Robbar

গোপেশের খল ক্লাউনেরা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 27, 2026 12:41 pm
  • Updated:June 27, 2026 12:41 pm  

তাঁর ছবির প্রতিটি রেখায় কুটিলতার যে বিস্তৃত বিন্যাস, তা প্রতিটি মুখচ্ছবিকে করে তোলে প্রতিকৃতি। একেকটি টাইপ বা তাদের চোখের ক্রূরতা, মুখের রেখার অনমনীয় নিষ্ঠুরতা তাদের শরীরী ভাষাকে স্পষ্ট করে তোলে। অথচ এগুলি প্রত্যেকটিই মুখচ্ছবি মাত্র, কোনওটিই পূর্ণাবয়ব মূর্তি নয়। কীরকম যেন মনে হয়, প্রতিদিনের অভ্যাসে যাদের মেনে নিই আমরা– তাদের আসল চেহারাটা দ্রুত রেখার ছন্দে তুলে ধরেছেন। যেন এরপরেই শিল্পের ঝাঁপ পড়ে যাবে। মুখের বদলে সাজানো অভ্যস্ত মুখোশটিই আবার দেখবে মানুষ। অথচ ছবির নাম ‘ক্লাউন’। এভাবেই ঘুরে বেড়ায় এই মানুষেরা, নিজের চেহারা লুকিয়ে, নিজের খলস্বভাব মেকি হাসির আড়ালে লুকিয়ে।

স্বাতী ভট্টাচার্য

৫.

“বাল্যকাল হইতেই জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র বৃহৎ প্রতি ঘটনার পশ্চাতে কি লুক্কায়িত আছে তাহা খুঁজিয়া বাহির করার নেশা আমাকে আজিও পরিচালিত করে। আকাশের মেঘে আলো ছায়া আর রঙে অপূর্ব খেলার মধ্যে অতি বাস্তব জীবন সংগ্রামে অনুসন্ধিৎসু মন যে সত্য দর্শন অনুভব করে তাহাই আমার শিল্প রচনার বিষয়বস্তু আর সেই বিষয়বস্তুকে কাগজে খুঁজে রূপায়িত করাই আমার শিল্প রচনা পদ্ধতি।”

তাঁর কাছে জীবন এবং শিল্প ছিল সমার্থক। জীবনে চলার পথে সংগ্রহ করেছেন চূড়ান্ত দারিদ্র, শিল্পী হিসেবে বিস্তৃত পরিচিতি; মানুষ, বিশেষত সাধারণ মানুষের জন্য তীব্র সহানুভূতি, সমবেদনা-ভরা হৃদয় নিয়ে অনুভব করেছেন সচেতন বৈরাগ্য– যা মানুষকে দাঁড় করায় নিজের মুখোমুখি। অতঃপর কালস্রোতে ভেসে গেছে জীবনের সমস্ত অর্জন। বিস্মৃতির পলি এসে ঢেকে দিয়েছে তাঁর নামটুকুও। গোপেশচন্দ্র চক্রবর্তী। বিংশ শতাব্দীর শিল্পকলার ইতিহাসে তাঁর ম্লান স্বাক্ষর বহুদিনই অপঠিত, যদিও পুরনো গল্পের বইয়ের ইলাস্ট্রেশনের কোনায় তাঁর ‘GC’ স্বাক্ষরটি কোনও প্রবীণকে আজও নিয়ে যেতে পারে সোনালি দুপুরের রঙিন ছেলেবেলায়।

গোপেশচন্দ্র চক্রবর্তী

জন্মেছিলেন সিলেটে। সালটা লক্ষণীয়– ১৯০৫, অর্থাৎ বঙ্গভঙ্গের বছর। ছোটবেলার অনেকটাই কেটেছে আসামে; তারপর শেষ কৈশোরে এসে পৌঁছলেন কলকাতায়। ছেলেবেলা অর্থাৎ পাঁচ বছর বয়স থেকেই ছবি আঁকার শখ। খোঁজখবর নিয়ে পৌঁছে গেলেন তৎকালীন আর্ট স্কুলে। খেয়ে না-খেয়ে ফুটপাথে, রেলস্টেশনে শুয়ে কোনওমতে আর্ট স্কুলে ক্লাস চালালেও শেষ করতে পারেননি। কিংবা প্রথাগত শিক্ষার একঘেয়েমি ভালো লাগেনি– তা-ও হতে পারে। তারপর পাশাপাশি অর্থোপার্জনের প্রয়াস এবং ছবির সঙ্গে ঘরবসত।

