nazi camps inspired satyajit ray to create cruel scientists | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নাৎসি ছাঁচে গড়া সত্যজিতের খল বিজ্ঞানীরা

‘ফ্রিৎস’ নামে সেই গল্পটা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭২ সালের ‘সন্দেশ’ পত্রিকার হেমন্ত সংখ্যায়। পরে এই গল্পেরই স্বকৃত ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য পেঙ্গুইন রে লাইব্রেরি’ থেকে প্রকাশিত ‘থ্রি রেস’ নামক বিরাট সংকলনে। প্রকাশের ৫৪ বছর পরেও গল্পটি এখনও একই রকম আকর্ষণীয়, একই রকম জনপ্রিয়। তাই এই গল্পটি এতদিনে কালোত্তীর্ণ ক্লাসিকের মর্যাদা লাভ করেছে। ‘ফ্রিৎস’ গল্পটা পড়লেও মনে পড়ে যায় নাৎসি ক্যাম্পের ডক্টর ফ্রিৎস ফিশারের কথা।

শেষ আপডেট: মে ২, ২০২৬, ১৭:৩০   
Facebook WhatsApp Messenger

সত্যজিৎ রায়ের সমগ্র কল্পবিজ্ঞানে বহু ক্রূর ও নিষ্ঠুর বিজ্ঞানীর দেখা পাই আমরা। তাই একটা সংশয় বারবার আমাদের মনের মধ্যে জেগে ওঠে। বাস্তব জগতের বিজ্ঞানীরা কি এতটা নির্মম হন? হতে পারেন? 

এতজন নির্দয় বিজ্ঞানীকে সত্যজিৎ কোথায় খুঁজে পেলেন? কী করে জানলেন ক্রূর গবেষকদের মানসিকতা কেমন হয়? 

ড. জোসেফ মেঙ্গেলে– এই বিজ্ঞানী ও ডাক্তার-বাবুর নাম শুনলে, একসময় মানুষের হাড় হিম হয়ে যেত। মানব সভ্যতার ইতিহাসে অন্ধকার অধ্যায় থেকে বিভীষিকাময় এই নামটা মুছে ফেলা খানিকটা অসম্ভব। কেন? 

zoom
আউশউইৎজ ডেথ ক্যাম্পের কম্যান্ডার রিচার্ড বের, জোসেফ মেঙ্গেলে এবং রুডলফ হোস, ১৯৪৪

ড. জোসেফ মেঙ্গেলে ১৯৪৩-৪৫ সালে হলোকাস্টের সময়, বিশেষ করে আউশভিৎজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দিদের উপর নিষ্ঠুর চিকিৎসা-পরীক্ষা চালাতেন। মানবদেহে বিভিন্ন জটিল রোগ, এমনকী ক্যান্সারের কোষ প্রবেশ করিয়ে শরীরের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতেন। এই পরীক্ষাগুলো কোনও চিকিৎসার উদ্দেশ্যে তিনি করতেন না। এগুলো মূলত ছিল তাঁর নিষ্ঠুর কৌতূহল ও বিকৃত বৈজ্ঞানিক আগ্রহের ফল। এই কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে বলা হত ‘এঞ্জেল অফ ডেথ’ বা ‘মৃত্যুর দূত’। 

ক্যাম্পে আগত অসহায় ইহুদি বন্দিরা– যাদের মধ্যে ছিল নারী, শিশু, যমজ ভাইবোনদের তিনি বাছাই করতেন নির্মম জিনগত পরীক্ষার জন্য। তাদের শরীরে ইনজেকশন দেওয়া হত, কোষে-কোষে ব্যথা বাড়ত, মারাত্মক জ্বর হত, শরীর ভেঙে পড়ত– তখন চিকিৎসা দেওয়ার বদলে তাদের কষ্টকেই পর্যবেক্ষণ করতেন ড. মেঙ্গেলে। 

ওই একই সময়ে, রাভেন্সব্রুক নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে, ড. ফ্রিৎস আর্নস্ট ফিশার বন্দিদের দেহে মারাত্মক রোগ বহনকারী ব্যাকটেরিয়া ইনজেক্ট করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন। তিনি একজন চিকিৎসকের পরিচয় বহন করলেও, তাঁর কাজ ছিল মানবতার সম্পূর্ণ বিপরীত। 

zoom
ড. ফ্রিৎস আর্নস্ট ফিশার

পরীক্ষাগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা করা। কিন্তু সেই গবেষণার পদ্ধতি ছিল ভয়ংকর। সুস্থ বন্দিদের শরীরে প্রথমে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষত তৈরি করতেন, তারপর সেই ক্ষতে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করিয়ে সংক্রমণ ঘটানো হত। এতে শরীর ফুলে উঠত, অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হত, জ্বর ও পচন ছড়িয়ে পড়ত ক্রমে সারা দেহে।

