Robbar

মার্জিমুলুক ঝাপসা রাত

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 7, 2026 3:54 pm
  • Updated:June 7, 2026 6:32 pm  

তাঁর গোটা জীবন জুড়েই রয়েছে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ক্ষতচিহ্নের দলিল। পার্সেপোলিস তারই সাক্ষ্য বহন করছে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনের কড়া সমালোচনা করেছেন মার্জান। ২০২২ সালের ‘উওম্যান, লাইফ, ফ্রিডম’ আন্দোলনের সময় প্রকাশ্যে প্রতিবাদীদের সমর্থন করেন তিনি। নারী-স্বাধীনতা কখনওই তাঁর কাছে নিছক কাগুজে-স্লোগান ছিল না। বাস্তবের মাটিতে আজ যেখানে মিসাইলের ছোঁয়ায় নিহত অসংখ্য নিষ্পাপ শিশুর কবর খুঁড়তে হচ্ছে, হয়তো সেখানেই বসে একদিন কোনও এক মেয়ে বুঝতে চেষ্টা করবে– ‘হিজাব’ কেন তার জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে উঠল? মার্জি-মাফিক না হোক, মর্জিমাফিক তো হওয়া উচিত!

স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

বছর দশেকের মেয়ে। ডাকনাম ‘মার্জি’। সেদিন ইশকুলে গিয়ে তার বেজায় মুখভার। মার্জির বন্ধুদের হালও তথৈবচ। তোম্বা মুখ। বুঝভুম্বুল। খানিক বিরক্তির গুঁড়ো যেন লেগে সকলের চোখেমুখে। কারণ? ওইদিন থেকেই অদ্ভুত এক পোশাক বাধ্যতামূলক হয়ে গেল মার্জিদের স্কুলে। ‘হিজাব’। নতুন এই শব্দটা, বেশ ঘনঘনই শুনতে লাগল তারা। কানাঘুষোয় শোনা গেল, এই পোশাক-ফতোয়া না কি নতুন শাসনকালের কড়া নিয়ম! তবে ছোটদের মাথা ও মন দুই-ই পরিষ্কার। তারা দিব্যি এর একটা সমাধান বাতলে দিলে। খানিক বাদেই দেখা গেল মার্জি আর তার বন্ধুরা হিজাবকে দড়ি বানিয়ে লাফালাফি করছে, খেলছে আর শখের অভিনয়ে বুঁদ হয়ে আছে! কিন্তু মার্জি ব্যতিক্রমী। বয়সে ছোট হলেও সে দিব্য টের পায়, দেশের হাল টলমল।

হিজাব যেদিন শুরু হল, পার্সেপোলিস বই থেকে

সময়টা ১৯৭৯-’৮০। ইসলামি বিপ্লবের জয়পতাকা সদর্পে উড়ছে ইরানে। রাজার রাজত্ব খতম! ৪০ বছরের শাসনভার ফেলে ইরানের শেষ শাহ্, মহম্মদ রেজা পহলাভি তখন পালিয়ে গিয়েছেন মিশরে। নতুন নেতা রুহোল্লা খোমেনেই-এর নিয়মকানুন টের পেতে দেরি হল না মোটেই। রাষ্ট্রযন্ত্র সটান সেঁধিয়ে গেল দেশের মানুষের অন্দরমহলে। ইরানের একদল মানুষ এই পরিবর্তনে মহাখুশি, অন্যদিকে আরেকদল বুঝল ‘বেদনায় ভরে গিয়েছে পেয়ালা’। সময়ের ইতিহাস রেখায়-লেখায় ধরে রাখার মতো মানুষ পাওয়া দুষ্কর! অবিশ্যি আটের দশকে ইসলামিক রিপাবলিক হয়ে ওঠা ইরান ঠিক কী কী পেল, আর কী-ই বা খুইয়ে ফেলল তার হদিশ এখনও মেলে। সাদা-কালো কার্টুনধর্মী রেখায়-লেখায় বাঙ্ময় ইরানের সেই রাজনৈতিক পালাবদলের খতিয়ান! কে লিখেছে? কে এঁকেছে?– কেন, সেদিনের সেই দশ বছর বয়সী মেয়ে, ‘মার্জি’! আজকের পৃথিবী যাঁকে একডাকে চেনে মার্জান সাত্রাপি নামে! ইরানের এই ভূমিকন্যা ছিলেন ফ্রান্সের অন্যতম সেরা-গ্রাফিক নভেলিস্ট। ‘ছিলেন’ শব্দটা তাঁর নামের পরে বসে গেল গত ৪ জুন। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে হঠাৎ করেই ‘নেই’ হয়ে গেলেন ‘মার্জি’। এই অসময়ে প্রস্থান নিঃসন্দেহে বেদনার। কারণ, রাজনৈতিক আবর্তে হাঁসফাঁস করতে থাকা ইরানের শিক্ষিত জনসমাজের যন্ত্রণা তাঁর মতো আর কে-ই বা পড়তে পেরেছিলেন? ‘পার্সেপোলিস’ গ্রাফিক নভেলের দু’টি খণ্ডে মার্জান তাঁর নিজের জবানিতেই বিশ্বের তামাম পাঠকদের শুনিয়েছেন ইরানের স্মৃতি-সত্তা-ভবিষ্যৎ!