তাঁর জীবনের গল্প অল্প কথায় শেষ হয়ে যাবার মতোই, কারণ তাঁর কয়েকটি ডায়েরি ছাড়া তাঁর জীবনের গল্প বুনতে কল্পনাই সহায়। কথাটা যে পুরোপুরি ঠিক হল– তা-ও হয়তো নয়। তাঁকে চিনে নিতে তাঁর ছবিও কম সাহায্য করে না। শিল্পী হিসেবে বেঁচে থাকার তীব্র সিদ্ধান্ত, যা প্রকৃতার্থে জিজীবিষা, তা তাঁর মধ্যে সিঞ্চন করেছে যন্ত্রণা,পরাজয়, ক্লান্তি, দুঃখ, বেদনার ঊর্ধ্বে এক বৃহত্তর জীবনদর্শন, এক সুনিবিড় বৈরাগ্য– যা পলায়নবাদী নয়, জীবনমুখী, অথচ যা আমাদের নিয়ে যায় অস্তিত্বের গভীরে। মানুষের আত্মচেতনা, আত্মদর্শন, তার অস্তিত্বের সংকট– এ সবই তাঁর ছবির বিষয় হয়ে ওঠে। তাঁর অধিকাংশ ছবিতে এক ধরনের ঘনায়মান বিষাদ ছায়া ফেলে, অধিকাংশ ছবিতেই কালো, ধূসর বা হালকা বাদামি রঙের প্রাধান্য, হয়তো-বা তার মধ্যেই কখনও ধরা দেয় চকিত একটু হালকা আলোর ছোঁয়া। চিত্রপট জুড়ে এই কৃষ্ণাভা কিন্তু অগভীর নয়, তাতে রয়েছে এক প্রগাঢ় ব্যঞ্জনা– যেন তাঁর রেখার মধ্যে দিয়ে রঙের মধ্যে দিয়ে ধরা দেওয়া এই ধূমায়িত বাস্তব সবল হলেও শেষ কথা নয়। স্তরে স্তরে বিন্যস্ত আছে যে অন্তর-চেতনা– মন যেন সহসা সচেতন হয়ে ওঠে সেই বিন্যাসের প্রতি। একইসঙ্গে এক পুঞ্জীভূত অথচ সংহত হৃদয়ের জ্বালাময় তাপ যেন চিত্রপটের বাইরে এসে আমাদের আবিষ্ট করে রাখে।

বিড়লা অ্যাকাডেমির যে প্রদর্শনীতে তাঁর ছবির সঙ্গে আলাপ, সেখানে মূলত তিরিশ দশকের কিছু ছবি রয়েছে। আর রয়েছে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের অর্থাৎ পঞ্চাশ দশকের কিছু ছবি। কিছু ছবির তারিখ উল্লেখ নেই। বিশেষত পুস্তক অলংকরণের জন্য করা কাজগুলি একেবারেই তারিখহীন। এ ব্যতীত একটি দৃশ্যচিত্র ও দু’-একটি ভাঙা বাড়ির ছবি চোখে পড়ে। 

তাঁর ছবিকাহিনি শুরু করা যাক তাঁর বাণিজ্যিক কাজগুলো দিয়ে– যেগুলো তাঁর সামগ্রিক চিত্রভাবনার থেকে সম্পূর্ণই আলাদা, নিজস্ব ভঙ্গিতে প্রাণময়। সেখানে ডিটেইল ড্রয়িং আছে, সমকালীন অলংকরণ ঘরানার সঙ্গে মিল আছে। তবে লিথোগ্রাফে ছাপা ছবিগুলি অনেককেই মনে করায় তাদের অতিপরিচিত দেবসাহিত্য কুটির প্রকাশিত পুজোসংখ্যা বা অনুবাদের বইগুলির কথা। সেসময় যা অন্তর্জাল-বিহীন ছেলেবেলায় কল্পনাশক্তি উজ্জীবিত করতে সাহায্য করত, কারণ প্রতিটি অলংকরণই খুব জীবন্ত ও বাস্তবসম্মত।

কাল্পনিক ছবিগুলির মধ্যে বিশেষ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আলাদিন ও আশ্চর্য প্রদীপের ছবিটি। সীমিত রঙের ব্যবহার সত্ত্বেও ওই একটি ছবিতেই জীবন্ত হয়ে ওঠে রূপকথার গল্পটি।

অলংকরণ হলেও এক অন্যতর প্রাণময়তা এ ছবিটিকে যেন আকর্ষণীয় করে তোলে, উত্তীর্ণ করে একক ছবির মর্যাদায়। অন্য সাদাকালো ছবিগুলোর ক্ষেত্রেও, গল্প না-জানা থাকলেও অলংকরণের ভঙ্গিমায় তা নিজস্ব ন্যারেটিভ তৈরি করে। এ প্রসঙ্গে নিচের ছবিদু’টি দ্রষ্টব্য।

প্রথম ছবিটির ড্রয়িং একটু দুর্বল হলেও সাদা রঙের ব্যবহার লক্ষ করার মতো। এ দু’টি ছবি সম্ভবত কোনও বিদেশি গল্পের অনুবাদ, অন্তত পোশাক দেখে তা-ই মনে হয়।

আবার নিচের ছবিটি যে বাড়ি থেকে পালিয়ে জাতীয় কোনও গল্পের অলংকরণ– তা পুলিশ এবং ছেলেটির মুখের ভাব দেখে খানিক অনুমান করা যায়।

