Robbar

মল্লিকার মল্লিকা নির্মাণ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 26, 2026 5:36 pm
  • Updated:March 26, 2026 5:42 pm  

মল্লিকা সেনগুপ্ত সেই ১৯৮০-র দশকের কবি, যে দশককে রাজনীতিকদের মতো জন্মবৃদ্ধ বাংলা কবিতার পুরুষেরা অগ্রাহ্য করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুনিয়া জুড়েই সে দশক মেয়েদের। ব্রিটেনের প্রথম নারী রাজকবি ক্যারল অ্যান ডাফি সেই দশকের। মার্কিন কবিতার দিক বদলে দেওয়া কবি এড্রিয়ান রিচ সেই দশকের। মল্লিকা সেনগুপ্ত অকালে প্রয়াত না হলে কী হত বলা মুশকিল। তবে একটা বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারি। কবির প্রথম বইয়ের জয়গান করা অর্থাৎ স্বভাব কবিতাকে সামনে রাখা বাংলা কবিতায় বিশিষ্ট নির্মাণের কিছু নবীনতর দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পেতাম তা বলাই যায়। 

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

বহুকাল আগে স্বপ্নে দেখেছিলাম, আমি একটা নোংরা পূতিগন্ধময় গ্রামীণ রেলস্টেশনে নেমেছি। অপেক্ষমাণ যাত্রী ও অন্যান্য মানুষ সকলেই পুরুষ। প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরলেই ধানখেত। সেখানে পরপর লেডিজ টয়লেট। স্বপনগামী একটা কবিতাও লিখেছিলাম সেই সময়, ২২ বছর আগে, নাম ছিল ফ্রয়েডীয় বিশ্লেষণের অপেক্ষায়।

এখন সময়ের দূরত্বে তাকে মনে হয়, আমার সেই সময়কার বাংলা বাজারের বদহজম! বাংলা কবিতা, এই দু’টি শব্দ শুনলে আমার মাথায় প্রথমেই যে-ছবিটা ফুটে ওঠে, সেখানে কেবলই পুরুষমানুষ। যে পুরুষ প্রতীকবাদ হয়ে পরাবাস্তববাদ অবধি ইউরোপের পুরুষ বুদ্ধিজীবীর অনুকরণে নেশা ও এক বিচিত্র দর্শনের যুগলবন্দি বাজিয়ে চলেছে। যা নতুন লিখতে আসা ছেলেদের (মেয়েদের নয়, কারণ আমাদের চেয়ে বেশি সংবেদী ছিল) মাথা খেয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, মেয়েদের লেখা ভীষণ মেয়েলি! তার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে দশকের অঙ্ক। জোড়-সংখ্যার দশক বিজোড় সংখ্যার দশকের তুলনায় দুর্বল। ১৯৫০-এর দশক ১৯৬০-এর চেয়ে বেশি জোরালো, ১৯৭০-এর দশক ’৮০-র চেয়ে বেশি ইত্যাদি। কিন্তু মজার ব্যাপার, ১৯৫০-এর দশকের কবি হওয়া প্রতিষ্ঠান-বিরোধী লিটল ম্যাগাজিনেও কবিতা সিংহের নাম শোনা যেত না সে-সময়। সেখানেও আমার স্বপ্নদৃশ্যের পুনরাবৃত্তি।

