September 11: Joy Goswami’s Personal Memory of 9/11। Robbar
Robbar
  • ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সেই গল্প জানো, অন্ধকার?

আর কিছু পরেই, সেখানে যাওয়ার কথা ছিল আমাদের। দেখতে দেখতেই আরেকটা এরোপ্লেনের ধাক্কা– দ্বিতীয় টাওয়ারে! তীব্র, হলুদ আলোর ঝলকানি! টিভির ঘোষকও আকস্মিকতায় স্তব্ধ। মুহূর্তে ঘরের ফোনগুলোও অকেজো। খবর এল: দুর্ঘটনা নয়, টেররিস্ট অ্যাটাক!

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬, ১১:২০   
Facebook WhatsApp Messenger

আগস্ট, ২০০১। গিয়েছিলাম আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। ‘ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রাম’-এ আমন্ত্রিত হয়ে। ১৬টি দেশের ১৬ জন লেখকের একজোট। পুরোদস্তুর হোটেলের মতোই এক বাড়িতে আমরা থাকতাম। আমার অভ্যাস ছিল সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে নীচ থেকে চা নিয়ে আসা। যেদিনের কথা বলছি, সেদিনও চা নিয়ে ফিরছি করিডোর দিয়ে। দেখলাম ইন্দোনেশিয়ার লেখক সি টকের দরজা খোলা। এমনকী, তাঁর ঘরের উল্টোদিকের দরজাটাও। ডাবলিন থেকে আসা সোনালি চুলের অ্যাঞ্জেলিনা থাকেন সেই ঘরে। দেখি– সি টক ও অ্যাঞ্জেলিনা কফি হাতে টেলিভিশনের সামনে স্থির। ওঁরা আমাকে দেখে বললেন, ‘দেখো, এখানে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে!’ বুলগেরিয়ার নিকোলাই গ্রজডিনস্কি-ও বলতে-না-বলতেই ঢুকে পড়লেন। বললেন, ‘শুনলাম একখানা প্লেন টুইন টাওয়ারের একটায় ক্র্যাশ করেছে!’

zoom
সেই অভিশপ্ত দিন

আর কিছু পরেই, সেখানে যাওয়ার কথা ছিল আমাদের। দেখতে দেখতেই আরেকটা এরোপ্লেনের ধাক্কা– দ্বিতীয় টাওয়ারে! তীব্র, হলুদ আলোর ঝলকানি! টিভির ঘোষকও আকস্মিকতায় স্তব্ধ। মুহূর্তে ঘরের ফোনগুলোও অকেজো।

খবর এল: দুর্ঘটনা নয়, টেররিস্ট অ্যাটাক!

zoom
ইতালির লেখক রোকো কারবোনে

সেসময় একটা উলের টুপি পরতাম। বিকেলবেলা টিপটিপিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। বেরতে যাচ্ছি আর ইজরায়েলের লেখক এতগার কেরেত-এর চিৎকার: ‘পুত্‌ ইত্‌ দাউন, পুত্‌ ইত্‌ দাউন!’ আমি হতভম্ব! ‘ইওর ক্যাপ, ইওর ক্যাপ! দে উইল শুত্‌ ইউ!’ বুঝলাম যে, টুপিটা অনেকটা ফেজ টুপির মতো দেখতে, তাই এতগার এমন শঙ্কিত! যদিও ইতালির লেখক রোকো কারবোনে বাৎসল্যের হাসিতে টুপি আমার মাথা থেকে তুলে নিজের পকেটে রাখলেন। সেদিন, টেলিফোন সক্রিয় হয়েছিল অনেক রাতে।

২.