মার্জান সাত্রাপি

আত্মপ্রকাশের দু’দশক পেরিয়েও ‘পার্সেপোলিস’ আজও কেন প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক? উত্তরটা বহুস্তরীয়। নিছক বিনোদন নয়, ‘পার্সেপোলিস’ এক কিশোরীর বেড়ে ওঠার গল্পের সঙ্গে অবলীলায় বুনে নেয় প্রতিবাদের ভাষা, প্রতিরোধের আগুন। ২০২৬-এ মধ্যপ্রাচ্য ফের অগ্নিগর্ভ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে ইরানের রাষ্ট্রনায়ক আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি সপরিবারে নিহত। দেশ কার্যত ধ্বংসস্তূপ। চারিদিকে অস্থিরতা। এমন পরিস্থিতিতে ‘পার্সেপোলিস’ আবারও দেখাচ্ছে নতুন পথের দিশা। জিওপলিটিক্যাল বা ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে রাজনৈতিক আগ্রাসন সাধারণ মানুষের জীবনে কোন অর্থ বয়ে আনে– তা বোঝার জন্য ‘পার্সেপোলিস’ নির্দ্বিধায় প্রথম পাঠ!

পার্সেপোলিসের নানান সংস্করণ

মার্জান সাত্রাপির ছবিকথার সবচেয়ে বড় গুণ– তিনি বহির্বিশ্বের উপাদানগুলিকে জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনার মধ্যে খুঁজে পান। সেই সঙ্গে আবিষ্কার করতে থাকেন পাঠকও! ছোট মেয়ে মার্জি দেখে ডিনার টেবিলে বসে তার বাবা-মা দেশের কথা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছে। শাহ্-এর গোপন পুলিশবাহিনী, বন্দি, আন্দোলন সবই উঠে আসে কথায় কথায়। অবিশ্যি ভয়ের কারণও ছিল। একটি রাজনৈতিক মিছিলে মৌলবাদী ফতোয়ার বিরূদ্ধে স্লোগান দেওয়ার সময় মার্জানের মায়ের ছবি তোলেন এক জার্মান ফোটোগ্রাফার। বিদেশের প্রথম সারির একাধিক সংবাদপত্রের পাশাপাশি ছবিটি ইরানের একটি পত্রিকাতেও ছেপে বেরয়। স্বভাবতই ভয় পেয়েছিলেন সাত্রাপির মা-বাবা। নব-নির্বাচিত রাষ্ট্রযন্ত্রের কোপ থেকে বাঁচতে চুলের রং পালটে, কালো রোদচশমা ব্যবহার করে চেহারা বদলাতে হয়েছিল মার্জানের মা-কে!

