Robbar

অরুন্ধতীর ছবি: আলো ক্রমে আসিতেছে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 28, 2026 5:41 pm
  • Updated:May 28, 2026 5:41 pm  

‘সাবিত্রী’। ছবিতে শায়িত সত্যবান– মৃত নয়, পুনর্জীবিত। তাই চারদিক আলোয় ভরা। সাবিত্রী যেন ছোট মেয়েটির মতো নিজের এই উত্তরণের আনন্দে উদ্ভাসিত। ছবিটির পশ্চাৎপটে আবার একই ধরনের রঙের খেলা, অর্থাৎ টোনাল ভেরিয়েশন– হলুদ রঙের মাঝখানে হালকা কমলা রং যেন উদিত সূর্যের গলানো‌ লালের আভাময় এক জ্যোতির্বলয়। এই যে আলোকে খুঁজে পাওয়া, মৃত্যুর অন্ধকারের মধ্যে থেকে জীবনকে ছিনিয়ে আনা– এটাই বোধহয় অরুন্ধতীর জীবনের ধ্রুবক।

স্বাতী ভট্টাচার্য

৩.

‘She could see it all so clearly, so commandingly, when she looked: it was when she took her brush in hand that the whole thing changed.’ 

একঘরে ছবি। একঘর মানে মোটেও একটি ঘরে সাজানো ছবি নয়। সে ছবি তো ছড়ানো রয়েছে ঘরের দেওয়ালে, কখনও-বা আসবাবপত্রের মাথায়, দেওয়ালে হেলান দিয়ে, কখনও-বা মেঝের ওপর সার দিয়ে। ধুলোর মায়াজাল হালকা করেছে ছবির রং। তেলরঙের ছবি– সহজেই আঁকড়ে নেয় উড়ে আসা ধুলোবালি। ছবি কি একরকম, শুধু তেলরঙে আঁকা– তা তো নয়– জলরং, পেনসিল, চারকোল নানা মাধ্যমে নানা সারফেসে নানা শৈলীতে আঁকা হয়েছে তাদের। এইসব ছবি অরুন্ধতী রায়চৌধুরীর। অরুন্ধতী সরকারি আর্ট স্কুলের উজ্জ্বল, সম্ভাবনাময় শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু পাস করবার দেড় দশকের মধ্যেই সমস্ত ছবি একঘরে করে, মনের অন্দরমহলে ঝাঁপ ফেলে দিলেন। অযত্নে পড়ে রইল সাধের তুলি-রঙের বাক্স, পড়ে রইল অসংখ্য ছবি। আজ সহসা সেই ছবির ভাণ্ডারের সামনে দাঁড়িয়ে, তাঁর কলেজের স্কেচখাতার জীর্ণ পাতা ওলটাতে ওলটাতে ঘরে ছায়া নামে, অকারণে ভারী হয়ে ওঠে মন– ‘এ কী মায়া লুকাও কায়া…।’

অথচ তাঁর লেখা পড়লে, তাঁর ছবি দেখলে বোঝা যায়– কী অসম্ভব প্রাণবন্ত মানুষ ছিলেন! দেওয়ালে ঝুলছে তাঁর একটি তৈলচিত্র– একধারে গভীর নীল, এই কি রবীন্দ্র-কথিত নিতল নীল? অন্যদিকে ধূসর কালো আর মাঝখানে বৃত্তাকার আলোর বলয়। তার কেন্দ্রে একটি মনুষ্য অবয়ব। দু’টি হাত ছড়ানো দু’দিকে। এ কি ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো’? না কি ‘আরও আরও আরও দাও প্রাণ’-এর চিরন্তন প্রার্থনা! কিন্তু আকাশবাণীর এই নিয়মিত শিল্পীটির তেমন প্রিয় ছিল না রবীন্দ্রসংগীত। হয়তো-বা রবীন্দ্র-গানের স্বরলিপির বাঁধন পছন্দ ছিল না এই আদ্যন্ত শিল্পী মানুষটির। উচ্চাঙ্গ সংগীতের চলনেই তিনি মনের মুক্তি পেতেন, যেমন পেয়েছিলেন পরবর্তীকালে গাওয়া কীর্তনের সুরে। কিন্তু এ ছবি বড় অদ্ভুত। এই নীলের মোড়কে যেন ধরা আছে সৃষ্টির আদি রহস্য। কী এক গভীর ব্যঞ্জনা ছবিটির পরতে পরতে।

