Asterix: Centenary of The Legendary Creators | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্রষ্টাদের শতবর্ষে উজ্জ্বল অ্যাসটেরিক্স

গোসিনি ও ইউদেরজোর বন্ধুত্বের চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৯৫৯ সালের ‘অ্যাসটেরিক্স’। রোমানদের মতো এক বিশাল সাম্রাজ্যকে দুই বন্ধু অ্যাসটেরিক্স-ওবেলিক্স মিলে স্রেফ বুদ্ধি এবং জাদুকরী শরবতের জোরে নাস্তানাবুদ করছে– এই সরল ও মজার থিমটি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রাচীর ভেঙে শিশু থেকে বুড়ো সবার মন জয় করে নিয়েছিল।

শেষ আপডেট: আগস্ট ১৩, ২০২৬, ২১:২৪   
Facebook WhatsApp Messenger

রোমান সাম্রাজ্যের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো দুর্ধর্ষ ‘গল’দের কীর্তিকাহিনির গল্প লিখেছিলেন ফ্রান্সের এক গল্পলেখক। তাঁর নাম রেনে গোসিনি। গোসিনির সেই গল্পকে রঙে-রঙে রঙিন রূপ দিয়ে কমিক্সের বইয়ে ফুটিয়ে তোলার কাজটি করেছিলেন আরেক ফরাসি চিত্রশিল্পী অ্যালবার্ট ইউদেরজো। সেই কমিক্সের নাম ছিল ‘অ্যাসটেরিক্স’।

অ্যাসটেরিক্সই পৃথিবীর প্রথম কমিক্স, যার গল্প লিখেছিলেন একজন ব্যক্তি আর তাতে ছবি এঁকে প্রাণ দিয়েছিলেন অন্য একজন। মজার ব্যাপার হল, ফ্রান্সের জাতীয় বীর– ‘গল’-দের গল্প লিখলেও এই দুই স্রষ্টার কারওরই পারিবারিক শিকড় ফ্রান্সে ছিল না।

zoom
গোসিনি ও ইউদেরজো

গত শতকের পাঁচের দশকে যখন বেলজিয়ান কমিক্সের জয়জয়কার, ঠিক তখনই রেনে গোসিনি এবং তাঁর শিল্পী বন্ধু অ্যালবার্ট ইউদেরজো ফরাসি কমিক্সে একটি নতুন বিপ্লব নিয়ে এলেন। ১৯৫৯ সালে তাঁদের যৌথ মস্তিষ্ক থেকে জন্ম নিল এক খুদে গলযোদ্ধা– অ্যাস্টেরিক্স এবং তার বিশাল বপুর অধিকারী ও পেশায় পাথর বহনকারী বন্ধু ওবেলিক্স। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে আরমোরিকার একটি ছোট্ট গল গ্রামের অদম্য প্রতিরোধের এই গল্প রাতারাতি ফরাসি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে ইউরোপে মার্কিন কমিক্স, সিনেমা এবং সংস্কৃতির একচেটিয়া আধিপত্য শুরু হয়। ঠিক সেই সময়ে অ্যাসটেরিক্সের জন্ম। বিশালাকার রোমান সাম্রাজ্যকে যদি আমরা তৎকালীন মার্কিন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ধরি, তবে অ্যাসটেরিক্সের ছোট্ট গ্রামটি ছিল ফরাসি সংস্কৃতির সেই অদম্য দুর্গ, যা কোনওভাবেই নিজের স্বাধীনতা ও মৌলিকত্ব হারাতে রাজি ছিল না। 

কালো জামা আর লাল পাজামা পরিহিত যোদ্ধা অ্যাসটেরিক্স আর তার বন্ধু ওবেলিক্সের নাম শোনেননি বা তাদের চেনেন না– এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। ১৯৫৯ সালের ২৯ অক্টোবর ‘পিলট’ নামের একটি ফরাসি পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পরেই কমিক্সটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেই জনপ্রিয়তা আজও অটুট।

zoom
১৯৫৯ সালের ২৯ অক্টোবর ‘পিলট’ পত্রিকায় আত্মপ্রকাশ অ্যাসটেরিক্স

শোনা যায়, প্যারিসের শহরতলি ববিনির একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে বসে দুই বন্ধু মিলে এই চরিত্রটির জন্ম দিয়েছিলেন। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের অজেয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা এক ছোট অথচ চতুর গলযোদ্ধা এবং তার অতিমানবিক শক্তির অধিকারী বন্ধুকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল এই ব্যঙ্গাত্মক কমিক্সের পটভূমি।

