works by atul prasad sen for bengali language in lucknow | Robbar
Robbar
  • ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬

অতুলনীয় লখনউ

গত শতাব্দীর দ্বিতীয় বা তৃতীয় দশকে বহির্বঙ্গে বাঙালির মননে ও ব্যবহারে মাতৃভাষার ব্যবহার অত্যন্ত সংকীর্ণ ছিল। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায়ও অনেকসময়েই তারা হিন্দি বা উর্দু ব্যবহার করত। বাংলার বাইরে বেশ কয়েকজন উদ্যমী বাঙালির উৎসাহে প্রবাসী বাঙালির মাতৃভাষা অনুশীলনে জোয়ার এল– রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, বৃন্দাবন ভট্টাচার্য, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী, প্রমথনাথ তর্কভূষণ, লালগোপাল মুখোপাধ্যায়, দেবেন্দ্রনাথ সেন এবং অতি অবশ্যই অতুলপ্রসাদ সেন।

শেষ আপডেট: আগস্ট ২৭, ২০২৬, ১৭:৫৩   
Facebook WhatsApp Messenger

একটু সময়ের ব্যবধান না পেলে একজন মানুষকে বিচার করার আপাত নির্মোহ অবকাশ তৈরি হয় না। ঠিক ৯২ বছর আগে অতুলপ্রসাদ কিছুটা অসময়েই তাঁর হাজার কাজ ফেলে রেখে বিদায় নিয়েছিলেন (আগস্ট ২৬, ১৯৩৪)। অতুলপ্রসাদকে আমরা মূলত সুর-লোকের বাসিন্দা হিসেবেই বেশি করে চিনি। তাঁর সাহিত্যকৃতি, রাজনৈতিক অবস্থান, সামাজিক অবদান– এই পরিচয়গুলিও আলোচনায় মাঝেমাঝে উঠে আসে। তাঁকে যাঁরা চিনতেন (যাঁরা কেউ আর বেঁচে নেই) তেমন অনেকে ব্যক্তি-অতুলপ্রসাদের ছবিও এঁকেছেন কথায়, লেখায়, স্মৃতিচারণে। কিন্তু এই সমস্ত পরিচয়ের সঙ্গেই লগ্ন হয়ে ছিল অতুলপ্রসাদের আরও একটি সত্তা, যেটা খুব একটা আলোচিত নয়। ‘প্রবাসী’ অতুলপ্রসাদ হল সেই সত্তা যা বাংলার বাইরে সারা ভারতে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের মূল সাংস্কৃতিক পরিচয়ে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিল। এবং এর পাশাপাশি বাঙালিকে শুধুমাত্র তার ‘বাঙালি’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে, অন্যান্য প্রদেশের মানুষ এবং তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে একটা সমন্বিত সাংস্কৃতিক প্রতিবেশ তৈরি করতে চেয়েছিল।

zoom
অতুলপ্রসাদ সেন

১৮৭১ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে মাতামহ কালীনারায়ণ গুপ্তর বাড়িতে অতুলপ্রসাদের জন্ম। বাবা বিখ্যাত ডাক্তার রামপ্রসাদ সেন, মা হেমন্তশশী। অবিভক্ত ভারতের ফরিদপুর জেলার মাদারিপুর পরগনার দক্ষিণ বিক্রমপুরের মগর গ্রামে অতুলপ্রসাদের পূর্বপুরুষের বাস। রামপ্রসাদ যৌবনে কিছুটা সৌভাগ্যের খোঁজেই কলকাতায় এলে সেসময়ের ব্রাহ্মসমাজের প্রমুখ পুরুষ দেবেন্দ্রনাথ, কেশবচন্দ্র সেন, শিবনাথ শাস্ত্রীদের সাহচর্যে আসেন। দেবেন্দ্রনাথের সাহায‍্যে ভর্তি হন মেডিক্যাল কলেজে। ১৮৬৯ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকায় কেশবচন্দ্র সেনের কাছে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। ঢাকায় ব্রাহ্ম আন্দোলনের পুরোধা-পুরুষ ঋষি কালীনারায়ণ গুপ্তর মেয়ে হেমন্তশশীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। অতুলপ্রসাদ তাঁদের জ্যেষ্ঠ সন্তান। ১৩ বছর বয়সে রামপ্রসাদের মৃত্যুর পরে, অতুল, মামার বাড়িতেই বড় হয়ে ওঠেন। অতুলের বড় হয়ে ওঠায় দাদু কালীনারায়ণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অতুলের  জীবনবোধ এবং সংগীত, সাহিত্যে রুচি তৈরি হয়েছিল দাদুর সাহচর্যে। সাহিত্যবোধ তৈরিতে সেজমামা গঙ্গাগোবিন্দের অবদানও কম নয়– জীবনে প্রথম নাটক দেখেছিলেন সেজমামার কল্যাণে। বড়মামা কৃষ্ণগোবিন্দ (স্যর কে জি গুপ্ত) বিখ্যাত ব্যারিস্টার এবং ষষ্ঠ ভারতীয় সিভিল সার্ভেন্ট। শিক্ষা, সংস্কৃতির এই উদার আবহে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বীজও উপ্ত হয়েছিল অতুলের মনে। ঢাকায় হিন্দু, মুসলমানের যে কোনও উৎসবে গভীর সম্প্রীতির আবহ তাঁকে নিজের জীবনেও এক খোলা মনের মানুষ করে গড়ে তুলেছিল। 