পুরনো ধরনে রং চাপানো। প্রথমে গভীর বা গাঢ় রঙের আস্তরণ দিয়েছেন, তারপর ধীরে ধীরে হালকা রং প্রয়োগ করে টোনাল ভেরিয়েশন সৃষ্টি করেছেন। যার ফলে ছবিতে এক ধরনের গভীর আবহ সৃষ্টি হয়েছে। তারপর বিভিন্ন স্থানে পাতলা স্বচ্ছ রঙের স্তর ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু অংশে ড্রাই ব্রাশিং কৌশল দেখা যায়। যেখানে আধা শুকনো ব্রাশের সাহায্যে রুক্ষ ও ভাঙা টেক্সচার তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও গ্লেজিং এই ছবিটির এবং সমসাময়িক বেশ কয়েকটি ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। পাতলা স্বচ্ছ রঙের একাধিক স্তর ব্যবহারের মাধ্যমে ছবিতে গভীরতা এবং স্বপ্নময় আবহ তিনি তৈরি করেছেন অনায়াসে।

তাঁর বেশিরভাগ তেলরঙের ছবিতেই এ ধরনের পরীক্ষামূলক কাজ দেখা যায়। তাঁর ছবিতে এক ধরনের স্থানিক বিভাজন দেখা যায়, যা খুবই পরিকল্পিত এবং সুচিন্তিত। এই যে বিমূর্ত মনুষ্য অবয়ব, যা গঠিত হচ্ছে কয়েকটি ঋজু ও কৌণিক রেখার সাহায্যে, তারা যেন অনেকসময়ই ভাসমান, উদ্বাহু, খানিকটা উদ্বেলও। তাঁর ছবির এই টানটান মানুষগুলো যেন মনে করায় শ্যাডো-পাপেটের কথা। এরা যেন ঠিক মানুষের মতো নয়, যেন তাদের ছায়াচিত্র। তাঁর ছবিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নীল এবং হলুদের ব্যবহার দেখা যায় আর অদ্ভুত ধূসর এক সাদার ব্যবহারও চোখে পড়ে। এই যে আস্তে আস্তে একটা রঙকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে চিত্রতল জুড়ে, এক গতিময় গভীর বিন্যাসে– এ যেন এক উৎসারণের গল্প। যেন পৃথিবীর কেন্দ্রে যে প্রাণবীজ, যে অভ্যন্তরীণ ঘূর্ণি, যে চক্রবৎ পরিভ্রমণ– তা-ই যেন ধরা দেয় তাঁর ছবিতে।

কখনও যেন তা অগাধ জলতলে নিমজ্জিত মানুষের মিছিল, যেন সংসারের মালিন্যে মনুষ্যত্ব হারানো একদল মানুষ আলোর অপেক্ষায় ঊর্ধ্বমুখী।

এ ছবিতে বড় বড় কাঠামোর আভাস রয়েছে। কখনও তা নিষ্পত্র গাছের ডালপালার কথা মনে করায়, কিংবা কোনও এক কাঠের ঘরের কথা– যেখানে আলো ঢোকে না, শুধুমাত্র বিচ্ছুরিত হয়। তবু কেন জানি মনে হয়, হয়তো-বা নীল রঙের জন্যই, এ যেন মজ্জমান মানুষের গল্প। দু’টি মানুষ– পরস্পরের থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু তারা একক, বিচ্ছিন্ন, স্থবির। তবু এ মৃতের গল্প নয়, ছবির উপরের তলে এক মায়াবি সোনালি আলো বারবার ঘন নীলের আবরণকে ভেঙে ভেঙে দেয়। এ-ও সেই গ্লেজিংয়েরই খেলা। কখনও ড্রাই ব্রাশিং, কখনও-বা স্প্যাচুলার সাহায্যে তিনি এই রুক্ষ টেক্সচার সৃষ্টি করেছেন; ভেঙে দিয়েছেন নিশ্চিত আবহকে; বিশেষত যেখানে তিনি এই ধরনের স্ট্রাকচারের ব্যবহার করেছেন, সেখানে স্প্যাচুলার সাহায্যে এক রুক্ষ গভীরতা এনেছেন। নিচের ছবিটি লক্ষণীয়।

