Robbar

কবি বনাম আবৃত্তিকার

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 20, 2026 3:05 pm
  • Updated:April 20, 2026 3:32 pm  

সমস্তটাকেই শঙ্খ ঘোষের মনে হচ্ছে ‘শৌখিন ভঙ্গি মাত্র, আসর জমাবার ফিকির।’ মনে হচ্ছে আবৃত্তির মধ্যে দিয়ে ‘কবিতাটি শেষ অবধি পৌঁছয় না হয়তো, শ্রোতার কাছে। পৌঁছয় কেবল আবৃত্তিকারের একটা নাটুকে আবেগ’। আর ‘নাটক’ই হচ্ছে কবিতা আবৃত্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ স্বাভাবিক এক বাক্‌স্পন্দই, শ্রী শঙ্খ ঘোষের মতে আধুনিক কবিতার, অথবা, কবিতার আধুনিকতার সবচেয়ে বড় পরিচয়। এইভাবে কবি স্বয়ং গড়ে তুলছেন ‘কবিতা পড়া’ কাজটার এক ভেতরকার নিয়ম। যা আবৃত্তিকার ধরতে চাইছেন বাইরের নিয়ম, মাপা নিয়ম দিয়ে।

সুমন্ত মুখোপাধ্যায়

১৭.

টমাস মান-এর একটি সুন্দর চিঠি আছে। টমাস মান লিখছেন: তুমি আমাকে ছোট করে লিখতে বলেছিলে, তাই অনেক দিন সময় লাগল। কিছু ছোট করে বলতে গেলে অনেকখানি জানা দরকার। এই ছোট্ট প্রস্তাবে যে তর্ক তুলতে চাইছি, শুরুতেই বলা ভালো, আমি অতখানি জানি না। কোনও রাগ ছোট করে গাইতে গেলে অনেক বড় গায়ক হতে হয়। আমি সে চেষ্টায় যাব না।

প্রথমেই এই ছোট্ট খসড়াটির শীর্ষক একটু পরিচ্ছন্ন করে বুঝে নেওয়া দরকার। ‘কবি’ আর ‘কবিতা পড়া’ কথাটার মধ্যে একজন কর্তা আছেন। আর আছে একটা কর্ম। সেই কর্ম-র একটা লক্ষ্য আছে। আছে একটা বিতর্ক। বিতর্কটা অদ্ভুত। সে হল কবিতা-পড়া– এই কাজটাকে নিয়েই। সংযোগ নিয়ে। অর্থ তৈরি করার ক্ষমতা নিয়ে। কবিতা পড়া-কে যদি একটা কোনও ‘পারফরম্যান্স’ বলি, সেই পারফরম্যান্সই এখানে হয়ে উঠেছে এক ক্ষমতাক্ষেত্র।

টমাস মান

কবিতা পড়ার মধ্যে যে একটা অর্থ তৈরি করার প্রক্রিয়া চলে, কে তার অধিকারী? কবি না পারফর্মার? অথবা পাঠক স্বয়ং, না কি কবিই হয়ে উঠতে চাইছেন পারফর্মার? এই পারফরম্যান্সের যুক্তিগুলো কী কী? নিয়মগুলো কী কী? আর বিরোধই বা কোনখানে?

এইসব প্রশ্ন নিয়ে আধুনিক বাংলা কবিতার বিশেষ এক পর্যায়ে গড়ে ওঠে এক তুমুল বিতর্ক। যার এক প্রান্তে ছিলেন পেশাদার অভিনেতা, আবৃত্তিকার অন্যদিকে ‘আধুনিকতা’ কথাটার নতুন অর্থ করতে চাইছেন– এমন বাঙালি কবিরা।

২.