রামকৃষ্ণ মিশনে দীক্ষিত ছিলেন গোপেশচন্দ্র। সারাজীবন ধুতি ও চাদর সম্বল করে নগ্নপদে ভারতবর্ষের পশ্চিম থেকে উত্তরপূর্ব অঞ্চলে জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। সাধারণ মানুষই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের সুবাদে দেশকে চিনেছিলেন। তাই পঞ্চাশ দশকে আঁকা তাঁর ছবিগুলি স্বাধীনতা-পরবর্তী হতাশা ও সাধারণ মানুষের বঞ্চনার কথা বলে। ১৯৩০-এ আঁকা একটি ছবিতে ছিল মানুষের পশুত্বের ছবি; আর পঞ্চাশ দশকের অর্থনৈতিক অসাম্যের ছবিটিতে ঝলসে উঠল সুতীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের বিদ্যুৎ। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, অজগরের মুখে ধরা পড়েছে একটি সোনার হরিণ। প্রাণপণে সেই ব্যাদিত মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে সে, কিন্তু সেই প্রয়াসের অনিবার্য ব্যর্থতার সম্ভাবনা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। একদিক দিয়ে দেখলে এ ছবিটি ওঁর চিত্রসম্ভারে বেশ ব্যতিক্রমী। একমাত্র অলংকরণের জন্য করা ফরমায়েশি ছবিগুলো ছাড়া এত রঙিন উজ্জ্বল ছবি নিতান্তই বিরল। বিশেষত অজগরটির বর্ণ-বৈচিত্র লক্ষণীয়। যে বহুস্তরিক ব্যঞ্জনা, শাণিত ব্যঙ্গ তার ছবিগুলোকে সমকালের কাছে প্রাসঙ্গিক করে তোলে– তারই প্রকাশ এই বর্ণময় চিত্রণে। ছবিটা খানিক কার্টুনধর্মী। রঙিন অজগর সেই ভঙ্গুর অর্থনীতির জনমোহিনী উপস্থাপনের প্রতীক হয়ে ওঠে। আর মানুষের উচ্চাশা আর লোভের প্রতীক ওই সোনার হরিণ। এই‌ লোভের সুযোগ নিয়ে মুনাফা লুটছে লোভী ব্যবসায়ীর দল। দুর্বল হয়ে পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো। এ ছবির নাম ‘প্রেজেন্ট ডে ইকোনমিক্স’। 

ছবি আঁকা গোপেশের অলস সময় কাটানোর উপকরণ নয়। তাঁর ছবি এক অস্তিত্বের সংকটের কথা বলে। তাঁর কৈশোর, যৌবন কেটেছে পরাধীন ভারতবর্ষে। তারপর স্বাধীনতা– সোনার বাংলার স্বপ্ন তখন মানুষের চোখে; কিন্তু স্বাধীনতা এল মন্বন্তরের হাহাকার নিয়ে, দাঙ্গার রক্ত মেখে, সহসা পায়ের তলার মাটি-হারানো একদল মানুষের চোখের জলে। ’৪৫-এ শেষ হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মানুষের অসহায়তার সুযোগে দাঁত-নখ বের করেছে কালোবাজারিরা। মাথায় তাদের কালো টুপি– ড্রাকুলার কথা মনে করায়। সর্বাঙ্গ ঢাকা কালো পোশাকের প্রান্তভাগে সূক্ষ্ম সোনালি কাজ– যেন তার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে রয়েছে মানুষের রক্তমাখা সোনালি মুদ্রা, আর বেরিয়ে রয়েছে রক্তমাখা নখ, শিকারী বাজের মতো হাত। ধারালো বাঁকা নখের উজ্জ্বল লাল রঙের বাস্তব প্রতিক্রিয়া অনস্বীকার্য।