বিদেশ থেকে ব্যারিস্টার হয়ে ফিরে এসে অতুলপ্রসাদ ১৯০২ সালের এপ্রিল মাসে যখন লখনউয়ে ওকালতিতে তাঁর পসার জমিয়ে বসলেন, সেসময় কেবল শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের মতো ললিতকলায় যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখলেন তা নয়, প্রবাসী বাঙালিদের সমস্তরকম উদ্‌যোগে অতুল তাঁর উদ্যম আর জীবন-রস ঢেলে দিলেন। লখনউতে গিয়ে অতুল প্রথমেই উর্দু ভাষা ও সাহিত্যে নিজেকে ব্যুৎপন্ন করলেন। পরবর্তীকালে তাঁর সৃষ্ট সংগীতে এই শিক্ষা কাজে লাগবে। উর্দু, হিন্দি-সহ উত্তর ভারতের বিভিন্ন ভাষা, তার সাহিত্য এবং সংগীত– অতুলপ্রসাদের সৃষ্টির ভুবনকে সমৃদ্ধতর করেছে।

zoom
প্রবাসে, ব্যারিস্টার বেশে

কিন্তু যে-কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেখানে ফেরা যাক এবার। লখনউতে অতুলপ্রসাদ ছিলেন প্রায় ৩২ বছর। লখনউ-বাসীর সর্বাঙ্গীণ উন্নয়ন ও জনসেবায় অতুলপ্রসাদের অবদান কম নয়। লখনউ শহরের পরিকাঠামো উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা মুছে যাওয়ার নয়। লখনউ মিউনিসিপ্যাল বোর্ডের সেই সময়ের ভাইস চেয়ারম্যান গঙ্গাপ্রসাদ বর্মার সহযোগী হয়ে অতুলপ্রসাদ লখনউ শহরের সৌন্দর্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন– ওই শহরে একাধিক দৃষ্টিনন্দন বাড়ি, পার্ক, লাইব্রেরি, রাস্তাঘাট তৈরি হতে পেরেছিল ওঁদের উদ্‌যোগে। পরবর্তীকালে মিউনিসিপ্যাল বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন অতুলপ্রসাদ।