কবিতা সিংহ

প্রতিষ্ঠান যে কেবল কোনও সংস্থা নয়, বরং ভাষা ও তার নির্মিত সংস্কৃতির ধাঁচাও হতে পারে, সেটা খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যেত কলকাতায়। বরং সেখানে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান পিতৃতন্ত্রের আলাপ ও বিস্তার ঘটছে। অতি বিখ্যাত কবিরা কফিহাউসে বসে বোঝাচ্ছেন, মেয়েরা কেন কবিতা লিখতে পারবেন না! এই আবহে জীবনের প্রথম দশকের শেষাংশ ও দ্বিতীয় দশকের প্রথমাংশ কাটানো এই অধম তরুণ কবির স্বপ্ন যে পূতিগন্ধময় হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বহু পরে, গভীর ও নিবিড় পাঠজগতে প্রবেশ করার পরে, আবিষ্কার করলাম, আমাদের হিসেবে ১৯৪০-এর দশকের কবি, নোবেল লরিয়েট অক্তাভিও পাজ (Octavio Paz) নিজের সারা জীবনে লালন করেছেন অন্তত দু’জন অতি গুরুত্বপূর্ণ মহিলা কবিকে। তাঁদের একজন বাংলায় বেশ পরিচিত, আমাদের হিসেবে ৫০-এর দশকের কবি আলেখান্দ্রা পিসারনিক (Alejandra Pizarnik), অন্যজন তাঁরই সমসাময়িক ইদা বিতালে (Ida Vitale)। দু’জনেরই কবিতার বইয়ের ভূমিকা লিখে দিয়েছেন ততদিনে প্রতিষ্ঠিত কবি অক্তাভিও। আমাদের এখানে এমন ঘটনা সহজে চোখে পড়ে না। এই পাঠচর্চা, কবিতার পাঠ, কবিতা সংক্রান্ত জগতের পাঠ, আমার কবিতার ব্যক্তিগত মৌলবাদ, মনের গভীরে নিজে থেকে তৈরি করে দেয় এক শ্রেণি বিভাজন।

অক্তাভিও পাজ

সময়ের চেয়ে অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ হল ভাষা, সেই ভাষা নির্মাণে গদ্যের চেয়ে অপেক্ষাকৃত গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ হল কবিতা (মহৎ এমনটা নয়), আর সেই ভাষাকে পুনর্নব করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পিতৃতান্ত্রিক গঠনতন্ত্রকে আঘাত করা। তাকে হত্যা করা। লাতিন আমেরিকায় তথা দুই আমেরিকা মহাদেশে এই ভাষা নির্মাণের চাহিদা তাদের নিবিড় বৈশিষ্ট্য। উপনিবেশের সূত্রে পাওয়া ইউরোপীয় ভাষাদের ইউরোপ থেকে বের করে এনে নতুন দুনিয়ায় নতুন করে দেখা এবং সে ভূখণ্ডের আদি ভাষার কবিতার পুনরুত্থান (যা মোটের উপর ১৯৬০-এর দশক থেকে শুরু হয়েছে) তাঁদের সেই সুযোগও দিয়েছে। সে উত্থান এতদূর যে শ্বেতাঙ্গ অসমকামী পুরুষ কবিতায় বিরাট ছাপ ফেলবেন এমনটা ভাবা কঠিন হয়ে উঠছে। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে তার মূলগত রাজানুগত্যহীন চরিত্রকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে মূলত বর্ণহিন্দু নির্মিত রক্ষণশীল লিখিত ভাষায় (শুনে কেউ মারতে আসতে পারেন) পুরুষ চারিত্র্য ভেঙে দেওয়া কঠিন ও দুরূহ। বিশেষত কবিতায়। কবিতা সিংহ, গীতা চট্টোপাধ্যায়, দেবারতি মিত্রের হাতে সে কাজ শুরু হলেও প্রথমজনকে যে পরিমাণ অপমান সহ্য করতে হয়েছে, তার তুলনা প্রথম প্রজন্মের নারী ঔপন্যাসিকদের সঙ্গে তুলনীয়। সেই অবস্থানের প্রেক্ষিতে আটের দশকের কবি মল্লিকা সেনগুপ্তের রাস্তা হয়তো সামান্য হলেও সহজ ছিল। কিন্তু তিনি কেবল লিটল ম্যাগাজিনের ঘেরাটোপে নিজেকে আটকে রাখতে চাননি। ফলত তাঁর অসম ও বিষম প্রতিযোগিতা ছিল, তা না বললেও চলে। যে কবি শুরু করেছিলেন ‘এখানে চল্লিশ চাঁদ পুরুষের আয়ু, কাঁটা তার পেরোলেই/ ব্লটিং পেপার ভুখা…’ (চল্লিশ চাঁদের আয়ু), তিনি পরে বহু পরে লিখবেন ‘মনে কর যেন বিদেশ ঘুরে/ খোকাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে/ একলা মা আর একলা ছেলে/ ডাকাতগুলো দেখতে পেলে/ কী হবে বল বীরপুরুষ খোকা?/ তুই করবি যুদ্ধ, আর আমি রইব বোকা!/ স্পষ্ট বলছি তা হবে না আর/ তুই ওদের তির ছুঁড়লে আমিও দেব মার’ (বীরপুরুষের মা)। মল্লিকা শুধু প্রবন্ধে নয় কবিতাতেও প্রমাণ করলেন দু’টি পাঠ্যবস্তুর পাঠান্তরী বুনন (intertextuality)। বাংলা কবিতার ঔপনিবেশিক ঝুলনমায়ার মুখস্থ বুলি ‘মতাদর্শ সামনে রেখে কবিতা লেখা যায় না’-কে এ কবিতা খণ্ডন করবে। ‘কবিতা হল না’ বলে কেটে দেবে! কিন্তু মনে রাখা দরকার আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে মার্কিন কবিরা এলিয়টের গভীর খ্রিস্টান মতাদর্শকেই খুঁজে পেয়েছিলেন সে কবির দক্ষিণপন্থা এবং পৃথিবীর প্রায় দুঃস্বপ্নলোকচিত (Dystopian) উপস্থাপনার পিছনে। যেমনটাবা মার্কসবাদী মনন খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল নেরুদার প্রাক-ঔপনিবেশিক আমেরিকা আবিষ্কারের পিছনে। আরও পিছনে গেলে দেখা যাবে দুনিয়ার প্রায় সমস্ত সফল প্রাচীন লিরিক হয় প্রেম নয় পূজা পর্যায়ের। সেখানে গভীর ঈশ্বর বিশ্বাসের মতাদর্শই সেইসব কবিতা লিখিয়েছে। একুশ শতকের ঈশ্বর অবিশ্বাসী কবিতা জগতে আত্মপরিচয়, প্রধানত লিঙ্গ যৌনতা ও জাতি, এক প্রধান চালিকাশক্তি।

