Robbar

ডাগআউটের ফেলু মিত্তির

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 17, 2026 5:44 pm
  • Updated:July 17, 2026 5:44 pm  

জর্জে সাম্পাওলির সহকারী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। সাদামাঠা। ট্র‍্যাকপ্যান্ট আর টি-শার্ট। ব্যস। সেদিনও যা। আজও তাই। এক। কেবল মাঝের সময়টায় তিনি বদলে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাস। বদলে দিয়েছেন আর্জেন্টিনাকে। তিনি, লিওনেল স্কালোনি। আলবিসিলেস্তেদের স্বপ্নের কারিগর। লিওনেল স্কালোনির ফুটবল দর্শন ঘোরতর লাতিন আমেরিকান। তিনি এই মডেলটির মাধ্যমে বিশ্বকে বুঝিয়েছেন খাতা-কলমে টেকনিক্যালি ও ট্যাকটিক্যালি এগিয়ে থাকা দলকে টেক্কা দিতে যে ওভার পারফরম্যান্স দরকার, সেই পারফরম্যান্স আসে প্ল্যানিং থেকে।

অর্পণ গুপ্ত

আর্জেন্টিনা জিতে গেল। পরপর দু’বার বিশ্বকাপ ফাইনালে চলে গেল আলবিসিলেস্তেরা। লিওনেল মেসি জিতে গেলেন। যে লিওনেল মেসি এককালে হারতে হারতে ক্লান্ত হয়ে অবসর নিয়ে নিয়েছিলেন, তিনিই যেন পেয়ে গেলেন একটা ‘সব পেয়েছির দেশ’। এই লিওনেলকে কেরিয়ার সায়াহ্নে এমন উপহার যিনি দিলেন, তিনি আরেক লিওনেল। লিওনেল স্কালোনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম তিন সফলতম ম্যানেজারের মধ্যে একজন হয়ে ঢুকে পড়েছেন যিনি মধ্য-চল্লিশেই।

ডুয়ো লিও: লিওনেল মেসির সঙ্গে লিওনেল স্কালোনি

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচে লিওনেল স্কালোনি কী করলেন? জাদু? নাহ্। একেবারে মোক্ষম পরিকল্পনা!

জুলিয়ানো সিমিওনে। প্রথম দলে চলে এলেন। অতিবড় সমর্থকও কি একথা মানবেন যে, সিমিওনে সেমিফাইনালে মাঠে নেমেই দৃশ্যমান কোনও শৈল্পিক মুভ বা বল-প্লে করে উঠতে পেরেছেন? তাঁর একাধিক অপরিণত সিদ্ধান্তে ‘উইদাউট দ্য বল’ আর্জেন্টিনা সমস্যায়ও পড়েছে। এমনকী, আর্জেন্টিনার দুই স্টপার লিসান্দ্রো এবং ক্রিস্টিয়ান রোমেরো হলুদ কার্ডও দেখেছেন। বারবার ফাউল করা, বলকে প্রবল খিদে নিয়ে তাড়া করার বাইরে খালি চোখে দেখা যায়, এমন কোনও ফুটবল তিনি খেলেননি। কিন্তু তাও এ-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, সেমিফাইনালের মতো হাইভোল্টেজ ম্যাচে স্কালোনির অন্যতম সফল মুভ এই সিমিওনে-কে নামানো।

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জুলিয়ানো সিমিওনে

এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। এক, সিমিওনে-কে মাঠে নামানোয় মেসি কিছুটা সেন্ট্রালি চলে আসতে পারলেন প্রথমার্ধে, এ-কথা মেসি নিজেও জানেন বেলিংহ্যাম-অ্যান্ডারসন জুটি তাঁকে মিডল করিডরে জায়গা দেবে না। দেয়ওনি। কিন্তু সিমিওনে ডানদিকে গিয়ে স্পেনস এবং গর্ডনের স্বাভাবিক কম্বিনেশন প্লে-টা নষ্ট করে দিলেন। ‘কেওস বল’ বলে একটা কথা ইদানীং ফুটবলে খুব জনপ্রিয় হয়েছে। মনে আছে, ‘দ্য ডার্ক নাইট’ ছবিতে জোকার কী বলেছিল?

“I’m an agent of chaos. Oh, and you know the thing about chaos? It’s fair!”

জুলিয়ানো সিমিওনেও তাই। ইংল্যান্ড হাইপ্রেস শুরু করায় কাজটা সহজ হয় সিমিওনের জন্য। এনার্জি বার্নিং এ-বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হিউমিডিটির কারণে প্রতিপক্ষের এনার্জি ড্রেইন করার দিকটি মাথায় থাকছে সব কোচের। সিমিওনে ক্রমাগত ফাউল করে যেতেই ইংল্যান্ডও পাল্টা আরও আগ্রাসী হল। এটাই চেয়েছিলেন স্কালোনি। ইংল্যান্ডের ‘ম্যান টু ম্যান মার্কিং’ কিংবা হাইপ্রেসিং ফুটবল থেকে খেলাটাকে নিজেদের হাতে নিয়ে আসতে। আর কে না জানে, এই ঘোলাজলের ফুটবলে আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি সফল দল তামাম দুনিয়ায় নেই!

