memory of kanika bandyopadhyay by his younger sister | Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

আমার দিদি কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

সমরেশ বসুকে নিয়ে দিদি আর বীরেনদা একদিন দুপুরে হাজির। সেখানেই খাওয়াদাওয়া হল। সকলেই খুব খুশি। দ্বিজেনদা তো কতবার বউদিকে নিয়ে এসেছেন। দিদির নীচুবাংলার বাড়িতে সমরেশদা, সন্তোষকুমার ঘোষ, অবধূত, নরেন্দ্রনাথ মিত্র– কে না এসে থেকেছেন! জর্জদা তো খুবই আসতেন। জর্জদার সঙ্গে তো একবার একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। দিদিকে না জানিয়ে এসেছেন, দিদি বলেছে, ‘যেমন না জানিয়ে এসেছ, আমার এখানে থাকা হবে না’। জর্জদা করেছেন কী, বাইরে জামতলায় গিয়ে বসে পড়েছেন, সেখানেই থাকবেন। আর দিদি জানলা দিয়ে সব ব্যাপারস্যাপার দেখে গিয়ে বলছেন, ‘অনেক হয়েছে! এখুনি ভেতরে এসো। এখানেই থাকবে তুমি!’

Published by: Robbar Digital

Posted:April 5, 2026 4:02 pm | Updated:April 6, 2026 10:48 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

দিদির সঙ্গে আমার প্রথম স্মৃতি বলতে মনে পড়ে দিদির বিয়ের কথা। আমার বয়স তখন সাড়ে তিন বছর। তবুও অল্প অল্প ছেঁড়া ছেঁড়া স্মৃতির মতো মনে আছে। বিয়ের দিন। দিদি গোঁসাইজির বাড়ির পিছনের উঠোনে পানপাতা হাতে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। অরুন্ধতীদি একখানা প্রদীপ হাতে নিয়ে দিদির পাশে পাশে চলেছে। সুন্দর দিদা ও গোঁসাইজির বাড়ির মাঝখানে বিয়ের আসর। অনেক রাত্রে আমায় কে যেন গরাস করে খাইয়ে দিচ্ছে। বড় হয়ে দিদির কাছে বিয়ের গল্প শুনেছি। কিন্তু এই সকল টুকরো দৃশ্যই আমার নিজের স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে।

zoom
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম হওয়া থেকেই আমাদের পরিবার শান্তিনিকেতনে। বাবা এসেছেন আরও পরে। কিন্তু তার আগেই মায়ের জ্যাঠামশাই রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এসেছিলেন, ব্রহ্মচর্যাশ্রমের শিক্ষক এবং দফতরের ম্যানেজার হিসেবে। তারপর গুরুদেবের ইচ্ছেয় আমাদের পরিবারের অনেককেই ছাত্র হিসেবে তিনি শান্তিনিকেতনে নিয়ে এসেছিলেন। বিষ্ণুপুর সংলগ্ন চুয়ামসিনা গ্রামে মায়ের বাস ছিল। শুনেছি, ছোটবেলাতেই দিদি চমৎকার গান গাইত। সোনামুখীর মনোহরতলায় দিদি যখন হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাচত আর গাইত– তখন নাকি সকলে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকত। চুয়ামসিনায় শ্রীধরের মন্দিরে গানবাজনার আসর বসত। সেই আসরেও দিদি গান গাইত। আমার মেজদি, ছোড়দিরা নাচত। এসবই শোনা কথা। আমি ছিলাম আট ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। আর দিদি সবার বড়। আমাদের ভাইবোনেরা এবং গোঁসাইজির দুই মেয়ে আলো, ছায়া– একইসঙ্গে মানুষ হয়েছিলাম। সকলকেই দিদি খুব ভালোবাসত। এবং আমরাও দিদির কথা মেনে চলতাম। মা-বাবার মৃত্যুর পর দিদি এবং বীরেনদাই আমাদের মা-বাবা হয়ে উঠেছিলেন। 