গল সেই সময়ে রোমানদের দখলে। অবশ্য, পুরোপুরি নয়। অদম্য গলদের একটি ছোট গ্রাম তখনও আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এভাবেই শুরু হয় অ্যাস্টেরিক্স কমিক্স সিরিজ। গলরা হল কেল্টিক জাতিগোষ্ঠীর সবচেয়ে বিখ্যাত একটি দল, যারা রাইন নদীর পশ্চিমের অধিকাংশ ভূখণ্ডে বসবাস করত, যার ফলে প্রাচীনকালে এই অঞ্চলটি গল নামে পরিচিত ছিল।

zoom
সেই অদম্য গলদের গ্রাম

গোসিনি অ্যাস্টেরিক্সের অভিযানের কাহিনিগুলি লিখতে গিয়ে বেছে নিয়েছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে থাকা গলের সেই ছোট্ট গ্রামটিকে, যে গ্রামটি ‘আরমোরিকা’ নামের একটি কাল্পনিক শহরে অবস্থিত ছিল এবং গ্রামটিকে অনেকেই আধুনিক ব্রিটানির সমতুল্য বলে মনে করেন। রোমানরা বারবার চেষ্টা করেও এই স্বাধীনচেতা গ্রামটিকে নিজেদের সাম্রাজ্যভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। গল-এর স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রতিরোধ রোমানদের আগ্রাসন রুখে দেয়। গলরা তাদের ‘ড্রুড’ বা পুরোহিতের তৈরি এক জাদু শরবতের কেরামতিতে শক্তিশালী হয়ে লড়াই করেই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

zoom
আঁকছেন ইউদেরজো

সেই গল্পের নায়ক ছিল বুদ্ধিমান, সাহসী খুদে যোদ্ধা ‘অ্যাস্টেরিক্স’-ই। যেকোনও কঠিন পরিস্থিতিতে সে পেশিশক্তির চেয়ে মগজাস্ত্র ব্যবহার করে রোমানদের বোকা বানাত। তার বন্ধু ওবেলিক্স ছিল দৈত্যাকার , শক্তিশালী সরল স্বভাবের এক রসিক ব্যক্তি, যে ছোটবেলায় জাদুকরী ওষুধে পড়ে গিয়ে অতিমানবিক শক্তি পেয়ে গিয়েছিল। এদের সঙ্গে ছিল গ্রামের পুরোহিত তথা জাদুকর প্যানারোমিক্স, যে জাদু শরবত বানিয়ে গল যোদ্ধাদের শক্তিশালী করে তুলেছিল। সোনালি কাস্তে দিয়ে কাটা ভেষজ উদ্ভিদের তৈরি সেই ‘জাদু শরবত’ খেয়েই গলযোদ্ধারা সাময়িকভাবে অপরাজিত ও মহাশক্তিশালী হয়ে উঠত, যা রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের বিশাল বাহিনীকে বারবার পরাজিত করতে সাহায্য করেছিল। এরা ছাড়াও এই দলে ছিল ওবেলিক্সের ছোট্ট ও বুদ্ধিমান পোষা কুকুর ‘ডগমেটিক্স’, যে পরিবেশ-রক্ষায় ছিল গাছ কাটার চরম বিরোধী।