মার্জানের মায়ের ছবি তোলেন এক জার্মান ফোটোগ্রাফার

মার্জান খানিক শুনে, খানিক দেখে বুঝতে চেষ্টা করে। একদিন শহরের দেওয়াল ছেয়ে যায় বিপ্লবীদের পোস্টারে। মার্জির শিশুমনে রোমাঞ্চ আনে বিপ্লব। শোনা গল্পের রসদ ঝেড়েঝুড়ে সে মনে মনে নিজেকেই ভবিষ্যতের ‘নবি’ বলে ভাবতে শুরু করে। ‘বড় হয়ে কী হতে চাও?’ স্কুলে এক শিক্ষিকা মার্জিকে জিজ্ঞেস করায় সে অম্লানবদনে জানায় যে, সে পয়গম্বর হতে চায়। সে কী! ডাক্তার নয়, ইঞ্জিনিয়ার নয়, শিল্পী বা উকিল নয়– শেষমেশ নবি! থতমত শিক্ষিকা সটান তলব করলেন মার্জির বাবা-মাকে। মেয়ের ইচ্ছে শুনে তাঁরাও পড়লেন চিন্তায়। মার্জি বুদ্ধিমতী, সমাজের অলিখিত নিয়মকানুন সে আড়েসাড়ে বুঝেছে এতদিনে। সব সত্যি সবসময় বলতে নেই। তাই বাবা-মা যখন একদিন নিরিবিলিতে তাকে ফের জিজ্ঞেস করে, ‘বড় হয়ে কী হবি?’ তখন মার্জি জানায়, ‘আমি ডাক্তার হব’। আশ্বস্ত হন মা ও বাবা দু’জনেই। কী আশ্চর্য, সেইদিন রাতেই ঈশ্বর-দর্শন হয়ে যায় মার্জানের!

মার্জানের ছিল বিভিন্ন বিষয়ে বই পড়ার অভ্যেস

নিজের সহপাঠী বা সমবয়সীদের চেয়ে ঢের বেশি বইপত্তর পড়ার দরুণ বাস্তব-কল্পনার মাঝামাঝি স্বপ্নচারণের এক নিজস্ব ক্ষেত্র ছিল সাত্রাপির। প্যালেস্তাইনের শিশুদের ভবিষ্যৎ, ফিদেল কাস্ত্রো হাতুড়ি তারা, ভিয়েতনামের যুদ্ধ, ইরানের দিকপাল রাজনীতিবিদ ও দেশনায়কদের কাহিনি জুড়ে ছিল তার মনোজগৎ। ‘ডায়ালেকটিক মেটিরিয়ালিজম’ বইখানা পড়তে পড়তে রেনে দেকার্তে আর কার্ল মার্কসের কাল্পনিক কথোপকথনে বুঁদ হয়ে যায় মার্জি। সাত্রাপির রসবোধ অতুলনীয়। শিশু মার্জিকে দিয়ে তিনি বলিয়ে নেন অনেক কথা। যেমন, একদিন রাতে নিজের ভাবজগতের ভগবানের চেহারার সঙ্গে কার্ল মার্কসের আশ্চর্য মিল টের পায় সে। তফাত একটাই– মার্কসের মাথার চুল ভগবানের চেয়েও বেশি ঢেউ খেলানো। রাত্তিরে মাঝেমধ্যেই ভগবানের সঙ্গে বৈঠক হয় তার। ভগবান একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি আর নবি হওয়ার কথা ভাবছ?’

মার্জি বলে, ‘আমরা বরং অন্য কিছু নিয়ে কথা বলি?’

ভগবান নাছোড়– ‘তোমার কি সত্যিই মনে হয় আমায় কার্ল মার্কসের মতো দেখতে?’

ছোট্ট মেয়ে একরোখা, ‘আমি তো বললাম, অন্য কোনও বিষয়ে কথা হোক।’

বিষন্ন ভগবান যেন মানুষের দুঃখের সবটুকু মুখে মেখে স্বগতোক্তির সুরে বললেন, ‘আগামিকাল আবহাওয়া অনেকটাই ভালো হয়ে যাবে।’

মার্জানের ভগবান ছিলেন কার্ল মার্কসের মতো দেখতে

এখানেই মার্জান সাত্রাপি অনন্য! একজন গ্রাফিক নভেলিস্ট হয়ে ইঙ্গিতবাহী ধারণায় পাঠককে সরাসরি সত্যের সামনে, বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করালেও, বিশ্বাসের এক চিলতে জমি কখনওই কেড়ে নেন না পায়ের তলা থেকে। আশায় বাঁচে চাষা। সেই আশা– যা চরম দুর্দিনেও নোনা ধরা দেওয়ালে ঝুলতে থাকা ভগবানের ছবি হয়ে পীড়িত মানুষকে ছলছল চোখে জুগিয়ে যায় নীরব আশ্বাস।