তখন ড. ফিশার দেখতেন সংক্রমণ কীভাবে বাড়ে এবং বিভিন্ন ওষুধ কাজ করে কি না। কিন্তু বন্দিদের কষ্ট লাঘবের কোনও আন্তরিক চেষ্টা তিনি করতেন না– তাদের যন্ত্রণা ছিল শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণের বিষয়।

উপরোক্ত ডক্টর মেঙ্গেলে বা ডক্টর ফিশার কী জাতীয় মানসিক রোগে ভুগছিলেন? সেই মানসিক রোগের নাম কী? নাৎসি দর্শনের চাপে অথবা প্রেরণায় কি ওই দুই চিকিৎসকের মধ্যে এই মানসিক ব্যাধির জন্ম হয়েছিল? না কি, যে কোনও মানুষের মনে, যে কোনও যুগে, এইরকম ব্যাধির জন্ম হতে পারে? স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নগুলো আমাদের মনে আসতে পারে। 

zoom
চিকিৎসারত ‘এঞ্জেল অফ ডেথ’ জোসেফ মেঙ্গেলে

জোসেফ মেঙ্গেলে ও ফ্রিৎস আর্নস্ট ফিশারের মতো নাৎসি চিকিৎসকদের মানসিক অবস্থাকে আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’ ও চরম ‘নার্সিসিস্টিক বৈশিষ্ট্য’-সম্পন্ন বলা যেতে পারে। তবে ইতিহাসবিদ ও মনোবিশ্লেষকেরা মনে করেন, তাঁদের আচরণে কিছু বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট ছিল– যেমন গভীর নিষ্ঠুরতা, সহানুভূতির অভাব এবং অন্য মানুষের কষ্টকে তুচ্ছ করে দেখার প্রবণতা। যদিও ব্যক্তিগত মানসিক গঠন দিয়ে এই নিষ্ঠুরতাকে ব্যাখ্যা করলে পুরো সত্য ধরা পড়ে না। নাৎসি দর্শন, বর্ণবাদী মতাদর্শ এবং রাষ্ট্রের অমানবিক চাপ– এই সব মিলেই তাঁদের মধ্যে এমন নিষ্ঠুরতার বিকাশ ঘটাতে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। ‘বৈজ্ঞানিক’ কার্যকলাপের নামে মানুষকে অমানুষ হিসেবে দেখার যে শিক্ষা তাঁরা পেয়েছিলেন, সেটিই তাঁদের বিবেককে ধীরে ধীরে নিস্তেজ করে দিয়েছিল সম্ভবত।

তবে সত্য হল, এই ধরনের মানসিক প্রবণতা কেবল কোনও বিশেষ সময় বা নির্দিষ্ট জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ক্ষমতা, অন্ধ আনুগত্য এবং মানবিকতার অভাব একত্রে হলে, যে কোনও সময়ে, যে কোনও সমাজে, সাধারণ মানুষও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। 

zoom
‘প্রোফেসর শঙ্কু ও আশ্চর্য পুতুল’, অলংকরণ: সত্যজিৎ রায়

‘প্রোফেসর শঙ্কু ও আশ্চর্য পুতুল’ নামে সত্যজিৎ রায়ের একটি জনপ্রিয় ছোটগল্পে আমরা এমন এক চরিত্রের সন্ধান পেয়েছি, যে চরিত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ওই দুই নাৎসি চিকিৎসকের কথা। তিনিও একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। তাঁর নাম, প্রোফেসর লিণ্ডকুইস্ট। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কয়েকজন বিজ্ঞানীকে নিজের বাড়িতে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন। তারপর ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁদের দেহের মধ্যে নিজেরই আবিষ্কৃত একটি তরল ইনজেক্ট করে তাঁদের পুতুলে রূপান্তরিত করে, নিজের ল্যাবরেটরতেই রেখে দিয়েছিলেন। পূর্ণ দৈর্ঘ্যের প্রতিভাবান মানুষ যদি আঙুলের মতো ছোট হয়ে যান, তখনও কি তাঁর বুদ্ধি ও প্রতিভা একইরকম উন্নত মানের থাকে? এটাই পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলেন ডক্টর লিণ্ডকুইস্ট। 

সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রোফেসর শঙ্কু ও আশ্চর্য পুতুল’ গল্পে প্রোফেসর লিণ্ডকুইস্ট আসলে এক ধরনের বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের চরম রূপ– যেখানে জিজ্ঞাসা আছে, কিন্তু নৈতিকতা নেই। এই জায়গাটাই তাঁকে জোসেফ মেঙ্গেলে বা ফ্রিৎস আর্নস্ট ফিশারের মতো বাস্তব চরিত্রদের সঙ্গে অস্বস্তিকরভাবে মিলিয়ে দেয়। 

আবার ফিরে আসি সত্যজিৎ রায়ের গল্পের প্রোফেসর লিণ্ডকুইস্টের মূল প্রশ্নে– মানুষ যদি আকারে আঙুলের মতো ছোট হয়ে যায়, তবে তার বুদ্ধি কি একই থাকবে? 

বৈজ্ঞানিকভাবে ভাবলে, মানুষের বুদ্ধিমত্তা নির্ভর করে মস্তিষ্কের গঠন, নিউরোনের সংখ্যা এবং তাদের জটিল সংযোগের উপর। যদি কেবল শরীর ছোট হয় কিন্তু মস্তিষ্কের ভেতরের গঠন অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে তাত্ত্বিকভাবে বুদ্ধি একই থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটা প্রায় অসম্ভব। শরীর ছোট হলে মস্তিষ্কও ছোট হবে, নিউরোনের সংখ্যা কমে যাবে, ফলে চিন্তা, স্মৃতি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পরিবেশ। অতিরিক্ত ছোট আকারের মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে বাস করবে– এক ফোঁটা জল তার কাছে বিশাল মনে হবে। সামান্য শব্দও প্রচণ্ড জোরে শোনা যেতে পারে। ফলে তার উপলব্ধি ও বুদ্ধির ব্যবহারেও বদল ঘটবে।

সত্যজিৎ রায় এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন– বিজ্ঞানের কাছে ‘কী করা যায়’– সেই প্রশ্ন নয়, বিজ্ঞান দিয়ে ‘কী করা উচিত’– সেই প্রশ্নটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।

প্রোফেসর লিণ্ডকুইস্টের মনেও কি ওই একই মানসিক ব্যাধি বাসা বেঁধেছিল? 

এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে, সত্যজিৎ রায়ের কল্পনায় তৈরি প্রোফেসর লিণ্ডকুইস্টের সঙ্গে ড. মেঙ্গেলে বা ড. ফিশারের যদিও একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও আছে, একথা বলতেই হয়। নাৎসি চিকিৎসকদের কাজ ছিল একটি বৃহৎ রাজনৈতিক মতাদর্শ– বর্ণবাদী নাৎসি দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে রাষ্ট্রের অনুমোদন ও চাপ ছিল। কিন্তু লিণ্ডকুইস্টের কাজ ব্যক্তিগত– তার নিজের কৌতূহল, নিজের আবিষ্কারকে প্রমাণ করার একরোখা ইচ্ছা থেকে জন্ম নেওয়া।

zoom
ডাহকাউ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নির্মম বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা

এখন প্রশ্ন, তাঁর মনেও কি একই মানসিক ব্যাধি ছিল? একে সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট রোগ বলা কঠিন। তবে তাঁর আচরণে আমরা দেখি সহানুভূতির অভাব, নিজের বুদ্ধির উপর অতিরিক্ত অহংকার এবং অন্য মানুষের জীবনের মূল্য না বোঝার প্রবণতা। তাঁর কৌতূহল ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পৌঁছয়, যেখানে তিনি অন্য মানুষকে নিজের পরীক্ষার ‘বস্তু’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এটা নিছক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান নয়, বরং অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার মতো এক ভয়ংকর কাজ। এই বৈশিষ্ট্যগুলো অনেক সময় বিপজ্জনক মানসিক প্রবণতার লক্ষণ হতে পারে।

সত্যজিৎ রায়ের গল্প এখানে আমাদের একটা বড় শিক্ষা দেয়– মানুষ যত বড় বিজ্ঞানীই হোক না কেন, যদি তার মধ্যে মানবিকতা না থাকে, তবে তার জ্ঞান বিপদের কারণ হতে পারে। প্রোফেসর লিণ্ডকুইস্টের মাধ্যমে তিনি সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন– বিজ্ঞান যেন কখনওই মানুষের উপর অত্যাচারের অস্ত্র না হয়ে ওঠে।

নাৎসি ক্যাম্পের ড. ফিশারকে তাঁর সহকর্মীরা তাঁর ফার্স্ট নেম ধরেই ডাকতেন। অর্থাৎ, ফ্রিৎস। উনিশ-কুড়ি বছর বয়স থেকেই সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতিতে এই ‘ফ্রিৎস’ নামটা গেঁথে গিয়েছিল! কারণ, তখন সদ্য যুবক সত্যজিৎ মাঝরাতে রেডিও চালিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খবর শুনতেন। এই যুদ্ধের খবর কাগজ থেকে কেটে স্ক্র্যাপ বুকে আঠা দিয়ে লাগিয়ে রাখতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তিন দশক পরে এই ‘ফ্রিৎস’ নামটা সত্যজিৎ রায় ফিরিয়ে এনেছিলেন নিজের এক ছোটগল্পে। 

‘ফ্রিৎস’ নামে সেই গল্পটা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭২ সালের ‘সন্দেশ’ পত্রিকার হেমন্ত সংখ্যায়। পরে এই গল্পেরই স্বকৃত ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য পেঙ্গুইন রে লাইব্রেরি’ থেকে প্রকাশিত ‘থ্রি রেস’ নামক বিরাট সংকলনে। প্রকাশের ৫৪ বছর পরেও গল্পটি এখনও একই রকম আকর্ষণীয়, একই রকম জনপ্রিয়। তাই এই গল্পটি এতদিনে কালোত্তীর্ণ ক্লাসিকের মর্যাদা লাভ করেছে। 

‘ফ্রিৎস’ গল্পটা পড়লেও মনে পড়ে যায় নাৎসি ক্যাম্পের ডক্টর ফ্রিৎস ফিশারের কথা। কেন? 

কারণ, এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র একটি আশ্চর্য পুতুল। মাপে সেই পুতুল এতই ছোট যে ১২ বছর বয়সী একটি ছেলে তাকে নিজের হাতের তালুতে শুইয়ে রাখতে পারত। যদিও সেই পুতুলের দু’ হাত আর দু’ পা ঝুলে থাকত তালুর বাইরে। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপারটা ছিল অন্য একটি জায়গায়। ফ্রিৎস যদিও পুতুল, তবুও তাকে পুরোপুরি জীবন্ত বলেই মনে হত। মাঝরাতে কে যেন, ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে, হেঁটে বেড়াত কম্বলের উপর দিয়ে। ফ্রিৎস নয় তো? 

যদি সে জীবন্ত হয়, তবে কি এই পুতুল নাৎসি ক্যাম্পের ড. ফ্রিৎস ফিশারের অমানবিক গবেষণার একটি কুফল? বন্দি কোনও পূর্ণবয়স্ক মানুষকে কি ছোট্ট পুতুলে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন ড. ফ্রিৎস ফিশার? তারপর সেই বুদ্ধিমান পুতুল ঘাসের নীচে লুকিয়ে পালাতে পেরেছিল নাৎসি ক্যাম্প থেকে? ‘ফ্রিৎস’ নামটার মধ্যে দিয়েই সত্যজিৎ আমাদের মনে করিয়ে দেন সেই নরপিশাচ ড. ফ্রিৎস ফিশারের কথা। ‘ফ্রিৎস’ গল্পটির সঙ্গে ‘প্রোফেসর শঙ্কু ও আশ্চর্য পুতুল’ গল্পটার এটা এক বিরল সাদৃশ্য। 

zoom
‘শঙ্কু ও ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’, অলংকরণ: সমীর সরকার

জীবন্ত মানুষের শরীরের মধ্যে বেমানান কোনও তরল ইনজেক্ট করে, সেই অসাড় ও অসহায় শরীরকে নিয়ে গবেষণা করার প্রবণতাটা বারবার ফিরিয়ে এনেছেন সত্যজিৎ রায় তাঁর বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন গল্পে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ পাওয়া যায়, ‘শঙ্কু ও ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ কাহিনিতে।

আসলে, স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে সত্যজিৎ বরাবরই সোচ্চার হয়েছেন। 

১৯৮০-এর দশকের শেষদিকে জার্মানিতে এক অস্বস্তিকর পরিবর্তনের আভাস দেখা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বহু বছর পরেও, কিছু বিভ্রান্ত তরুণ-তরুণীর মধ্যে আবার চরম জাতীয়তাবাদী ও নাৎসি ভাবধারার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হতে থাকে। এই প্রবণতাকে সাধারণভাবে ‘নিও-নাৎসিবাদ’ বলা হয়। অর্থাৎ, পুরনো নাৎসি মতাদর্শের নতুন রূপ।