আর্জেন্টিনা গোটা বিশ্বকাপে ‘ওয়াইড স্পেস’ অর্থাৎ বাংলা ময়দানে ‘মাঠ চওড়া’ করে খেলার দিকে যেতে পারেনি নিজেদের সীমাবদ্ধতার কারণে; সিমিওনে থাকায় ইংল্যান্ডকে পাল্টা এই চালটিই দিলেন স্কালোনি। সাইডব্যাক ও হাফেরা যত মাঠের মাঝখান থেকে ধারে সরবে, মাঝে বাড়বে জায়গা। হাফস্পেসে ম্যাক-আলিয়েস্টার এবং অবশ্যই লিওনেল মেসি জায়গা পাবেন। দ্বিতীয় প্ল্যানটি খুব সফল না-হলেও প্রথম প্ল্যানটি কিন্তু কাজে লেগে যায়। ইংল্যান্ড, যতক্ষণ সিমিওনে প্রথমার্ধে মাঠে থেকেছে, ততক্ষণ নিজেদের কম্বিনেশন প্লে-র বদলে চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে আর্জেন্টিনাকে ফিজিক্যালিটিতে চ্যালেঞ্জ করায়। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ফাউল, যা তাঁদের জন্য ভয়ংকর বিপদটি ডেকে আনছিল।

আরও একটি বিষয় স্কালোনির মগজাস্ত্রে ছিল। রডরিগো ডি পলের মতো ‘উইদাউট দ্য বল’-এ হাই স্ট্যামিনা ও হাই ওয়ার্করেট রাখা প্লেয়ারকে ৬০ মিনিটের পর মাঠে নামিয়ে তাঁর পুরো এনার্জিকে ব্যবহার করে খেলার কন্ট্রোল নেওয়া। প্রয়োজনে আক্রমণে ঝাঁঝ বাড়াতে গেলে তাঁকে পারাডেসকে তুলতে হবে মাঠ থেকে, তখন ডি পল সরে আসতে পারবেন মাখখানে। সিমিওনে পাক্কা এক ঘণ্টা মাঠে থেকে ডি পলের বেস্ট ভার্সানটিকে মাঠে নিয়ে আসার সুযোগ করে দিলেন।

তারপরেও ইংল্যান্ড গোল পায়। নাহুল মলিনা এ-বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে দুর্বল পারফর্মার। তাঁর পিছন থেকে এসে গোল করে যান গর্ডন। ম্যাচের বয়স তখন ৫৫ মিনিট। এরপর ইংল্যান্ড ঠিক কী করল? থমাস টুখেলের মতো কোচ ৭০ মিনিটে গর্ডনকে তুলে নামালেন এজরি কোনসাকে। চলে গেলেন পাঁচ ব্যাকে। তাতেও ক্ষান্ত হলেন না, ডেক্লান রাইসকে তুলে নামালেন ড্যানিয়েল বার্নকে। টুখেল আধুনিক ফুটবলের একজন প্রাজ্ঞ কোচ হয়ে বুঝলেন না, লো-মিড ব্লক মানেই বক্সে ডিফেন্ডারের জঙ্গল বানানো নয়।

হতাশ থমাস টুখেল

ইংল্যান্ডের ফুটবলের সমস্যাই হল তাঁদের নিজস্ব কোনও ফুটবল-দর্শন না-থাকা। স্পেনের ফুটবলে ক্লাবস্তর থেকে অসংখ্য স্প্যানিশ কোচ কোচিং করান। ইতালিতেও তাই। জার্মানি শেষ এক দশকে এই সমস্যায় ভুক্তভোগী হলেও দীর্ঘদিন নিজেদের সংস্কৃতিকে আঁকড়ে সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু ইংল্যান্ডের ক্লাব ফুটবলকে নিয়ন্ত্রণই করেন স্প্যানিশ-জার্মান কিংবা ইতালীয় কোচরা। শুধু টপ লেভেল না, তৃণমূল স্তরেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাই। ঠিক এ-কারণেই, যা নিজেদের শক্তি নয়, তাতেই অঙ্ক কষে চলে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন থমাস টুখেল। আর্জেন্টিনা এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। প্রথম ৬০ মিনিটের খেলায় ইংল্যান্ড স্পেস পাচ্ছিল। গোলও পেল সেই স্পেসকে ব্যবহার করেই। কিন্তু গোল খাওয়ার পরেই খেলা পাল্টাল। পাল্টাল কারণ, ফেলে আসা ৬০ মিনিটে নিজের অজান্তেই আর্জেন্টিনার ফাঁদে পা দিয়ে ইংল্যান্ড ততক্ষণে নিজেদের এনার্জি শেষ করে ফেলেছে। পাঁচ ব্যাকে চলে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্তে তাঁরা অবচেতনে বিশ্বাস করল আর্জেন্টিনার আক্রমণের সামনে এই ডিফেন্সিভ গেমই অপশন। থমাস টুখেল নিজের দলকে ধারণাটুকুই পরিষ্কারভাবে দিতে পারেননি যে, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ‘উইদাউট দ্য বল’-এ নিজেদের বক্সে ঢুকে আসা কোনও দিন নিরাপদ অপশন হতে পারে না। তাই খেলোয়াড়েরা মাঠের ভিতর নিজের অজান্তেই সেই লো-মিড ব্লকে সরল।