১৮৯২ সালে লখনউতে বাঙালিদের উদ্‌যোগে স্থাপিত হয় ‘বিদ্যাসাগর গ্রন্থাগার’। ১৯০২ সালে অতুলপ্রসাদ এই গ্রন্থাগারের সভাপতি হন– আমৃত্যু তিনি এই পদে আসীন থেকেছেন। তাঁর নেতৃত্বে এই গ্রন্থাগার লখনউ শহরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। দুঃস্থ, নিঃসহায় মানুষের সেবা, শুশ্রূষার উদ্দেশ্যে ১৯০৩-এ তৈরি হয় ‘গুডউইল ক্লাব’। এই ক্লাবেরও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হলেন অতুলপ্রসাদ। অকাতরে অর্থসাহায‍্যও করেছেন ক্লাবের কাজে। গুডউইল ক্লাবের ধাঁচে শহরে একাধিক সেবাশ্রম সমিতি গড়ে ওঠে– এর প্রত্যেকটিতেই অতুলপ্রসাদের সক্রিয়-সমুজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল। দুঃস্থ মানুষের সেবার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয় ‘আউধ সেবা সমিতি’– ছেলেদের একত্রিত করে মুষ্টিভিক্ষার মাধ্যমে আর্ত-আতুরের সেবার জন্য অর্থ ও অন্যান্য সাহায‍্য সংগ্রহ করাই এই সমিতির কাজ। বঙ্গভঙ্গের পরের বছর সেটি, ১৯০৬ সাল। এই সমিতিতে সমাজের সব বর্গের মানুষ একত্রিত হয়ে কাজ করতেন। একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবক এই সমিতির হয়ে বন্যা, দুর্ভিক্ষ-সহ নানা দুর্বিপাকে মানুষের পাশে দাঁড়াত। অতুলপ্রসাদ এই সমিতিরও সভাপতির দায়িত্ব নিলেন। এই দায়িত্ব শুধু আলংকারিক নয়, গায়ে-গতরে খেটে, অর্থসাহায‍্য করে তিনি তাঁর ভূমিকা পালন করেছেন যথাযথভাবে। মেয়েদের শিক্ষার জন্য ১৮৯৫ সালে লখনউতে স্থাপিত হল ‘হিন্দু গার্লস স্কুল’ রমেশচন্দ্র ঘোষের উদ্‌যোগে। অতুলপ্রসাদ ১৯০২-তে এই স্কুলেরও পরিচালন সমিতির সভাপতি হলেন। এই স্কুল শুধু বাঙালি মেয়েদের জন্য নয়, সব গোষ্ঠীর মেয়েই এই স্কুলে পড়তে আসত। বেঙ্গলি ইয়ং মেন্‌স অ‍্যাসোসিয়েশন (হকি খেলায় তাদের দেশজোড়া নাম ছিল একসময়), হরিমতী গার্লস স্কুলেরও সভাপতি অতুলপ্রসাদ। একথা ভুলে গেলে চলবে না যে অতুলপ্রসাদের কোনও কূপমণ্ডুকতা ছিল না– শুধু বাঙালি নয়, সব ভাষার, সমাজের সব বর্গের মানুষকে তিনি তাঁর এইসব কাজে ডেকে নিয়েছিলেন। অতুলপ্রসাদের মামাতো বোন, বিখ্যাত গায়িকা সাহানা দেবী লিখেছিলেন– ‘এমনিতে তিনি ভারি শান্ত, ধীর-স্থির। খানিকটা লাজুক, মিষ্টভাষী ও মোলায়েম প্রকৃতির।’ এই ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হত মানুষ তাঁর প্রতি। লখনউয়ের ‘সেন সাহেব’ বা মি. এ পি সেন সকলের পছন্দের মানুষ, ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছিলেন খুব অল্প সময়ে। লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসমিতির অন্যতম সদস্য ছিলেন– শিক্ষক-নির্বাচন কমিটির অনেক বিভাগেরও, বিশেষ করে আইন বিভাগের, সদস্য ছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ‍্যাক্টে বাণিজ্য বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল বিচারপতি গোকরণনাথ মিশ্র এবং অতুলপ্রসাদ সেনের প্রস্তাবের উপর ভিত্তি করেই। লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নাম এ পি সেন হল। 

zoom
দিলীপকুমার রায় ও সাহানা দেবী

এইসব সমাজকল্যাণমুখী কাজের পাশেপাশে অতুলপ্রসাদ আরও একটি খুব প্রয়োজনীয় কাজ করেছেন। তাঁর রাজনীতি-লগ্নতার কথা এখানে বলছি না। বলছি প্রবাসী বাঙালিদের একত্রিত করে বাংলার বাইরে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসারে অতুলপ্রসাদের অবদানের কথা। লখনউতে সেসময় বেশ কয়েকজন গুণী এবং কৃতবিদ্য বাঙালি একত্রিত হয়েছিলেন। কে ছিলেন না সেই তালিকায়! রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায়, রাধাকমল মুখোপাধ্যায়, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ রায়, অবিনাশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নির্মল সিদ্ধান্ত, প্রভু গুহঠাকুরতা, অসিতকুমার হালদার, দ্বিজেন সান্যাল, পাহাড়ী সান্যাল ইত্যাদি। এঁরা মিলে লখনউয়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিচয়কে এক সমুন্নত মানে বেঁধে দিতে পেরেছিলেন। অতুলপ্রসাদ লখনউয়ের এই সমস্ত উদ্‌যোগ, আয়োজনের মধ্যমণি– তাঁর বাড়ি সকলের অবিকল্প গন্তব্য।