বারবার তাঁর ছবিতে ফিরে আসে বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব, পরস্পরের যোগাযোগের অভাব; লক্ষ করলে দেখা যাবে, দু’টি পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে দু’টি মনুষ্য অবয়ব। তাদের ঘিরে রেখেছে অদ্ভুত এক সজীব সাদা আলো। তার মধ্যে মিশে গেছে আলোর সোনালি আভা। একরোখা সবুজ গাছের অবয়ব। নীলের মধ্যে যে কতরকম বর্ণচ্ছায় আভা ছড়ায়, তা ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যায়। এও তো সেই উত্তরণের গল্প। যে ধোঁয়াশা, যে আত্মবিশ্বাস, যে অনিশ্চয়তা মানুষকে ঘিরে রাখে– তার বাইরে গিয়ে, সেই বন্ধনকে অস্বীকার করে, সে নিজের একক অস্তিত্বকে, তার মনুষ্যত্বের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে ঘোষণা করছে। তাঁর বেশিরভাগ ছবিতেই কেন্দ্রীয় চরিত্র নারী। আশ্চর্যভাবে এই পর্যায়ের ছবিতে সবসময়ই বিমূর্ত জ্যামিতিক উপস্থাপন তাদের। অবয়বে নারীত্বের আভাসটুকু দিলেও, শেষপর্যন্ত যেগুলি নারীদের অভ্যস্ত দর্শনচিহ্ন, সেগুলির অনুপুঙ্খায়ন কিন্তু তিনি সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়েছেন। যেন একথাই বোঝাতে যে, তারা সর্বাগ্রে মানুষ, শারীরিক গঠনের বিভাজন তো তিনি অস্বীকার করেননি; কিন্তু শেষপর্যন্ত তাদের তিনি মেয়ে-মানুষ নয়, মানুষ হিসেবেই দেখিয়েছেন। এক আশ্চর্য মায়াবি জোৎস্না খেলা করে চিত্রটি জুড়ে; কিন্তু সেই জ্যোৎস্না যেন জ্যোতিচক্রের মতো ঘিরে রাখে এই দুই মানবককে।

অরুন্ধতীর ছবিতে গাঢ় নীল আকাশ আছে, কালোয় নীলে মেশা আঁধার আছে, সংরচনের বাঁধন আছে; কিন্তু শেষপর্যন্ত তাঁর ছবি এক উৎসারণের কথা বলে, আলোর সন্ধান দেয়, মনুষ্যত্বের জয়ের কথা বলে। এমনই এক আলো-মাখা ছবি ‘সাবিত্রী’। ছবিতে শায়িত সত্যবান– মৃত নয়, পুনর্জীবিত। তাই চারদিক আলোয় ভরা। সাবিত্রী যেন ছোট মেয়েটির মতো নিজের এই উত্তরণের আনন্দে উদ্ভাসিত। ছবিটির পশ্চাৎপটে আবার একই ধরনের রঙের খেলা, অর্থাৎ টোনাল ভেরিয়েশন– হলুদ রঙের মাঝখানে হালকা কমলা রং যেন উদিত সূর্যের গলানো‌ লালের আভাময় এক জ্যোতির্বলয়। এই যে আলোকে খুঁজে পাওয়া, মৃত্যুর অন্ধকারের মধ্যে থেকে জীবনকে ছিনিয়ে আনা– এটাই বোধহয় অরুন্ধতীর জীবনের ধ্রুবক।

তাঁর জীবনও তো এমনই এক উত্তরণের ইতিহাস। এমনই এক ভাঙন থেকে মুক্তি খোঁজবার গল্প। আত্মশক্তিতে সমস্ত বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে এক নতুন আলোয় চোখ মেলবার কাহিনি। বাবা ছিলেন রংপুর কারমাইকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ দেবপ্রসাদ ঘোষ। তাঁর অগাধ জ্ঞান নানা বিষয়ে! তিনি যেন‌ চলন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। মা সংস্কৃতজ্ঞ, বেথুন কলেজের গ্রাজুয়েট শোভা ঘোষ। সংস্কৃতিমনস্ক এই পরিবারের আটটি ছেলেমেয়ের পঞ্চমজন অরুন্ধতী।