পশ্চিম জার্মানির বিভিন্ন শহরে ছোট ছোট উগ্রপন্থী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। যেমন, ১৯৮৩ সালে মিউনিখ শহরে মাইকেল কিউনেনের নেতৃত্বে ‘অ্যাকশন ফ্রন্ট ন্যাশনাল সোশালিস্ট’ নামে একটি সংগঠন সক্রিয় হয়েছিল। যদিও সরকার এই সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করে, তবুও এর প্রভাব পুরোপুরি থামানো সম্ভব হয়নি। ১৯৮৭ সালে বার্লিন ও হামবুর্গে নিও-নাৎসি সমর্থকদের মিছিল ও গোপন বৈঠক হত প্রায় প্রায়। 

zoom
মাইকেল কিউনেন

১৯৮৮ সালের ২০ এপ্রিল, অ্যাডলফ হিটলারের জন্মদিনের দিন জার্মানির কিছু অংশে, বিশেষ করে ডর্টমুন্ড ও ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে, গোপনে সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। এই সমাবেশগুলোতে নাৎসি প্রতীক ব্যবহার করা হত এবং বিদেশি ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে রীতিমতো ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হত।

১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর ভাঙার আগে-পরে পূর্ব জার্মানিতেও, বিশেষ করে লাইপজিগ ও ড্রেসডেন অঞ্চলে কিছু বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট যুবক-যুবতীর মধ্যে হিটলারের চিন্তাধারার বিস্তার দেখা যায়। কাজেই সেই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেক তরুণকে ভুল পথে ঠেলে দিয়েছিল। 

তবে জার্মানির সাধারণ মানুষ এবং সরকার এই প্রবণতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়। আইন করে নাৎসি প্রতীক ও প্রচার নিষিদ্ধ করা হয় এবং শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সত্যতা জানানো হয়। 

এই ঘটনার প্রতিবাদ করার জন্য ও সম্ভাব্য সমাধান সাজেস্ট করার জন্য, প্রোফেসর শঙ্কুর নতুন অ্যাডভেঞ্চার কাহিনির পটভূমি হিসেবে সত্যজিৎ রায় বেছে নিলেন জার্মানির ইনগোলস্টাট শহরকে। গল্পটা প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। প্রোফেসর শঙ্কুর এই গল্প যে আকস্মিক নয়, তার অকাট্য প্রমাণ: এই গল্প লেখার খুব কাছাকাছি সময়ে, ভারতেও স্বৈরাচারী শক্তির উত্থান হতে শুরু করেছে এবং এই বিষয়ে জনসাধারণকে সাবধান করে উনি একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন দেশবাসীর উদ্দেশ্যে। 

zoom
সত্যজিৎ রায়

এই চিঠিতে তিনি স্পষ্ট করে জানান, ভারতেও ধীরে ধীরে কিছু স্বৈরাচারী প্রবণতা মাথা চাগাড় দিয়ে উঠছে। মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা, ভিন্ন মতকে দমন করা এবং অন্ধ আনুগত্যের পরিবেশ সৃষ্টি করা– এই লক্ষণগুলো তিনি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে বলেন– কারণ গণতন্ত্র কেবল একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, একটা সচেতন মানসিকতা। যদি মানুষ নিজের বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে, তবে কোনও সমাজই নিরাপদ নয়। তিনি বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান জানান, যেন তারা প্রশ্ন করতে শেখে, সত্যকে খুঁজে নিতে শেখে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে দাঁড়াতে পারে।

এই চিঠির মূল বার্তা ছিল– ইতিহাস আমাদের অনেক শিক্ষা দিয়েছে, কিন্তু সেই শিক্ষা মনে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই। স্বৈরাচারকে রুখতে হলে দরকার সচেতনতা, মানবিকতা এবং স্বাধীন চিন্তার সাহস। 

সুতরাং, সত্যজিৎ রায়ের কলমে জিঘাংসা পূর্ণ যে সমস্ত বিজ্ঞানীদের দেখা আমরা পেয়েছি, তাঁদের পিছনে সত্যজিৎ রায় দেখেছিলেন স্বৈরাচারী অর্থাৎ নাৎসি মনোভাবের ঘন কালো ছায়া। 

concentration camp Fritz Fischer Josef Mengele Nazi germany Professor Shonku Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Satyajit Ray Scientist

Share this article on