১৯২৪ সালের বড়দিনের ছুটিতে লখনউতে বসে অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্সের প্রথম অধিবেশন। অতুলপ্রসাদ এই আয়োজনের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা। প্রস্তুতিপর্বের আসর বসে দিনের পর দিন তাঁর কেশরবাগের বাড়িতে। ভারতবিখ্যাত সংগীত-কলাবিৎ একত্রিত হয়েছিলেন সেই অধিবেশনে– ‘সঙ্গীতসাগর’ ভাতখণ্ডে, শ্রীকৃষ্ণরতনজানকর, ফৈয়াজ খান, চন্দন চৌবে, আলাউদ্দিন খান, এনায়েত খান, বীরু মিশ্র, হাফিজ আলি খান, ফিদা হুসেন– আরও কত সব নাম! অতুলপ্রসাদের গুণমুগ্ধ স্নেহভাজন অধ্যাপক বিনয়েন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত এই অধিবেশনের যে বর্ণনা দিয়েছেন তার একটু নমুনা এখানে দিই, “তিনদিন আমরা খুব উত্তেজনার মধ্যে সময় কাটালাম– অতুলপ্রসাদ প্রথম দিন দোপল্লী টোপী ও আঙ্গারখাঁ, চুরীদার পরে এলেন– ওয়াজিদ আলি শাহ্‌র খাস জলশাঘরে এই তো উপযুক্ত সাজ– লখনউতে ‘ময়ফিল’-এ এই পোষাক পরে বড় বড় নবাব, রাজা, তালুকদাররা আসতেন। সারা হিন্দুস্থানের বিভিন্ন ঘরানা আপন আপন বৈশিষ্ট্য দেখালেন– যে সঞ্চয় লুক্কায়িত ঐশ্বর্য বলে গুণীদের কাছে পূর্ণ উদ্যমে পরিবেশন করলেন– চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। যাঁরা সঙ্গীত শাস্ত্রে প্রবেশ করেননি, আমার মতো, তাঁরা মার্গ সঙ্গীতের মাহাত্ম্য অনুভব করলেন, কিন্তু মাধুর্যের রসাস্বাদন করতে পারলেন না। তানের পর তান, তানের পর তান, অবিরাম তানের নূতন নূতন অভিযান, নাভীদেশের গভীর অন্তঃস্থ হতে উত্থিত গমক, সিংহ নিনাদের মত প্রতীয়মান হচ্ছিল– তবুও এটা বুঝতে পারছিলাম যে এক অনির্বচনীয় শাস্ত্র-বিজ্ঞান মন্থন হচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম, ধূর্জটিপ্রসাদ কিছু নূতন, কিছু পূর্ব-পরিচিত রাগের সঙ্গ পেয়ে বেশ আনন্দ পাচ্ছেন, তবে আমার মনে হয়েছে অতুলপ্রসাদ সঙ্গীতবিজ্ঞানের উচ্চমানের বৈচিত্র্য দেখে আনন্দও পেয়েছেন উত্তেজনাও যথেষ্ট পেয়েছেন, কিন্তু তিনি সৃষ্টির উদ্দীপনা খুব কমই পেয়ে থাকবেন– এই আমার নিজের ধারণা।”

zoom
ওয়াজিদ আলি শাহ্‌

এরকম বড় অনুষ্ঠানের আয়োজনের পাশাপাশি প্রায় প্রতি রবিবারেই অতুলপ্রসাদের বাড়িতে গানের আসর বসত। এছাড়াও লখনউতে কোনও বিশিষ্ট শিল্পী এলেই তাঁদের নির্বিকল্প ঠিকানা হত অতুলপ্রসাদের বাড়ির জলসা। বিভিন্ন সময়ে আবদুল করিম খান, দিলীপকুমার রায়, পণ্ডিত ভাতখণ্ডে, শ্রীকৃষ্ণরতনজানকর, সাহানা দেবী, রেনুকা দাশগুপ্ত-র মতো গানের মানুষেরা অতুলপ্রসাদের প্রাসাদ তাঁদের সংগীতরসসুধায় ধুইয়ে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথও অতুলের অতিথি হয়েছেন। গানে, বাজনায়, গল্পে, খাওয়া-দাওয়ায় অতুলপ্রসাদ এঁদের আপ্যায়িত করেছেন। অতুলের বাড়ির এক রবিবারের জলসায় শ্রীকৃষ্ণরতনজানকর ৪০ মিনিট ধরে গেয়েছিলেন ‘ভবানীদয়ানী মহিষাসুর মরদিনী’, যে-সুর অতুলকে ভৈরবীর রসে ডুবিয়ে তৈরি করিয়ে নিয়েছিল–

