


১৪ এপ্রিল, ১৯২৩, নৈহাটি স্টেশনে নামিয়ে তাঁকে সাধারণ কয়েদিদের মতো খাটো কুর্তা আর ইউনিফর্ম পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল হুগলি জেলে। সহবন্দিদের মধ্যে পেলেন বরিশালের সতীন্দ্রনাথ সেন, কবি খান মহম্মদ মইনুদ্দিন প্রমুখকে। জেলের সুপার আর্সটেন বন্দিদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করতেন। সেই অমানুষিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে নজরুল ব্যাঙ্গাত্মক প্যারোডি লিখলেন যা বন্দিদের মধ্যে অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেল। হুগলি জেলে রাজবন্দিরা সাধারণ কয়েদিদের মতো সুপারকে ‘সরকার-সালাম’ জানাতে অস্বীকার করল। শুরু হল অত্যাচার, ভাতের বদলে জুটল মাড়ভাত, পায়ে ডান্ডা-বেড়ি, হাতে হ্যান্ডক্যাপ, নির্জন সেলে আটকে রাখা হল তাঁদের। নজরুল গান লিখলেন, ‘এই শিকলপরা ছল মোদের এ শিকল পরা ছল’।
প্রতিবাদ। প্রতিবাদ, শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে, অন্যায় শাসন আর অবিচারের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ কবিতার ছত্রে ছত্রে, বিদেশি শাসকের রক্তচোখের ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে দেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে সোচ্চার উচ্চারণে। দেশের মানুষের মনে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, প্রতিরোধের শক্তি আর সাহস জাগানোর লক্ষ্যে প্রতিবাদের আগুন হাতে স্বাধীনতা ও মানবতা প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ে নেমেছিলেন নজরুল ইসলাম। সমিধ ছিল তাঁর তীক্ষ্ণশব্দ, ছন্দের তীব্র স্পন্দন, উপমার লক্ষ্যভেদী নিশানা আর বুকভরা দুরন্ত সাহস। কবিতায় কবিতায় মার খাওয়া মানুষের দুর্দশায় ব্যথিত বিদ্রোহীর মর্মযন্ত্রণার উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, দীপ্ত কণ্ঠে প্রতিরোধের ‘হায়দরি হাঁক’ দিয়েছিলেন তিনি। যার ফল গ্রেফতারি, অপরাধ প্রমাণের নামে প্রহসন, আর অবশেষে কারাবাসের নির্দেশ। ২৩ নভেম্বর, ১৯২২, গ্রেফতারি থেকে ১৫ ডিসেম্বর ১৯২৩– প্রায় এক বছর এক মাস ২৩ দিন কারাগারে রাজদ্রোহের অপরাধে বন্দি থাকতে হয়েছিল তাঁকে। ভারতের ইতিহাসে রাজদ্রোহে অভিযুক্ত প্রথম কবি তিনি।
কিন্তু কেন?
নজরুলের অপরাধ ছিল একটি কবিতা লেখা। কবিতার নাম ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। ৭৯ পঙ্ক্তির এই দীর্ঘ রূপক কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায়, ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯২২ সালে শারদীয় দুর্গাপুজোর ঠিক আগে। ‘ধূমকেতু’র ১২-তম সংখ্যায়। ‘ধূমকেতু’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট । রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী থেকে নেওয়া হয়েছিল এই ‘ধূমকেতু’ নামটি, প্রকাশক এবং মুদ্রাকর ছিলেন আফজালুল হক। যিনি বন্দি হন, জামিন পান এবং পরবর্তীতে মামলা চলাকালীন নজরুলের বিপক্ষে সরকারি ‘অ্যাপ্রুভার’ হিসেবে সাক্ষ্য দেন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে, আন্দোলন দমনের নামে দেশের মানুষের ওপর নেমে আসা অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছিল এই কাব্যে, কবি লিখেছিলেন, ‘দেবশিশুদের মারছে চাবুক বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি/ ভূ-ভারত আজ কসাইখানা আসবি কখন সর্বনাশী?/ দেবসেনা আজ টানছে ঘানি তেপান্তরের দীপান্তরে/ রণাঙ্গনে নামবে কে আর তুই না এলে কৃপাণ ধরে?’ কবিতাটি নজরুল রচনা করেছিলেন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র পূজা সংখ্যায় (আশ্বিন ১৩২৯) দেবেন বলে, কিন্তু পরে মত বদলে তিনি ‘ধূমকেতু’তেই কবিতাটি প্রকাশ করেন।