‘আধুনিক বাংলা কবিতা’ কথাটাকে এইখানে একটু ছোট করে মীমাংসা করে নেওয়া দরকার। ‘আধুনিক’ কথাটা নিয়ে প্রথম বিতণ্ডা বাধে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষে। মূল তর্ক রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর ভক্তদলের সঙ্গে সে যুগের নতুন লিখতে আসা কবি আর ঔপন্যাসিকদের। ১৯৩০-এর দশকে বিতর্কটি থেমে গেলেও মনে রাখা দরকার, এই তর্ক ছিল মূলত উপন্যাসে ‘ন্যাচারালিজম’ বা ‘রিয়ালিজম’কে কেন্দ্র করে। কবিতার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা খুব পরিচ্ছন্ন ছিল না। ঠিক কোন আধুনিকতাবাদের কথা এখানে বলা হচ্ছে? কখনও তা ইমেজিজম কখনও বা সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজমের উল্লেখ থাকলেও, নতুন কবিদের লেখায় আধুনিকতার একটাই কোনও লক্ষ্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এই ‘আধুনিক’ কথাটাকে আবার নতুন করে ঢেলে সাজানো হয় ঠিক ৩০ বছর পরে। ১৯৬০-এর গোটা দশক জুড়েই বাংলা কবিতা এবং তার আধুনিকতার ক্ষেত্রটি ইংরেজি ভাষা জগৎ থেকে সরে যাবে ফরাসি কবিতায়। এর একটা প্রান্ত যদি হয় ১৯৬১ সালে প্রকাশিত বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে ‘শার্ল বোদলেয়ার ও তাঁর কবিতা’, অন্য প্রান্তে স্মরণযোগ্য অরুণ মিত্র ও বিষ্ণু দে’র ‘প্রবন্ধ মালা’।

বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে ‘শার্ল বোদল্যের ও তাঁর কবিতা’

এ আলোচনায় অবশ্য সেই আধুনিকতার সমস্ত বিশেষত্বে চোখ রাখা সম্ভব নয়। তবু একটি কথা মাথায় রাখতে চাই– এই সময়েই বাংলা কবিতা তার আঙ্গিক নিয়ে যাবতীয় তর্কের সঙ্গে খুব আশ্চর্যভাবে জড়িয়ে নিয়েছিল কবিতা পড়ার সূত্রটিকেও। অর্থাৎ কবিতা পাঠ নয়, তার পারফরম্যান্সও এখানে অনেকখানি গুরুত্ব নিয়ে আসবে। গুরুত্বের কেন্দ্রে ছিল দু’টি মূল কথা– ১. অর্থ উৎপত্তির প্রশ্ন আর ২. সংযোগের সমস্যা। আর একটি সূত্র– কবিতার নাটক।

কবিতা পড়া নিয়ে এখানে ছোট একটা পরিপ্রেক্ষিত মাথায় রাখা চাই। কবিদের কবিতা পড়া, বিশেষত আনুষ্ঠানিকভাবে, বাংলা কবিতার ইতিহাসে এর আগে কিন্তু ততটা গুরুত্ব পায়নি। কখনও কখনও স্মৃতিকথায় আমরা শুনি, মধুসূদন কিংবা বিহারীলালের কবিতা পড়ার বিবরণ। কখনও নবীনচন্দ্র সেন, আনুষ্ঠানিক আবৃত্তি করছেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু কেমনভাবে পড়ছেন এঁরা, তার কোনও সচেতন বিবরণ থাকছে না কোথাও। নজরুল যে সভার মধ্যে কবিতা পড়ে মাতিয়ে দিচ্ছেন শ্রোতাকে– একথা সত্য, কিন্তু তিনিও কবিতা পড়া বিষয়ে ভাবছেন না কিছু। অন্তত সেই ভাবনার লিখিত কোনও রূপ নেই আমাদের কাছে। একটা সুরেলা আবহে টেনে টেনে কখনও বা উদাত্ত গলায় কবিতা পড়তেন কবিরা। রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল পর্যন্ত গড়িয়ে আসা এই সুরেলা আবৃত্তি হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে বুদ্ধদেব বসু কিংবা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো কবিদের স্বকণ্ঠে পড়া কবিতায়। কিন্তু যে আধুনিকতা এঁদের অভীষ্ট ছিল, কী ঘটছিল সেই পশ্চিম ইউরোপীয় আধুনিকতার আবহে?