‘সে ডাকে আমারে।
          বিনা সে সখারে রহিতে মন নারে!–
প্রভাতে যারে দেখিবে বলি
          দ্বার খোলে কুসুম-কলি,
কুঞ্জে ফুকারে অলি যাহারে বারে বারে,
নিঝর কলকণ্ঠ-গীতি বন্দে যাহারে,
          শৈল-বন পুষ্পকুল নন্দে যাহারে,
          যার প্রেমে চন্দ্র তারা
          কাটে নিশি তন্দ্রাহারা,
যার প্রেমের ধারা বহিছে শত ধারে।’

গত শতাব্দীর দ্বিতীয় বা তৃতীয় দশকে বহির্বঙ্গে বাঙালির মননে ও ব্যবহারে মাতৃভাষার ব্যবহার অত্যন্ত সংকীর্ণ ছিল। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায়ও অনেক সময়েই তারা হিন্দি বা উর্দু ব্যবহার করত। বাংলার বাইরে বেশ কয়েকজন উদ্যমী বাঙালির উৎসাহে প্রবাসী বাঙালির মাতৃভাষা অনুশীলনে জোয়ার এল– রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, বৃন্দাবন ভট্টাচার্য, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী, প্রমথনাথ তর্কভূষণ, লালগোপাল মুখোপাধ্যায়, দেবেন্দ্রনাথ সেন এবং অতি অবশ্যই অতুলপ্রসাদ সেন। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত মাসিকপত্রের সমগোত্রীয় একটা মাসিক পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনা করা হল– কাশীবাসী কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নাম দিলেন ‘প্রবাসজ্যোতি’। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তীকে পরামর্শ দিলেন অতুলপ্রসাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। সুরেশ দেখা করলে অতুল নিজেই বললেন ‘প্রবাসজ্যোতি’-র জন্য গ্রাহক সংগ্রহ করে দেবেন। সুরেশের অনুরোধে “ড্রয়ার থেকে ধূলা ঝেড়ে একখানা ‘এক্সসারসাইজ বুক’ সুরেশবাবুর হাতে দিলেন। পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল একটি পাতায়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বাঁ হাতের চোখের কোণের জল মুছে সুরেশবাবু বললেন, ‘এ দুটি গান আমি লিখে নেবো’।” গান দু’টি হল– ‘মোদের গরব মোদের আশা’ এবং ‘হরি হে, তুমি আমার সকল হবে কবে’। ‘প্রবাসজ্যোতি’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘আ মরি বাংলা ভাষা’ ধ্যানমন্ত্রটি পত্রিকার শীর্ষে উৎকীর্ণ হয়ে।  

