egypt match & a 90 min dream in war stricken Palestine | Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক

প্যালেস্তাইনের ফুটবল-প্রসঙ্গে ফিফা-র অবস্থান কী? সে অবস্থান আদৌ দৃঢ়? ২৬৫টি স্পোর্টস ফেসিলিটি অর্থাৎ ট্রেনিং গ্রাউন্ড, বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবের পৃথক পৃথক বিল্ডিং, জিম– ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পুনর্নিমাণের জন্য, ফিফা কোনওরকম অর্থসাহায্য করেনি। ৫০টি মিনি-পিচ, একটি ফুটবল অ্যাকাডেমি এবং পাঁচটি ফুল-সাইজ স্টেডিয়াম ও একটি জাতীয় স্টেডিয়াম– বাস্তবে হয়েছে শূন্য। শূন্যের মতোই, মৃত ফুটবলারদের উদ্দেশে কোনও অফিশিয়াল বিবৃতি নেই। আজ পর্যন্ত। তবে কি ফিফা ‘জেনোসাইড’ সমর্থন করে?

Published by: Robbar Digital

Posted:July 13, 2026 5:41 pm | Updated:July 13, 2026 7:38 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

‘ফুটবল– কী এমন এক খ্যাপাটে ম্যাজিক, যে ম্যাজিকে যুদ্ধের একাধিপত্য ভঙ্গুর হয়ে যায় আর মিসাইলগুলো হয় একেকটা মাছি! যে ম্যাজিক পারে ৯০ মিনিটের জন্য সমস্ত ভয় থামিয়ে দিতে আর শরীরে ও আত্মায় ছড়িয়ে দেয় এমন এক রোমাঞ্চ– যা কবিতার অভিলাষ, মদ এবং একটা অচেনা মেয়ের সঙ্গে প্রথম আলাপের চেয়েও তীব্র? আমরা ভেবেছিলাম বেইরুটের যে রাস্তাগুলো যুদ্ধ-যন্ত্রণায় মরে গেছে, যে রাস্তাগুলো আজীবনের মতো অবরুদ্ধ হল, সেইসব রাস্তা প্রাণ পেয়েছিল ফুটবলে…’ 

মাহমুদ দারউইশ লিখছিলেন। প্যালেস্তাইনের কবি, অ্যাক্টিভিস্ট। যখন ইজরায়েলি সেনা বেইরুট আক্রমণ করেছিল, ১৯৮২ সাল, দু’মাসের জন্য একটা শহর অবরুদ্ধ! যুদ্ধধস্ত প্যালেস্তিনীয়দের সামনে বেঁচে থাকার শ্বাস আর বিকল্প পথ হাজির করেছিল কে? ফুটবল বিশ্বকাপ। পাওলো রোসির ইতালি। জিকো-সক্রেটিসের ব্রাজিল। আর, একা মারাদোনা। 

zoom
যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরে ফুটবল

আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটা হলুদ রঙের দেওয়াল। ফ্যাকাশে ও দীর্ঘ। দেওয়ালের কোথাও কোথাও পেল্লায় আকারের ফুটবল। আসলে ফুটবলের ছবি। গায়ে অগুনতি বুলেটের দাগ। দেওয়ালের সামনে, বিস্তারিত ফাঁকা মাঠে একে একে উদ্বাস্তু ক্যাম্প। কিছু প্যালেস্তিনীয় কিশোর ফুটবল খেলে সেখানেই। বার্সেলোনার জার্সি গায়ে। সালিম খাদের আল-আশকার ছিলেন তেমনই একজন। ৩২ বছর। একজন প্যালেস্তিনীয় গোলকিপার। এলপিজি সিলিন্ডারের খোঁজ করতে করতে পৌঁছেছিলেন দক্ষিণ গাজা অঞ্চলের এক শহরে– আল-কারারা। সেখানেই, আল-আশকারকে খুন করে ইজরায়েলি সেনা। ২৯ জুন, ২০২৬। 