zoom
ডগম্যাটিক্স

‘অ্যাসটেরিক্স’ সিরিজটি ছিল হাস্যরসাত্মক অ্যাডভেঞ্চারে পরিপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক কাহিনির ধারাবাহিক উপস্থাপনা। গোসিনির লেখার প্রধান শক্তি ছিল তাঁর ক্ষুরধার রসবোধ এবং শব্দের চাতুর্য। ইউদেরজো তাঁর ‘মার্সিনেল স্কুল’ বা ‘বিগ-ফুট’ কার্টুন ঘরানার অতিভুজীয় রূপান্তর এবং বাস্তবধর্মী সূক্ষ্ম ডিটেইলিংয়ের এক অনন্য মিশ্রণে সেই লেখা থেকে ছবি আঁকতেন। বেলজিয়ান কমিক্সের ‘ক্লিয়ার লাইন’ যেখানে খুব সরল ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবহার করত, ইউদেরজো সেখানে ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত। তার চরিত্রের মুখগুলো কার্টুনের মতো হলেও ব্যাকগ্রাউন্ডের রোমান স্থাপত্য, যুদ্ধজাহাজ, বর্ম, রাস্তা এবং পোশাক-আশাক আঁকার ক্ষেত্রে তিনি চরম ঐতিহাসিক নির্ভুলতা এবং বাস্তবসম্মত নিখুঁত ড্রয়িং ব্যবহার করতেন। ইউদেরজোর আঁকা মারামারির দৃশ্যগুলো হয়ে উঠেছিল দারুণ জীবন্ত ও গতিশীল। যখন কোনও গলযোদ্ধা ঘুসি মেরে রোমান সৈন্যদের শূন্যে উড়িয়ে দিত, তখন ধুলোর মেঘ, ছিটকে যাওয়া কাপড় এবং গতি বোঝানোর জন্য তার স্ট্রোকগুলো অ্যানিমেশনের মতো গতিময় মনে হত। চরিত্রগুলোর ভিতরের রাগ, ভয়, আনন্দ বা ধূর্ততা কেবল তাদের চোখের মণি এবং ভ্রু-র সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমেই ফুটিয়ে তুলতে ইউদেরজো ওস্তাদ ছিলেন। মানুষের পাশাপাশি পশুপাখি– বিশেষ করে কুকুর ‘ডগমেটিক্স’ বা রোমানদের ঘোড়াগুলোর মুখের এক্সপ্রেশনও তিনি চমৎকারভাবে এঁকেছিলেন। অ্যাস্টেরিক্স ছাড়াও তাঁরা যৌথভাবে অনেকগুলি কমিক্স তৈরি করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল– ‘উম্পাহ-পাহ’, ‘জেহান পিস্তোলে’ এবং ‘লুক জুনিয়র’-এর মতো অসাধারণ সব কমিক্স।

zoom
ওবেলিক্সের বিক্রম

আপাতদৃষ্টিতে শিশুদের গল্প মনে হলেও, তাঁদের প্রতিটি কমিক্সেই মিশে থাকত সমসাময়িক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং মানব চরিত্রের নিখুঁত ব্যঙ্গচিত্র বা ‘স্যাটায়ার’। কমিক্সকে স্রেফ ‘ছোটদের হালকা বিনোদন’ থেকে তুলে এনে এক লহমায় উচ্চমানের রাজনৈতিক ও সামাজিক ‘ব্যঙ্গচিত্র’-এ রূপান্তর করেছিলেন তাঁরা। গোসিনির এমন লেখাগুলোকে বলা হয়েছিল ‘ডাবল-লেয়ার্ড রাইটিং’ বা দ্বি-স্তরীয় লেখনী, যা শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয় পাঠককেই সমানভাবে টেনে নিয়ে যায়।

যদিও ‘অ্যাস্টেরিক্স’ কমিক্সটির পটভূমি ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৫০ অব্দের প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য, তবুও গল্পটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে ফরাসি প্রতিরোধের এক শক্তিশালী রূপক বা মেটাফর লুকিয়ে ছিল। চারিদিক শত্রুতে ঘেরা থাকা সত্ত্বেও গলরা যেভাবে রোমানদের কাছে নতিস্বীকার না-করে যুদ্ধে এগিয়েছিল, সেটি ফরাসিদের জাতীয়তাবোধ ও আত্মমর্যাদাকেই পুনরুজ্জীবিত করে।