একটি ছোট্ট উদাহরণ তুলে নিই, ফরাসি কবিতার ভ্যালেরি জানাচ্ছেন– স্তেফান মালার্মের নিচু গলার একটানা সুরেলা আবৃত্তি ওঁর কবিতা পড়া নিয়ে পরিপন্থী। আর ইংরেজি কবিতার জগতে টি. এস. এলিয়ট, তাঁর কবিতা পড়া অনেকখানি সরিয়ে নিয়ে আসছেন সুরেলা পাঠ থেকে, তাঁর অভীষ্ট হয়ে উঠছে একটা কোনও বাক্‌স্পন্দ। ইয়েট্‌স বা পাউন্ডের ধরন থেকে অনেকখানি দূরে চলে আসছে কবিতাপাঠ। এই সময়েই রেকর্ডিংয়ের দৌলতে, কবিরা গ্রামোফোন রেকর্ডে নিজেদের কবিতাপাঠ তুলে দিচ্ছেন উদ্দিষ্ট শ্রোতা অথবা পাঠকদের কাছে। অর্থাৎ, কবিতা লেখা আর তার নানা কৃৎকৌশল নয়, এমনকী, কবিতা পড়ার মধ্যে দিয়ে যেন অর্থ উৎপাদন বা সংযোগের একটা কোনও আবর্ত সচেতনভাবে গড়ে তুলতে চাইছেন কবিরা। সেই সচেতনতাই বাংলা কবিতায় এসে হাজির হবে ২০ বছর পরে, বাংলা ভাষার কবিতা লেখায়। অবশ্য তখন, এই বাংলায় হাজির হয়ে পড়েছেন কবিতা পড়ার আর-এক পারফর্মার। যাঁরা ওই একই সময়ে ‘আবৃত্তি’ নামক একটি শিল্প-সম্ভাবনায় নিবিষ্ট হয়ে আছেন। মূলত তাঁরা নাট্যকর্মী। আর কেউ কেউ সম্পূর্ণ নতুন এক শিল্পমাধ্যম বলেই ভাবছেন এই ‘আবৃত্তি’কে, এখানে এঁদের কথাও একটু বলা দরকার।

ইশকুল, পাঠশালায় অথবা বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে কবিতা আবৃত্তির একটা সুযোগ থাকলেও, পাবলিক পারফরম্যান্সের স্তরে স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পমাধ্যম হিসেবে আবৃত্তি উঠে আসতে থাকে ১৯৪০-এর দশকে। রেডিও সম্প্রচারেও কিন্তু ছয়ের দশকের আগে আবৃত্তি বিশেষ মর্যাদা পায় না। বিশ শতকের চারের দশকে IPTA আন্দোলনের সঙ্গে হয়তো, কবিতা আবৃত্তির জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার একটা যোগ ছিল। নাটকের সঙ্গে, নাট্যকর্মীরাই অনেকে কবিতাপাঠের একটা প্রস্তুতি শুরু করেন। আর এক্ষেত্রে অনেক সময়েই তাঁদের মূল নির্ভরতা হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ। আমাদের মনে পড়বে শম্ভু মিত্রর ‘দুঃসময়’ পাঠের অভিজ্ঞতা। ১৯৪৬-এ দেশজোড়া দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে। মনে পড়বে ছয়ের দশকে করা ওঁর কবিতা আবৃত্তির রেকর্ডগুলির কথা, অথবা পাঁচের দশকের গোড়ায় পড়া ‘মধুবংশীর গলি’ অথবা জীবনানন্দ পাঠ। একটি সাক্ষাৎকারে শম্ভু মিত্র জানিয়েছেন এই আবৃত্তি ‘কবিতা-করা’র চিন্তাভাবনা। যে উদ্বেগে যুক্ত হয়েছিল সময়ের সংক্ষিপ্ততা। এছাড়াও মনঃসংযোগ। এই কথাবার্তা থেকে বোঝানোর একটি নতুন শিল্পমাধ্যমের কথাই ভাবছেন তাঁরা, যার উপস্থাপনার করণকৌশল তখনও নিষ্পন্ন হয়নি।

শম্ভু মিত্র

৩.