zoom
নিহত সালিম আল-আশকার

অর্থ হয়, আমেরিকায় বিশ্বকাপ চলছিল তুঙ্গে! ততদিনে হেডলাইন হয়েছে– ‘এ হল গোলকিপারদের বিশ্বকাপ’। কেপ ভার্দের ভোজিনহা। ইরানের আলিরেজা। সৌদি আরবের আল ওয়াইস। কুরাসাও-এর এলয় রুম। প্রত্যেককে বিস্মিত চোখে দেখেছে আপৃথিবী। তুলনায় ছোট দল, ক্ষমতাহীন, বিশ্বকাপের রোশনাই-মঞ্চে ম্রিয়মাণ, তবু জানকবুল লড়েছিল একজন গোলকিপার। বারপোস্টের নিচে। এই তালিকায় আল-আশকারের নাম জ্বলজ্বল করত, কখনও, কোনওদিন। আল-আশকার স্বপ্ন দেখেছিল, একদিন ঠিক বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করবে তাঁর দেশ। প্যালেস্তাইনের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপ খেলবে সে। নিশ্চিত যত গোল সেভ করবে। একা এবং অকল্পনীয়। ওটুকুই তো রেজিস্ট্যান্স বলে জেনেছিল!

কোনও আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে, প্যালেস্তাইনের পতাকা উড়লে গ্যালারিতে, তা অযুত-নিযুত মানুষের অস্তিত্ব। সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে, আউটসাইড ডজ করে একটা গোল। আর পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে জানিয়ে দেওয়া: বিগত তিন বছরে, অর্থাৎ ৭ অক্টোবর, ২০২৩ থেকে আজ, এই মুহূর্ত অবধি ইজরারেলি সেনা যত প্যালেস্তিনীয় ফুটবলার হত্যা করেছে, তাদের সর্বমোট সংখ্যা ৫৬৭। 

zoom
বিশ্বকাপের গ্যালারিতে ফ্রি প্যালেস্তাইন ফ্ল্যাগ

এইবার একটু থামতে হবে। অহেতুক হাহাকারে ভেসে গেলে চলে না। কয়েকটি প্রশ্ন, ভীষণ জরুরি। প্যালেস্তাইনের ফুটবল-প্রসঙ্গে ফিফা-র অবস্থান কী? সে অবস্থান আদৌ দৃঢ়? গাজা ভূখণ্ডে ফুটবল খেলার যোগ্য যেটুকু মাঠ অবশিষ্ট, তা প্যালেস্তাইন স্টেডিয়ামে। সেখানেই ফুটবল প্র্যাকটিস করেন আলি তাফেশ। একটা পা নেই। বোমে উড়ে গেছে। অথচ দুর্দান্ত অ্যাথলিট ছিল সে! আলি তাফেশ বলছে, যে-সমস্ত স্পোর্টস ফেসিলিটি অর্থাৎ ট্রেনিং গ্রাউন্ড, বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবের পৃথক পৃথক বিল্ডিং, জিম– ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, তার সংখ্যা ২৬৫। পুনর্নিমাণের জন্য, ফিফা কোনওরকম অর্থসাহায্য করেনি। পাশাপাশি, ‘ফিফা এরিনা’ নামে একটি প্রজেক্টে বলা হয়েছিল, ৫০টি মিনি-পিচ, একটি ফুটবল অ্যাকাডেমি এবং পাঁচটি ফুল-সাইজ স্টেডিয়াম ও একটি জাতীয় স্টেডিয়াম– প্যালেস্তাইনের জন্য বরাদ্দ করেছে ফিফা। বাস্তবে হয়েছে শূন্য। শূন্যের মতোই, মৃত ফুটবলারদের উদ্দেশে কোনও অফিশিয়াল বিবৃতি নেই। আজ পর্যন্ত। তবে কি ফিফা ‘জেনোসাইড’ সমর্থন করে? মৃত ফুটবলারদের আত্মা নেমে আসে গাজা ভূখণ্ডের নানা স্টেডিয়ামে। দেখে, অধিকাংশই ধ্বংসপ্রাপ্ত। কিছু স্টেডিয়ামে ভিটেহারানো মানুষের শিবির। একটা স্কুলে, আলো জ্বলছে। 