অরুন্ধতী রায়চৌধুরী

১৯৩৫ সালে জন্ম। প্রায় ৩৫ বছর পরে ‘স্মৃতির ঝরা পাতা’য় লিখছেন ‘রংপুরের স্বপ্নে ভরা দিনগুলির কথা।’ সেইসব দিন– ‘যেন রাংতায় মোড়ানো রঙিন জলছবির গোছা’। রংপুরের কারমাইকেল কলেজ– ৯০০ বিঘা জমি তার চারদিকে। যার ‘প্রাসাদের মতো বাড়ি আর তাজমহলের মত বিরাট গম্বুজ’। সাদা রং, ‘চারপাশে মিনার ও ছোট গম্বুজ নকশা করা জাফরির জানালা’। বাবা এই কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার সুবাদে বিরাট বাংলো-বাড়িতে থাকতেন তাঁরা। পাশে লাল ফুলে ভরা শিমুল গাছ, ‘পঞ্চবটির বন’, আর বুনো লেবু টক করমচা থোকা‌‌ জলপাইয়ে ভরা সবুজ গাছ; আর রয়েছে মোটা মোটা কাঁঠাল গাছ, পাকা কাঁঠালের গন্ধে তার তলায় শিয়ালের দল আসর জমায়। ‘হুয়া হুয়া কেয়া হুয়া’ চিৎকারে পাড়া মাত করে। চওড়া বারান্দায় লন্ঠনের আলোয় পড়তে বসা ভাইবোনেরা একসঙ্গে উত্তর দেয়– ‘কুছ নেহি হুয়া কুছ নেহি হুয়া’। এই সোনায় মোড়ানো দিনগুলির কথা, লিখছেন– ‘জলে ভিজিয়ে জলছবি তুলতে হয় জানো তো? আমারও সেসব মন কেমন করা দিনগুলির কথা ভাবলে চোখে জল আসে। আর ভিজিয়ে নিলে ছবিগুলো হয়ে ওঠে আশ্চর্য রঙিন।’ পড়াশুনা, খেলাধুলা, নানা খুনসুটির সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই গানের তালিম শুরু হয়েছিল অরুন্ধতীর। গান তাঁর অস্তিত্বের আরেক প্রাণরস। স্কুলের পাঠ শেষ করে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ পাস করলেন তিনি। কিন্তু মনে চলে নিরন্তর রংয়ের খেলা, বদলে যায়, বদলাতে থাকে চোখে দেখা দৃশ্যপট। কিন্তু শিখতে হবে ছবির ব্যাকরণ। তারই টানে ভর্তি হলেন সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে। সহপাঠী হিসেবে পেলেন পরবর্তীতে-বিখ্যাত সব শিল্পীদের– ধীরাজ চৌধুরী, সুনীল দাস, যোগেন চৌধুরী, অজয় কুমার ঘোষ, শ্যামশ্রী বসু, অনিতা রায়চৌধুরী। শিয়ালদায কিংবা হাওড়া স্টেশনে স্কেচ করতে যাওয়া, আউটডোর করা, পাশ্চাত্য শৈলীর ছাত্রী হলেও মাঝেমাঝেই ভারতীয় শৈলীর ছবিতে হাত পাকানো– স্বপ্নের মতো কেটে গেল পাঁচটি বছর। খাতার পর খাতা ভর্তি ড্রয়িং আর স্কেচ। সেগুলির দ্রুত চলমান রেখা, একেকটি যেন একেকটি জীবনের গল্প! মা ও শিশুর ছবি বারবার ফিরে আসে, মোড়ার উপর বসে রান্না করছে মা, শিশু কোলে বিষণ্ণ মায়ের ড্রইং, নানা ভঙ্গিতে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে থাকা-শোয়া-বসা মানুষগুলো তাঁর দ্রুত রেখার টানে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

