


গত তিন-চার বছরে তাঁর সঙ্গে মধ্যে মধ্যে দেখা হওয়ার সুযোগ হয়েছে তাঁর অন্যতম কর্মক্ষেত্র ‘National Council of Education’-এর সুবাদে। তিনিই কোনও কোনও অনুষ্ঠানে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, কোনও কাজের জন্য ডেকে নিতেন। এ বছরের শুরুতেই তাঁরই নির্দেশে ‘NCE’ আয়োজিত আমার আরেক শিক্ষক অধ্যাপক রমাপ্রসাদ দে’র একটি স্মারক বক্তৃতা আমাকে দিতে হয়েছিল। যোগাযোগ যথারীতি সতীদিই প্রথম করেন। কিন্তু নিজে অসুস্থ ছিলেন বলে আসতে পারেননি। তারপর তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, তাঁর শরীর একটু ভালো হলেই আমাকে একদিন বাড়িতে আসতে বলবেন। সেটা আর সম্ভব হল না।
তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক। ১৯৬২ সালে যখন আমি এমএ পড়ার জন্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলাম, খুব সম্ভবত সেই সময়েই তিনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসে যাদবপুরে অধ্যাপনায় যোগ দিয়েছেন। তবে আমরা যে-ক’জন পড়ুয়া সে বছর প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে যাদবপুরে এসেছিলাম, তাদের কাছে তাঁর আরেকটি পরিচয় ছিল। তা হচ্ছে প্রেসিডেন্সিতে আমাদের অন্যতম প্রিয় অধ্যাপক ভবতোষ চট্টোপাধ্যায়ের সূত্রে। ভবতোষবাবু আমাদের কিটস পড়াতে শুরু করার পরে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। আমরা যখন যাদবপুরে ঢুকলাম তখন তিনি ও সতীদি সবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন বা হতে যাচ্ছেন। সে খবর আমাদের কানে পৌঁছে গিয়েছিল।
তাঁরা যখন নতুন সংসার করছেন তখন একবার আমার রাঙাদাদু– অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ রায়ের সঙ্গে তাঁদের বাড়ি গিয়ে তাঁদের স্নেহ উপভোগ করার সৌভাগ্যও হয়েছিল। দেখেছিলাম আমার প্রেসিডেন্সির সহপাঠী মিহির ভট্টাচার্য, স্যরের আরেকজন ছাত্র, যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিল এবং সে সময়ে গুরুতর অসুস্থ– তার সব খবরই তাঁরা রাখেন এবং এই দুই ছাত্রছাত্রীর তারুণ্যের প্রতি তাঁরা দু’জনই সহানুভূতিশীল।

আমার মনে এঁদের দু’জনের নামই আবার কবি কিটস-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছে। তাঁদের মেয়ের জন্মের পরে সতীদিই একবার কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, ওর নাম রাখা হয়েছে ‘মনিতা’, কিটস-এর ‘Hyperion’ কাব্যটির ‘Moneta’-র অনুষঙ্গে। তবে সতীদির কাছে আমরা কিটস পড়িনি। পড়েছিলাম ওয়াল্টার স্কট-এর বিখ্যাত উপন্যাস ‘Heart of Midlothian’। এই উপন্যাসটি আমার খুবই প্রিয় এবং পরে এক সময়ে আমি নিজেও অধ্যাপক হিসাবে এটি পড়িয়েছি। তবে সতীদি আমাদের এই উপন্যাসটি পাঠ্যরূপে পড়িয়েছিলেন, না উনিশ শতকের প্রথমদিকের সাহিত্য-ইতিহাসের উদাহরণ হিসাবে– সেটা এতদিন বাদে ঠিক মনে পড়ছে না। সেমেস্টার-পূর্ব সেই অধ্যয়নের যুগে বেশ ক’টি ক্লাস জুড়ে বেশ রসিয়ে রসিয়ে উপন্যাসটি পড়া হয়েছিল, একথা মনে আছে।
সে সময়ে শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্তের নেতৃত্বে আমাদের বিভাগটি প্রসার লাভ করছিল। খুব সম্ভবত সতীদির প্রায় সমসময়েই এসেছিলেন অধ্যাপক ইন্দ্রাণী হালদার, আর তার কিছুটা পরে, অধ্যাপক যশোধরা বাগচী ও শীলা চৌধুরী (পরে লাহিড়ী চৌধুরী)। এই শেষ দু’জনের ক্লাস অবশ্য আমি করিনি, আমার তখন এমএ পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে।

