Bimal Kar’s Novels: Human Psychology & Solitude | Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

ইচ্ছে বনাম সামাজিকতা

বিমল করের উপন্যাস ফিরে পড়তে গিয়ে যেন আরও বেশি করেই চিনে নিচ্ছি কীভাবে তিনি দেখছেন সময় আর ব্যক্তি-ভুবনকে একটা জটিল সমগ্রতায়। তাঁর একটা ‘অনুসন্ধান’ থাকে উপন্যাসে, নিজেই বলেছেন। মোহিনী-অবিন প্রেমের উপলক্ষে, পূর্ব-বিশ্বাসের সঙ্গে আধুনিক নিরপেক্ষ দৃষ্টির অমোঘ সংঘাত উঠে এল ‘অসময়’ উপন্যাসে। লেখক যেন সূত্রধর, তিনি প্রধান চরিত্রগুলির মুখে প্রথম-পুরুষ কথন বসিয়ে পাঠককে নিয়ে যাচ্ছেন অন্তর্গত দোলাচলে সরাসরি। 

Published by: Robbar Digital

Posted:August 25, 2026 7:21 pm | Updated:August 25, 2026 7:28 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

প্লটের চমক নয়, ঘটনা নামমাত্র, বরং পারিবারিক-সামাজিক একটা ফ্রেমের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতা, গহন চেতনা-প্রবাহে চলছে নিজেরই সঙ্গে অনর্গল বোঝাপড়া– এই দিকটা নিয়ে বিমল করের উপন্যাস যেন মধ্যবিত্ত জীবনের অন্দরের দরজা খুলে দেয়। প্রতিদিনের অভ্যস্ত দিনযাপনের মধ্যেই সম্পর্কের ভাঙাগড়া, আর লেখক দেখে নিচ্ছেন চরিত্রের ভিতরে তার অভিঘাত, একজন শান্ত, নিরপেক্ষ দর্শকের চোখে। সারাক্ষণ। ঘর-গৃহস্থালির আনাচকানাচ নিয়েই পটভূমি, বাইরে জীবন আপাত নিস্তরঙ্গ, কেবল অন্তর্ভুবনে নিঃশব্দ এক তোলপাড়। আত্মসমীক্ষা চলতেই থাকে; প্রায় চেকভের ধরনেই ‘প্লটলেস’ আখ্যান। খুব স্বাভাবিক যে চরিত্রের স্বগত-কথন কাহিনির অনেকটা জুড়ে, আর তা যোগ করে দেয় একটা আত্মমগ্নতাও। তাঁর তিনটি উপন্যাস, যেগুলি লেখক নিজে বলেছেন ‘মেজাজের দিক থেকে কাছাকাছি’ ‘খড়কুটো’ (১৯৬৪), ‘পূর্ণ অপূর্ণ’ (১৯৬৭), ‘অসময়’ (১৯৭২), শাল-পলাশের বন আর টিলা-পাহাড় নিয়ে একটা শান্ত প্রবাস ঘিরে, আর তারই প্রেক্ষিতে, চরিত্রের অশান্ত মনোভুবন যেন তীব্রতর মাত্রা পেয়ে যায়।