১৯৫৯-এর স্কেচখাতাটির রেখাচিত্রে সাবলীল চলন ও শিল্পীর ভাবব্যঞ্জনা মুগ্ধ করে। মূলত অনুশীলনের জন্য করা এই রেখাচিত্রগুলির প্রত্যেকটির মধ্যেই একটি সংবেদনশীল মনের, অনুভবী দর্শনের প্রকাশ দেখা যায়। দ্রুত হাতে আঁকা এই রৈখিক দর্পণে আভাস মেলে এক অন্যতর জীবনকাহিনির, খুব চেনা অথচ না-দেখা লোকেদের, প্রাত্যহিক যাপনের। ১৯৬০ সালে কলেজ থেকে পাস করে বেরলেন। ইতিমধ্যেই বিবাহ হয়েছে দিলীপ রায়চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি ছিলেন রসায়নবিদ ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট। সাত বছরের বিবাহিত জীবনে তাঁদের সম্পর্কের রসায়নে কোনও খাদ ছিল না।

স্বামীর সঙ্গে গেছেন তিনি প্যারিস, ইতালি। নিজের চোখে দেখেছেন সেখানকার মিউজিয়ামগুলো। মজার কথা এই যে, এই ভ্রমণের যে বিবরণ পরবর্তীকালে লিখেছেন– সেখানে কোনও ছবি বা মিউজিয়ামের কথা নেই, রয়েছে চারিদিকের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলির চমৎকার বর্ণনা, নানা রঙের খেলা। আর আছে বেশ সরস ভঙ্গিতে লেখা সেখানকার খাবারের গল্প।

“খাদ্যসম্ভার– সামুদ্রিক মাছের রান্না। অতি বৈচিত্রপূর্ণ! দেড়-ফুট লম্বা আর ইঞ্চি ছয়েক চওড়া বিশালাকার সুসিদ্ধ, লাল টকটকে চিংড়িরা শুয়ে আছে দিব্যি কাঁচের ঘরটিতে। ‘ঈল’ মাছেরা সাপের মত ওই চিংড়িদের জড়িয়ে ধরে ঘুমুচ্ছে। অতিকায় সামুদ্রিক শামুক ও ঝিনুকের শোভা স্যালাড পাতা ও নানান রঙের সব্জির সাজিতে। এ দৃশ্যে আমাদের অবস্থা হল সাংঘাতিক। আজগুবি কাঁকড়া আর ভেটকি মাছেরা যেন আমাদের তাড়া করে এল। মাছ আর মুখে তুলতে পারলাম না।”

যাত্রাপথে আর যা সঞ্চিত হয়েছে, তা হল ওই সময়ে করা তাঁর অনবদ্য কিছু স্কেচ।

এই পর্বের দিনগুলি সত্যিই যেন সোনায় মোড়া। নানা জায়গায় ঘুরছেন, আকাশবাণীর নিয়মিত শিল্পী– ভজন গাইছেন, গাইছেন নানা রাগপ্রধান গান। ছবির প্রদর্শনী হচ্ছে। লেডি রাণু স্বয়ং তাঁকে উৎসাহ দিচ্ছেন একাডেমিতে প্রদর্শনী করতে। প্রদর্শনী হচ্ছে মুম্বইয়ের জাহাঙ্গীর আর্ট গ্যালারি, দিল্লির আইফ্যাক্‌স গ্যালারিতে।

সংসার জীবনেও দায়িত্ব বেড়েছে। ঘর আলো করে এসেছে ফুটফুটে দুই মেয়ে। এর মধ্যেই সবার অজান্তে দুঃস্বপ্নের ছায়া নামল জীবনে। ১৯৬৬ সাল। একাডেমিতে চলছে অরুন্ধতীর একক প্রদর্শনী। পর্দার নেপথ্যে থেকে যে সৌম্যদর্শন সদা-উৎসাহী মানুষটি, প্রদর্শনী যাতে সুচারুভাবে সম্পন্ন হয় সেজন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, সেই দিলীপ রায়চৌধুরী সহসা চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে। ছোট মেয়েটির বয়স তখন মাত্র ১১ মাস। জীবনের স্বচ্ছন্দ গতি গেল পালটে– দায়দায়িত্ব, অর্থনৈতিক সংকট, সব কিছুর মধ্যেও নিজেকে শক্ত রেখে হাতে তুলে নিলেন রং-তুলি।

