরিত্র নয়, এগুলি যেন সমকালীন আদর্শায়িত বাঙালি গৃহবধূর কুণ্ঠিত আবরণের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। বিশেষত ‘মা ও শিশু’ ছবিটির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই এই কথাটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

শচী ও ঐন্দ্রিলা, সুখলতা রাও

সাবিত্রী সত্যবানের কাহিনি অবলম্বনে তাঁর আঁকা ‘ওহ মাই বিলভেড’ ছবিটি এক ইংরেজ আধিকারিকের পছন্দ হওয়ায় অবনীন্দ্রনাথ তাঁকে সেকথা জানান ও ছবিটি তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। কাতর মুখে সত্যবানের জীবনভিক্ষার উদ্দেশ্যে ছুটে চলা উদ্বিগ্ন সাবিত্রীর এই ছবিটি অবশ্য সাহেব প্রথম দেখেন মডার্ন রিভিউয়ের পাতায়।

সাবিত্রী, সুখলতা রাও

সে যুগের মেয়েদের নানা সমস্যা ভাবিয়েছিল তাঁকে। শিশুপাঠ্য বইয়ের অভাব, স্কুলে যাওয়ার বা স্কুলের শিক্ষা সম্পূর্ণ করার সুযোগের অভাব, আর সবচেয়ে বেশি তাদের স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকারের অভাব। তাই তিনি অসংখ্য গল্প লিখলেন– ছোট শিশু থেকে কিশোর-কিশোরীদের জন্য। লিখলেন পাঠ্যপুস্তক– ‘নিজে পড়’, ‘নিজে শেখ’– যেন বইয়ের নামের মধ্যে দিয়েই বুনে দিতে চাইলেন আত্মবিশ্বাসের বীজটি।

কী চমৎকার সহজ ভাষায় অক্ষর পরিচয় করিয়েছেন তিনি। বইয়ের আরম্ভ অভ্যাসের জন্যে কিছু নকশার মতো লাইন দিয়ে– যাতে সহজে নিজে নিজে লিখতে শিখে যায় ছোট শিশুরা ।

অথচ বইটির মধ্যে দিয়ে বয়ে যায় এক সহজ ও সাবলীল কৌতুকময়তা। শিশু মনস্তত্ত্বের পাঠ তাঁকে নিতে হয়নি, কিন্তু শিশুদের মনের কথা ভালো করে বুঝতেন তিনি। তাই এই বইটির পাতায় পাতায় ছবি, আর ছড়া, নানা গল্পকথা। যেমন একটি ছবিতে ইঁদুরদের পালানো দেখে বুঝে নিতে হয়– ওটি বেড়ালের থাবা, অথচ নাটকীয় মন্তব্যটি শিশুকে ভাবনার খোরাক জোগায়।

একটি ছবিতে যেমন দেখা যায় গ্রামের পথে অ্যাম্বাসাডারের মতো একটি আওয়াজ এসে পড়েছে এবং হর্নের আওয়াজে একটি গরু ভয় পেয়ে খানায় গড়িয়ে পড়ছে। সঙ্গের ছড়াটিতে সেই ছবিরই বিশদ বর্ণনা–

হাওয়া গাড়ি যায়
গাই ভয় পায়।
বলদ পালায়,
গড়ায় খানায়।

কিন্তু ছবি ও গল্পের সুব্যবহারের সবচেয়ে চমকপ্রদ উদাহরণ সম্ভবত নিচের পাতাটি।

আজকের প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে হয়তো এগুলি খুব অভিনব কিছু মনে না-ও হতে পারে, কিন্তু মনে রাখতে হবে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। তখনও যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘হাসিখুশি’ ছাড়া এত সুন্দর রঙিন ছবি আঁকা পাঠ্যপুস্তক সুলভ ছিল না মোটেই। সহজপাঠের তুলনাতেও এই পাঠগুলি সহজ এবং ছবিগুলিও শিশুমনের কাছাকাছি।