zoom
বীরেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

বাবা যখন গুরুপল্লীতে বাড়ি পেলেন, তখন দিদিদের নিয়ে চলে এসেছিলেন। খুব সুন্দর বড় খড়ের বাড়ি। গরমে ঠান্ডা, শীতে গরম। একতলা। পিছনে বড় সিমেন্ট বাঁধানো বারান্দা, সামনেও তাই। বিরাট বড় বড় দু’-খানা পাশাপাশি ঘর আর বাঁ-দিক থেকে দু’পাশে মাঝারি দুটো ঘর। ডান পাশে আলাদা আর একটা বাড়ি। রান্নাঘর আর ভাঁড়ার ঘর। সেখানেও বড় বারান্দা। খানিকটা দূরে কলঘর। মাঝে বিরাট উঠোন। উঠোনের এক ধারে নিজেদের তৈরি গোয়ালঘর। তাল, খেজুর, পেয়ারা, বেল, কাঁঠাল গাছে ভর্তি বাগান। অনাড়ম্বর, অথচ সুখ-শান্তি-আনন্দের অভাব ছিল না! শুনেছি, শান্তিনিকেতনে এসে দিদি নাকি প্রজাপতির মতো ঘুরে ঘুরে বেড়াত আর পাখির মতো গান গাইত। তখন থেকেই দিদি গুরুদেবের সাহচর্য পেয়েছে। একদিন শ্যামলীতে আম কুড়োতে গিয়ে গুরুদেবের নজরে পড়ে। সে গল্প সকলেরই জানা। তারপর থেকে বড়দের দলে দিদির ডাক পড়ত– গান শেখার জন্য, অভিনয় করার জন্য। অমিতাদির লেখায় পড়েছি, বনমালীকে দিয়ে গুরুদেব দিদিকে ডেকে পাঠাতেন, আর দিদি মাঠ পেরিয়ে ছুটে ছুটে যেত গান শেখার জন্য।

zoom
শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

আমার জন্মের আগে থেকেই দিদি সকলের পরিচিত। ‘বিখ্যাত’ যাকে বলে। ততদিনে দিদির প্রথম রেকর্ড বের হয়ে গিয়েছে। ‘কণিকা মুখোপাধ্যায়’ নামে। তখনও ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ হননি। শান্তিনিকেতনে তখন দিদিকে সকলে ‘মোহর’ নামে এক ডাকে চেনে। অনেকে ভাবেন, ‘মোহর’ নামটা গুরুদেবের দেওয়া। তা কিন্তু সঠিক নয়। মায়ের কাছে শুনেছি, আমাদের এক দিদি ছিল, ‘গিনি’ নামে। আমাদের বাড়িতে প্রত্যেকের নামই নানা অলংকারের নামে। মায়ের নাম ‘সোনা’, দিদির নাম ‘মোহর’, ছোড়দার ‘পান্নালাল’। আর তার মেয়েদের নাম পলা, মুক্তা, রূপা। মেজদার ছেলের নাম হীরক। আমার আর ঝর্ণাদির নাম রুনু-ঝুনু, অলংকারের শব্দ।

zoom
রবীন্দ্রসংগীতের প্রথম রেকর্ড, শিল্পীনাম: কণিকা মুখোপাধ্যায়

সকলের ছোট হওয়ায় দিদির ভালোবাসা আমি বরাবরই একটু বেশি পেয়েছি। ছোটবেলা থেকেই সকলে আমাকে ডাকত ‘ছোট্ট মোহর’। আমিও নিজেকে তাই ভাবতাম। দিদির মুখে শুনেছি, কেউ আমাকে নাম জিজ্ঞেস করলেই, আমি নাকি বলতাম– ‘আমার নাম কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়’। দিদির মতো করে কালি দিয়ে গালে কালো তিল বসাতাম। ‘কণিকা’-র সঙ্গে মিলিয়েই আমার নাম রাখা হয়েছিল ‘বীথিকা’।  

দিদি এমন অপূর্ব সুন্দরী ছিল! তার এককণাও আমরা কেউ পাইনি। আমরা ভাইবোনেরা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম, আর সাজ নকল করার চেষ্টা করতাম। মাথায় ছোট্ট করে আটকানো চুলে– হয় ফুলের মালা, না হয় ফুল; চোখে কাজল; নিজের নকশা করা গয়না; নতুন রকমের শাড়ি। আর ঠোঁটের ডগায় থাকত একরকম মোনালিসার মতো হাসি। অসাধারণ রূপসী! পরিচর্যাও করত দিদি। একেকদিন সকালে দেখতাম, মুসুরির ডালবাটা মুখে মেখে বসে আছে। কখনও-বা বাটা হলুদ। সেজন্যই বোধহয় শেষ দিন পর্যন্ত দিদির মুখ এত সুন্দর ছিল। বয়সের দাগ শরীর স্পর্শ করলেও, মুখের সৌন্দর্যে অম্লান ছিল।