অ্যাস্টেরিক্সের বিভিন্ন কমিক্সে গোসিনি যেভাবে তৎকালীন ইউরোপীয় দেশগুলোর জাতীয় চরিত্র এবং ব্রিটিশ, বেলজিয়ান বা গথদের (জার্মান) স্বভাবকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, সেটি ছিল এককথায় অনবদ্য। মাছ বিক্রেতা আনহাইজেনিক্সের পচা মাছ নিয়ে মারামারি, বুড়ো জেরিয়াট্রিক্সের চিরতারুণ্য, সর্দার ভাইটালস্ট্যাটিস্টিক্সের ঢালের ওপর দাঁড়িয়ে ভারসাম্য রাখার লড়াই আর ক্যাকোফোনিক্সের গাছের মাথায় বন্দি গান– এগুলো শুধু হাসির খোরাক ছিল না, এর গভীরে লুকিয়ে ছিল ফরাসিদের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এবং আত্মপরিচয়ের এক দারুণ আখ্যান।

অ্যাসটেরিক্স কমিক্সটি সরাসরি আধুনিক পুঁজিবাদ ও মুক্তবাজার অর্থনীতির ওপরেই এক চরম আঘাত এনেছিল। রোমানরা যখন যুদ্ধ করে গলদের হারাতে পারল না, তখন এক তরুণ অর্থনীতিবিদকে পাঠানো হয়েছিল, যে ওবেলিক্সের তৈরি পাথর চড়া দামে কিনে পুরো গ্রামে লোভ ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা ঢুকিয়ে দিয়েছিল। টাকা কীভাবে সমাজকে বদলে দেয়, তা গোসিনি অসাধারণ রসবোধের মাধ্যমে এই কমিক্সে দেখিয়েছিলেন। রোমের অলিগলি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে ফুটিয়ে তুলতে গোসিনি এমন এক রোম শহর তৈরি করেছিলেন, যেটি আসলে বিশ শতকের আধুনিক প্যারিস বা যেকোনও বড় শহরের প্রশাসনিক জটলাকেই নির্দেশ করে।

গোসিনি জানতেন, মানুষ সব যুগেই এক। তাই তাঁর গল্পে গলরা রোমানদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়লেও, নিজেদের মধ্যে তারা সারাক্ষণ মাছ বাসি না টাটকা– তা নিয়ে মারামারি করে। মানুষের এই চিরন্তন পরনিন্দা-পরচর্চা, পরশ্রীকাতরতা এবং হুজুগে মানসিকতাকে তিনি দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

zoom
দুই বন্ধুর আশ্চর্য যুগলবন্দি

রেনে গোসিনির ব্যক্তিগত জীবন ছিল তাঁর কমিক্সের মতোই বৈচিত্র্যময়, যা বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছিল। আজ থেকে ১০০ বছর আগে, ১৯২৬ সালের ১৪ আগস্ট, ফ্রান্সের প্যারিস শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন রেনে গোসিনি। তাঁর বাবা স্তানিসলাস ছিলেন পোল্যান্ডের একজন রাসায়নিক প্রকৌশলী এবং মা আনা ছিলেন ইউক্রেনের বাসিন্দা। উভয়েই ছিলেন ইহুদি অভিবাসী। প্যারিসে জন্ম হলেও গোসিনির শৈশব কেটেছিল আর্জেন্টিনায়। তাঁর জন্মের মাত্র দু’বছর পরে, ১৯২৮ সালে তাঁর বাবার চাকরির সূত্রে পুরো পরিবার আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে চলে যায়। সেখানেই রেনের শৈশব ও শিক্ষা জীবন কাটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ইউরোপে থাকা তাঁদের অনেক আত্মীয় স্বজন ‘হলোকস্ট’-এর শিকার হয়েছিলেন। ইউরোপে থেকে যাওয়া গোসিনির মামা, কাকা ও অন্যান্য ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ওপরে নাৎসি বাহিনী অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছিল। তাঁদের অনেককেই গ্রেফতার করে কুখ্যাত ‘আউশভিৎজ’ (Auschwitz) বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়েছিল এবং সেখানে তাঁদের অনেকেই মারা যান। এই ভয়াবহ পারিবারিক ক্ষতি রেনে গোসিনিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এটি ছিল তাঁর জীবনের এক গভীর ট্র্যাজেডিও।