উপেন্দ্রকিশোরের সাহচর্যে ছবির প্রতি সুখলতার যে ভালোবাসা জন্মেছিল, ছবির ভাষা আয়ত্ব করার যে সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন, তা-ই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল এক নিজস্ব শৈলী তৈরি করতে। তাঁর ছবিতে বেঙ্গল স্কুল ঘরানার ছাপ যেমন রয়েছে, তেমনই তাঁর গল্পের সঙ্গে আঁকা ছবিগুলির লাইনে এক ধরনের জোরালো অভিব্যক্তি দেখা যাবে। তাঁর লেখার সঙ্গে বেশিরভাগ ছবিই তাঁর আঁকা। এইসব ছবির মধ্যে তাঁর প্রথম বই ‘গল্পের বই’-এর চিত্রায়নে উপেন্দ্রকিশোরের শৈলীর ছাপ সুস্পষ্ট। এই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১২ সালে। ১২-টি বহুল প্রচলিত বিদেশি রূপকথার গল্প নিয়ে লেখা এই বইটির সব ছবিতেই জোরালো রেখাচিত্র বা লাইন ড্রইংয়ের মধ্যে দিয়ে যেমন গল্পের ঘটনাক্রমের আভাস দেওয়া হয়েছে, তেমনই চরিত্রগুলির বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলারও চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলায় সেই প্রথম কোনও মেয়ের লেখা এবং আঁকা সমন্বিত বই প্রকাশ পাচ্ছে। বইটির ভূয়সী প্রশংসা হয়েছিল ‘ভারতী’ পত্রিকায়– ‘বঙ্গনারীর হস্তে এমন চিত্র রচিত হয়– ইহা দেখিয়া শুধু আনন্দে নহে, গৌরবেও আমাদিগের চিত্ত ভরিয়া উঠে।’ 

ছোটবেলার স্মৃতি হাতড়ে ‘গল্পের বই’টির মলাটের ওপর আঁকা ডানাওয়ালা পরির ছবিটি মনে পড়বে অনেকেরই, কিন্তু সে ছবিও যে তাঁরই আঁকা জানা ছিল না শিশুকালে।

আলাদাভাবে অর্থাৎ কাহিনির হাত-ছাড়ানো বিচ্ছিন্ন ছবিগুলি দেখতে দেখতে মনে হয় কাহিনিনির্ভর হওয়া সত্ত্বেও অভিব্যক্তির গুণে চরিত্রগুলির মধ্যে এক ধরনের সজীবতার সঞ্চার হয়েছে। তবে এই ছবিগুলির মধ্যে কাহিনির অতিরিক্ত কোনও বিন্যাস নেই, কাহিনির সূত্র ধরে তবেই বোঝা যায় ছবিগুলির মর্ম।

“এবারে দৈত্য খুবই নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে। তা’ দেখে বুড়ীও আবার আরেক গাছা চুল পটাস্‌ করে টেনে তুলেছে। তখন, দৈত্য যে লাফটা দিল আর রাগটা কর্‌ল! বুড়ীকে সে মারেই। আর কি! অনেক হাত জোড় করে বল্‌ল, আর কর্‌ব না দাদা, এবার ছেড়ে দাও। বুড়ী মানুষ ব’সে ব’সে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, আর স্বপ্ন দেখেছিলাম।” 

দৈত্য ও বুড়ী, অলংকরণ: সুখলতা রাও

এই লাইনগুলি না পড়লে, খুব মন দিয়ে দেখলেও বড় বড় নখ আর নাকের বিরাট আয়তন ছাড়া ঘুমন্ত লোকটিকে দৈত্য বলে ভাবা কঠিন। আসলে সুখলতা বিশ্বাস করতেন কোনওরকম হিংস্রতা বা ক্রূরতা শিশুসাহিত্যে থাকা উচিত নয়। কাজেই দৈত্য বলে যদি কেউ মুলোর মতো দাঁত আর কুলোর মতো কানওয়ালা ভয়ংকর কিছুর কল্পনা করে– তাই তিনি এরকম শান্তশিষ্ট দৈত্যের ছবি আঁকলেন।

আবার পরের ছবিটি বলে সেই মজার বাড়ির কথা, যেখানে ‘ঘর খানা দেয়াল থেকে চাল অবধি খালি মিঠাই মণ্ডা দিয়ে তৈরী। দেয়াল সব সন্দেশের, চাল মালপুয়ার, জানালা শার্শী সব মিছরির। এমন মজা কি আর হয়? হরি আর গিরি ত কেবল হাস্‌ছে আর নাচ্‌ছে আর দুহাতে তুলে খালি মুখে দিচ্ছে।’