১৯৪১ সালে মাধ্যমিক পাশ করেই সংগীত ভবনে কাজে যোগ দিয়েছিল দিদি। দীর্ঘদিন ধরে সংগীত ভবনের অধ্যাপিকা। শেষের দিকে অধ্যক্ষা এবং বিভাগীয় প্রধান। কত ছাত্রছাত্রী যে দিদির কাছে শিখেছে! আর দিদি তাদের সবার প্রিয় ‘মোহরদি’। একসময়ে আমিও সংগীত ভবনে দিদির ছাত্রী ছিলাম। তার আগে, ছোড়দি, মেজদি আর দাদাও সংগীত ভবনে গান শিখেছে। মেজদি গানের পাশাপাশি সেতার বাজাতেন, ছোড়দি নাচ। দিদির সঙ্গে ওরা পাটনা, হাজারিবাগ কত জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে অনুষ্ঠান করার জন্য। শৈলজারঞ্জন মজুমদার– ‘শৈলদা’ ওদের নিয়ে যেতেন। 

zoom
শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সঙ্গে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

বড়বেলায় দিদির গুরু ছিলেন শৈলজারঞ্জন মজুমদার এবং শান্তিদেব ঘোষ। এছাড়া হেমেন্দ্রলাল রায়, ওস্তাদজি, চিঞ্চোরেজি, অশেষদা, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, কালীপ্রসন্ন মজুমদার, কমল দাশগুপ্ত, হরেন চট্টোপাধ্যায় এমন অনেকের কাছেই সংগীতের তালিম নিয়েছিল দিদি। তাছাড়া স্বয়ং গুরুদেবের কাছে থেকেই বেশ কিছু গান শিখেছিল। গান সম্বন্ধে ওর কোনও গোঁড়ামি ছিল না। ভালো গান ভালোবাসত। রবীন্দ্রসংগীত ছাড়াও ভজন, অতুলপ্রসাদী, নজরুলগীতি, কীর্তন এমনকী, আধুনিক গানও রেকর্ড করেছিল। দিদির শেষ রেকর্ড ‘দুষ্প্রাপ্য মোহর’– সেখানে রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া সবরকম গানই রয়েছে।

দিদি যখন সংগীত ভবনের ছাত্রী ছিল তখন আমি জন্মাইনি। আমি ওকে দেখেছি সংগীত ভবনের শিক্ষিকা হিসেবে। বাড়িতেও, আমাদের প্রত্যেককে নিয়ে গান শেখাতে বসত। কিন্তু আশ্চর্য লাগে, আমি কখনও দিদিকে রেওয়াজ করতে দেখিনি। বিয়ের পর বীরেনদা আর দিদি চিনা ভবনে রিসার্চ স্কলারদের ব্লকে ঘর নিয়ে থাকতেন। সেখানে রেওয়াজ করত কি না, জানি না। কিন্তু আমার মনে হয়, শেখাতে শেখাতেই দিদির প্রাত্যহিক রেওয়াজ হয়ে যেত। না-হলে অমন সুরেলা গলা হয় কী করে! সকলে বলত, দিদির গলা নাকি এসরাজের সুরের মতো। একটুও নড়ে না! দিদির গানই জীবনে প্রথম কানের মধ্যে নিয়েছি। ওই গলা, ওইভাবে সুর লাগানো, উচ্চারণ করা, ভাবের প্রকাশ এমনভাবে কানের ভেতর দিয়ে হৃদয় অবধি পৌঁছে গিয়েছে যে, তার থেকে আর বেরতে পারিনি। গুরুপল্লীর খড়ের বাড়ির বারান্দায় যখন গ্রামোফোনে দিদির গান বাজানো হত, আমরা ভাইবোনেরা মিলে বসে শুনতাম। তখনই সব গান আমাদের মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।

zoom
আলোকচিত্র ঋণ: কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় মেমোরিয়াল ট্রাস্ট

১৩ বছর বয়সে দিদি যখন প্রথম আধুনিক গানের রেকর্ড বের করে, শুনেছি, গুরুদেব তাতে খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন। তারপরই তিনি পরপর হিন্দুস্থান গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে দিদির তিন-চারখানা রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড প্রকাশ করেন। দিদির মুখেই গল্প শুনেছি, গুরুদেবের সঙ্গে দিদি প্রথম গান গাইতে গিয়েছিল ছায়া সিনেমাহলে। গুরুদেব ডেকচেয়ারে বসেছিলেন, আর দিদি তাঁর চেয়ারের হাতল ধরে গান গাইছিল। হঠাৎ গুরুদেবও দিদির সঙ্গে গলা মেলাতে শুরু করেন। এত কাছ থেকে ওঁকে পাওয়া, অথচ দিদির সঙ্গে তাঁর একটি ছবিও নেই। কত গান তিনি দিদিকে হাতে লিখে দিয়েছিলেন। সেসবও দিদি গুরুত্ব না-বুঝে অন্যদের অবলীলায় দিয়ে দিয়েছে। তা নিয়ে পরে অনুশোচনাও করেছে। কিন্তু আমার মনে হয়, দিদি কিছুই হারায়নি। আসলে গুরুদেবের গানকে দিদি লেখায় নয়, সমস্ত শরীরে, মনে গ্রহণ করেছিল। সেটা আমৃত্যু দিদির সঙ্গেই থেকে গিয়েছিল।

ছেলেবেলার স্মৃতির কথা ভাবলে, দিদির বন্ধুদের কথাও খুব মনে পড়ে। সুচিত্রাদি, টুটুদি, অরুন্ধতীদি, অনুদি, রেনুকাদি– কত বন্ধু ছিল দিদির। রবীন্দ্রলাল রায়ের মেয়ে মালবিকা কানন। ওঁরা তখন আমাদের পাড়ায় থাকতেন। দিদি আর মালবিকাদি খুব বন্ধু ছিলেন। ওরা একসঙ্গে মনোতোষ রায়ের কাছে ব্যায়াম শিখত। সাইকেল চালাত। তখন তো শান্তিনিকেতন এখনকার মতো ছিল না। সকলেই ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতে পারত। কলাভবনের সামনে খেলাধুলো করেছি কত, আবার সারা আশ্রম চত্বর জুড়ে ফুল কুড়িয়েছি। মেজদির বন্ধু নীলিমা সেনও খুব আসতেন আমাদের বাড়ি। সুচিত্রাদি আর অরুন্ধতীদি যেমন সুন্দরী ছিলেন, তেমন ভালো গান গাইতেন। পরে অরুন্ধতীদি অভিনয়ে গেলেন, দিদি আর সুচিত্রাদি সংগীতে। আমার কিন্তু মনে হয়, ওঁরা দু’জন অভিনয় করলেও দারুণ নাম করতেন। আবার অরুন্ধতীদি যদি শুধু গান গাইতেন তাহলেও বিখ্যাত হতেন। আমার মনে আছে, ‘বিসর্জন’ নাটকে মহিষীর চরিত্রে অপূর্ব অভিনয় করেছিল দিদি। সংগীত ভবনে একবার ‘শেষরফা’ নাটক হয়েছিল, সেখানেও দিদির অভিনয় দেখে সকলে মুগ্ধ হয়েছিল। কেউ কেউ তো দিদিকে কানন দেবীর সঙ্গে অবধি তুলনা করেছিল। 

zoom
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুচিত্রা মিত্র

দিদির আরেকজন বন্ধু ছিলেন, সেবাদি। তিনি ছিলেন নৃত্যশিল্পী। মনে আছে, সেবাদি একবার চিত্রাঙ্গদা সেজে নাচ করেছিলেন আর দিদি গেয়েছিল গান। সেই অপূর্ব যুগলবন্দি এখনও আমার স্মৃতিতে অক্ষয়। ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘শাপমোচন’-এ দিদির গান সামনাসামনি শোনার সৌভাগ্য হয়েছে– এ আমার বিরাট প্রাপ্তি। আর একবার কলকাতার কোনও একটা অনুষ্ঠানে, সম্ভবত বঙ্গ সংস্কৃতি উৎসবে, দিদি ও জর্জদা একসঙ্গে গান গেয়েছিল। সঙ্গে নাচ করেছিলেন মঞ্জুশ্রী চাকী, আমরা বলতাম ‘মঞ্জুদি’। সেই অনুষ্ঠানটাও আমৃত্যু আমার স্মৃতিতে থাকবে।

zoom
আলোকচিত্র ঋণ: কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় মেমোরিয়াল ট্রাস্ট

