Akashvani Turns 100: Memories of Bengal’s Radio Stars | Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

কানে কানে একশো

চাকরিটা পেয়েছিলাম আকাশবাণী ভবনে ইউপিএসসির নানা স্তর পেরিয়ে। তবে কলকাতায় ক’দিন কাটিয়ে আমায় চলে যেতে হল কার্শিয়ং আকাশবাণীতে। এক বছর ছিলাম। নাটকের টানে ছেড়ে চলে আসি। তবে আকাশবাণী আমায় ছাড়েনি। আবার ডাক পড়ে।মাঝেমাঝে ঘোষণার বিভূতি দাস বা মিহিরদা তলব করতেন। ছন্দা সেন, দেবাশিস বসু সবাই মিলে আনন্দে থাকলেও বেশিদিন টিকতে পারিনি। 

Published by: Robbar Digital

Posted:August 26, 2026 7:40 pm | Updated:August 26, 2026 7:40 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

সালটা ১৯৭৩। স্কটিশ চার্চ কলেজে কবি সম্মেলন কেয়া চক্রবর্তী, তরুণ সান্যাল, অলোক রায় ছাত্রদের হাতচিঠি লিখে কবিদের আমন্ত্রণ জানানোর অনুরোধ করলেন। সেই অনুষ্ঠানেই কেয়াদি কবিতা সিংহের সঙ্গে আমায় আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘একদিন সৌমিত্রকে তোমার কাছে নিয়ে যাব।’

কেয়াদির সঙ্গে ট্রামে করে আকাশবাণী ভবনে যেতে যেতে বললাম, ‘‘অনেক আগে বারকয়েক ওই বাড়িতে গিয়েছি, ‘গল্পদাদুর আসরে’। তখন জয়ন্ত চৌধুরী গল্পদাদু ছিলেন। তখন কতই বা বয়স, নয়-দশ… মায়ের সঙ্গে গিয়েছিলাম।’’

zoom
কেয়া চক্রবর্তী জড়িত ছিলেন আকাশবাণীর সঙ্গে

কেয়াদির নাটকের ঘরে কাজ ছিল, আমায় কবিতাদির ঘরে বসিয়ে চলে গেলেন যেখানে বীরেন্দ্র ভদ্র, শুক্লা বন্দ্যোপাধ্যায়, অজিত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ বসেন। কবিতাদির ঘরে পাশের চেয়ারে এক রাশভারী মানুষ বিভাস বোস, অন্যদিকে দু’জন চেনা জগন্নাথ বসু (আমার স্কুলের সিনিয়র) আর পঙ্কজ সাহা তাঁর সঙ্গে কয়েকমাস আগে আলাপ হয়েছিল তাঁদেরই আয়োজনে এক উৎসবে। ঘরভর্তি তরুণ মুখ। যোগব্রত চক্রবর্তী (বড় অকালে চলে গেলেন যোগব্রত), আনন্দশঙ্কর, আরও অনেকে। ‘যুববাণী’ নামে একটি নতুন সম্প্রচার শুরু হয়েছে, তারই কাজ চলছে ওই ঘরে।

zoom
সেকালের আকাশবাণীর বেতার নাটকের কলাকুশলীরা, একদম ডানদিকে জগন্নাথ বসু

কবিতাদি আমার নাম নথিভুক্ত করতে বললেন। আমার কাজ হল একটা টেপ রেকর্ডার কাঁধে নিয়ে, নানা বয়সের মানুষের রেডিও শোনার অভিজ্ঞতা রেকর্ড করে নিয়ে আসা। খাতায় সই করে সেই রেকর্ডার নিয়ে সেদিনই ফেরত দিতে হত।

আমার গোপন ইচ্ছে ছিল ঘোষক হওয়ার। যুববাণীতে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করার পর কবিতাদির অপত্য স্নেহ আর জগন্নাথদা, পঙ্কজদার ভালোবাসায় রেডিওর নানা কাজ দ্রুত শিখতে পারলাম। কয়েক মাসের মধ্যেই আমায় চুক্তিভিত্তিক কাজে নেওয়া হল। পাঁচ দিন বা সাত দিন। কলেজের ফাইনাল পরীক্ষার পড়াশুনোর মধ্যেই এই নতুন কাজের অভিনিবেশ। যুববাণীতে ঘোষণার কাজ বেশিদিন হল না। অরুণাংশু বিশ্বাস যোগ দিলেন স্থায়ী পদে।

zoom
কিংবদন্তি দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

এদিকে ঘন ঘন এই বাড়িতে যাওয়ার ফলে আলাপ হয়ে গেল গৌরী ঘোষ, পার্থ ঘোষ, অমিয় চট্টোপাধ্যায়, মিহির বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরও অনেকের সঙ্গে। করিডোরে নামী মানুষদের নাম ঝোলানো বিমান ঘোষ, বিমলভূষণ, উপেন তরফদার, প্রণবেশ সেন… আরও কতজন! এই নিউজরুমটি বড় প্রিয় ছিল। উপেনদা ‘সংবাদ বিচিত্রা’ প্রযোজনা করতেন, তাতে প্রধানত দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় বা তরুণ চক্রবর্তী সংযোজনা করতেন। শেখর গুপ্ত ছিলেন উপেনদার সহযোগী। কলেজের পরীক্ষা শেষ হয়েছে, ১৯৭৫-এ নান্দীকারে যোগ দিয়েছি ট্রেনি হিসেবে, আর স্কটিশ স্কুলে শিক্ষকের চাকরি। রেজাল্ট বেরলেই এমএ ক্লাসে ভর্তি।