মিঠাই বাড়ি, অলংকরণ: সুখলতা রাও

তবে সবচেয়ে সজীব অলংকরণ বোধহয় রামখেল তিলক সিং-এর গল্পের ছবিটি– 

আজ কর্‌ব রান্না খা’ব পেট ভ’রে,
কাল আন্‌ব রাণীর ছেলে, ড্যাং ড্যাং করে
আমি রাম-খেল-তিলক-সিং,
তাই নাচি তিড়িং তিড়িং।

রামখেল তিলক সিং, অলংকরণ: সুখলতা রাও

তিড়িং তিড়িং করে নাচবার ভঙ্গিটি চমৎকার ধরা দিয়েছে ছবিটিতে । এরকম আরও অসংখ্য চিত্রায়ন রয়েছে তাঁর গল্পের সঙ্গে।

তাঁর ছবিতে মানুষ এবং জীবজন্তু দুয়েরই বহুল উপস্থিতি চোখে পড়ে, দু’-একটি অলংকরণ বিচ্ছিন্নভাবে ছবি হিসেবেও প্রশংসার দাবি রাখে। বিশেষত চরিত্রগুলির শরীরী বিভঙ্গের সাহায্যে তিনি অনায়াসে স্পষ্ট করে তোলেন তার বৈশিষ্ট্য, যা না কি সচিত্রকরণের এক আবশ্যিক শর্ত। কোনও কোনও অলংকরণ হয়তো তুলনায় দুর্বল বা অতি সাধারণ মানের, তবে মনে রাখতে হবে, সংসারের সব কাজ করে তবেই তিনি সময় পেতেন তাঁর মনের জানলা খোলার। কাজেই সবক্ষেত্রে হয়তো যথেষ্ট মন বা সময় কোনওটাই দিতে পারেননি তিনি।

অলংকরণ: সুখলতা রাও

মাঝেমাঝে ড্রয়িংয়ের দুর্বলতা ধরা পড়ে, অনেক সময় রেখার ব্যবহার‌ মনে হয় শিশুসুলভ, তবুও পরের দিকে করা গল্প-নিরপেক্ষ ছবিগুলিও নিতান্ত অবহেলার যোগ্য নয়। আর মনে রাখতে হবে, তিনি এসব ছবি এঁকেছিলেন শিশুদের জন্য, তাদের কল্পনার পাখনাটি ভালোভাবে মেলে দেবার জন্যে। সে যুগে সেই শিশু-পাঠকরা এইসব ছবি দেখে মজা পেত তো বটেই, কিন্তু আজকের কার্টুনে গল্প দেখা শিশুটিও যখন তাঁর আঁকা কুমড়ো, ইঁদুর আর পরির সঙ্গে একটি শাড়ি পড়া মেয়ের ছবি দেখে জিজ্ঞেস করে– এটা সিন্ডারেলার ছবি কি না, তখনই ইলাস্ট্রেটর হিসেবে তাঁর সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন করাটা কেমন যেন ঔদ্ধত্য হয়ে ওঠে। আমরা শিল্পী সুখলতাকে ভুলে গিয়েছি, আর সেজন্যেই বাঙালি ইলাস্ট্রেটরদের তালিকায় প্রথম বাঙালি মহিলা ইলাস্ট্রেটর সুখালতা রাওয়ের নামটা খুঁজে পাওয়া যায় না। এর কারণ দ্বিবিধ। প্রথমত সেই যুগে কেন, এযুগেও অলংকরণ শিল্পীদের নাম আলাদা করে লক্ষ করার কথা অনেকেই মনে করেন না; আর যেহেতু উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার এবং পরবর্তীতে লীলা মজুমদারও তাঁর কিছু কিছু লেখা নিজেই অলংকরণ করেছিলেন, তাই নিজের গল্প বা ছড়ার সঙ্গে নিজেই ছবি এঁকে অলংকরণ করাটাই রায়বাড়ির দস্তুর মনে হতে পারে। 