মল্লিকা সেনগুপ্ত

যেখানে মল্লিকা সেনগুপ্তের সমসাময়িক ভেনিজুয়েলার কবি মারিয়া আউক্সিলিয়াদোরা আলবারেস (María Auxiliadora Álvarez) লিখছেন–

আপনি কখনও প্রসব করেননি
আপনি চেনেন না কাটারির শান দেওয়া ধার
নদীর কিলবিলে সাপেদের
কখনও দেখেননি আপনি
আপনি কোনওদিন প্রিয় রক্তের থকথকে কাদায়
নাচেননি
ডাক্তার
এত গভীরে হাত ঢোকাবেন না
সেখানেই রেখেছি আমার সমস্ত দা কাটারি
সেখানেই ঘুমিয়ে আছে আমার শিশুকন্যা
আপনি কোনওদিন
সাপের পেটের মধ্যে একটা রাতও কাটাননি
আপনি নদী দেখেননি কখনও

মল্লিকা লিখলেন–

পুরুষের দেহে এক অতিরিক্ত অঙ্গ
যা অনন্ত শক্তিতে ন্যস্ত, পৃথিবীর মালিকানা।
মিস্টার ফ্রয়েডের মতে, এর অভাবে নারী নিকৃষ্ট।
অধস্তন হিসেবে সে পুরুষের পৌরুষকে ঈর্ষা করে।