মায়ের ছবি আঁকা দেখতে দেখতে, তার্পিন আর তিসির তেলের গন্ধের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠল দুই মেয়েরই। ছবি আঁকায় চিরদিনই উৎসাহ ও সক্রিয় সহযোগিতা পেয়েছেন স্বামীর কাছ থেকে, মেয়েরাও বুঝে যায় মায়ের শিল্পী-মনের চাহিদা। এদিকে অবস্থা বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় অরুন্ধতীর ছবির ভাষাও। এবার ছবিতে আসে অনেক বেশি বাস্তবানুগ ফর্ম। বাইরের প্রাত্যহিক মালিন্যে যখন জীবনের রং অনেকটাই ঝাপসা, তখন কিন্তু ক্যানভাসে নানা উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার।

সেই ত্রিকোণাকৃতি কম্পোজিশন, সেই পশ্চাৎপটে উজ্জ্বল আলো, অথচ রং এখানে অনেক তীব্র। ছবির সামনের অংশে তল বিভাজনের সাহায্যে টেক্সচার তৈরি করা হয়েছে। সবটাই খুব সুচিন্তিত। যেন আলো-আঁধারির যে তন্বিষ্ঠ মায়া তৈরি হতে পারত, তাকে জোর করে ভেঙে দেওয়া। কোথায় যেন মিলে যায় ‘টু দ্য লাইটহাউস’-এর–

‘The autumn trees gleam in the yellow moonlight, in the light of harvest moons, the light which mellows the energy of labour, and smooths the stubble…’

মায়ের আঁকা যে ছবিটি অবাক হয়ে দেখছে ছোট্ট যশোধরা, সেই ছবিটির মধ্যেও একই ধরনের রঙের ব্যবহার। কেন্দ্রীয় ফর্মটির শরীরে তেলরঙের মোটা, ভারী লেপ। পরতে পরতে রং বসানো। অথচ চারপাশের ফিগারগুলোতে ব্রাশের চলন দ্রুত, অনেকটা আঁচড় কাটার মতো টেক্সচার। মাঝের আলো মসৃণ, প্রায় ধাতব। অথচ কী এক শোকের আবহ ঘিরে থাকে ছবিটিকে। ফিগারগুলোর গায়ে খসখসে, ভাঙা টেক্সচার। শ্রমের ছাপ, উথালপাথাল জীবনের সঙ্গে লড়াই এর চিহ্ন। ব্রাশ এখানে শুধু রং বোলায় না, স্পর্শ তৈরি করে।

এল ১৯৭১। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, আবার ভাঙন, আবার স্থানচ্যুতি– শোকাকুল, ভীত, লুণ্ঠিত মানুষগুলির বেদনা স্পর্শ করে তাঁর সংবেদনশীল মনকে। মনের দর্পণ হয়ে ওঠে ছবি। সে ছবির নিচের দিকে জড়ো হওয়া, নতজানু, শিশু-কোলে মূর্তিগুলো ভারী, মাটি-ঘেঁষা। তারা বিপন্ন প্রাত্যহিকতার যন্ত্রণা, মৃত্যু ও মাতৃত্বের সংকটের কথা বলে। মাঝের নারীমূর্তির উপরে তোলা দু’ হাত ট্রায়াঙ্গলের চূড়া তৈরি করেছে। সে মাটি ছেড়ে উঠছে আলোর দিকে। 

দু’ পাশে ইচ্ছাকৃত ফাঁকা জায়গা নেগেটিভ স্পেসের নির্দ্বিধ ব্যবহার। কারণ ওই শূন্যতাই নীরব আর্তিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। চিত্রতল ভরা সোনালি গেরুয়া-বাদামিতে তারা রচনা করে মাটি, রক্ত, শ্রমের কথন। মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত টোনের টান। কোথায় যেন মনে হয়, শিল্পী ফিরছেন তাঁর পুরনো দর্শনে। ছাত্রজীবনে দেখা-আঁকা সেই ক্লিষ্ট মানুষগুলোর কাছে। সবুজ ব্যাকগ্রাউন্ডে মৃত্যু, অনিশ্চয়তার অস্পষ্ট ছায়া যেন নিহিত পাতালছায়া, এক অন্ধকার আগ্রাসন। কিন্তু সেটা শেষ নয়।‌ এই যে ধাতব সোনালি রঙে পূর্ণতার আভাস– এ শুধুই আলো নয়, রূপান্তর। যন্ত্রণা পুড়ে কাঞ্চন হয়েছে। মনে পড়ে ‘জীবনস্মৃতি’র সেই কথাগুলি–