zoom
লখনউতে অতুলপ্রসাদ সেনের বাড়ি

কানপুরে ‘বঙ্গসাহিত্য-সমাজ’-এর বার্ষিক উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন অতুলপ্রসাদ বাংলা ১৩২৮ সালে। সেই উৎসবে অতুলপ্রসাদ সভাপতির অভিভাষণে বললেন, ‘প্রবাসে মাতৃভাষার সাধনা ও প্রচারে উদ্দেশ্য যে শুধু মহৎ তাহা নহে; ইহা আমাদের আত্মরক্ষা ও আত্মপুষ্টির জন্য নিতান্ত প্রয়োজনীয়। … প্রবাসে বাংলা সাহিত্য চর্চার অনেক সার্থকতা। তন্মধ্যে একটি এই– যে, আমরা যুক্তপ্রদেশে (সে-সময়ের উত্তরপ্রদেশ) থাকিয়া বাংলা সাহিত্যের উন্নতিকল্পে নূতন উপকরণ যোগাইতে পারি। আদান-প্রদানে সাহিত্যের সৌষ্ঠব বর্ধিত হয়।… মধুকর যেমন নানা কুসুম হইতে মধু সংগ্রহ করিয়া, আপন মধুচক্রের মধুভাণ্ডার পূর্ণ করে, সেইরূপ তাঁহাদের কর্তব্য যে এ দেশের বিবিধ সাহিত্য কুসুম হইতে মধু সংগ্রহ করিয়া আমাদের মধুচক্রের আয়তন বর্ধিত করেন।… এ বিষয়ে আমাদের আর-একটি কর্তব্য আছে।… বাংলা সাহিত্যভাণ্ডার হইতে নূতন নূতন খাদ্য সংগ্রহ করিয়া এদেশের ভাষাকে আরও সুশ্রী ও সবল করিতে পারি। আধুনিক হিন্দি সাহিত্য খানিকটা বাংলা সাহিত্যের অনুকরণে গঠিত হইতেছে।’ বাঙালির অস্মিতার পক্ষে এহেন মন্তব্য গৌরবের বই-কি! সেই অধিবেশনে অতুলপ্রসাদ পাঁচটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন– বাংলার বাইরে যেখানেই বাঙালির বাস সেখানে ‘বাংলা পুস্তক-ভাণ্ডার স্থাপনা’, ‘সাহিত্য-সমিতি স্থাপন করা’, ‘প্রাদেশিক সাহিত্য সম্মিলনী’, ‘যুক্তপ্রদেশে একটি সুলিখিত ও সুপরিচালিত মাসিক পত্রিকা স্থাপন’ এবং ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শাখা বিস্তার করা’। এভাবে বৃহত্তর পটভূমিকায় বহির্বঙ্গে বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতি বিস্তারের এই প্রণোদনা অতুলপ্রসাদ জাগিয়ে তুলেছিলেন। অতুলপ্রসাদের নেতৃত্বে সম্মিলনীর নতুন নামকরণ করা হল ‘উত্তর ভারতীয় বঙ্গ সাহিত্য সম্মিলন’, সঙ্গে ছিলেন কানপুরের ডা. সুরেন্দ্রনাথ সেন, কাশির রায় বাহাদুর ললিতবিহারি সেন। এই নতুন ‘সম্মিলন’-এর খবরে মিরাট থেকে ৯১ বছর বয়সি কেদারনাথ দত্ত সুরেন্দ্রনাথ সেন এবং অতুলপ্রসাদকে চিঠি লিখে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন বহির্বঙ্গে বাঙালির সামগ্রিক জীবনযাত্রার দিশা খুজে দেওয়ার জন্য। 

এই নবগঠিত সম্মিলনের প্রথম অধিবেশন (প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন, পরে যেটা নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন নামে পরিচিত হয় ১৯৫৩ সালে) বসে পরের বছর দোলপূর্ণিমার দিন (১৯ ফাল্গুন, ১৩২৯) কাশী সেন্ট্রাল হিন্দু কলেজ প্রাঙ্গণে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে। এলাহাবাদে দ্বিতীয় অধিবেশনের (১৩৩০) সভাপতি হয়েছিলেন ‘প্রবাসী’ ও ‘মডার্ন রিভিউ’-র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। তৃতীয় অধিবেশন বসে লখনউতে সরলাদেবীর সভাপতিত্বে। এইসব সম্মেলনে সারা ভারতের বাঙালিরা আসতেন, অংশ নিতেন। নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন তো বহুদিন ধরেই বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় তাদের দায় পালন করে আসছে।

প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের এই তৃতীয় অধিবেশনেই সম্মেলনের মুখপত্র হিসেবে ‘উত্তরা’ পত্রিকার প্রকাশের ব্যবস্থা হয়। সম্পাদক অতুলপ্রসাদ, সহ-সম্পাদক সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী। শুরুর দিকে সেই পত্রিকার আর্থিক দায়ভার অনেকটাই বহন করেছিলেন অতুলপ্রসাদ। বাংলার চৌহদ্দির বাইরে থেকে যেসব পত্রিকা প্রকাশিত হত তাদের মধ্যে ‘উত্তরা’ একটা বিশিষ্ট স্থান তৈরি করে নিতে পেরেছিল। রবীন্দ্রনাথের লেখা সেই পত্রিকার গৌরব বৃদ্ধি করেছে। প্রায় ৩০ বছর ধরে প্রকাশিত হয়েছিল সুরেশ চক্রবর্তীর সম্পাদনায়।

অতুলপ্রসাদের জীবন নানা ব্যক্তিগত ঘাত-প্রতিঘাতে দীর্ণ। কিন্তু সেসব তাঁর এই সারস্বত-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে খুব যে একটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তা নয়। ব্যক্তি অতুলপ্রসাদ তাঁর স্খলন-পতন-ত্রুটি-আনন্দ-বিরহকে সরিয়ে রেখে যে-উদ্দীপনায় তাঁর সামাজিক এবং সারস্বত দায় পালন করেছেন তার সঙ্গে তুলনীয় উদাহরণ খুব বেশি নেই বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে।

Atul Prasad Sen Lucknow Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar অতুলপ্রসাদ সেন প্রবাসজ্যোতি প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন সুরেশ চক্রবর্তী

Share this article on