অলংকরণ: সুখলতা রাও

গত শতাব্দীর তিনের দশক পর্যন্ত সন্দেশের পাতায় নিয়মিত দেখা যেত তাঁর ছবি। নিজের প্রত্যেকটি লেখার সচিত্রকরণ শুধু নয়, অন্য লেখকদের লেখার সঙ্গেও তাঁর করা অলংকরণ সন্দেশকে সমৃদ্ধ করেছে। এমনকী স্বর্ণকুমারী দেবীর একটি ইংরেজি বইয়ের অলংকরণের জন্য প্রয়োজনীয় ছবিও তিনি এঁকে দিয়েছিলেন লেখিকার অনুরোধে। প্রথমদিকে সচিত্রকরণ করেছেন মূলত লাইন ড্রইংয়ের সাহায্যে। পরবর্তীকালে কিছু কিছু অলংকরণ তিনি করেন জলরঙে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় তাঁর ‘বন্ধুর দান’ গল্পটি সন্দেশের পর পর দু’টি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম সংখ্যার সচিত্রকরণ করা হয়েছে রেখাচিত্রে, কিন্তু দ্বিতীয় সংখ্যার ছবিটি ‘লোচন চরণকে কাঁধে করিয়া লইয়া যাইতেছে’ আঁকা জলরঙে। ক্রমশ তাঁর অলংকরণগুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বোঝা যাচ্ছিল, কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার ছাপ দেখা যাচ্ছিল, টানা ছবির বদলে অনেকসময় টুকরো ছবি থাকত। উদাহরণ স্বরূপ সন্দেশের ১৩৩১ সালে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘সময়হারা’ কবিতার সঙ্গে করা অলংকরণের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সচিত্রকরণকে যদি কবিতার বিষয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবা যায় তাহলে হয়তো এই অলংকরণের খুব একটা প্রশংসা করা যায় না, কিন্তু তিনটি পৃথক ইমেজের সাহায্যে কবিতাটির মূল ভাব (যেটি ছোটদের কবিতা হলেও খানিকটা বিমূর্তভাবেরও বটে) ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। সে যুগে এ ধরনের অলংকরণ কিন্তু অনেকটাই ব্যতিক্রমী। এই প্রসঙ্গে অবশ্যই উল্লেখ্য তাঁর কমিক স্ট্রিপের ধরনের অলংকরণের কথা। ১৩৩১ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় সুকুমারের ‘হেশোরাম হুঁশিয়ার’-এর কমিক স্ট্রিপ। পরের সংখ্যায় সুখলতা ওরকমই খোপ খোপ করে ছবিতে গল্প লেখেন। সেখানে ছবির সঙ্গে কোনও লেখা নেই। মজার কথা এই যে ছবির গল্পটি অর্থাৎ ‘ময়রার চোর ধরা’ আছে যে কবিতায়, সেটি কিন্তু কয়েক পাতা পরে বিচ্ছিন্নভাবে ছবি ছাড়া ছাপা হয়েছে। এর আগেও অবশ্য ১৩২৮-এর চৈত্র সংখ্যায় ‘ডিম রেঁধেছি খাসা’ বলে যে কমিক্সটি আঁকেন, সেটিও কিন্তু এরকমই ছবির‌ সঙ্গে ছড়া মিলিয়ে আঁকা। এই শৈলী সুখলতার একান্ত নিজস্ব বললে ভুল হয় না।এই একই পদ্ধতিতে করা সুখলতার আরও একটি কমিক স্ট্রিপ ১৩৩০-এর আষাঢ়ের ‘সন্দেশ’-এ পাই– ‘ঘুমের ঘোরে’। এছাড়া ‘পিঠে ভাগ’ নামে একটি কার্টুন স্ট্রিপ-ও এঁকেছিলেন ১৩৩১-এর জ্যৈষ্ঠে।

বাঙালি মহিলা শিল্পী হিসেবে প্রথম কমিক স্ট্রিপ আঁকার কৃতিত্বটিও তাঁর। চারটি আলাদা আলাদা বক্সের ফ্রেম তিনি এঁকেছেন– সিধু গয়লাকে জব্দ করার জন্য পিচকিরি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রের মাস্টারমশাইয়ের গায়ে জল দিয়ে তাড়া খেয়ে পালানোর দৃশ্য‌ দেখানোর জন্য। কমিক স্ট্রিপের ধরনে আঁকা এই ছবিটিতে স্পিচ বেলুনও ব্যবহার করা হয়েছে। ছবিটির মধ্যে গতি এবং নির্মল হাস্যরসের আবেদন রয়েছে, যার সরল উপস্থাপনা এবং বিষয় একান্তই রায়বাড়ি ঘরানার। 