কিন্তু এইসব নতুন অল্পবয়সি অধ্যাপকের উপস্থিতি আমাদের বিভাগটিকে বিশেষরকম জীবন্ত করে তুলেছিল। ১৯৬৪ সালে এমএ পাশ করার পর আমি নিজেও যখন এই বিভাগে অধ্যাপনায় যোগ দিলাম, তখন এইসব দিদিরই সাহায্য ও প্রশ্রয় পেয়েছিলাম নিজের বিষয়ে অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার কাজে আত্মবিশ্বাস সংগ্রহ করতে।
আমার আর সতীদির আগ্রহ যেহেতু ইংরেজি সাহিত্যের প্রায় একই কালপর্বকে কেন্দ্র করে ছিল, তাই মধ্যে মধ্যেই পাঠক্রম ভাগাভাগির সময়ে আমাকে নানা বিষয় পড়াতে তিনি উৎসাহ দিয়েছেন। কোলরিজের ‘Christabel’ কবিতাটি পড়ানোর ভার উত্তরাধিকার সূত্রে আমি তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। উনিশ শতকীয় ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়নে আমাদের বিভাগের অগ্রগতিতে তাঁর অবদান ছিল প্রচুর। আগ্রহ ছিল বিভাগীয় পত্রিকার সার্বিক উন্নয়নে।

ব্যক্তিগতভাবে বিশেষ করে মনে পড়ে, আমার কর্মজীবনের শেষ পর্বে আমি খুবই দুঃসাহসের সঙ্গে শেলির অসমাপ্ত মহাকাব্য ‘Triumph of Life’-এর বাংলা অনুবাদ করি, এবং তা নিয়ে বিভাগ থেকে আয়োজিত একটি ছোট সেমিনারে কিছু বলি। সতীদি তার অনেক আগেই অবসর নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর প্রসন্ন হাসিটি নিয়ে ওই সভায় তিনি এসেছিলেন এবং পুরনো ছাত্রীকে যথেষ্ট উৎসাহিত করেছিলেন।
তাঁর অমায়িক নিরভিমান ধরনে বিভাগের বাইরেও তিনি অনেক কাজ করতেন, যার হয়তো সবাই খোঁজও রাখতেন না। ‘‘All India Women’s Council’’-এর মতো একটি মস্ত বড় নারী সংগঠনের কাজে যে তিনি যুক্ত আছেন, তা আমি তখনই জানতে পারি, যখন তার একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। বয়স তাঁর এই উৎসাহ ও সক্রিয়তার ওপর কোনও প্রতিকূল প্রভাব ফেলতে পারেনি। সবসময়েই তাঁকে দেখেছি প্রফুল্ল ও মানুষের সঙ্গে সংযোগে আগ্রহী।

গত তিন-চার বছরে তাঁর সঙ্গে মধ্যে মধ্যে দেখা হওয়ার সুযোগ হয়েছে তাঁর অন্যতম কর্মক্ষেত্র ‘National Council of Education’-এর সুবাদে। তিনিই কোনও কোনও অনুষ্ঠানে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, কোনও কাজের জন্য ডেকে নিতেন। এ বছরের শুরুতেই তাঁরই নির্দেশে ‘NCE’ আয়োজিত আমার আরেক শিক্ষক অধ্যাপক রমাপ্রসাদ দে’র একটি স্মারক বক্তৃতা আমাকে দিতে হয়েছিল। যোগাযোগ যথারীতি সতীদিই প্রথম করেন। কিন্তু নিজে অসুস্থ ছিলেন বলে আসতে পারেননি। তারপর তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, তাঁর শরীর একটু ভালো হলেই আমাকে একদিন বাড়িতে আসতে বলবেন। সেটা আর সম্ভব হল না। তাই আজ স্মৃতিতেই তাঁকে আমার প্রণাম জানাই।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved