cinchona was first invented by Quechua tribes of peru | robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

ম্যালেরিয়ার ওষুধ প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন পেরুর আদিবাসীরা

১৮৫৯ সালে ব্রিটিশ সরকারি কর্মচারী স্যার ক্লিমেন্ট মারখাম, দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালা থেকে সিঙ্কোনা বীজ ও চারা সংগ্রহ করে ভারতে নিয়ে আসেন। সেই চারা ও বীজ থেকে ১৮৬১ সালে নীলগিরির উটাকামুন্ডে (বর্তমানে উটি) পরীক্ষামূলকভাবে সিঙ্কোনার চাষ প্রথম শুরু হয়। আমাদের দার্জিলিংয়ে দক্ষিণ আমেরিকার গাছের চারা এসে তখনও পৌঁছয়নি। কলকাতা বোটানিক্যাল গার্ডেনের তৎকালীন সুপারিনটেনডেন্ট ডা. থমাস অ্যান্ডারসন জাভা থেকে কিছু সুস্থ চারা এনে, দার্জিলিঙের সেনচাল এলাকায় প্রথম নার্সারিটি তৈরি করেন ১৮৬২ সালে।

Published by: Robbar Digital

Posted:April 24, 2026 6:24 pm | Updated:April 24, 2026 6:25 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

সতেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে, দক্ষিণ আমেরিকার ছোট্ট একটি দেশ, পেরুর ভাইসরয় জেনারেল বা লাটসাহেব ছিলেন চতুর্থ কাউন্ট অফ সিনকোন। তিনি থাকতেন পেরুর রাজধানী লিমায়। একবার তাঁর স্ত্রী কাউন্টেস আনা দে ওসোরিও প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হলেন। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এল। কিছুক্ষণ পরে ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েও গেল। কিন্ত অল্পসময় পরেই আবার ফিরে এল সেই জ্বর, একইভাবে কমে গেল, ঠিকই কিন্ত পুরোপুরি কমে গেল না। বারবার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে আর যায়, কিছুতেই জ্বর আর সারে না। লাটসাহেব পড়লেন ভারি চিন্তায়!

zoom
কাউন্টেস আনা দে ওসোরিও

এমন সময়ে ত্রাতার ভূমিকায় এগিয়ে এলেন স্প্যানিশ সরকারের এক পারিষদ। তিনি খবরটি পেয়ে ভাইসরয়কে চিঠি লিখে জানালেন, স্থানীয় এক গাছের ছালের কথা, যে-ছাল খেয়ে এমনই জ্বরের হাত থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছেন! তিনি এই গাছটির সন্ধান পেয়েছিলেন পেরুর ‘কেচুয়া’ নামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজনের কাছ থেকে, যাঁরা শরীরে তাপমাত্রার কাঁপুনি থেকে রক্ষা পেতে এই গাছটির পাতা ও ছাল ব্যবহার করতেন।

সিনকেন চিঠি পেয়েই লোক পাঠালেন সেই গাছের খোঁজে। খোঁজ করে নিয়ে আসা হল সেই গাছের ছাল। অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছিল সেদিন। ম্যাজিকের মতো কাজ করেছিল সেই ছালের নির্যাস। জ্বর থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন লাটসাহেবের স্ত্রী। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনাটির পরে জ্বর নিরাময়ে গাছটির গুণের কথা ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। গাছটির নামই হয়ে গেল ‘ফিভার ট্রি’ অর্থাৎ, জ্বর গাছ।

zoom
সিঙ্কোনা গাছের ফুল

আঠারো শতকের এক ভূ-পর্যটক, চার্লস মেরি ডে লা কন্ডামিন ফিভার ট্রি-র গুনগুন সারা ইউরোপে ছড়িয়ে দিলেন। পরে, জেসুইট মিশনারিরা ফিভার ট্রি-কে ইউরোপে নিয়ে এলেন। সেই গাছের পাতা ও ছাল গুঁড়ো করে জ্বর সারাতে লাগলেন তাঁরা। সেই সময়ে এর নাম ছিল– ‘জেসুইটের পাউডার’ বা ‘কার্ডিনাল পাউডার’। জ্বরটি যে ম্যালেরিয়া, সেটি অবশ্য জানা গিয়েছিল অনেক পরে।