‘পাবলিক পারফরম্যান্স’ হিসেবে ১৯৬০-এর দশকে আস্তে আস্তে জায়গা পেতে থাকে আবৃত্তি। মূলত কাজী সব্যসাচী আর শম্ভু মিত্রর হাত ধরে। গানের অনুষ্ঠানে অথবা জলসা অনুষ্ঠানে শুরু হয় আবৃত্তি। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত অথবা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো প্রখ্যাত অভিনেতাও আবৃত্তি অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন এই সময়ে। জনমানসে, বিশেষত বাঙালি মধ্যবিত্ত সাধারণ্যে আবৃত্তি শোনার একটা রেওয়াজ দেখতে পাই এই দশকেই। রেডিও সম্প্রচারেও কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান বাড়তে থাকে। শুধুমাত্র আবৃত্তিকেই জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করার দিন যদিও তখনও আসেনি।

এখানে আরও একটা প্রসঙ্গ তোলা চাই। কবিতা, কবিদের স্বকণ্ঠে শোনার সুযোগও কিন্তু একইসঙ্গে বাড়ছে এই সময়ে। ১৯৫৪ সালে। কলকাতার সেনেট হলে আয়োজিত হয় স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সব থেকে বড় কবিতা পাঠের আসর! উদ্যোক্তা ছিলেন সিগনেট সংস্থার কর্ণধার ডি. কে., এরপর থেকে কবিদের কবিতাপাঠ শোনার সুযোগ বাড়তে থাকে। ১৯৬০ আর ১৯৭০-এর দশকে কবিদের কবিতাপাঠ বাংলা জুড়েই ছড়িয়ে পড়ে। ছোট-ছোট পত্রিকার উদ্যোগে এখানে-ওখানে শুরু হয় কবিতাপাঠ সভা। কবিরাও এসে দাঁড়াচ্ছেন পারফরম্যান্সের সামনে। ১৯৫৩ সালে ‘কৃত্তিবাস’ আর ১৯৫২ সালে ‘শতভিষা’ পত্রিকার আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা কবিতা ততদিনে এসে দাঁড়িয়েছে নতুন সব প্রশ্নের সামনে।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা পাঠ

এইখানেই ‘কবিতা’কে ঘিরে একটা অনিবার্য বিতর্কের সম্ভাবনা তৈরি হয়ে উঠেছিল বাংলায়। বিষয়টা কবিতা লেখার দিক থেকে নয়, কবিতার উপস্থাপনা, অর্থসঞ্চার আর সংযোগ নিয়ে। প্রশ্নটা ওঠে কবিদের তরফে। ‘কবিতা’র নামে ঠিক কী পৌঁছে দিতে চাইছেন আবৃত্তি-শিল্পী, সাধারণ মানুষের কাছে– এই ছিল মূল প্রশ্ন।

সেই বিতর্কে পৌঁছনোর আগে দেখা দরকার, কেমন ছিল কবিদের সেই পারফর্ম্যান্সের ছবি। দুটো বিক্ষিপ্ত উদাহরণ নিয়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। প্রথম উদাহরণ কবীর সুমনের বিখ্যাত একটি গান। কবি অরুণ মিত্রর কবিতা পড়া নিয়ে। কবিতা নিয়ে নয় কিন্তু। সুমনের মতো একজন পারফর্মার একটি ‘কবিতা পড়া’র বিবরণ দিচ্ছেন গানের ভেতরে। পড়াটাই এখানে মূল অভিনিবেশের জায়গা।

পৃথিবী দেখছে আমাদের মুখে, বেলা অবেলার প্রতিচ্ছবি
নতুন একটা কবিতা পড়তে উঠে দাঁড়ালেন প্রবীণ কবি
উঠে দাঁড়ালেন যেমন দাঁড়ায়, পুরনো মাটিতে গাছের চারা
সেই উত্থান দেখে নেয় শুধু মহাজীবনের সঙ্গী যারা।
উঠে দাঁড়ালেন যেমন দাঁড়ায় বন্দিনী এক বাঘিনী চিতা
চিড়িয়াখানায় অসহায় তবু উঠে দাঁড়ানোয় অপরাজিতা।