zoom
‘খড়কুটো’ বইয়ের প্রচ্ছদ

মনস্তাত্ত্বিক পাঠে তাঁর আগ্রহ, ঘটনাপ্রবাহে নয়, ‘অসময়’ প্রসঙ্গে লেখক নিজেই বলছেন‘বলা বাহুল্য আমার অধিকাংশ লেখার মতন এই উপন্যাসের কাহিনিগত অংশ অতি ক্ষীণ, শুধু চরিত্রগুলির মনের মধ্যে দ্বিধা, সংশয়, দুর্বলতা, বিশ্বাস, আত্মপ্রশ্ন ব্যক্ত করাই আমার উদ্দেশ্য ছিল।’ (‘আমার লেখা’, বাছাই গল্প) বিশ শতকের মাঝখানে, বিহার-প্রবাসী পড়তি বনেদি যে বাঙালি পরিবারের তিন ভাই বোন মোহিনী, সুহাস আর আয়নাকে ঘিরে এই উপন্যাস, পুরনো বিশ্বাস-সংস্কার আঁকড়ে-থাকা ওই পরিবারকেই তিনি বলছেন ‘নিভৃত ভূখণ্ড’। মোহিনীর রয়েছে একটা ভুল অতীত-পর্ব। স্বামীর সঙ্গে তার বিবাহ-জীবনের মোহভঙ্গ কেন্দ্র করে, এখন তিন পুরুষের পুরনো বাড়ি আর পরিবারের ‘সম্ভ্রম’ নিয়ে বাঁচা, যতদিন না তার জীবনে অবিন এসে ভেঙে দেয় তার ‘আড়াল’। বুলার জন্য সুহাসের আর তপুর জন্য আয়নার প্রেমও অপূর্ণ, বুলা বা তপু ‘সামাজিক মর্যাদা’-য় সমতুল্য নয়, আর মোহিনীর সামনে নিজেদের সুখী দেখতেও ভাইবোনের দ্বিধা। সুহাস অবশ্য কলকাতায় চাকরি নিয়ে খোলা হাওয়ায় এসে পড়েছে আগেই। তাদের বাবার পিতৃতান্ত্রিক দাপট আর ‘বনেদিয়ানা’-র অহংকারের পাশে জেঠামশাই ছিলেন বিপরীত-মুখ, এখন তিনি উদাসীনতা আর কর্তব্যের টানাপোড়েনে বাস্তবের সঙ্গে অহরহ বোঝাপড়া চলছে তাঁরও। মনে হয়, ব্যক্তিগত দ্বিধা-সংশয় নিয়ে, অবিরল আত্মবিশ্লেষণ নিয়ে, বিমল করের এক-একটি চরিত্রই হয়ে উঠছে ‘নিভৃত ভূখণ্ড’!

zoom
লেখক বিমল কর যেন সূত্রধর

লেখক যেন সূত্রধর, তিনি ‘অসময়’-এর প্রধান চরিত্রগুলির মুখে প্রথম-পুরুষ কথন বসিয়ে পাঠককে নিয়ে যাচ্ছেন অন্তর্গত দোলাচলে সরাসরি। মোহিনীর এতদিনের আপাত-স্থিতি ভাঙছে, যখন কলকাতা থেকে এসে পড়া, সুহাসের বন্ধু অবিনয় ওরফে অবিন তার ‘তিন পুরুষের পুণ্য’ আঁকড়ে-থাকার অভ্যাসকে বলে ‘সাজানো মিথ্যে’, নস্যাৎ করে দেয় তার ‘ত্যাগের গৌরব’! লেখক বলছেন, ‘যদি সেই পুরনো জগতে হঠাৎ কোনো সর্বনাশা ঝড়-ঝাপটা এসে লাগে যা একেবারে হাল আমলের তবে কেমন হয়?’ আচমকা ‘ঝড়-ঝাপটা’-র মতোই এসে পড়ে অবিন, মোহিনীর ভিতরে বন্ধনমুক্তির ইচ্ছা জাগিয়ে দিয়ে‘আমার জন্য সংসারের ক্ষতি হবে, এ আমি কোনোদিন চাই নি…তবু আমার এই পড়ন্ত বয়সে কিসের এক এলোমেলো বাতাস এসে আমায় বিব্রত করে রেখেছে।’ ‘পূর্ণ অপূর্ণ’ উপন্যাসেও অবনী আর ললিতা তাদের সম্পর্কের দূরত্ব, মানসিক টানাপোড়েনে বাঁচে; হৈমন্তী বা কুমকুমের মধ্যেও সমাজ-পরিবারের প্রত্যাশার মুখে ইচ্ছার অবদমন। কোনও-না-কোনও সম্পর্কে যুক্ত কয়েকটি চরিত্র বিমল করের উপন্যাসে আশ্চর্য জটিলতায় জড়িয়ে পড়ে, প্রত্যেকেরই ভিতরে গোপন অসম্পূর্ণতার বোধ। মধ্যবিত্তের বোধ-বিশ্বাসের ক্ষয় নিয়ে তাঁর উপন্যাস ‘দংশন’(১৯৫৭), ‘দেওয়াল’ (১৯৫৬-১৯৬২, তিন খণ্ড) অথবা ‘যদুবংশ’ (১৯৬৮) নগর-ভিত্তিক ও ঘটনাবহুল, তবে অন্তর্দর্শনও বহুস্তর।