সে ছিল এক অসুখী সময়, অসহযোগ, খেলাফৎ, সশস্ত্র আন্দোলনের ব্যর্থতায় হতাশ নজরুলের মনের মধ্যে জমেছিল বিক্ষোভ, প্রচলিত অবস্থা এবং ব্যবস্থার মধ্যে নিষ্ক্রিয় জড়ত্বকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন তিনি, দেখেছিলেন ধর্মের নামে অধর্মের বেসাতি– এই সব কিছু মিলে এক ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া জন্ম নিয়েছিল তাঁর মনে, যার বিস্ফোরক প্রকাশ এই কবিতা। যে কবিতায় দেবী দুর্গাকে আগমন জানিয়েছিলেন। কবি চেয়েছিলেন, দেবীর দৈব ক্ষমতায় দানবীয় আসুরিক শক্তির (ইংরেজ শাসকদের) পরাভব এবং বিনাশ।
গ্রেফতার হলেন যেভাবে
‘ধূমকেতু’ প্রকাশের আগে থেকেই নজরুলের ওপর তীক্ষ্ণ নজর ছিল ইংরেজ সরকারের। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলেন মওলানা হসরত মোহানী– ফলে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ হয়। বাংলায় এই দাবি প্রথম মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করলেন নজরুল ইসলাম। ধূমকেতুতে ১৩-তম সংখ্যায় ১৩ অক্টোবর ১৯২২, অর্থাৎ ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশিত হওয়ার পর, তিনি লিখলেন, ‘ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনও বিদেশীর মোড়লীর অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এদেশে মোড়লী করে দেশকে শ্মশানভূমিতে পরিণত করেছেন,তাঁদের পাততারি গুটিয়ে বোঁচকা পুঁটুলি বেঁধে সাগর পাড়ে পারি দিতে হবে…’। স্বাভাবিকভাবেই এসব কথার উত্তাপ সহ্য হয়নি ব্রিটিশ শাসকদের। ২৩ নভেম্বর, ১৯২২ নিষিদ্ধ ঘোষিত হল তাঁর বই ‘যুগবাণী’, স্বাধীন ভারতে যে নিষেধাজ্ঞা কোনও দিন প্রত্যাহৃত হয়নি। এর আগেই অবশ্য ১৯২২-এর ৮ নভেম্বর সকালে ধূমকেতুর দফতর ৭ নং প্রতাপ চাটুজ্জে লেনে গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে হাজির হয় পুলিশ, তল্লাশি চলে, বাজেয়াপ্ত করা হয় নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ আর লীলা মিত্রের প্রবন্ধ ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ত’, সঙ্গে অনেক কাগজপত্র– দেওয়ালি এবং আগমনী সংখ্যার যাবতীয় লেখালিখি। সেইদিন নজরুলকে গ্রেফতার করা সম্ভব হল না কারণ সেই সময় নজরুল কলকাতায় ছিলেন না, ছিলেন সমস্তিপুরে। ধূমকেতু অফিসে তল্লাশির সময় উপস্থিত ছিলেন মুজফ্ফর আহমদ এবং আবদুল হালিম, তাঁরা নজরুলের হদিশ জানলেও পুলিশকে তা জানাননি। গিরিবালা দেবী, প্রমীলাকে নিয়ে তখন ভাইদের কাছে ছিলেন সমস্তিপুরে, নজরুল তাঁদের আনতে সেখানে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁদের নিয়ে তিনি পারি জমান কুমিল্লায়, পথে বেলুড়ে দু’দিন বিশ্রাম নেন এক বন্ধুর বাড়িতে। কুমিল্লায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, সেই ২৩ নভেম্বর তারিখে যেদিন তাঁর ‘যুগবাণী’কেও সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। কুমিল্লা থেকে তাঁকে আনা হয় কলকাতায়। সেখানে গভর্নরের একজিকিউটিভ কাউন্সিলের বিচার বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সদস্য স্যর আবদুর রহিম ‘ধূমকেতু’র বিরুদ্ধে মোকদ্দমায় সম্মতি দেন, কিন্তু নজরুল ইসলামকে সরাসরি অভিযুক্ত করে হাজির করা হয় ২৫ নভেম্বর তারিখে বিচারপতি সুইন হো-র এজলাসে, শুনানির দিন ঠিক করা হয় ২৯ নভেম্বর।

বিচার এবং জবানবন্দি