১৯৪৩ সালে, রেনের বয়স যখন মাত্র ১৭ বছর, তখন তাঁর বাবা হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে কিশোর গোসিনির কাঁধে পুরো পরিবারের দায়িত্ব চলে আসে। তিনি বাধ্য হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। প্রথমে তিনি একটি টায়ার কারখানায় সহকারী হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু সেখানে মন না টেকায় পরবর্তীকালে তিনি একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় সহকারী চিত্রশিল্পী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন, যেটি ছিল তাঁর শিল্পী জীবনের প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ।

zoom
গল গ্রামের প্রধান সদস্যরা

১৯৪৫ সালে রেনে এবং তাঁর মা নিউ ইয়র্কে চলে যান তাঁর মামার কাছে। সেখানে তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চেষ্টাও করেন, কিন্তু সফল হননি। নিউ ইয়র্কে তাঁর দিনগুলো ছিল চরম দারিদ্রের। তিনি সেখানে আগের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে একজন ইলাস্ট্রেটর হিসেবে কাজ খোঁজারও চেষ্টা করছিলেন। গোসিনি পরে রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘আমি ওয়াল্ট ডিজনির সঙ্গে কাজ করতে আমেরিকা গিয়েছিলাম, কিন্তু ওয়াল্ট ডিজনি নিজেই সেটা জানতেন না!’ সেখানে তিনি দীর্ঘদিন তীব্র অর্থকষ্ট ও বেকারত্বের মধ্য দিয়ে যান। এই সময়েই তাঁর পরিচয় হয় বিখ্যাত ‘ম্যাড’ ম্যাগাজিনের হবু প্রতিষ্ঠাতা হার্ভি কার্টজম্যান এবং বিল এলডারের সঙ্গে, যা তাঁর কমিক্স ভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে।

মার্কিন সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ এড়াতে ১৯৪৬ সালে গোসিনি তাঁর নিজের দেশ ফ্রান্সে ফিরে যান এবং ফরাসি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি সেনাবাহিনীর কর্পোরাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ছবি আঁকার হাত ভালো থাকায় সেনাবাহিনী তাঁকে রেজিমেন্টের অফিসিয়াল ইলাস্ট্রেটর বা আনুষ্ঠানিক চিত্রশিল্পী হিসেবে নিযুক্ত করে, যেখানে তিনি সেনাবাহিনীর জন্য বিভিন্ন পোস্টার ও কমিক্স আঁকতেন।

zoom
দুই বন্ধু

১৯৫১ সালে রেনে পুনরায় ইউরোপে ফিরে আসেন এবং বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে একটি প্রেস এজেন্সির প্রধান হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী অ্যালবার্ট ইউদেরজোর সঙ্গে।

শিল্পী হিসেবে অ্যালবার্ট ইউদেরজো ছিলেন সম্পূর্ণ স্বশিক্ষিত। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তিনি ফরাসি যুব ও কমিক্স ম্যাগাজ়িনের প্রকাশক সংস্থা “সোসিয়েতে প্যারিসিয়েন দে ল’এদিসিওঁ” (এসপিই)-তে কমিক্সের অক্ষরবিন্যাস এবং ছবি সম্পাদনার কাজ শুরু করেছিলেন। ১৯২৭ সালের ২৫ এপ্রিল ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর জন্মগতভাবে দুই হাতে ছিল মোট ১২টি আঙুল!

ইউদেরজোর বাবা সিলভিও ইউদেরজো এবং মা মারিয়া সাকো ছিলেন ইতালি থেকে আসা অত্যন্ত দরিদ্র অভিবাসী। তাঁর বাবা ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রি। ফ্রান্সে তৎকালীন সময়ে ইতালীয় অভিবাসীদের খুব একটা ভালো চোখে দেখা হত না। ফলে চরম বর্ণবাদ, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক অবহেলার মধ্য দিয়ে তাঁর শৈশব কেটেছিল। ১৯৪০ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং নাৎসি জার্মানি ফ্রান্স দখল করে, তখন ইউদেরজোর বয়স মাত্র ১২ বছর। যুদ্ধ এবং বোমাবর্ষণ থেকে বাঁচতে তাঁর পরিবার প্যারিস ছেড়ে ফ্রান্সের ব্রিটানি অঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে আশ্রয় নেয়। সেখানে তিনি একটি খামারে কাজ করতেন এবং কাঠমিস্ত্রি বাবার কাজে সাহায্য করা শুরু করেন। এই ব্রিটানি অঞ্চলের শান্ত প্রকৃতি এবং গ্রামীণ জীবন তাঁর মনে গভীর দাগ কেটেছিল। পরবর্তীতে অ্যাসটেরিক্সের গল্পে রোমানদের প্রতিরোধ করা সেই বিখ্যাত ‘গল গ্রাম’ (Gaulish Village)-এর নকশা তিনি এই ব্রিটানির গ্রামগুলোর আদলেই করেছিলেন।

ইউদেরজো কোনও প্রথাগত আর্ট স্কুলে পড়ার সুযোগ পাননি। সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় এবং ওয়াল্ট ডিজনির ‘মিকি মাউস কমিক্স’ দেখে তিনি আঁকা শিখতেন। যুদ্ধের পর, তিনি প্যারিসে ফিরে অ্যানিমেশন স্টুডিও এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রে কার্টুনিস্ট হিসেবে কাজের সন্ধান করেন। শুরুতে যুগের পর যুগ কঠোর পরিশ্রমের পরেও তাঁকে চরম পারিশ্রমিক বৈষম্য ও বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ১৯৫১ সালে রেনে গোসিনির সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁর জীবন ছিল এক অনিশ্চিত রুটি-রুজির লড়াই।

zoom
ভারসিনজেতোরিক্সের দর্প!

গোসিনি ও ইউদেরজোর বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়া এতটাই নিবিড় ছিল যে, তাঁরা একসঙ্গে একের পর এক কালজয়ী কমিক্সের চরিত্র তৈরি করতে শুরু করেন, যার চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৯৫৯ সালের ‘অ্যাসটেরিক্স’। বিস্ময়কর বিষয় হলো, ইউদেরজো ছিলেন বর্ণান্ধ। তিনি লাল এবং সবুজ রঙের পার্থক্য করতে পারতেন না। তা সত্ত্বেও তাঁর আঁকার নিখুঁত লাইন, চরিত্রদের গতিশীলতা বা ‘ডায়নামিজম’ এবং অনন্য শৈলী কমিক্সের দুনিয়ায় ইতিহাস তৈরি করে। রঙের ক্ষেত্রে তিনি মূলত তাঁর ভাই মার্সেল বা অন্য সহযোগীদের ওপর নির্ভর করতেন, কিন্তু তুলি এবং কালির জাদুতে তিনি ছিলেন অনন্য। এই অ্যাসটেরিক্স সিরিজের মাধ্যমে রেনে গোসিনি এবং ইউদেরজো প্রমাণ করেছিলেন যে, কমিক্সের মতো একটি হালকা মাধ্যমকেও বিশ্বমানের উচ্চাঙ্গের সাহিত্যে রূপ দেওয়া সম্ভব।

zoom
নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে অ্যাসটেরিক্সের অভিযান

গোসিনি কমিক্সগুলো লিখেছিলেন ফরাসি ভাষায়, কিন্তু পরে সেগুলো পৃথিবীর ১১১টিরও বেশি ভাষা ও উপভাষায় অনূদিত হয়। ১৫টিরও বেশি লাইভ-অ্যাকশন এবং অ্যানিমেটেড সিনেমা তৈরি হয় এই কমিকস নিয়ে। মানুষ অ্যাসটেরিক্সকে আপন করে নিতে দেরি করেনি। আসলে, গোসিনির তৈরি করা প্রতিটি চরিত্রই ছিল আমাদের চারপাশের চেনা মানুষেরই একেকটি রূপ। তাই পাঠকেরা খুব সহজেই এইসব চরিত্রের সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পেরেছিল। যখনই খুদে অ্যাসটেরিক্স বা সরল-সোজা ওবেলিক্স তাদের অলৌকিক পানীয় খেয়ে মহাশক্তিশালী রোমান লিজিয়নদের কচুকাটা করেছে, তখনই পাঠক এক অদ্ভুত মানসিক তৃপ্তির স্বাদ পেয়েছে। রোমানদের মতো এক বিশাল সাম্রাজ্যকে দুই বন্ধু মিলে স্রেফ বুদ্ধি এবং জাদুকরী শরবতের জোরে নাস্তানাবুদ করছে– এই সরল ও মজার থিমটি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রাচীর ভেঙে শিশু থেকে বুড়ো সবার মন জয় করে নিয়েছিল।