এ কিন্তু নিছক স্বাধীনতা-উত্তর পরিস্থিতি-জনিত হতাশা, রাগের প্রকাশ নয়। তিনের দশকে আঁকা ছবিগুলির প্রচ্ছন্ন বয়ানেও একই সচেতনতার বুনট লক্ষ করা যায়। পঞ্চাশের মন্বন্তর, দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতা, দেশভাগের যন্ত্রণা তাঁকে সারাজীবন ব্যথিত করেছে, ক্ষুব্ধ করেছে। সেই ক্ষোভ, সেই হতাশা তিনি ঢেলে দিয়েছেন কাগজে। রং নেই তাঁর ছবিতে, নেই অনুপুঙ্খ ড্রয়িং, কিন্তু স্বৈরাচারী রাজনীতির তীক্ষ্ণ নখারাঘাত ও মানসিক ক্ষতগুলির প্রতিফলন শিহরিত করে দর্শককে। মাঝেমাঝেই ছবির অবয়ব বা চরিত্রগুলিকে বিকৃত করে দেন। ওয়াশ পদ্ধতির সঙ্গে যে স্বপ্নময়তার অনুষঙ্গ জড়িয়ে থাকে দর্শকের মনে, তাকে এভাবেই ভেঙেচুরে চূড়ান্ত আধুনিকতার এক নব্য বয়ান তৈরি করেন। তাঁর প্রতিটি ছবিই যেন এক-একটি নিজস্বী। এই আত্যন্তিক সততার জন্যই আজকের দর্শকও এইসব ভাঙাচোরা বা অস্পষ্ট মানুষগুলির সঙ্গে আত্মিক মিল অনুভব করেন। কারণ দ্রুত পরিবর্তনশীল এক অস্থির পৃথিবীর প্রতীক এই ফিগারগুলি। আজকের উৎকেন্দ্রিক মানুষদেরও প্রতিরূপ। যে সুতীব্র ব্যঙ্গ জড়িয়ে রয়েছে ছবিগুলির পরতে পরতে, তা যে কতখানি হতাশাজাত তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। ন্যুব্জ শাসক, চোখ তার বন্ধ, হাতের আড়ালে তার অশোকস্তম্ভ– যা না কি গণতন্ত্রের স্মারক, আর সামনে নিরন্ন দরিদ্র মানুষের প্রসারিত হাত। অন্ধ শাসক হয়তো গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে চান, কিন্তু জনগণের দিকে তাকাবার সাহস তাঁর নেই, তাঁর কাঁধ বেঁকে গিয়েছে দায়িত্বের ভারে, অভিযোগ আর অপূর্ব চাহিদার দাবিতে তার শরীর বিকৃত। এ কি স্বাধীন ভারতের প্রতিভূ!

ফর্ম ভাঙবার যে খেলা রবীন্দ্রনাথ শুরু করেছিলেন, যা ক্রমশ ভারতীয় শিল্পের আধুনিকতার বয়ান হয়ে উঠল পঞ্চাশ-ষাট দশকের শিল্পীদের হাতে– তাঁদেরই পূর্বসূরি ছিলেন অধুনাবিস্মৃত এই আত্মমগ্ন শিল্পী। ছয়ের দশকের শেষে বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্থানের অভিধা নিয়ে বিধ্বস্ত, তখন পাকিস্তানের জেনারেল অত্যাচারী ইয়াহিয়া খানের একটি ছবি আঁকেন তিনি। সেটি যেন তাবৎ স্বৈরাচারী শাসকের অন্তর-দর্পণ।

প্রখ্যাত চিত্র সমালোচক ও সি গাঙ্গুলি কিংবা ‘প্রবাসী’, ‘মডার্ন রিভিউ’ সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিতি ছিল তাঁর। এতটাই যে তাঁরা দু’জনেই তাঁর কাজ সম্বন্ধে বেশ সদর্থক মন্তব্য করেছেন। ও সি গাঙ্গুলি যেমন লিখছেন–

‘His mystic and mysterious compositions are full of profound and symbolic philosophy pregnant with deep meaning and appeal only to the highest intellect and greatest connoisseurs of art.’

কাজেই অনুমান করা যায়, ওরিয়েন্টাল আর্ট সোসাইটি বা সেখানকার শিল্পীদের কাজের সঙ্গে তিনি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর ছবি গল্প বলে না, গল্প ভাবায়। তাঁর অনেক ছবিই ওয়াশ শৈলীতে করা। অথচ ওয়াশের আবেশ থেকে যোজন দূরে তাঁর ছবির আবহ। বেশিরভাগ ছবি রঙের ছোপ দিয়ে আঁকা– মোটা তুলির পোচে টানা, কোথাও বা হালকা করে ফুটে ওঠা একটি মুখের আভাস, কালোর মধ্যে হলদেটে ধূসর রঙের প্রক্ষেপ। এই ধরনের ব্রাশিং রবীন্দ্রনাথের ছবির শৈলী মনে করায়। বিশেষত কিছু কিছু বিকৃত মুখের ছবি। আবার ওয়াশে করা কিছু ছবির আলোআঁধারি ছোপছোপ মনে করায় গগনেন্দ্রনাথের ছবির কথাও। মনে রাখতে হবে– এ ছবিগুলির বেশিরভাগই ১৯২৭ থেকে শুরু করে তিরিশ দশক জুড়ে করা। এই পর্যায়টি ভারতীয় ছবির ক্ষেত্রে খুব জরুরি। রবীন্দ্রনাথ তখন পুরোদমে ছবি আঁকছেন, গগনেন্দ্রনাথের আলোছায়া নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পাশাপাশি কিউবিস্ট কাজও চলছে। তিরিশ-চল্লিশ দশকেই উঠে আসছেন একদল তরুণ শিল্পী– হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার, অতুল বসু, গোবর্ধন আশ, চিত্তপ্রসাদ– এঁদের কাজে সচেতনভাবে বেঙ্গল স্কুলের ধারাকে অস্বীকার করার প্রবণতা পরিস্ফুট হয়ে উঠছে। ছবির ভাষা বদলাচ্ছে দ্রুত, কারও কারও ছবিতে ধরা দিচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শ। ছবি‌ হয়ে উঠছে জীবনমুখী। ক্যালকাটা গ্রুপ ছবিতে, ভাস্কর্যে নতুন আঙ্গিক নিয়ে আসছে। শান্তিনিকেতনে বিনোদবিহারী, রামকিংকরও তাঁদের মতো করে শিল্পশৈলী নিয়ে পরীক্ষা করে চলেছেন। অর্থাৎ ভারতশিল্পের আধুনিকতার বয়ান নির্মিত হচ্ছে। এর মধ্যেই শুরু হল মন্বন্তরের হাহাকার। ভারতশিল্প মধ্যবিত্ত সারল্যের নির্মোক খসিয়ে পৌঁছে গেল জনতার দরবারে; অজ্ঞ মূর্খ নিপীড়িত অসহায় মানুষগুলোর কাছে– যারা শুধু ধোঁকে আর ফ্যান চায়, ‘আর জঞ্জালের মতো জমে রাস্তায় রাস্তায়’। এই যে ঠিক মানুষের মতো, কিন্তু যেন অবমানুষ, যেন ‘মানুষের ব্যঙ্গচিত্র বিদ্রূপ বিকৃত’, সেরকম মানুষেরা উঠে আসে গোপেশ চক্রবর্তীর ছবিতেও। চিত্তপ্রসাদ, জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান বা সোমনাথ হোর-রা যখন রাজপথে অভুক্ত মানুষের মৃত্যুমিছিল এঁকে চলেছেন, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাচ্ছেন সমাজের এই গভীর ক্ষত– গোপেশ তখন তুলে আনছেন স্বার্থান্ধ, লোভী, নিষ্ঠুর সেই মানুষগুলোকে, যাদের মুখের প্রতিটি রেখায় ফুটে উঠেছে নানা দূরভিসন্ধির মানচিত্র।