শুনানি শেষে ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি ম্যাজিস্ট্রেট সুইন হো মামলার রায় দেন, নজরুল ইসলামের এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডের সাজা হয়। সুইন হো নিজে একজন কবি ছিলেন, যদিও কাব্যিক বিচারে তিনি অন্য এক কবির জবানবন্দির কাছে পরাস্ত হন। প্রেসিডেন্সি জেলে বসে ৭ জানুয়ারি, ১৯২৩, রবিবার, নজরুল নিজেই নিজের জবানবন্দিটি লেখেন যা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে খ্যাত। যেখানে আত্মপক্ষ সমর্থন করে নজরুল লিখেছিলেন, ‘আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করবার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন। আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সেই বাণী রাজ বিচারে রাজদ্রোহ হতে পারে, কিন্তু ন্যায় বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়, সত্যাদ্রোহী নয়, সে বাণী রাজদ্বারে দণ্ডিত হতে পারে কিন্তু ধর্মের আলোকে ন্যায়ের দুয়ারে তা নিরপরাধ, নিষ্কলুষ, অম্লান, অনির্বাণ, সত্য সুন্দর।…’
বিচার শেষে নজরুলকে ১৬ জানুয়ারি প্রেসিডেন্সি জেল থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। চারমাস আলিপুরের জেলে রাজবন্দি নজরুল মাতিয়ে রেখেছিলেন অন্য সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের কবিতায় আর গানের জাদুতে। ফলে অচিরেই তাঁকে স্থানান্তরিত করা হল হুগলি জেলে। আলিপুরে বন্দি থাকাকালীন ২২ ফেব্রুয়ারি নজরুলকে তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করলেন রবীন্দ্রনাথ। যদিও তাঁর অনুগামীরা খুশি হননি, তবুও পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে জোড়াসাঁকোতে ডেকে পাঠিয়ে তাঁর হাত দিয়ে জেলেই এক কপি বই পাঠিয়ে দিলেন। বই পেয়ে আত্মহারা নজরুল সৃষ্টির উল্লাসে মেতে উঠে লিখলেন, ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে…’ আর জেলের ইউরোপিয়ান ওয়ার্ডেন চমকে উঠলেন নোবেলজয়ী টেগোর একজন বন্দিকে বই উৎসর্গ করেছেন দেখে।

হুগলি জেলে বিদ্রোহের আগুন
আলিপুর থেকে হুগলি। কারাগার বদলে গেল, বদলে গেল তাঁর পোশাক। ১৪ এপ্রিল, ১৯২৩, নৈহাটি স্টেশনে নামিয়ে তাঁকে সাধারণ কয়েদিদের মতো খাটো কুর্তা আর ইউনিফর্ম পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল হুগলি জেলে। সহবন্দিদের মধ্যে পেলেন বরিশালের সতীন্দ্রনাথ সেন, কবি খান মহম্মদ মইনুদ্দিন প্রমুখকে। জেলের সুপার আর্সটেন বন্দিদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করতেন। সেই অমানুষিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে নজরুল ব্যাঙ্গাত্মক প্যারোডি লিখলেন, যা বন্দিদের মধ্যে অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেল। হুগলি জেলে রাজবন্দিরা সাধারণ কয়েদিদের মতো সুপারকে ‘সরকার-সালাম’ জানাতে অস্বীকার করল। শুরু হল অত্যাচার, ভাতের বদলে জুটল মাড়ভাত, পায়ে ডান্ডা-বেড়ি, হাতে হ্যান্ডক্যাপ, নির্জন সেলে আটকে রাখা হল তাঁদের। নজরুল গান লিখলেন, ‘এই শিকলপরা ছল মোদের এ শিকল পরা ছল’।
কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ল। বন্ধুস্বজনেরা ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। আবদুল হালিমের নামে দেওয়া নজরুলের এক গোপন চিঠির সূত্রে তাঁরা সব অত্যাচারের কথা জানতে পারলেন। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, নলিনীকান্ত সরকার দেখা করতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন। দুঃসাহসিক নলিনীকান্ত ফেরার পথে জেলের পাঁচিলে উঠে পড়ে, পাঁচিল থেকে হাতজোড় করে নজরুলকে অনুরোধ করলেন অনশন তুলে নেওয়ার জন্য। নজরুল ইঙ্গিতে জানিয়ে দিলেন, তা অসম্ভব। জ্বর আসে নজরুলের, সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি– সেই খবর আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হলে সকলে আতঙ্কিত হন! নজরুলের শারীরিক অবস্থা সংকটজনক, বাকিদেরও তাই। শিলং থেকে টেলিগ্রাম করে নজরুলকে অনশন প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করলেন রবীন্দ্রনাথ: ‘give up hunger strike, our literature claims you’। ১৭ মে বাজে শিবপুর থেকে ছুটে গেলেন শরৎচন্দ্র, কিন্তু জেলে ঢোকার অনুমতি পেলেন না। চুরুলিয়া থেকে নজরুলের মা এলেন, তাঁকেও ফিরতে হল শূন্য হাতে। জেল কর্তৃপক্ষ তাঁকেও অনুমতি দিল না।