ওইদিন সন্ধেয় কর্মশালার পরিচালকরা লেখকদের একত্র করলেন। নানা ধর্মের সব লেখক। সকলেই সেদিন একমত: মানুষই প্রথম কথা, মানুষের শিল্পই প্রধান, ভালোবাসাই প্রধান– ধর্ম প্রধান নয়। ঠিক হল, লেখকরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে শান্তির বার্তা দেবেন।

যাওয়া শুরু হল বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেউ কেউ সদ্য লিখিত কবিতা হাতে। এতগার কেরেত যে-ভয়টা পেয়েছিলেন, খুনখারাপি হবে, তা একেবারেই হয়নি।

দেশে ফেরার বেশিদিন বাকি নেই তখন। শোনা গেল লাদেনকে খোঁজার জন্য শুরু হয়েছে যুদ্ধ। টিভিতে সেসব দেখাচ্ছেও। আমি খানিকটা দেখে নেমে এলাম রাস্তায়। দেখি– লম্বা একটা মিছিল। নীরব। মিছিলের সামনে একটা বড় পোস্টারে লেখা: ‘War is not the answer.’ পাশে, আরেকটিতে: ‘We want peace.’ এঁরা, প্রত্যেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। মিছিলের পিছন পিছন যেতে লাগলাম। নানা রাস্তার বাঁক থেকে অচেনা ছেলেমেয়ে, পথচারী, এই যুদ্ধবিরোধী নীরব মিছিল দীর্ঘ করতে লাগলেন।

zoom
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০০১। ওয়াশিংটন ডিসি। যুদ্ধবিরোধী মিছিল

৩.

ফেরার দিন ঘনিয়ে আসছিল আমাদের। তাই একদিন সন্ধেয় লাউঞ্জে জড়ো হওয়া। আমন্ত্রিত লেখকরা ছাড়াও নানা কৃতী মানুষ। মদ্যপান চলছে। দরজার কাছে, যথারীতি, আমি সাদা কাগজের গেলাসে, চায়ে চুমুক দিচ্ছি। মত্ত হয়ে একজন লেখক বলে উঠলেন, ‘তোমরা অষ্টম শতাব্দীতে আমাদের সঙ্গে কী করেছিলে?’ যিনি বলছেন, তিনি বৌদ্ধ। এসেছেন সাউথ কোরিয়া থেকে। আরেকজন ইতালিয়ান বললেন, ‘আর তোমরা? ষষ্ঠ শতাব্দীতে?’ দেখা গেল তিনি ক্রিশ্চান। ব্যাপারটা ক্রমে বেড়ে চলল। কেউ ষষ্ঠ, কেউ অষ্টম, কেউ একাদশ– এক একজন এক একটা পাথরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আর মধ্য দিয়ে জলপ্রবাহের মতো শতাব্দীগুলো বয়ে চলেছে। পান করে খুলে গিয়েছে তাঁদের আগল। অথচ সেই শতাব্দীগুলো বহুকাল পার করে এসেছেন তাঁরা। আর কথাবার্তায় স্পষ্ট হচ্ছে, প্রত্যেক ধর্মই কখনও-না-কখনও অন্য ধর্মের মানুষকে হত্যা করেছে। সারা ঘরে এই কথার রক্ত ঘুরতে লাগল।

zoom
গেরাল্ড এ বারবারা। অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল, এই দৃশ্য দেখেছিলেন। কখনও আর ফিরে আসেননি তিনি…

রাত ২টো বাজল। এই রাত্রে অনুবাদক-লেখক-ইতিহাসবিদ যুবতী নারীরাও ছিলেন। পুরুষরা যখন ক্রুদ্ধ হয়ে আক্রমণ করছেন নিজেদের, তখন সেই নারীরা শতাব্দীর জলপ্রবাহের ওপর দিয়ে ভেসে এসে একেকজন পুরুষকে জড়িয়ে ঠোঁটের ওপর ঠোঁট রাখলেন। আর বললেন, ‘স্টপ, নাও স্টপ। এনাফ! দিজ ইজ নট ওয়ার।’

অবচেতনের ক্রোধ বদলে গেল প্রণয়প্রবাহে। সেই রাতে, শতাব্দীবাহিত যুদ্ধে বিরতি ঘোষণা করল চুম্বন।

………………………………….
অনুলিখন: সম্বিত বসু

সংবাদ প্রতিদিনের ৩৫তম জন্মদিনের ক্রোড়পত্র থেকে পুনর্মুদ্রিত

 

9/11 personal experience Recalling September 11 Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Twin Towers attack

Share this article on