তাঁর ছবির প্রতিটি রেখায় কুটিলতার যে বিস্তৃত বিন্যাস, তা প্রতিটি মুখচ্ছবিকে করে তোলে প্রতিকৃতি। একেকটি টাইপ বা তাদের চোখের ক্রূরতা, মুখের রেখার অনমনীয় নিষ্ঠুরতা তাদের শারীরিক ভাষাকে স্পষ্ট করে তোলে। অথচ এগুলি প্রত্যেকটিই মুখচ্ছবি মাত্র, কোনওটিই পূর্ণাবয়ব মূর্তি নয়। কীরকম যেন মনে হয়, প্রতিদিনের অভ্যাসে যাদের মেনে নিই আমরা– তাদের আসল চেহারাটা দ্রুত রেখার ছন্দে তুলে ধরেছেন। যেন এরপরেই শিল্পের ঝাঁপ পড়ে যাবে। মুখের বদলে সাজানো অভ্যস্ত মুখোশটিই আবার দেখবে মানুষ। অথচ ছবির নাম ‘ক্লাউন’। এভাবেই ঘুরে বেড়ায় এই মানুষেরা, নিজের চেহারা লুকিয়ে, নিজের খলস্বভাব মেকি হাসির আড়ালে লুকিয়ে।

নিপীড়িতের ছবির উদাহরণ ছবির দুনিয়ায় কম না-হলেও, নিপীড়কের একক ছবির উদাহরণ তুলনায় কম। কিন্তু বঞ্চনার কাহিনিগুলি তো উভমুখী, কাজেই শিল্পীর এই সচেতন বাছাই ব্যতিক্রমী বলতেই হবে।

আর তাই তাঁর অসংখ্য কাল্পনিক প্রতিকৃতি-চিত্রের মধ্যেও ফুটে ওঠে রোজকার দেখা মানুষগুলোর মুখ। তাদের মুখের রেখার কঠিন চোখের বিচিত্র ভাব। যেন তারা ভয় দেখানো ভয়ংকর কিংবা বিড়াল-তপস্বী হয়ে থাকতেই ভালোবাসে।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংস্থা শ্যামলীর উদ্দেশ্য লিপিবদ্ধ করতে গিয়েও তিনি একই মনোভাবের পরিচয় দেন–

‘মানবজাতি বিপন্ন, অতি ক্রূর ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানুষ মানুষকে হত্যা করছে। এই ধ্বংসের হাত থেকে বর্তমান, ভবিষ্যৎ মানবজাতিকে রক্ষা করতে হবে। এর দায়িত্ব প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের।’

অর্থাৎ সমাজের প্রতি শিল্পীর দায়বদ্ধতা অস্বীকার করেননি তিনি। তেমনই বারবার জোর দিয়েছেন আত্মচেতনা ও আত্মদর্শনের ওপর। অর্থাৎ নিছক দোষারোপের খেলায় নামলে হবে না, বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে গলদ কোথায়– আর সেখান থেকেই আত্মশক্তিতে উদ্বোধন ঘটিয়ে বের করতে হবে সমাধান সূত্র। কারণ মানুষই পারে মানুষকে এই বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে: 