ছোটবেলা থেকেই দিদির সুবাদে বহু জ্ঞানীগুণী মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি। খুব মজা হত, দিদি যখন কলকাতায় রেডিয়োতে গান গাইতে যেত, আমায় সঙ্গে করে নিয়ে যেত। আমি দিদির এসকর্ট হিসেবে সই করতাম। সেসব কবেকার কথা। দিদি সংগীত-শিল্পী, বীরেনদা সাহিত্যিক। ফলে ওঁদের জন্য কত মানুষ যে আমাদের বাড়ি আসতেন!

zoom
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, শান্তিদেব ঘোষ এবং সুচিত্রা মিত্র

সমরেশ বসুকে নিয়ে দিদি আর বীরেনদা একদিন দুপুরে হাজির। সেখানেই খাওয়াদাওয়া হল। সকলেই খুব খুশি। দ্বিজেনদা তো কতবার বউদিকে নিয়ে এসেছেন। দিদির নীচুবাংলার বাড়িতে সমরেশদা, সন্তোষকুমার ঘোষ, অবধূত, নরেন্দ্রনাথ মিত্র– কে না এসে থেকেছেন! জর্জদা তো খুবই আসতেন। জর্জদার সঙ্গে তো একবার একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। দিদিকে না জানিয়ে এসেছেন, দিদি বলেছে, ‘যেমন না জানিয়ে এসেছ, আমার এখানে থাকা হবে না’। জর্জদা করেছেন কী, বাইরে জামতলায় গিয়ে বসে পড়েছেন, সেখানেই থাকবেন। আর দিদি জানলা দিয়ে সব ব্যাপারস্যাপার দেখে গিয়ে বলছেন, ‘অনেক হয়েছে! এখুনি ভেতরে এসো। এখানেই থাকবে তুমি!’

zoom
দেবব্রত বিশ্বাস ও কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

খুবই আনন্দের ছিল সেইসব দিন। ‘সিম্পল লিভিং, হাই থিঙ্কিং’– এই কথাটায় আমরা খুবই বিশ্বাস করতাম। দিদি যখন গানের জগতে আস্তে আস্তে নাম করতে শুরু করল, তখন শ্রোতাদের মুখে তিনটে নাম খুব শুনতাম– হেমন্ত-সুচিত্রা-কণিকা। একের পর এক রেকর্ড বের হচ্ছে তখন। বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে শ্রোতারা শুনে ফেলছেন। কলকাতায় কত জলসা, নৃত্যনাট্য, গীতিনাট্য। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর দিদির ‘শ্যামা’র গান শুনে লোকে পাগল। মঞ্চে যে কতবার ‘শ্যামা’ অভিনীত হল! হেমন্ত ‘বজ্রসেন’, চিন্ময় ‘উত্তীয়’ আর দিদি ‘শ্যামা’। গানের সঙ্গে যে এমন অভিনয় করা যায়, তা না-শুনলে বিশ্বাস হত না। ভারতের নানা জায়গায় ওঁদের ডাক পড়তে লাগল। রেডিওতেও হল। আর ছিল গ্রামোফোন কোম্পানি। গ্রামোফোন কোম্পানির মালিক সাহেব আমাকে খুব ভালোবাসতেন। সেখানে সামনে বসে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, গায়ত্রী বসু, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাবিত্রী ঘোষ প্রমুখদের গান শুনেছি। দিদি সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিত। একবার দিদির সঙ্গে লেকপ্লেসে বনানী ঘোষের বাড়িতে উঠেছিলাম। বনানীদির ছোটবোন বনশ্রী, আমি বলতাম ‘বুলবুলদি’, আমার খুব বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। খুবই আনন্দ হয়েছিল সেইবার।

zoom
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

দিদি আমাকে একবার ব্রোকেটের জামা বানিয়ে দিয়েছিল। জামাটা এত সুন্দর ছিল যে, শান্তিনিকেতনে সবাই আমার দেখে একটা করে জামা বানিয়ে ফেলেছিল। দিদি তখন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাছে ভজন শিখতে যেত। একবার আমাকেও সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছে। মনে আছে, সেইবার দিদির সঙ্গে আমিও একটি গান শিখেছিলাম। নিজে যেমন গাইতে ভালোবাসত, গান শেখাতেও ভালোবাসত। নতুন কিছু শিখে তা শিখিয়ে দিয়েই যেন প্রকৃত আনন্দ পেত। খুব সরল মানুষ ছিল তো। তার খেসারতও দিতে হয়েছে বহুবার। কেউ যখন দিদির প্রশংসা করতেন, দিদি চিরকাল বলত, আমার আর কৃতিত্ব কোথায়! গুরুদেব কথা লিখেছেন, সুর দিয়েছেন। আমি তো শুধু গেয়েছি। ঈশ্বরের আশীর্বাদ রয়েছে, তাই লোকে আমার গান ভালোবাসে।