কবিতা পাঠ করছেন অরুণ মিত্র

এরপর একে একে আসতে থাকবে সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে বাঁধা উপমা। ‘সাধারণ লোক’, ‘প্রেমিক প্রেমিকা’, ‘সন্তানহারা মায়ের বাঁচা’ আর শেষ পর্যন্ত–

উঠে দাঁড়ালেন যেমন দাঁড়ায় চেনা কবিতায় অচেনা শব্দ
আবেগের কোনও অভিধান নেই তাই বেরসিক পাঠক জব্দ

শুধু কবির উঠে দাঁড়ানোই পৌঁছে গেল কবিতার ভেতর শব্দের উঠে দাঁড়ানোয়। এই বর্ণনা কবির না পারফর্মারের?

আর এর একেবারে বিপরীত এক পারফর্ম্যান্সের উদাহরণ এবার তুলে নেব। লিখছেন জয় গোস্বামী, শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়ের কবিতা পড়া নিয়ে। এক মফস্‌সলের মঞ্চে যেখানে হাজির শক্তি। মত্ত এক পারফর্মার।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়

“কোনও কবিসম্মেলনে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নাম ঘোষণা হওয়া মাত্র হল-এর মধ্যে বিরাট চিৎকার ও হল্লা শুরু হয়ে যেত। সেই সভা আরও এক-দেড় ঘণ্টা সময় অতিক্রম করেছে ততক্ষণে। কিন্তু সবাই চুপচাপ ছিলো।… যখন নাম ঘোষণা হল তখন তো হইহই। তিনি যখন হল-এ ঢুকছেন, সঙ্গে একদল যুবক। টলতে টলতে স্টেজে উঠলেন। একবার মনে আছে, শক্তি মঞ্চে উঠেই বললেন: নামিয়ে দাও, ওটা নামিয়ে দাও। বলেই স্টেজের ওপর পা ছড়িয়ে বসে পড়লেন। মাইক্রোফোনের লোকটি কী করবে ভেবে পাচ্ছে না।… একটু আগেই হুড়মুড় করে ঠিক আমার সামনে সারিতে এসে বসে পড়েছিল দু’জন। তারা বলল: ‘ওহ এই হচ্ছে শক্তি দাঁ’।”

৪.

এই হচ্ছে এক পরিস্থিতি যেখানে ‘কবি’, বস্তুত আধুনিক কবি, তৈরি করে তুলছেন পারফর্ম্যান্সের এক প্রতিস্পর্ধী নিয়ম। এক অন্যরকম আয়োজন। এই নতুন চিন্তারই এক সূত্র পাওয়া যাবে ছোট্ট এক বিবরণে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁকে ঘিরে এক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান চলছে ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট  হলে। অনেক মানুষের মধ্যে এসে পড়েছেন স্বয়ং শম্ভু মিত্র। পড়বেন তিনি, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা। উপস্থিত দর্শকরা সহর্ষে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন তাঁকে। কবিতা পড়া শেষ করে মঞ্চ থেকে নিষ্ক্রান্ত হচ্ছেন যখন শম্ভু মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্মিত হেসে দাঁড়িয়েছেন তাঁর সামনে। আবৃত্তি কেমন লাগল জানতে চাইছেন শম্ভু মিত্র। সুভাষ জানালেন: ‘ভালো, তবে আমি পড়লে বোধহয় আর একটু ভালো হত।’ ‘ও তাই বুঝি!’ বলেই বেরিয়ে যাচ্ছেন আবৃত্তিকার। সুভাষ আর একটু স্মিত হেসে সঙ্গীকে জানালেন: ‘এই কবিতাগুলো তো সামান্য, সাধারণ কথা। ওইভাবে বললেই তো হয়।’