‘অজ্ঞতা প্রসূত সংকীর্ণ স্বার্থবৃদ্ধিই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। অজ্ঞতার সংকীর্ণতা পশুভাব প্রতিকারের একমাত্র উপায় মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধন দ্বারা যথার্থ মানবদরদী মন তৈরি করা ও সর্ব বিষয়ে মানবজাতিকে শক্তিশালী করা।’

এ ভাবনা কেন এসেছিল তাঁর মনে সে উত্তরও পাওয়া যায় তাঁর ছবিতে। যেখানে একটিমাত্র উদ্যত তর্জনী থামিয়ে রেখেছে অসংখ্য মানুষকে, যারা না কি জনগণ। উত্তর-ঔপনিবেশিক শাসনের দমননীতি যে স্বাধীন দেশেও একইভাবে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে সাদা মুখোশ-পরা বাদামি চামড়ার শাসকেরা– সেকথা স্পষ্ট করে তাঁর ছবির বিন্যাসে ফুটিয়ে তোলেন শিল্পী।

তাঁর ভাবনার মধ্যে, ছবির মধ্যে, কাজ করে এক আবিশ্ব চেতনা। মানুষের জন্য কাজ করেছেন তিনি আজীবন, তাদের অবস্থা সম্বন্ধে সচেতন করতে চেয়েছেন। নিজে জানিয়েওছেন সেকথা– ‘সর্বক্ষেত্রে সংগঠন ও সমন্বয় সাধনে শিল্পীর প্রয়োজন সর্বাগ্রে, নতুন সৃষ্টির ও অতীত সৃষ্টির সমন্বয় সাধন ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ করিবার ভাবদ্রষ্টা সাধক শিল্পী।’ তার বিদ্রুপ শানিয়ে উঠেছে সমকালীন শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি, যেখানে ছাত্ররাই সবচেয়ে উপেক্ষিত।

অন্যদিকে ধর্মভীরু মানুষগুলোর প্রতি নির্মম কশাঘাত করেছেন। সেইসব নারী-পুরুষ, যারা ধর্মের নামে মিথ্যা গুরুর পায়ে অনায়াসে লুটিয়ে দেয় নিজেকে, আর সেই গুরু তখন হয়তো ভাবতে থাকেন কীভাবে এদের ব্যবহার করা যেতে পারে নিজের স্বার্থে। সেই ছবিটিতেও রং হয়ে ওঠে ব্যঙ্গাত্মক।

কেবল কলকাতায় নয়, আসামের বিভিন্ন জায়গায়– গৌহাটি, জোড়হাট, তিনসুকিয়া, শিলং আবার মণিপুর, নাগাল্যান্ডের কোহিমা, ইম্ফল থেকে বিহারের দেওঘর– নানা জায়গায় পঞ্চাশ দশকে ছবির প্রদর্শনী করেছেন গোপেশ। মূলত স্থানীয় লোকদের মধ্যে ছবি সম্বন্ধে উৎসাহ জোগাতে, সচেতনতা বাড়াতে।

স্থানীয় কত বিখ্যাত লোক এসেছেন তাঁর প্রদর্শনী দেখতে। তাঁদের মন্তব্য ধরা রয়েছে শিল্পীর খাতার পাতায়। সামাজিক সমস্যা সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন তিনি, কিন্তু শিল্পী হিসেবে নিজের লক্ষ্য ছিল স্থির। কত গভীরভাবে যে তিনি মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তাই ধরা রয়েছে এরকম নানা খাতার পাতায়, আর তাঁর নিজস্ব শব্দগুচ্ছে।


গোপেশচন্দ্র বৈরাগী মনের মানুষ, কেবল নিজেকে নয় অন্যের উত্তরণেও বিশ্বাস করতেন। দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্বন্ধে লোককে অবহিত করবার জন্যই ‘শ্যামলী’ গঠন করেছিলেন। নিজের অকালমৃত ছোট মেয়েটির নামে। উদ্দেশ্য ছিল সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান। স্বাধীনতার পরের বছর প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা ছিল তাঁর স্বপ্নের দেশ গড়ার এক রূপক। ‘শ্যামলী’ তাই সততার, সুবিচারের, নিষ্ঠার কথা বলে গিয়েছে। দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষের দেশের মানুষগুলোকে তিনি বলেন– এক মুঠো চাল বা ছটাকমাত্র তেল-মশলা সরিয়ে রাখতে, অসময়ের প্রয়োজন মেটানোর জন্য। শ্যামলীর ছত্রছায়ায় তিনি নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। তেমন কয়েকটি প্যামফ্লেটে দেখা যায় সমকালীন নানা মনীষীর নাম, নিজেকে যাদের স্নেহধন্য মনে করতেন তিনি।