কেপ-ভার্দের বিরুদ্ধে এর চেয়ে ঢের কঠিন লো-মিড ব্লক ভেঙে এসেছেন মেসি-আলভারেজরা। ইংল্যান্ডের সবচেয়ে দুর্বল অংশ এরিয়াল বলে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের এক্সপোজড হয়ে যাওয়া। ঠিক সেই কারণেই লম্বা চেহারার নিকো গঞ্জালেসকে নামিয়ে বক্সে এরিয়াল বলে একজন স্টপারকে ডিসট্র‍্যাক্ট করার কাজটি করলেন স্কালোনি, একইসঙ্গে বক্সের ওপর সেকেন্ড বলটিকে আরও ক্ষিপ্রভাবে আক্রমণ শুরু করলেন। অন্যদিকে, লাউটারোকে নামালেন বক্সে অতিরিক্ত খেলোয়াড় বাড়াতে ও স্পেস তৈরি করতে আর সবশেষে মন্টিয়েলকে মেসির সঙ্গে জুড়ে দিলেন রাইট ফ্ল্যাঙ্কে ক্রমাগত এরিয়াল বল তোলার কাজে। এনার্জিতে ভরপুর ডি পল থাকায় পারাডেসের মতো খেলোয়াড়কে তুলে নিতেও আর দ্বিধা করার কথা ছিল না। স্কালোনি করেনওনি। কেল্লাফতে! এরপর গোল আসা ছিল সময়ের অপেক্ষা। এল‌ও।

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লওটারোর জয়সূচক গোলের মুহূর্ত

আলেক্সিস ম্যাক-আলিয়েস্টার-এঞ্জো ফার্নান্দেজ-মেসিরা জানেন, দিনের পর দিন একসঙ্গে একের পর এক বড় ম্যাচ খেলতে খেলতে এই দলটাও জানে, তাঁদের সবথেকে বড় সম্পদ হল মোমেন্টামকে কাজে লাগানো। একবার যদি ঘোড়ার জিনে টান পড়ে, তাহলে আর্জেন্টিনা কেবল দৌড়বে, তা-ই নয়, সামান্যতম মুহূর্তকেও এনক্যাশ করবে। যার প্রতিফলন হবে স্কোরলাইনে।

লিওনেল স্কালোনির ফুটবল দর্শন ঘোরতর লাতিন আমেরিকান। তিনি এই মডেলটির মাধ্যমে বিশ্বকে বুঝিয়েছেন খাতা-কলমে টেকনিক্যালি ও ট্যাকটিক্যালি এগিয়ে থাকা দলকে টেক্কা দিতে যে ওভার পারফরম্যান্স দরকার, সেই পারফরম্যান্স আসে প্ল্যানিং থেকে। ম্যাক-আলিয়েস্টার বা এঞ্জো আর্জেন্টিনার হয়ে যা খেলেন, তার তুলনায় অনেক কম পারফর্ম করেন ক্লাবস্তরে। কারণ, লিওনেল স্কালোনির ফুটবল মস্তিষ্ক!

আর্জেন্টিনার স্বপ্নের কারিগর

পজিশনাল ফুটবলের যে বাড়বাড়ন্ত দুনিয়া-জুড়ে শুরু হয়েছিল, তারই বিপ্রতীপে আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই মডেলটির সফল রূপায়ণ করে দেখিয়ে দিলেন– ‘অ্যাক্সিডেন্টাল কোচ’ স্কালোনি– সাম্পাওলির সহকারী হিসেবে যিনি এসেছিলেন। সাদামাঠা। ট্র‍্যাকপ্যান্ট আর টি-শার্ট। ব্যস। সেদিনও যা। আজও তাই। এক। কেবল মাঝের সময়টায় তিনি বদলে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাস।

লিওনেল স্কালোনি তাই উদাহরণ। বাঙালির বাজার করতে বেরিয়ে ভুটান চলে যাওয়ার যে চিরকালীন রোম্যান্টিসিজম– বাংলা শার্ট-প্যান্ট-একটা কলম-অথচ যার বুকপকেটে বিশ্বকে চমকে দেওয়া ভাবনার কুচি, তা-ই লিওনেল স্কালোনি!

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন গোলগপ্‌পো-র অন্যান্য লেখা

……………………