আসলে, শোষিতের এই জয়ের গল্প যুগে যুগে সব দেশের মানুষকেই হাসিয়েছে এবং আনন্দ দিয়েছে। রেনে গোসিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সত্যিকারের হিউমার বা রসবোধের কোনও ‘এক্সপায়ারি ডেট’ হয় না, কোনও সীমানাও হয় না। আমাদের বাংলাভাষাতেও, যখন পৌলমী সেনগুপ্ত প্রথম আনন্দমেলায় এই কমিক্সটি অনুবাদ করেছিলেন, তখনও কমিক্সটি পড়তে গিয়ে মনেই হয়নি– এটি দূর ইউরোপের কোনও ফরাসি গ্রাম বা রোমান যুগের গল্প।

মানুষের দুঃখ-কষ্টের দিনে গল গ্রামের সেই উৎসবের ভোজ আর ওবেলিক্সের চওড়া হাসি আজও আমাদের কাছে এক ঝলক টাটকা বাতাসের মতো কাজ করে। আধুনিক ভিডিও গেম এবং কমিক্স অ্যাপের মাধ্যমে আজকের জেনারেশন আলফা বা জেন-জি তরুণদের কাছেও গোসিনির রসবোধ একই রকম থেকে গিয়েছে। ফরাসি সংস্কৃতির এই সূক্ষ্ম রসিকতাগুলোকে যখন অ্যান্টিয়া বেল এবং ডেরেক হকরিজ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন, তখনও তাঁরা আক্ষরিক অনুবাদ না-করে ব্রিটিশ সংস্কৃতির উপযোগী করেই পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। ফলে, পাঠক কখনই মূল রস থেকে বঞ্চিত হয়নি।

আজ দুই স্রষ্টার জন্মের এক শতাব্দী পরেও তাঁদের তৈরি চরিত্রগুলো একইভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে। গোসিনির মৃত্যুর পরে ইউদেরজো একা এবং পরবর্তীকালে নতুন একঝাঁক লেখক-শিল্পী এই সিরিজকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। শতাধিক ভাষায় অনূদিত হয়ে কোটি কোটি সংখ্যায় বিক্রি হওয়া এই কমিক্স প্রমাণ করে– ভালো গল্পের কোনও ভৌগোলিক বা ভাষাগত সীমারেখা থাকে না। আসলে, ‘অ্যাসটেরিক্স’ শুধুমাত্র একটি ‘কমিক্স বুক সিরিজ’ ছিল না, এটি ছিল বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে এক কালজয়ী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দলিল।

রেনে গোসিনি তাঁর জীবনের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কঠিন অভিজ্ঞতাকে কোনও তিক্ততায় রূপ না দিয়ে, হাস্যরস ও রূপকের মাধ্যমে এক অনবদ্য মানবিক বিজয়ের গল্পে রূপান্তর করেছিলেন। ১৯৭৭ সালে প্রয়াত হন রেনে গোসিনি আর তার ৪৩ বছর পরে ২০২০ সালের ২৪ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন ইউদেরজো। দুই স্রষ্টারই প্রয়াণ ঘটলেও, তাঁদের লেখনী আর আঁকার জাদুতে অ্যাসটেরিক্স ও ওবেলিক্স আজও বিশ্বজুড়ে অক্ষয় ও অম্লান হয়ে রয়েছে।

……………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী-র অন্যান্য লেখা

……………………….

Albert Uderzo asterix Auschwitz France Gaul Gaulish Village Obelix René Goscinny Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar The Holocaust

Share this article on