১৭৪২ সালে বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস পেরুর লাটসাহেবের স্ত্রী কাউন্টেস অফ সিনকোনের নাম অনুসারে গাছটির নামকরণ করলেন ‘সিঙ্কোনা’। ১৮২০ সালে দুই ফরাসি বিজ্ঞানী পিয়ের জোসেফ পেলেটির ও জোসেফ বিয়েনেম কোভেন্টু বললেন, সিঙ্কোনা গাছের ছালে থাকা কুইনিন-ই আসলে এই জ্বর সারাতে কার্যকরী ভূমিকা নেয়। পেলেটির ও বিয়েনেম কোভেন্টুর গবেষণার পথ ধরে সারা বিশ্ব জুড়েই শুরু হয়ে যায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আবিষ্কার হয় অনেকগুলো ওষুধ, যাদের মধ্যে পরে সবচেয়ে বেশি সাফল্য পেয়েছিল ‘ক্লোরোকুইন’।

zoom
ক্লোরোকুইন

১৮৫৯ সালে ব্রিটিশ সরকারি কর্মচারী স্যর ক্লিমেন্ট মারখাম, দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালা থেকে সিঙ্কোনা বীজ ও চারা সংগ্রহ করে ভারতে নিয়ে আসেন। সেই চারা ও বীজ থেকে ১৮৬১ সালে নীলগিরির উটাকামুন্ডে (বর্তমানে উটি) পরীক্ষামূলকভাবে সিঙ্কোনার চাষ প্রথম শুরু হয়। আমাদের দার্জিলিংয়ে দক্ষিণ আমেরিকার গাছের চারা এসে তখনও পৌঁছয়নি। কলকাতা বোটানিক্যাল গার্ডেনের তৎকালীন সুপারিনটেনডেন্ট ড. থমাস অ্যান্ডারসন জাভা থেকে কিছু সুস্থ চারা এনে, দার্জিলিঙের সেনচাল এলাকায় প্রথম নার্সারিটি তৈরি করেন ১৮৬২ সালে। সেনচালের অত্যধিক ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে চারাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চাষের স্থান পরিবর্তন করা হয়। ১৮৬৪ সালে অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকায় অবস্থিত মংপু এবং রাংবি উপত্যকায় সিঙ্কোনা চাষ শুরু হয়। পরবর্তীকালে এখানেই সিঙ্কোনা থেকে কুইনাইন তৈরির জন্য একটি বড় কারখানা গড়ে ওঠে। পরে অসম ও সিকিমেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সিঙ্কোনা গাছের চাষ ও কুইনাইনের উৎপাদন শুরু হয়েছিল। 

১৯০৫ সালের দিকে ভারত কুইনাইন উৎপাদনে স্বনির্ভর হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের কাছে কম খরচে এই ওষুধ পৌঁছে দিতে ব্রিটিশ সরকার ডাকঘরের মাধ্যমে নামমাত্র মূল্যে কুইনাইনের প্যাকেট বিক্রি শুরু করে। সিঙ্কোনা গাছের থেকে পাওয়া কুইনাইনের মাধ্যমেই মানুষ ম্যালেরিয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিল। ম্যালেরিয়া রোগের নিরাময় আবিষ্কৃত হলেও এই রোগের উৎস এবং অন্যান্য বিস্তারিত তথ্য তখনও বের করা সম্ভব হয়নি।

zoom
সিঙ্কোনা গাছের ছাল

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ম্যালেরিয়া ছিল এক মারাত্মক ব্যাধি। ম্যালেরিয়া রোগের প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায় বিখ্যাত ‘এবারস্‌ প্যাপিরাস’ (Ebers Papyrus)-এ। এটি প্রাচীন মিশরের একটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত পাণ্ডুলিপি, যেখানে ম্যালেরিয়ার মতো উপসর্গের উল্লেখ রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে গ্রিক সভ্যতায় এই রোগটির প্রকোপ ব্যাপকভাবে দেখা যায়। সেই সময়ে এথেন্সের এমন কোনও ঘর বাকি ছিল না, যেখানে কেউ জ্বরে ভুগছিল না। এই জ্বর হওয়ার কারণ হিসেবে ডোবার জল থেকে উঠে আসা বিষাক্ত বাতাসের প্রভাবকেই দায়ী করা হয়েছিল। 

শুধু গ্রিক বা রোমান সাম্রাজ্য নয়, প্রাচীনকালে পুরো পৃথিবীর মানুষেরই বিশ্বাস ছিল বদ্ধ জলের বিষাক্ত জলীয় বাতাসই ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রধান কারণ। ১৭১৮ সালে ইতালীয় চিকিৎসক ফ্রান্সিসকো টরটি প্রথম ‘ম্যালেরিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। ইতালীয় শব্দ ‘mala’ (খারাপ) এবং ‘aria’ (বাতাস) থেকে এই নামকরণ করেছিলেন তিনি।