zoom
যদুবংশ (১৯৭৪) ছবির পোস্টার

দুই বিকল্পের মধ্যে তীব্র দোটানা, গভীর নৈতিক দ্বন্দ্ব লেখকের আখ্যান জুড়ে, আত্মবিশ্লেষণের একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া তাই জরুরি হয়ে ওঠে। মোহিনীর একদিকে অবিনের প্রতি আকর্ষণ, অন্যদিকে সংস্কার, তার স্বস্তি আর দীর্ঘনিশ্বাস একই সঙ্গে‘যখন আমার বেলা ছিল তখন তো আসো নি, এই অসময়ে তুমি আমার কাছে কিছু চেয়ো না।’ আমাদের মনে পড়তে পারে, ভিতরে-বাইরে যাবতীয় অমিল সত্ত্বেও, মার্কেস-এর উপন্যাসে পড়ন্ত বেলার প্রেম, পরস্পর-নির্ভরতাকে নতুন স্বীকৃতি দিয়ে (‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা’); ফর্মিনার দ্বিধা ছিল আরিজাকে ‘দ্বিতীয় সুযোগ’ দেওয়া নিয়ে, মোহিনীরও দীর্ঘ দ্বন্দ্ব নিজেরই সঙ্গে। ‘পূর্ণ অপূর্ণ’-র ললিতারও একদিকে সংশয়, অবিশ্বাস নিয়ে অবনী, অন্যদিকে সুরেশ্বরজনকোলাহল থেকে দূরে তার আশ্রমে দৃষ্টিহীনের সেবা নিয়ে, যাকে সে ভালোবেসেছিল একতরফাই। পাঠক বুঝে যায়, সুরেশ্বরেরও রয়েছে একটা আত্ম-অনুসন্ধান, আর তাকে ঘিরেই ‘পূর্ণতা’-র একটা অন্য পাঠ সম্ভব হয়ে উঠবে শেষ পর্যন্ত। বিমল করের ‘গ্রহণ’ (১৯৬৪) উপন্যাসেও সীতাংশু, সুমিত্রা আর রমলার ভিতরে গ্লানি, আত্মসংশয়, পাপবোধ; শিরোনাম সেই অনালোকিত অবস্থারই রূপক হয়ে উঠল।

zoom
পূর্ণ অপূর্ণ বইয়ের প্রচ্ছদ

বিমল করের উপন্যাস ফিরে পড়তে গিয়ে যেন আরও বেশি করেই চিনে নিচ্ছি কীভাবে তিনি দেখছেন সময় আর ব্যক্তি-ভুবনকে একটা জটিল সমগ্রতায়। তাঁর একটা ‘অনুসন্ধান’ থাকে উপন্যাসে, নিজেই বলেছেন। মোহিনী-অবিন প্রেমের উপলক্ষে, পূর্ব-বিশ্বাসের সঙ্গে আধুনিক নিরপেক্ষ দৃষ্টির অমোঘ সংঘাত উঠে এল ‘অসময়’ উপন্যাসে‘যা অতীত, পুরনো, তার সমস্ত কিছু অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই, আবার যা বর্তমানের তার ষোলো আনাকে গ্রহণ করতেও আমি অক্ষম। এই দুইয়ের সংঘর্ষনৈতিক অথবা আত্মিক, বুদ্ধিগত বা হৃদয়গত, তারই একটা পরিচয় দেবার জন্যেই ‘অসময়’ লিখেছিলুম।’ (‘আমার লেখা’) আশ্চর্য নয় যে, অবিনকে তিনি করতে চেয়েছেন ‘সর্ববিষয়ে অবিশ্বাসী’, যে অচলায়তনে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠবে, ‘ভাঙো!’ প্রচলিত বিশ্বাস, প্রাতিষ্ঠানিক রীতিকে প্রশ্ন করে অবিন, মোহিনীর অতীতের কারণে আয়নার বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে যাচ্ছে দেখে সুহাসকে বলেছে, ‘বিয়েটাকে তোমরা বারোয়ারি পুজোর মতন করে তুলেছ, সেখানে ছেলে-মেয়ের ব্যাপারটা চাপা পড়ছে… এই তামাশা আমার পছন্দ হয় না।’ একদিকে সে ‘প্রচলবিরোধী’, অন্যদিকে সপ্রতিভ বাক্শৈ‌লী আর উইট নিয়ে সে এক-এক সময়ে মনে করায় ‘অমিত রে’!