শ্যামলীর তরফ থেকে নিজের ছবি আঁকার প্রদর্শনীও করেছেন।

মনে রাখতে হবে, গোটা পঞ্চাশ দশক ধরে ক্লান্তিহীনভাবে এইসমস্ত কাজ করে চলেছেন তিনি। এই সময় জুড়ে তিনি দেখিয়ে চলেছেন তাঁর দেখাকে– তার তাৎপর্য যাতে সবাই বুঝতে পারে সেজন্য লোকের কাছে ছবি নিয়ে গিয়েছেন– গ্যালারিতে নয়, কোনও ক্লাবঘরে, কোনও ছোট হলঘরে– যেখানে জায়গা পেয়েছেন, সেখানেই ছবির আসর সাজিয়েছেন। যাতে লোকের মন তৈরি হয়, চোখ দেখে, ছবির অন্তরে প্রবেশ করে তাঁর গভীর ভাবনার শরিক হতে পারে। মনে পড়ে যায় ‘সোনার বাংলা’ ছবিটির কথা। ছবির কেন্দ্রে রয়েছে একটি সোনার তৈরি মুখ, অনেকটা মূর্তির ধাঁচে আঁকা, তবু মনে হয় সেটি যেন এক মিথ্যা দেবতার। কারণ ছাঁচটি যেন মুখোশের। মূর্তিটির চোখবন্ধ কপালে ত্রিনয়ন নয়, যেন একটি লাল টিপ, শান্ত ধ্যানমগ্ন, খানিক বিব্রতও যেন। এ মুখ কি বঙ্গমাতার, না কোনও নিস্পৃহ সন্ন্যাসীর? যন্ত্রণা, ক্লান্তির ছাপ তাঁকে জর্জর করেছে। মুখের নিচের দিক থেকে প্রায় দাড়ির মতো করে আঁকা ঝুপসি কালো বাদামি অন্ধকারে অসংখ্য মানুষের অবয়ব। যেন সে তাদের যন্ত্রণা নিজের মধ্যে ধারণ করে মৌন হয়ে গিয়েছে। এই যে গাঢ় লালচে বাদামি রঙের ছিটে– এ যেন দাঙ্গা-দুর্ভিক্ষ-দীর্ণ বাংলার ক্ষতচিহ্ন মনে করিয়ে দেয়। এ বাংলায় উজ্জ্বল সোনা নেই, আছে তামাটে মলিন সোনার রং। আজ তাদের সোনার বাংলার স্বপ্ন গেছে মিথ্যা হয়ে, তাদের হতাশ আকুতি পৌঁছয় না অন্ধ-বধির দেবতার কানে। দেশভাগের দ্বিখণ্ডিত সোনার বাংলা যেন একটা মিথমাত্র।

তবে ছবিটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ সম্ভবত হালকা সাদা রঙে আঁকা রবীন্দ্রনাথের মুখাবয়ব। অসংখ্য মানুষের ছায়া-শরীরের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছেন। মুখভাব করুণ। যেন দীন কণ্ঠে বলছেন– ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। অন্ধকারের মধ্যে এই আশার বাণীটুকুই প্রচ্ছন্ন রয়েছে এই ছবিটিতে, কারণ ধ্বংস নয় পুনরুজ্জীবনেই বিশ্বাস করেছেন শিল্পী।

মানব প্রেমের ওপর আধারিত এক গভীর আধ্যাত্মিক চেতনা ছিল গোপেশের। এ প্রসঙ্গে তাঁর তিনটি ছবির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। একটি ‘মায়া’। ওয়াশ পদ্ধতিতে করা এই ছবিটির কম্পোজিশন অদ্ভুত গোলাকৃতি। কুণ্ডলী-পাকানো সাপের মতো আকৃতি। তার মধ্যে আটকে পড়া একটা মুখ– ক্লান্ত বিভ্রান্ত শূন্যদৃষ্টি– মায়ার বন্ধনের ইঙ্গিত করছে। চওড়া তুলির পোচ দিয়ে আঁকা– আলো-আঁধারির খেলার মধ্যে দিয়ে মায়ার দ্বৈত রূপকে ধরেছেন। আকারে ছোট হলেও, এ ছবিটির মধ্যে ধরা দেয় বিশাল জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক অনুভূতি– প্রাত্যহিক মায়ার চক্রে পাক খেয়ে চলছে জীবন, তার লোভ মোহ হিংসা ছলনা নিয়ে। তার নখ, বিকট দাঁত ও চোখের ভাবে তাই যেন এক সর্পিল নৃশংসতা।