zoom
আকাশবাণীতে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন, ১৯৫৩

দিদি খুবই চাইতেন, আমি গান গাই। এমএ পাস করার পর, দিদির উৎসাহেই সংগীত ভবনে ভর্তি হয়েছিলাম। চার বছরের ডিগ্রি কোর্স। দিদির কাছে নিয়মানুসারে গান শেখা শুরু হল। সেটা ছিল ডিগ্রি কোর্সের প্রথম ব্যাচ। সংগীত ভবনের তখন স্বর্ণযুগ। দিদি আর শান্তিদা শেখাতেন রবীন্দ্রসংগীত। নিমাইচাঁদ বড়াল ধ্রুপদ, আর ওয়াজেল ওয়ার হিন্দুস্থানি সংগীত। দিদির কাছে গান শেখা যে কী আনন্দের– ‘পিপাসিত রে’, ‘শরৎ আলোর কমল বনে’ এমন বহু গান, কত নজরুলগীতি, অতুপ্রসাদী, দ্বিজেন্দ্রগীতি দিদি শিখিয়েছিল। দিদির ক্লাস করার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকতাম। দু’-বছর শেষ হলে, পার্ট ওয়ান পরীক্ষা দেওয়ার পর, দিদির কথাতেই মেন সাবজেক্ট ‘ক্ল্যাসিকাল’ নিয়েছিলাম। দিদির বক্তব্য ছিল, দিদি আর শান্তিদার কাছে ছোট থেকেই শিখেছি, কিন্তু ধ্রুবতারা যোশীর কাছে গান শেখার সৌভাগ্য আর হবে না। তাছাড়া দিদি মনে করত, ক্ল্যাসিকাল জানলে রবীন্দ্রসংগীত আরও ভালো করে শেখা যায়। 

zoom
শান্তিনিকেতনের একটি গ্রুপ ফটোতে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, মায়া সেন, গীতা ঘটক ও অন্যান্যরা

আরেকজন আশ্চর্য মানুষ ছিলেন বীরেনদা। এত রসিক মানুষ আমি কখনও দেখিনি। যে কোনও ব্যাপারে তাঁর উত্তর থাকত জিভের ডগায়। আমরা সব ভাইবোন বীরেনদাকে যেমন ভয় পেতাম, তেমনই ভালোবাসতাম। বীরেনদা এমনিতে বেশ রাগী ছিলেন। তর্ক একেবারে সহ্য করতে পারতেন না। দিদির সঙ্গেও প্রায়ই খুব মজার ঝগড়া হত। আমি দেখেছি, বীরেনদা দিদির গান টেপে চালিয়ে লেখাপড়ার কাজ করতেন। নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন মানুষটা। গানের কদর দিতে চাইতেন। হয়তো নিঃসন্তান ছিলেন বলেই আমাদের সন্তানস্নেহে মানুষ করেছিলেন দু’জনে।

zoom
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে লেখিকার পুত্র

এই সমস্ত স্মৃতিই যখন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়, তখন দুটো মানুষই অনেক দূরে। বিশেষত দিদি। ওকে খুবই মনে পড়ে আমার। অথচ দুর্ভাগ্য, আর কোনওভাবেই আমার ভালোবাসার হাত, শ্রদ্ধার হাত, আমার ব্যাকুলতার হাত দিদি অবধি পৌঁছতে পারবে না। ২০০০ সালের ৫ এপ্রিল চলে গিয়েছিল। মনে আছে, চলে যাওয়ার আগে, দিদির খুব প্রিয় একখানা গান বারবার শুনতে চেয়েছিল। ‘শোনাব শোনাব’ বলে আর শোনানো হয়নি। এখন সেই গানখানাই আমার গান হয়ে দাঁড়িয়েছে–

আমার ক্ষুধিত তৃষিত তাপিত চিত, নাথ হে, ফিরে এসো।
ওহে নিষ্ঠুর, ফিরে এসো,
আমার করুণকোমল এসো,
আমার সজলজলদস্নিগ্ধকান্ত সুন্দর ফিরে এসো। ফিরে এসো।

Debabrata Biswas Hemanta Mukhopadhyay Kanika Bandyopadhyay Rabindra Sangeet Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shantideb Ghosh Suchitra Mitra visva bharati

Share this article on