কমিক স্ট্রিপ, সুখলতা রাও

সুকুমার রায় মারা যাবার পর কিছুদিন ‘সন্দেশ’ পত্রিকা বন্ধ ছিল। নবপর্যায়ের সন্দেশের প্রথম অর্থাৎ আশ্বিন সংখ্যার চতুর্থ প্রচ্ছদের ছবিটিও এঁকেছিলেন তিনি। সেই সন্দেশের হাঁড়ি হাতে দাড়িওয়ালা দাদু, সামনে উৎসুক ছেলেমেয়ের দল। উপেন্দ্রকিশোরের ঢঙে আঁকা এই রঙিন ছবিটির কম্পোজিশনে সেই মুনশিয়ানা না থাকলেও ফিগারগুলির সপ্রাণ অভিব্যক্তি প্রশংসনীয়। বিশেষভাবে চোখ আটকে যায় লাল শাড়ি পরা মেয়েটির ওপর। তার উজ্জ্বল উপস্থিতি ছবিটিতে অন্য দ্যোতনা আনে।

পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে সুখলতা বলেছিলেন: ‘মেয়েদের মধ্যে আমিই বোধহয় প্রথম নিজের বই নিজে চিত্রিত (illustrate) করি, বিশেষত বাঙালি মেয়েদের মধ্যে।’ এ দাবির সত্যতা অনস্বীকার্য। তথাপি তাঁর অবদানের মূল্যায়ন করা বা এর জন্যে সুখলতাকে কোনও আলাদা স্বীকৃতি দেওয়ার কথা মনে হয়নি আজও। আর দ্বিতীয় কথাটি তো সার্বিকভাবে সত্য। মেয়েদের গুরুত্ব না দেওয়া তো সামাজিক অভ্যাস। কাজেই প্রচারবিমুখ মিতভাষী সুখলতার এই অনন্য অবদানের মূল্যায়ন হয়নি আজও। বরং বলা ভালো, চিত্রশিল্পী বা ইলাস্ট্রেটর, কমিক স্ট্রিপ আঁকিয়ে সুখলতাকে আমরা মনে রাখিনি। তাঁর লেখা অধিকাংশ বইয়ের নতুন সংস্করণে আজ অন্য লোকেদের অলংকরণ চোখে পড়ে। আর এভাবেই বিস্মরণের ধুলোয় ঢাকা পড়ে যায় সেইসব পথিকৃৎ রেখাগুলো, হারিয়ে যায় এক নীরব কিন্তু সুসংহত শিশুশিক্ষার, শিশু মনোরঞ্জন কৃত্যের উৎসমুখ।

তবু আজও কোনও শিশু যখন ‘নিজে পড়’-র পাতা উল্টে তাঁর আঁকা ভারতীয় পতাকার ছবি দেখে পড়ে– ‘এতে তিনটি রং আছে। ঘাসের মতো সবুজ রঙ। দুধের মতো সাদা রঙ। আর গেরি মাটির মতো লাল রঙ’, তখন মনে হয়– অতীতের সব প্রয়াসই তারার মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে বিস্মৃতির অন্ধকারে। দরকার শুধু তাকে চিনে নেওয়ার, উত্তোলিত করা দরকার ভারতের এইসব পথিকৃৎ শিল্পীর জয়পতাকা।

…………… পড়ুন চিত্রার্পিত কলামের অন্যান্য পর্ব ……………

পর্ব ৫ : গোপেশের খল ক্লাউনেরা

পর্ব ৪ : নন্দলালের ছাত্রী থেকে সশস্ত্র বিপ্লবী

পর্ব ৩ : অরুন্ধতীর ছবি: আলো ক্রমে আসিতেছে

পর্ব ২ : আমিনা করের ছবি যেন জীবনানন্দের কবিতা

পর্ব ১ : মনের মানুষের সন্ধানেই রানী চন্দের শিল্পনীড় রচনা