zoom
মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়

কিন্তু আকাশবাণী ভবন তখন আমায় চুম্বকের মতো টানে। এক ২৪ ঘণ্টা ধর্মঘটের আগের দিন মিহির বন্দ্যোপাধ্যায় আমায় জিজ্ঞেস করলেন সারারাত ডিউটি করতে পারব কি না পরদিন সকাল পর্যন্ত। সোৎসাহে রাজি। রাতে আট নম্বর স্টুডিওতে পাশাপাশি দেবদুলালদা, পার্থদা, অমিয়দা আরও অনেকের সঙ্গে রাত্রিযাপন। নিউজরুমে প্রণবেশ সেন, শিবশেখর সরকার, উপেন তরফদার প্রমুখ। কাকভোরে পার্থদা, গৌরীদি, কবিতাদি, বিভাস বোস সবাই এলেন। আস্তে আস্তে কয়েকজনের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধন হল।

zoom
অমর জুটি: পার্থ ঘোষ ও গৌরী ঘোষ

দেবুদা, অমিয়দা, পার্থদা, গৌরীদির প্রশ্রয়ে শুরু হল ‘আবৃত্তিলোক’। আয়োজন হল ‘বয়েজ ওন লাইব্রেরি’ হল-এ কবিতার সকাল উপেনদা পুরো অনুষ্ঠান রেকর্ড করলেন। নান্দীকার আর আকাশবাণী– দু’-জায়গায় শিখতে হয়েছে নিয়মশৃঙ্খলা আর সময়জ্ঞান। থিয়েটার যেমন সময়ে হয়, অনুষ্ঠান সম্প্রচারও সঠিক সময়ে। তার প্রস্তুতিও ঘড়ির কাঁটা মেনে।

পরীক্ষা দিয়ে একটি চাকরিও জুটল আকাশবাণীতে। প্রথমে লিখিত পরীক্ষা তারপর সাক্ষাৎকার ভিত্তিক। সালটা ১৯৭৭। সেদিন পার্ক সার্কাস ময়দানে ‘ফুটবল’ নাটকের শো ছিল। নামের আদ্যক্ষর দিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের ডাকা হচ্ছিল। ক্রমশ বিকেল গড়িয়ে যায়, পাংশুমুখে বসে আছি। আমার আগে একজন ‘পি’ অক্ষরে ছিলেন, তাঁকে বললাম আপনার আগে যাব। তিনি আপত্তি করলেন না। যাঁর হাতে তালিকা ছিল, তাঁকে অনুরোধ করলাম। কয়েক বছরে পূর্ব-পরিচিত। বললেন, ‘যান, কিন্তু চাকরি আপনার হবে না।’ কোনওরকমে দরজায় টোকা দিয়ে বললাম কেন আসতে চাই। ইন্টারভিউ বোর্ড ভ্রুকুঞ্চনে সম্মত হলেন। দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়ে পার্ক সার্কাস ছুটলাম।

zoom
শতবর্ষের আকাশবাণী

চাকরিটা পেয়েছিলাম আকাশবাণী ভবনে ইউপিএসসির নানা স্তর পেরিয়ে। তবে কলকাতায় ক’দিন কাটিয়ে আমায় চলে যেতে হল কার্শিয়ং আকাশবাণীতে। এক বছর ছিলাম। নাটকের টানে ছেড়ে চলে আসি। তবে আকাশবাণী আমায় ছাড়েনি। আবার ডাক পড়ে। মাঝেমাঝে ঘোষণার বিভূতি দাস বা মিহিরদা তলব করতেন। ছন্দা সেন, দেবাশিস বসু– প্রত্যেকে মিলে আনন্দে থাকলেও বেশিদিন টিকতে পারিনি। কেননা আমি রাজ্য সরকারের আধিকারিক।

zoom
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র

কিন্তু ওই বাড়ি, ওই স্টুডিও, বীরেন ভদ্র, পঙ্কজ মল্লিক, কবিতাদি, দেবুদা, পার্থদা, গৌরীদি, অমিয়দা আজ সশরীরে কেউ না-থাকলেও, আছেন সবসময় আমাদের রেডিওর ইতিহাসে। যেমন জগন্নাথদা তাঁর নাটকে, পঙ্কজদা তাঁর প্রযোজনায়, প্রণবেশ সেন তাঁর লেখায়, উপেন তরফদার রেডিওর নতুন সংবাদ-ভাষ্যে।

শতবর্ষে এই সোনার আলোর ঝলকানি এত বিখ্যাতজনের সঙ্গে আমার গায়েও যে ছিটেফোঁটা পড়েছিল আমার আনন্দের শেষ নেই। এই বাড়িতেই আমার প্রিয় বন্ধু রবীন্দ্রসংগীতের রমা রায়চৌধুরী (পরে মণ্ডল) একসঙ্গে অডিশন দিতে গিয়েছি, কিংবা অনেক সকালে আচম্বিতে কাজি সব্যসাচী আমার খোঁজ করতে এসেছেন– এগুলোই প্রাপ্তি এ জীবনে।

মনে আছে, আমার আকাশবাণীর চাকরি ছাড়ার পরই এখানে যোগ দিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী। অতি সম্প্রতি তাঁর ‘রেডিওওয়ালা’ বইতে রয়েছে আকাশবাণীরই চমৎকার এক স্মৃতিকথা।

আজ শতবর্ষ উদযাপনে আমরা এই বাড়িকে প্রণাম জানানোর ভাগীদার হতে পারলাম না। প্রণাম জানালাম এই লেখাতেই।

Akashbani Akashbani Bhavan Birendrakrishna Bhadra Debdulal Bandopadhyay Gouri Ghosh Jagannath Basu kabita singha Kaji Sabyasachi keya chakraborty Mihir Bandopadhyay Pankaj Mallik Partha Ghosh Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Soumitra Mitra

Share this article on