শম্ভু মিত্র ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়

এই কথাটার আরও একটু পরিচয় পাওয়া যাবে শঙ্খ ঘোষের অনেকগুলো লেখায়। মূল বিতর্কটির পরিচয় রয়েছে ‘নিঃশব্দের তর্জনী’ বইটির, ‘কবিতা পড়া: কথা ও সুর’ এই প্রবন্ধে। ১৯৭০ সালে লেখা প্রবন্ধটি ছাড়াও রয়েছে ‘জার্নাল’-এর ‘আবৃত্তিকথা’ নামের ছোট্ট লেখাটি। ছোট্ট কয়েকটি উদ্ধৃতির মধ্য দিয়ে ওঁর মূল কথাগুলো তুলে আনছি:

ক.
বিনয় মজুমদার একা একা তাঁর কবিতা পড়ছিলেন কফি হাউসের একান্তে, … ভারি যত্নে আলাদা করে উচ্চারণ করছিলেন এক-একটি শব্দ। একটু জোর দিয়ে, আর হঠাৎ কখনও থেমে থাকছিলেন অনেকক্ষণ। যেন একটা শব্দ তিনি নতুন দেখলেন এখানে, কী ভেবে শব্দটি এখানে বসিয়েছিলেন যেন তাই ভেবে নিলেন একটু। তারপর, যেন খানিকটা আশ্বস্ত হয়ে, আবার শুরু করলেন তাঁর পড়া, তখন যেন গোটা ব্যাপারটার মানে পেয়ে গিয়েছেন তিনি।… বুঝে নিলাম যে এই পড়াটা আসলে নিজের সঙ্গে নিজেরই একটা বোঝাপড়া মাত্র।

খ.
কবিতার ইস্‌থেটিক্‌স আর কবিতার আবৃত্তিতে প্রায়ই দেখি একটা বিচ্ছেদ ঘটে যায়।

গ.
আবৃত্তিকে যাঁরা নিতান্ত ব্যসন হিসাবে ব্যবহার করেন, যাঁদের গলা ভাল কিংবা গলা খেলানো ভাল, … তাঁর কবিতার গদ্য অন্বয়টাকে মাত্র লক্ষ্যে রাখেন, সেইটেকে শ্রোতার কাছে সঞ্চারিত করতে পারলেই তাঁদের সফলতা। কবিতা যে তার চেয়ে বেশি কিছু, এটা বুঝে নেওয়া তাঁদের পক্ষে বেশ একটু শক্ত।

এই সমস্তটাকেই শঙ্খ ঘোষের মনে হচ্ছে ‘শৌখিন ভঙ্গি মাত্র, আসর জমাবার ফিকির।’ মনে হচ্ছে আবৃত্তির মধ্যে দিয়ে ‘কবিতাটি শেষ অবধি পৌঁছয় না হয়তো, শ্রোতার কাছে। পৌঁছয় কেবল আবৃত্তিকারের একটা নাটুকে আবেগ’। আর ‘নাটক’ই হচ্ছে কবিতা আবৃত্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ স্বাভাবিক এক বাক্‌স্পন্দই, শঙ্খ ঘোষের মতে আধুনিক কবিতার, অথবা, কবিতার আধুনিকতার সবচেয়ে বড় পরিচয়। এইভাবে কবি স্বয়ং গড়ে তুলছেন ‘কবিতা পড়া’ কাজটার এক ভেতরকার নিয়ম। যা আবৃত্তিকার ধরতে চাইছেন বাইরের নিয়ম, মাপা নিয়ম দিয়ে।