zoom
‘দেওয়াল’ উপন্যাসের প্রচ্ছদ

সন্দেহ, অবিশ্বাস আর ভাঙন নিয়ে চিহ্নিত এই যে অস্থির সমকাল, এর ভিতরে দাঁড়িয়ে জীবনে ‘পূর্ণতা’-র বোধ কি আদৌ সম্ভব? ‘পূর্ণ অপূর্ণ’ উপন্যাসে এইটাই লেখককে ভাবাচ্ছে‘জগৎ যতই অসম্পূর্ণ হোক, কোনো কোনো মানুষ এই অসম্পূর্ণ জগতের মধ্যেই একটা পূর্ণতার ধ্যান করে…।’ (‘আমার লেখা’) একদিকে অবনী-ললিতার অশান্ত সম্পর্ক, অন্যদিকে সুরেশ্বরের আতুর-সেবা, যা এক অর্থে নিজস্ব ধরনে তার ‘পূর্ণতার সন্ধান’; ‘পূর্ণ’ আর ‘অপূর্ণ’-এর সহাবস্থান স্পষ্ট হচ্ছে। অবিনের মধ্যেও কি দুই বিরোধী সত্তা? এক অবিন প্রখর ও তার্কিক, অন্য অবিন শান্ত-কোমল যেমন মৃত্যুমুখী শচির (মোহিনীর পূর্ব-প্রেমিক)পাশে, অথবা আয়না-তপুর বিবাহের উদ্যোগে। মনস্তাত্ত্বিক সংকট তুলনায় নিয়ন্ত্রিত ‘খড়কুটো’ উপন্যাসে, তবে সেখানেও একটা অদৃশ্য সংঘাততরুণী ভ্রমরের একদিকে সরল ধর্মবোধ, প্রেম, অন্যদিকে লেখক নিজেই যাকে বলেছেন মৃত্যুর ‘অবধারিত নিয়তি’। লেখকের গদ্যও যেন দুই বিপরীত মেলায়সংহত, নৈর্ব্যক্তিক তাঁর বাক্ভ‌ঙ্গী, আপাত-সরল, অথচ বনজ্যোৎস্নার বর্ণনায় নিপুণ, আবার অন্তঃশায়ী বিষাদ প্রায়ই আসন্ন কোনও মৃত্যু ঘিরে (‘অসময়’, ‘খড়কুটো’)।

zoom
‘অসময়’ উপন্যাসের প্রচ্ছদ

মধ্যবিত্তের দ্বিধান্বিত মনোভুবন চিনিয়ে দেয় বিমল করের উপন্যাস, আর তার একটি জরুরি পাঠও তৈরি হয়ে ওঠে। এটা ঠিকই যে, পাঁচ দশকেরও বেশি পার হয়ে গিয়েছে এর মধ্যে, আমাদের সমাজ-অর্থনীতির ছক বদলাচ্ছে, আলগা হচ্ছে পিতৃতান্ত্রিক অনুশাসন, পারিবারিক-সামাজিক সংস্কারও তুলনায় শিথিল এখন। বিয়ে-ভাঙা নিয়ে ট্যাবু এখন এত প্রাসঙ্গিক নয়, বিবাহে মেয়েদের অবস্থান নিয়ে পূর্ব-ধারণা ভাঙছে, যদিও নির্মূল নয়। তবে এখনও, ক্রমাগত বদলাতে-থাকা সময়ের সঙ্গে জুড়ে থাকার গরজে, যথেষ্ট ‘সামাজিক’ হয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে, আমাদের প্রতিদিনের জীবন উৎকণ্ঠ। ব্যক্তিগত ইচ্ছা আর সামাজিক প্রত্যাশার টানাপোড়েন এখন অবারণ। এই সময়ে দাঁড়িয়ে, চারিয়ে-থাকা বিচ্ছিন্নতার মধ্যে, পারস্পরিক দূরত্বের মধ্যে, সংশয় আর অন্তঃশীল ‘অপূর্ণতা’-র বোধ নিয়ে, আমরাও কি এক অর্থে হয়ে উঠছি ‘নিভৃত ভূখণ্ড’?

…………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন উমা চট্টোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা

…………………..

bengali novel bimal kar human psychology Jodu Bangsha Khorkuto Purna Apurna Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar solitary

Share this article on