ইরানের সমগ্র ইতিহাস ধরা পড়েছে মার্জান সাত্রাপির তুলিকলমে

মার্জি দেখে, অবাক চোখে। নতুন সরকার শরিয়তি আইন চাপিয়ে দেয়, মেয়েদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করে, কো-এড স্কুল তুলে দেয়। যে শিক্ষকেরা একসময় প্রগতিশীলতার কথা বলতেন, তাঁরাই পিছনের দিকে হেঁটে রাষ্ট্রের শেখানো বুলি আউড়ে যান। বিপ্লব স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয়– আর রাষ্ট্র সেই প্রতিশ্রুতির ভাষাকে ক্ষমতার পরিভাষায় অনুবাদ করে। রাষ্ট্রের পুনর্গঠন যেন ক্রমেই ছাউনি ফেলতে থাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যক্তিগত কুঠুরিতে। ‘পার্সেপোলিস’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্বের একটিতে আমরা দেখি মার্জির কাকা আনুশ-কে। পুলিশের খাতায় তিনি বিপ্লবী বলে চিহ্নিত। শাহ্-বিরোধী আন্দোলনের সময় জেলও খেটেছেন বহুদিন। ইসলামিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি জেল থেকে ছাড়া পান। বাড়ি ফেরেন একসময়। মার্জির চোখে তার কাকা (আনুশ) কোনও নায়কের চেয়ে কম কিছু নন। রোজ রাতে কাকার থেকে তাঁর জীবনের রোমহর্ষক অ্যাডভেঞ্চারের গল্প শুনে বিভোর হয়ে যায় মার্জি। কিন্তু দুর্দিন অতর্কিতে আঘাত হানে! পুরনো শাসনযন্ত্রের দেখানো পথে হেঁটে নতুন সরকারও আনুশকে রাষ্ট্রের শত্রু বলে ঘোষণা করে। মৃত্যুদণ্ড হয় আনুশের। বিপ্লবের চিরন্তন ট্র্যাজেডি শিশুমনে রেখে যায় প্রবল অভিঘাত। সে ধাক্কা পাঠকদেরও বিচলিত করে বইকি। যে বিপ্লব মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই বিপ্লবই কখনও কখনও নিজের সন্তানদেরও গ্রাস করে।

কাকা আনুশ ছিলেন মার্জির চোখে মস্ত নায়ক

পার্সেপোলিসের পটভূমিতে এর পাশাপাশিই উঠে এসেছে ইরান-ইরাক যুদ্ধের (১৯৮০-১৯৮৮) কিছু মর্মান্তিক আখ্যানের কোলাজ। শহর জুড়ে সাইরেনের দাপট, বোমা পড়ছে অহরহ, বাড়িঘর ধ্বংস হচ্ছে চোখের নিমেষে। যুদ্ধে প্রচুর পরিমাণ সেনা প্রয়োজন– অতএব নরম মাটিতে আঁচড় কাটাই শ্রেষ্ঠ পন্থা। স্কুলে দরিদ্র পরিবারের ছেলেদের নানা ছলছুতোয় পাঠানো হচ্ছে যুদ্ধে! প্রত্যেককে দেওয়া হচ্ছে একখানি করে চাবি। তারা সেটা গলায় ঝুলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছে! তাদের বলা হচ্ছে– যুদ্ধে শহীদ হলে, এই চাবি না কি তাদের জন্য স্বর্গের দরজা খুলে দেবে। এই মিথ্যে প্রতিশ্রুতির মোহে অন্ধ হয়ে অকালে ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য তরতাজা প্রাণ!

স্কুলে দরিদ্র পরিবারের ছেলেদের নানা ছলছুতোয় পাঠানো হচ্ছে যুদ্ধে!