zoom
যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরে ম্যাজিক

একটা ল্যাপটপ। বাকিটুকু অন্ধকার। ল্যাপটপ ঘিরে একঘর মানুষ। আট থেকে আশি। ইন্টারনেট শাট-ডাউন হয়ে যেতে পারে, বাফার করতে পারে, কিন্তু স্ক্রিনে চলছে ফুটবল বিশ্বকাপ। কী এমন খ্যাপাটে সেই ম্যাজিক! যে ম্যাজিক ঘনঘোর দুঃসময়েও ছড়িয়ে দিলেন ফাদি আল-আরাউই– একজন গাজা স্ট্রিপ প্রিমিয়ার লিগের ফুটবলার। একটা ক্যাফে, যেখানে মিশর আর মরক্কোর জাতীয় পতাকা টাঙানো। বিদ্যুৎ সরবরাহের দু’খানা বিকল্প ব্যবস্থা এবং একটা ব্যাটারি– ব্যাক আপ হিসেবে প্রস্তুত রেখেছেন, আলা বাবলি। রয়্যাল ক্যাফের মালিক। যেন নির্বিঘ্নে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো দেখতে পায় অসংখ্য প্যালেস্তাইনের মানুষ। সাদা রঙের পর্দা আর এক্সটেনশান কর্ড জোগাড় করেছিলেন মহম্মদ হোসেন। নড়বড়ে ইন্টারনেট সত্ত্বেও, একটা উদ্বাস্তু ক্যাম্প হয়ে উঠেছে ফুটবল ফ্যান পার্ক। টুকরো টুকরো দৃশ্য, হারিয়ে যাবে জানি। এ-সভ্যতা পুঁছবে না কখনওই। তবু রিয়েল মাদ্রিদের ৭ নম্বর জার্সি গায়ে যে প্যালেস্তিনীয় বালক বিস্ময়ে তাকিয়েছিল সাদা পর্দায়, সে স্বপ্ন পেয়েছিল। দৃঢ় কোনও খুঁটি পেয়েছিল। ভুলে গিয়েছিল, যে কোনও মুহূর্তে ধুলো হয়ে যেতে পারে ওই স্কুল, ওই ক্যাফে, ওই উদ্বাস্তু ক্যাম্প। 

মনে হবে, ডিসটোপিয়া। দু’পাশে ভাঙাচোরা কয়েকটি হাইরাইজ। অর্ধেক ছাদ। লোহার খাঁচা। মিহি মিহি ধুলো। ধ্বংসের। ধ্বংসের ভেতরে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ। ধ্বংসের ঘাড়ে-মাথায় উঠে পড়েছে কিছু মানুষ। ঠাসাঠাসি করে। দেখছিল, আর্জেন্টিনা বনাম মিশর। গাজা শহরে। ঝুলছিল কয়েকটা আলো আর মিশরের লাল-কালো পতাকা।

zoom
ফুটবল একটা স্বপ্নালু রাত

কে আয়োজন করেছিল সেই ফুটবল স্ক্রিনিং-এর? মহম্মদ আল-ওয়াহিদি। ৫৭ বছর। একজন প্যালেস্তিনীয় ত্রাণকর্মী। মিশর সরকারের তরফ থেকে যে ত্রাণসামগ্রী এসে পৌঁছয় গাজায়, আল-ওয়াহিদি সেই কমিটির প্রধান। অথচ কিক-অফের আগেই মৃত্যু। একটা ইজরায়েলি মিসাইল, আল-ওয়াহিদির ট্যাক্সি গুঁড়িয়ে দেয়। আর কিছুক্ষণ পরেই, লিওনেল মেসির গোলে কামব্যাক করেছিল আর্জেন্টিনা। 

মাহমুদ দারউইশ বলেছিলেন, ফুটবল ইজ দ্য নোবেলেস্ট ওয়ার। সবচেয়ে মহৎ যুদ্ধ! মৃত ফুটবলারদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই হাজির হয়েছিলেন স্ক্রিনিং-এ। সেখানে ফুটবল কেবল এন্টারটেনমেন্ট নয়। সেখানে ফুটবল একটা স্বপ্নালু রাত। যুদ্ধবিমান, ড্রোনের শব্দ আর অনর্গল বম্বিং ভুলে থাকার ৯০ মিনিট। ট্রমা নেই। মৃত্যুভয় নেই। খিদে নেই। বিশ্বকাপের সম্প্রচার চলছে…

Argentina Egypt Egypt Argentina match FIFAWorldCup2026 Football Palestine Palestine Genocide Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on