আত্মপরিচয়ের কবিতা। যে পরিচয়ের এক প্রধান পথ শরীর। একুশ শতকের সমকামী পুরুষ ছাড়া নিজের শরীরকে পুরুষ তার আত্মপরিচয়ের অংশ করে তোলেননি কবিতায় (হয়তো বা আখ্যানেও)। কিন্তু নারী করেছেন। সে শরীর কামনার নয়। জৈবিক। পুরুষ হয়তো বা অচেতনভাবে নিজেকে তাঁর লিঙ্গের প্রতি পিতৃতন্ত্রের দাগিয়ে দেওয়া কাজ অর্থাৎ বহির্দুনিয়া অর্থাৎ ‘বিরাট কোনও প্রকল্প’ নিয়ে তিনি ব্যস্ত ও ন্যস্ত। নারী শুরু করছেন তাঁর নিজের শরীর থেকে। যাচ্ছেন এক প্রতিদুনিয়ায় যা পিতৃতন্ত্রের নির্মাণকে চ্যালেঞ্জ করে। মল্লিকা সেনগুপ্ত সেই চ্যালেঞ্জের কেতনবাহী। ‘যে গানে হিংসা আমি সেই গান লিখিনি/ শিকারি আমি তো শ্রেণীবিদ্বেষ শিখিনি’। অর্থাৎ আধুনিকতার দাগিয়ে দেওয়া আগমার্কা মার্কসবাদীদের শ্রেণীশত্রুর রক্ত নয়। মল্লিকা আরও আগে মার্কসকেই প্রশ্ন করেছিলেন– ‘শ্রেণীহীন রাষ্ট্রহীন আলো-পৃথিবীর সেই দেশে/ আপনি বলুন মার্কস, মেয়েরা কি বিপ্লবের সেবাদাসী হবে?’ মজা লাগে যখন এই পৃথিবীর যে কোনও রকমের বিপ্লবোত্তর সমাজে, এবং না-বিপ্লব সমাজে রাজনীতিবিদ মানে চশমা পরা বুড়ো পুরুষের মুখই মনে পড়ে! যে মুখের উপর সমস্ত পুরনো দরজা ভেঙে দিয়েছিলেন মল্লিকা সেনগুপ্ত। মেয়েদের অ আ ক খ হয়ে কথামানবী আমাদের স্পষ্টতর নতুন দিক দেখায়। যে দিক নারীবাদ এবং যার হাত ধরে এসেছে এই পৃথিবীর যৌনমুক্তি। 

মল্লিকা সেনগুপ্ত সেই ১৯৮০-র দশকের কবি, যে দশককে রাজনীতিকদের মতো জন্মবৃদ্ধ বাংলা কবিতার পুরুষেরা অগ্রাহ্য করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুনিয়া জুড়েই সে দশক মেয়েদের। ব্রিটেনের প্রথম নারী রাজকবি ক্যারল অ্যান ডাফি সেই দশকের। মার্কিন কবিতার দিক বদলে দেওয়া কবি এড্রিয়ান রিচ সেই দশকের। মল্লিকা সেনগুপ্ত অকালে প্রয়াত না হলে কী হত বলা মুশকিল। তবে একটা বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারি। কবির প্রথম বইয়ের জয়গান করা অর্থাৎ স্বভাব কবিতাকে সামনে রাখা বাংলা কবিতায় বিশিষ্ট নির্মাণের কিছু নবীনতর দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পেতাম তা বলাই যায়। 

তবে অকাল প্রয়াণের আক্ষেপ নয়, বরং তাঁর ‘কবিতা ও স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’ বইটির বিপুল প্রভাব, যা বিদ্যায়তনিক চর্চা পেরিয়ে আমাদের প্রত্যেকের ঘরে ঢুকে এসেছে তার প্রমাণ আমি নিজে। ‘স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’ না পড়লে আমাদের মতো সাধারণ ঘরে জন্মানো অনুন্নয়নের স্মৃতিবাহী পুরুষ-মস্তিষ্কে সহজে স্বাধীনতার মন্ত্র এবং মেয়েদের অপর দুনিয়া প্রবেশ করত না। তাঁর জন্মদিনে বরং স্মরণ করা যাক সেই কৃষ্ণনাগরিক মেয়েটিকে, যে অতি তরুণ বয়সে নির্মাণ করে ফেলেছিল একেবারে নিজস্ব একটি কবিতা-পৃথিবী, যা অজস্র মেয়েদের এবং কিছু ছেলেদের নিজস্ব চিন্তা গ্যালাক্সি নির্মাণে সাহায্য করেছে।