“মৃত্যু যখন মনের চারিদিকে হঠাৎ একটা ‘নাই’ অন্ধকারের বেড়া গড়িয়া দিল, তখন সমস্ত মন প্রাণ অহোরাত্র দুঃসাধ্য চেষ্টায় তাহারই ভিতর দিয়া কেবল ‘আছে’ আলোকের মধ্যে বাহির হইতে চাহিল।”

অরুন্ধতীর ক্ষেত্রেও অনুভূত যন্ত্রণা তুলিতে এসে হয়ে আলোর উদ্ভাস হয়ে গেছে। সোনালি, গেরুয়া, গাঢ় বাদামি আর কালচে-নীলের ব্যবহারে আলো আর ছায়ায় তৈরি হয়েছে এক শক্তিশালী বৈপরীত্য! পশ্চাৎপটে এক টুকরো হলুদ আলোয়, কেন্দ্রীয় নারীমূর্তিটি, মনে হয় যেন, ভেতর থেকে জ্বলছে।

এই জ্বলন আর উত্তরণ, শোক আর প্রার্থনা– তাঁর ভেতরেও এক আত্মিক পরিবর্তনের সূচনা করছিল। ১৯৭৪ সালে হল তাঁর শেষ এগজিবিশন, তখনও চল্লিশের কোঠায় পা পড়েনি তাঁর। বড় মেয়ে লোপামুদ্রা ক্লাস এইট, যশোধরা স্কুলের নিচু ক্লাস। অর্থসংকট খানিক বেড়েছে। প্রদর্শনীর খরচ অনেক। বিক্রি করে দিতে হল সাধের গাড়িটিও। আর সেই সঙ্গে তুলে রাখলেন রং-তুলি-ক্যানভাস। এক গভীর শূন্যতাকে এড়াতে যাতায়াত করতে লাগলেন সারদা মিশনে। যোগাযোগ তৈরি হল অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে। যেন নির্মোকের মতো ছেড়ে ফেলছেন পুরনো জীবন, পুরনো অভ্যাস– অভিযোগহীন কর্তব্যপরায়ণতা এবং এক অন্তর্লীন অভিমানে; বুঝেছিলেন, শ্রেয় এবং প্রেয়-র দ্বন্দ্বে প্রেয়কে আড়ালে রাখলেই স্থির থাকবে লক্ষ্য। অথবা আশ্রমিক নির্লিপ্তি এভাবেই বদলে দিয়েছিল তাঁকে। অথচ তখনও তিনি আগের মতোই প্রাণবন্ত। কেবল এক অদ্ভুত নির্বেদে বেদপাঠ, গীতা-উপনিষদের পাঠ ব্যাখ্যা করেন। কীর্তন গান প্রাণ ঢেলে। নানারকম আধ্যাত্মিক চর্চায় নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। অবরসবরে কিছু ইলাস্ট্রেশন, অনুরোধে বইয়ের মলাট, আনমনা কিছু আঁকিবুঁকি– ছাদ-বাগানের ফুলের রঙে চোখ ডুবিয়ে অনুভব করেন সুখ-দুঃখের সীমানা ছাড়ানো সেই চিরন্তনকে। কিন্তু সে এক অন্য অধ্যায়।

‘টু দ্য লাইটহাউস’-এর শেষ লাইনটি মনে পড়ে। ‌Lily Briscoe, তার ক্যানভাসের মাঝখানে একটা দাগ টেনে বলে, ‘I have had my vision’, হয়তো এমনটি ভেবেছিলেন অরুন্ধতীও… হয়তো, কিংবা হয়তো না… কে জানে!

তথ্য ও চিত্র-ঋণ: শিল্পী-কন্যা লোপামুদ্রা ও যশোধরা রায়চৌধুরী

…………… পড়ুন চিত্রার্পিত কলামের অন্যেন্য পর্ব ……………

পর্ব ২ : আমিনা করের ছবি যেন জীবনানন্দের কবিতা

পর্ব ১ : মনের মানুষের সন্ধানেই রানী চন্দের শিল্পনীড় রচনা