অন্য দু’টি ছবির একটি ‘হোয়েন লাইফ বিগিন্‌স’ ও অন্যটি ‘ডেথ’। এ দু’টি তাঁর দার্শনিক মনোভাব ও আধ্যাত্মিক চেতনার প্রকাশ। প্রথম ছবিটিতে মাতৃজঠরে একটি অজাত শিশুর ভ্রূণ। মায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সে নাড়ির বাঁধনে। এ ছবিতেও কোনও রং নেই। ফ্যাকাশে লালচে রঙের আবহে সূচিত হচ্ছে জন্মের প্রথম ক্ষণ। কিন্তু ছবিটি ঘিরে এক বিষণ্নতার ঘোর। মায়ের চোখ বন্ধ, মুখে ক্লান্ত হাসির আভাস। যেন মাটি, যেন ছাই, মন্বন্তরের শস্যহীন প্রান্তরে নতুন ফসলের আভাস। মাটি, জল, রক্ত মাখা এক নতুন বাংলার জন্ম; কিংবা বৃহত্তর অর্থে মানুষের জন্ম। সিপিয়া টোন ব্যবহার করে হয়তো জীবনের বহমানতার সূচনাকেই বোঝানো হয়েছে। অস্তিত্ব আছে, স্পন্দন আছে, কিন্তু পরিচিতি নেই। ছবির নিচের দিকে একটি হৃদয়ের আকৃতি বোধহয় সেটিই আভাসিত করে। ছবিটিতে মায়ের সঙ্গে সন্তানের গভীর আত্মিক বন্ধন সূচিত হয়েছে জন্ম-নাড়িটি মায়ের ঠোঁটের ওপর স্থাপন করে, যেন তা এক কোমল প্রাণিত চুম্বনের দ্যোতক।

এ পর্যায়ের শেষ ছবিটি ‘মৃত্যু’। ওয়াশ শৈলীতে করা ছবির মধ্যে একটি আয়তাকার কালো ঘনক, আর তার ওপরে একফালি উজ্জ্বল আলোর রেখা। মৃত্যু যে নতুন আলোর দিকে যাত্রা সেই ভাবটিই এখানে স্পষ্ট হয়েছে। এ ছবির তলায় একটা আবছা মোষের মাথা। মৃত্যুচেতনাকে তীব্র করতে যে যমের বাহন মহিষের ব্যবহার, তা সহজেই অনুমেয়। মহিষের আবছায়া চিত্রণটি রয়েছে ছবির নিচের দিকে, আর আলোকশিখাটি উপরে, মাঝখানে সেই অন্ধকার স্তম্ভ– যেন মৃত্যুকে উদ্ধত অস্বীকার; এ ছবি তাই জীবনের আলোর অস্তিত্বের অথবা আত্মার চিরন্তনতার ধ্যানমূর্তি। চিকণ আলোর চকিত ব্যবহার ছবিটিতে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, এই ছবিটি তিনি এঁকেছেন ১৯২৭-এ। অন্য দু’টি ছবিও কাছাকাছি বয়সেই আঁকা। এ সময় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, এ সময় নতুন ভারতের স্বপ্ন দেখার সময়। আবার এ সময়েই গগনেন্দ্রনাথ মেতেছেন আলো-আঁধারির খেলায়। এই তিনটি প্রভাবই এই ছবিতে লক্ষ করা যায়। শৈলীগতভাবেও এটি গগনেন্দ্রনাথের ছবির খুবই কাছাকাছি।

গোপেশচন্দ্র ছিলেন সেই বিরল প্রতিভার অধিকারী, যিনি সব ধরনের ছবিতেই প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর একটিমাত্র ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিং-এও একই ধরনের আলোর ব্যবহার দেখা যায়। বলাই বাহুল্য সেটিও রাতের দৃশ্য। তাঁর ছবি দেখতে দেখতে মনে হয়, মেঘের মধ্যে যে শিল্পী মুখের ছবি খুঁজে পেয়েছিলেন– তাঁর সারা জীবনের শিল্পচর্চা বোধ করি আবর্তিত হয়েছিল এরকমই নানা খোঁজের বৃত্তে। অন্ধকার থেকে আলোর অভিসারে যে শুধু তাঁর মন ছুটেছিল, তা নয়, যাবতীয় নঞর্থক ভাবনার মধ্যে তিনি খুঁজতে চেয়েছেন সম্ভাবনার বীজটুকুকে। আর তাই হাল ছাড়েননি। সারাজীবন শিল্পের হাত ধরে চলেছেন জীবনের খোঁজে। 

তথ্যসূত্র:

১। Stranger form the forgotten art of G. C. Chakravarti exhibition catalogue
২। ‘Forms beneath the surface’, অঙ্কন কাজী
৩। বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে বিড়লা একাডেমিতে ফিরলেন বেঙ্গল মডার্নিজমের ‘হারানো’ নক্ষত্র গোপেশ চক্রবর্তী, পৃথা ঘোষ

তথ্য-ঋণ: মিত ব্যাস, দ্বিজ গ্যালারি, রাজকোট। অঙ্কন কাজী।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা: অনুভব দত্ত (যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ইতিহাস বিভাগ) এবং সুজাতা কর সাহা (শিল্পী)

…………… পড়ুন চিত্রার্পিত কলামের অন্যেন্য পর্ব ……………

পর্ব ৪ : নন্দলালের ছাত্রী থেকে সশস্ত্র বিপ্লবী

পর্ব ৩ : অরুন্ধতীর ছবি: আলো ক্রমে আসিতেছে

পর্ব ২ : আমিনা করের ছবি যেন জীবনানন্দের কবিতা

পর্ব ১ : মনের মানুষের সন্ধানেই রানী চন্দের শিল্পনীড় রচনা