আধুনিক চিকিৎসার জনক, গ্রিসের বিখ্যাত দার্শনিক হিপোক্রেটিসই প্রথম ম্যালেরিয়ার পর্যায়ক্রমিক জ্বরের ধরন বর্ণনা করেছিলেন। ১৮৮০ সালে আলজেরিয়ায় কর্মরত ফরাসি সামরিক চিকিৎসক শার্ল লুই আলফঁস ল্যাভেরন (Alphonse Laveran) প্রথম একজন রোগীর লোহিত রক্তকণিকায় ম্যালেরিয়ার পরজীবী খুঁজে পান। ল্যাভেরন দাবি করেন যে, তিনি রোগটির কারণ শনাক্ত করেছেন এবং সেটি একটি প্রাণী। কিন্তু তিনি নিশ্চিত ছিলেন না যে এই পরজীবী প্রাণীটি ঠিক কী ধরনের।

zoom
চিকিৎসক শার্ল লুই আলফঁস ল্যাভেরন

বেশিরভাগ মানুষই অবশ্য সেই সময়ে ল্যাভেরনের কথা বিশ্বাস করেনি। অনেকেই ল্যাভেরনের এই আবিষ্কারকে মিথ্যা বলেও দাবি করেছিল। কিন্তু ল্যাভেরন তাতে একটুও দমে যাননি। গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে তিনি ম্যালেরিয়ার পরজীবী প্লাসমোডিয়াম (Plasmodium) সম্পর্কে বিভিন্ন বিস্তারিত তথ্য উদ্‌ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরে, এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটির জন্যেই ১৯০৭ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল ল্যাভেরনকে। তবে তার আগেই, ১৯০২ সালে ম্যালেরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটির জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়ে গিয়েছিলেন স্যর রোনাল্ড রস। ল্যাভেরনের মতো রোনাল্ড রসও একজন সামরিক ডাক্তার ছিলেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই এই ব্রিটিশ চিকিৎসক ম্যালেরিয়া নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ছোটবেলায় ভারতে থাকার সময়েই ম্যালেরিয়ার প্রকোপ নিজের চোখে দেখেছিলেন। তাঁর বাবাও আক্রান্ত হয়েছিলেন ম্যালেরিয়ায়। তাই ম্যালেরিয়াই হয়ে ওঠে তাঁর গবেষণার বিষয়। যদিও এই গবেষণায় রোনাল্ড রস তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কখনও সহযোগিতা পাননি। গবেষণা, সহকারী নিয়োগ ইত্যাদির জন্য অর্থব্যয় তাঁকে নিজেকেই করতে হয়েছে। আর বারবার পেয়েছেন বদলি হয়ে যাওয়ার নির্দেশ। এই সবকিছুকে সঙ্গে নিয়েই, রোনাল্ড রস, ল্যাভেরনের ম্যালেরিয়ার সঙ্গে প্রাণীর সংযোগ থাকার প্রস্তাবিত তত্ত্বকে প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন। তাঁকে এই গবেষণায় উৎসাহিত করেছিলেন ‘ট্রপিকাল মেডিসিনের জনক’ হিসেবে পরিচিত প্যাট্রিক ম্যানসন।

zoom
প্যাট্রিক ম্যানসন

ল্যাভেরন তার এক জার্নালে ম্যালেরিয়ার সঙ্গে মশার যোগসূত্র থাকার কথা ধারণা করেছিলেন, কিন্তু তিনি তা নির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ১৮৯৭ সালে সেই মশা নিয়েই গবেষণা করতে করতেই রস দেখলেন মশাদের পাকস্থলীতে এমন কিছু বস্তু আছে, যার সঙ্গে ম্যালেরিয়াস স্পোরোজয়েটের খানিকটা সাদৃশ্য রয়েছে। এই ঘটনাটিতে রস যেন কিছুটা আশার আলো দেখতে পেলেন। এরপরেই তিনি ম্যালেরিয়া জীবাণুর জীবনচক্রের একটি পূর্ণাঙ্গ মডেল তৈরি করে আলোড়ন ফেলে দিলেন। রস প্রমাণ করে দেখালেন, ম্যালেরিয়া ছড়ানোর পেছনে দায়ী প্রধান পতঙ্গটি আসলে স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা।

রসের এই প্রমাণের সূত্র ধরেই ইতালির জীববিজ্ঞানী জিওভানি বাতিস্তা গ্রাসি এবং বিশ্বখ্যাত জীবাণুবিদ রবার্ট কচ ম্যালেরিয়া নিয়ে গবেষণাকে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যান। এই দুই বিজ্ঞানীদের দেওয়া তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী প্রজন্ম বুঝতে পারে যে, ম্যালেরিয়া দমনে কেবল মশা মারলে হবে না, রক্তে থাকা পরজীবীকেও ধ্বংস করতে হবে। প্রাকৃতিক কুইনাইন কার্যকরী হলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। ১৯৩৪ সালে বায়ার কোম্পানির ল্যাবে সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে তৈরি হয়েছিল ক্লোরোকুইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাণরক্ষাকারী ওষুধ।

আজ বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে ম্যালেরিয়ার প্রতিরোধে আমরা যখন ‘R21’ বা ‘Mosquirix’-এর মতো উন্নত টিকার দেখা পাচ্ছি, তখনও কিন্ত ইতিহাসের পাতায় সিঙ্কোনা ও কুইনাইনের গুরুত্ব একইভাবে থেকেই গিয়েছে।

…………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী-র অন্যান্য লেখা

…………………….

Alphonse Laveran Cinchona Ebers Papyrus Malaria mosquito peru Quechua tribes Quinine Ronald Ross Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on