এইটেই যে একমাত্র মত তা নয়। কবিরা যে তাঁদের কবিতা পড়া বা কবিতা নিয়ে ভাবছিলেন তা জানতে পারার নানা সূত্র আছে। আমি এখানে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকার পেশ করছি। যেখানে শক্তি জানাচ্ছেন, তাঁর বিখ্যাত ‘অবনী বাড়ি আছো’ কবিতাটিতে শেষ পর্যন্ত তিনি যে আবহাওয়া তৈরি করতে চান, সেটা বন্ধ বাড়ির আর তাই চিৎকার করে ডাকতে থাকেন কবিতার শেষে। কারণ এই যে ‘আমি’, কবিতার ‘আমি’– সে-ও তো এক বন্ধ বাড়ির মতোই। শক্তি জানাচ্ছেন, তাঁর এইরকম কিছু কবিতা আছে, সভায় পড়ার মতো। সব কবিতা, সভায় বা আসরে পড়ার মতো নয়– যেমন সনেট। অর্থাৎ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার পারফর্ম্যান্সের নির্বাচন আছে। যা হয়তো শঙ্খ ঘোষের কাছে গ্রহণীয় নয়। এইখানে দেখার এটুকুই যে, কবিরা কি শুধুই কবিতা লেখা কাজটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখছেন নিজেকে, শক্তি, যখন নিজের লেখা নিয়ে সন্ধিহান হয়ে পড়েছেন, তিনি লিখছেন:

গতরাতে শেষ করা পদ্যটির তুমুল উত্তাপ
এখন পারি না দিতে সভাঘরে, বিশিষ্ট শ্রোতাকে।

এখানে দেখার মতো, কবি তার কবিতা লেখার ‘তুমুল উত্তাপ’ দিতে চাইছেন ‘বিশিষ্ট শ্রোতাকে’। কবি-পাঠক এই চলাচলের পথে এখানে জুড়ে যাচ্ছে পারফরমার-শ্রোতার আবর্তটিও! কবিতা, কবিতা লেখা, কবিতা পড়া সব মিলিয়ে হয়ে উঠছে এক শক্তিক্ষেত্র, যেখানে অর্থ উৎপাদনের একটা ক্রিয়া চলছে। আর সেই ক্ষেত্রটিতে পারফর্মারই হয়ে উঠতে চাইছেন কবির নিয়ন্ত্রক, আর কবি, কবিতার ভেতরের নিয়মগুলো প্রতিষ্ঠা করে নিজেই হতে চাইছেন এক সম্পূর্ণ স্বাধীন পারফর্মার। এর ভেতর তৈরি হয়ে উঠছে বাংলা কবিতার এক অত্যাবশ্যক তর্ক– কবি বনাম আবৃত্তিকার। যে তর্ক এখনও শেষ হয়েছে বলে মনে হয় না।

এক, দুই, আড়াই-এর অন্যান্য পর্ব …

১৬. অগ্রন্থিত শক্তির শক্তি

১৫. ঋতুপর্ণ, অন্তরমহল আর রবীন্দ্রনাথ

১৪. জয় এখন শেষজীবনের বুদ্ধদেব বসুর মতোই প্রশ্নাতুর

১৩. নকশাল পর্বের হত্যা-প্রতিহত্যার পরিবেশে কলকাতায় এসেছিল মারি ফারার

১২. এমনও হাসি আছে বেদনা মনে হয়

১১. গুরুদত্ত চেয়েছিলেন, বিজয়ের চলে যাওয়া দিয়ে শেষ হবে ‘পিয়াসা’

১০. কবির বিশ্রাম

৯. গত ২০ বছরে নস্টালজিয়ার এত বাড়বাড়ন্ত কেন?

৮. কলকাতার মূর্তি-আবর্জনা কি বাড়ছে?

৭. ভাবা প্র্যাকটিস করা, কঠিন এখন

৬. লেখার অত্যাচার, লেখার বাঁচা-মরা

৫. বিশ্বকর্মা পুজোর সন্ধেবেলাটার মতো বিষাদ আর হয় না

৪. কথা শেষ হতে পারে, ‘শেষ কথা’ বলে কিছু হয় না

৩. দেখা হলে বলে দিও, আজও বেঁচে আছি

২. ফুলের রং শেষ পর্যন্ত মিশে যায় নন্দিনীর বুকের রক্তের ইমেজে

১. আমাদের বিস্মৃতিশক্তির কথা বলে গিয়েছেন ভাস্কর চক্রবর্তী