ব্যাপারটা এমনই পৈশাচিক যে প্রায় রূপকের মতো লাগে। অথচ ইতিহাস-সাক্ষী, যুদ্ধের সময় শহিদদের মহিমান্বিত করতে এমন ভয়ংকর প্রতীকী প্রচার সত্যিই করা হয়েছিল টালমাটাল ইরানে। সাত্রাপির কালি-তুলির জোরালো টানে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রতারণার ইতিহাস, বিপন্ন মানুষের জীবনের টানাপোড়েন। ‘পার্সেপোলিস’ ইরানকে কেবল এক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা মৌলবাদের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তুলে ধরে না। বরং কত হাজার বছরের সমৃদ্ধি পেরিয়ে এসেও আজ যে মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন যাবৎ লাল ফিতের জট ও নিত্যনতুন যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে নিজেদের ক্ষমতার পরিপূর্ণ ব্যবহার করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেই আখ্যানই উঠে এসেছে রেখালেখের মাধ্যমে। উঠে এসেছে দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ক্ষোভ, হাস্যরস এমনকী বিচ্ছেদ-বেদনার মুহূর্তও। গ্রাফিক-নভেল হওয়ার দরুণ পাঠকের মনের উপর মাধ্যম তার পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। সাত্রাপির সাদা-কালো আঁকা যেন একাধারে রাজনৈতিক কার্টুন, আবার একইসঙ্গে শিশুসুলভ সারল্যে ভরপুর স্মৃতির নানান ফ্রেম। এমনই দক্ষ স্টাইলাইজেশন! গ্রাফিক নভেলের ইতিহাসে ‘পার্সেপোলিস’-এর আবির্ভাব এক আশ্চর্য সন্ধিক্ষণে। ততদিনে আর্ট স্পিগেলম্যানের ‘মাউস’ (১৯৮০-১৯৯১) এবং ক্রেগ থমসনের ‘ব্ল্যাংকেটস্’ (২০০৩) গ্রাফিক নভেলকে শিশুতোষ তকমা ছাড়িয়ে উন্নত সাহিত্যের মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। স্পিগেলম্যান যেখানে কমিকসের ফ্রেমে হলোকস্টের ইতিহাস ধরেছেন, সেখানে থমসনের প্রধান উপজীব্য ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম এবং সর্বোপরি এক অন্তর্মুখী স্মৃতিকথা। পার্সেপোলিস যেন এই দুই মেরুর সংযোগ-সাঁকো। এতে ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত জীবনচরিত দুই-ই বয়ে চলে একত্রে। রাষ্ট্র, পরিবার ও ব্যক্তিজীবন আঁকায়-লেখায় মিলে পাশাপাশি পাতায় থিতু। কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি কোনওরকম বাড়তি দেখানেপনা না থাকার দরুণ কঠিন বাস্তব ধরা পড়েছে সহজ দেখার চোখে। কোনওরকম ভান বা অস্পষ্টতা না রেখে, সরাসরি বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা পাঠককে টেনে রাখে একেবারে শেষ পর্যন্ত। রাষ্ট্র যখন ক্রমাগত জেহাদ ঘোষণা করে নিজের অস্তিত্বকে প্রমাণ করতে চায়, তখন সমাজ ধীরে ধীরে ভয়, নজরদারি এবং যুদ্ধের গোলকধাঁধায় আটকা পড়ে। ২০২৬-এর উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে পার্সেপোলিসের এই সতর্কবার্তা কোনও ভবিষ্যদ্বাণীর চেয়ে কম কিছু বলে মনে হয় না। দু’ দশক আগের বই যেন এক লহমায় ঘোরতর প্রাসঙ্গিক এবং সমসাময়িক হয়ে ওঠে।

পার্সেপোলিসের দুই পূর্বসূরি গ্রাফিক নভেল ব্ল্যাংকেটস্ আর মাউস

যুদ্ধ কি কেবল সীমান্তে? যুদ্ধ কি সমাজের ভিতরেও নয়? বেড়ে ওঠার দিনগুলিতে মার্জি বুঝতে পারে, দেশের উপর বাইরে থেকে বোমা পড়ছে বটে, কিন্তু সমাজ-সংস্কৃতির দৈনন্দিন চর্চায় নিয়ন্ত্রণ আসছে রাষ্ট্রের ভিতর থেকে। গান গাওয়া নিষিদ্ধ, মদ্যপান নিষিদ্ধ, পাশ্চাত্য পোশাক মানেই খুব সন্দেহজনক। বিপ্লবী গার্ডেরা সমানে রাস্তায় টহল দিচ্ছে। এক রাতে মার্জি ও তার বন্ধুরা মাইকেল জ্যাকসনের গান শুনে ফেরার পথে তেমনই একদল রক্ষীবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। মার্জান সাত্রাপির বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং রসবোধের মিলমিশে ঘটনাটি এক চূড়ান্ত রাজনৈতিক ব্যঙ্গদর্শন হয়ে ফুটে উঠেছে। যেন পপ মিউজিককে শত্রু ঠাউরে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে! কিন্তু মানুষের হাত-পা বেঁধে রাখলেও, সে তার জাল কেটে ঠিকই বেরিয়ে পড়ে, এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হল না। আঁটোসাঁটো জীবনযাত্রার হাঁসফাঁস থেকে মুক্তির আনন্দ পেতে রাষ্ট্রের নিয়মকানুনকে অহরহ বুড়ো আঙুল দেখাতে থাকে মার্জানের মুক্তমনা পরিবার। তারা গোপনে পার্টি করে, নিষিদ্ধ গান শোনে, নাচে, মদ্যপান করে। বাজারে মদ অমিল হওয়ায় মার্জানের আরেক কাকা ওয়াইন তৈরি করার জন্য বাড়ির বেসমেন্টেই বানিয়ে ফেলেন আস্ত একখানা ল্যাবরেটরি! বৃহৎ পরিবারের ধর্মপ্রাণ সদস্যদের কেউ কেউ অবিশ্যি ভোগেন এক ধরনের অপরাধবোধে। সাত্রাপি তাঁর সরস তুলিকালিতে ফুটিয়ে তোলেন তেমনই এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়া মিসেস নাসরিনকে। ভদ্রমহিলা বাথটবের মধ্যে ওয়াইনের জন্য আঙুর থেঁতো করতে করতে ক্রমাগত ক্ষমা চাইতে থাকেন ঈশ্বরের কাছে। অনায়াস ভঙ্গিতে মার্জান পাঠকদের মনে করিয়ে দেন, এই ছোট ছোট অবাধ্যতাই রাষ্ট্রের প্রবল সাঁড়াশিচাপের মাঝে তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জায়গা তৈরি করেছিল।

রাষ্ট্রের নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখাতে থাকে মার্জানের পরিবার।

আজকের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে বিষয়টিকে যেন আরও প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। বহির্বিশ্বের সঙ্গে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক পরিচয় দীর্ঘদিন ধরেই গড়ে উঠেছে সংঘাতের ভাষায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ আক্রমণ আদতে ইরানের দীর্ঘ সংঘাত-ইতিহাসেরই আরেকটি অধ্যায় লিখছে। গত ৪০ বছরেরও কিছু বেশি সময় পেরিয়ে আজও যে তাতে বিশেষ রদবদল ঘটেনি তা খামেনির মৃত্যু ও তৎপরবর্তী ঘটনাতেই স্পষ্ট। ইরানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বেলাগাম মিসাইল এবং ড্রোনের আক্রমণ কার্যত স্তব্ধ করেছে জনজীবন। ঠিক এই অবস্থানটিতে ‘পার্সেপোলিস’ যেন নিজের সামগ্রিক নির্যাসটুকু নিংড়ে হয়ে ওঠে বিবেক!

সংঘাতের ইতিহাস ধরা দিয়েছে রেখায়-লেখায়

সাত্রাপি তাঁর চিত্র-কাহিনিতে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন– বড় রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যেও সাধারণ মানুষের জীবনই হল গল্পের আসল উপাদান। বিশ্লেষক, নীতি-নির্ধারকেরা যখন ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে ভাবতে ব্যস্ত, তখন অসংখ্য পরিবার ভাবছে নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ, সন্তানদের শিক্ষা, দু’বেলা খাওয়া-পরার সংস্থান নিয়ে। সম্ভবত এই কারণেই বহু নিষেধাজ্ঞা, বহু চোখরাঙানি সত্ত্বেও ‘পার্সেপোলিস’ এবং অবশ্যই তার স্রষ্টা মার্জান সাত্রাপি বিশ্বজুড়ে এমন জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। বইটির শেষভাগে একটি দৃশ্য মনে দাগ কেটে যায়। ক্রমশ বিপন্ন হয়ে ওঠা দেশের রাজনৈতিক আবহে মার্জির বাবা-মা স্থির করেন, মেয়েকে তাঁরা বিদেশে পাঠিয়ে দেবেন। বিমানবন্দরে বিদায়ের মুহূর্তটি আশ্চর্য সংযত, অথচ পাঠকের গলার কাছে যেন জমে ওঠে একদলা দুঃখ, আবেগ। দেশ-কাল-সীমানা মুছে গিয়ে জেগে থাকে এক পরিবার, কিছু মানুষ, তাদের শোকতাপ, বেদনা, বিরহ। আজ যখন পৃথিবী জুড়ে হানাহানি, বিশ্ববাজারে জ্বালানি-অমিল, মুদ্রাস্ফীতি, মৃত্যুমিছিল– তখন পার্সেপোলিসের কথা মনে পড়তে বাধ্য!

বিমানবন্দরে বিদায়ের মুহূর্তটি আশ্চর্য সংযত

মার্জির চোখে দিয়েই আমরা দেখতে পাই, বুঝতে শিখি– ভূরাজনীতি, অভ্যুত্থান, যুদ্ধ এসব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনকেই ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, জীবনেই লয় হয়। ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেওয়া ঘটনাগুলি সংবাদপত্রের শিরোনামে, বা কাগুজে নীতি হিসেবে কায়েম হলেও; সে নীতির প্রতিধ্বনি ফেরে বোমায় বিধ্বস্ত ইস্কুলের ছোট ছোট ক্লাসঘরের দেওয়ালে। ঠিক এমনই একটা অস্থির সময়ে নিজের জন্মভূমি থেকে অনেক দূরে, ফ্রান্সে, বিদায় নিলেন মার্জান। সংবাদপত্রের বিবৃতি অনুযায়ী তাঁর মৃত্যুর কারণ ‘শোক’। গত বছর তাঁর স্বামী, প্রখ্যাত সুইডিশ প্রযোজক ম্যাতিয়াস রিপার মৃত্যুর পর থেকেই না কি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন সাত্রাপি।

স্বামী ম্যাতিয়াস রিপার সঙ্গে মার্জান সাত্রাপি

আড়ালেই এল মৃত্যু। অবিশ্যি শোকের আখ্যান মার্জানের সারাজীবন ধরেই বড় কম নয়। বলা যায়, তাঁর গোটা জীবন জুড়েই রয়েছে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ক্ষতচিহ্নের দলিল। পার্সেপোলিস তারই সাক্ষ্য বহন করছে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনের কড়া সমালোচনা করেছেন মার্জান। ২০২২ সালের ‘উওম্যান, লাইফ, ফ্রিডম’ প্রকাশের সময় সরাসরি প্রতিবাদীদের সমর্থন করেন তিনি। নারী-স্বাধীনতা কখনওই তাঁর কাছে নিছক কাগুজে-স্লোগান ছিল না। বাস্তবের মাটিতে আজ যেখানে মিসাইলের ছোঁয়ায় নিহত অসংখ্য নিষ্পাপ শিশুর কবর খুঁড়তে হচ্ছে, হয়তো সেখানেই বসে একদিন কোনও এক মেয়ে বুঝতে চেষ্টা করবে– ‘হিজাব’ কেন তার জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে উঠল? মার্জি-মাফিক না হোক, মর্জিমাফিক তো হওয়া উচিত! হয়তো মেঘমুলুকের কোনও এক অলীক তরঙ্গের কোণে, এক আবছা আলোচনাকক্ষে ভগবান, কার্ল মার্কস এবং রেনে দেকার্তের সঙ্গে এখন প্রবল তর্কবিতর্ক চলছে মার্জানের! ঝাপসা রাতে পাঠকের স্বপ্নচারণে সে ছবি ধরা পড়তেই পারে। নাই বা তাহার অর্থ হোক, নাই বা বুঝুক বেবাক লোক!