এদিকে নজরুলের শরীরের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। ২১ মে তারিখে কলকাতায় গোলদীঘি ময়দানে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে নজরুলের মুক্তির দাবিতে একটি বিরাট জনসভার আয়োজন করা হল। সভায় বক্তব্য রাখলেন অতুল সেন, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, হেমন্ত সরকার, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী প্রমুখ। সভায় প্রস্তাব নেওয়া হল, যে কোনও মূল্যে নজরুলের প্রাণ রক্ষা করবার জন্য কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করতে হবে, নজরুল যাতে অনশন ভঙ্গ করেন। নজরুলের বন্ধুরাও এগিয়ে এলেন, তাঁরা ৩০ টাকা চাঁদা তুলে বেসরকারি জেল পরিদর্শক স্যর আব্দুল্লাহ্ সোহরাওয়ার্দীকে ট্যাক্সি ভাড়া দিলেন, হুগলি যাওয়া-আসার ট্যাক্সি ভাড়া। সোহরাওয়ার্দি নজরুল এবং অন্য রাজবন্দির সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সম্মত করালেন অনশন ভঙ্গের জন্য, তিনি কথা দিলেন সরকারের সঙ্গে কথা বলে এই অত্যাচার এবং অমানবিক ব্যবহারের অবসান ঘটাতে সচেষ্ট হবেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সক্রিয় উদ্যোগে নজরুল এবং তাঁর সহবন্দিরা অনশন প্রত্যাহার করতে রাজি হলেন। ততদিন অনশন প্রায় ৪০ দিনে পড়েছে। কুমিল্লা থেকে ছুটে এসেছেন বিরজাসুন্দরী দেবী, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে ওইদিন চলে গেলেন হুগলি জেলে। প্রায় দু’-ঘণ্টা অপেক্ষার পর শুধুমাত্র বিরজাসুন্দরী দেবীকে সাক্ষাতের অনুমতি দিল জেল কর্তৃপক্ষ। ঘণ্টাখানেক বাদে ফিরে এসে বিরজাসুন্দরী জানালেন অনেক কষ্টে রাজি করিয়েছেন তিনি, তাঁর হুমুক মায়ের হুকুম, নজরুল সেই আদেশ ফেলতে পারেননি, লেবুর রস খাইয়ে তাঁর অনশন ভঙ্গ করে তাঁর জীবন বাঁচিয়ে জেল থেকে ফিরে এলেন তিনি।
বহরমপুরের দিনগুলি
অনশন ভঙ্গের ২৭ দিন পর বহরমপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হল নজরুল ইসলামকে। হুগলি জেলের সেই ভয়ংকর পরিবেশ বদলে গেল, কনডেমড সেল, সাপের সঙ্গে বসবাস আর করতে হল না। জেল-সুপার বসন্ত ভৌমিক নজরুলকে একটা হারমোনিয়ামের ব্যবস্থা করে দিলেন জেলে, জেলে বসেই রচনা করলেন ‘ইন্দ্রপ্রয়াণ’ কবিতা, কিন্তু প্রিজন অ্যাক্ট ভাঙার অপরাধে আবার মামলায় জড়িয়ে পড়লেন। সেখানে সাবডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট এন কে সেনের আদালতে নজরুলকে উপস্থিত করা হয়, তাঁর হয়ে বহরমপুরের উকিল ব্রজভূষণ গুপ্ত মামলা লড়তে শুরু করেন। মামলার তারিখ স্থির হয় ১৪ ডিসেম্বর ১৯২৩। অন্যদিকে তখনকার প্রিজন অ্যাক্ট অনুসারে নজরুলের সাজা মকুব হয়ে মুক্তির দিন এগিয়ে আসে ১৫ ডিসেম্বর ১৯২৩। নজরুল মুক্তি পেলেন কারাগার থেকে। ডা. নলিনাক্ষ সান্যালের বাড়িতে ঠাঁই নিলেন, বহরমপুর সায়েন্স কলেজে তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হল। দেশের মুক্তির জন্য কবিতা লিখে, দেশবাসীর ওপর নেমে আসা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে নজরুল কারাবরণ করেছিলেন। কারাগারেও থামেনি তাঁর প্রতিবাদ। আপসহীন এক সংগ্রামী তিনি, সাম্য স্বাধীনতা আর গোঁড়ামি মুক্ত অসাম্প্রদায়িক চেতনার চিরন্তন পূজারি।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved