


যেখানে অধিকাংশ সমকামী সম্পর্কের ক্ষেত্রে চরিত্রদের লড়াই করতে দেখা যায় সম্পর্কটির বাইরের প্রতিকূলতার সঙ্গে, সেখানে Eva Baltasar-এর এই উপন্যাসে উঠে এসেছে একটি সমলিঙ্গ সম্পর্কের অন্তর্দ্বন্দ্ব সুতরাং প্রান্তিক যৌনতার যে কোনও সম্পর্কে সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও প্রেমকে একটি মানবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখাটাই হয়তো শ্রেয়। প্রেমের জন্য লড়াই বা প্রতিবাদ করা যেতেই পারে, কিন্তু তা কোনওভাবেই সম্পর্কে থাকা মানুষগুলির স্বাধীনতা বিক্রয় করে নয়।
ছোট্ট, পাতলা, মাত্র ১০৫ পৃষ্ঠার একটি বই। বইয়ের প্রচ্ছদ সাদা-কালো। একটি মেয়ের আলোছায়া মুখাবয়ব। মেয়েটির ঠোঁটে সিগারেট। সামান্য লম্বা নখযুক্ত আঙুল সিগারেটটা ধরে আছে। বই খুললেই উপন্যাসের কাহিনিস্রোতে প্রবেশ করবার আগে একটি সাদা পাতার সামান্য উপরে ডানদিকে লেখা একটি লাইন:
‘Love is a solitary thing’
ভাবনা ছিল– এত ছোট বই, শুরু করলে একটানা পড়ে শেষ করে দেওয়া যাবে। কিন্তু গল্প শুরু করার আগেই এই ছোট্ট বাক্যে থমকে গেল ভাবনা।
প্রান্তিক যৌনতা-সংক্রান্ত অধিকাংশ সাহিত্যে যে বিষয়গুলি সবচেয়ে জোরালোভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে তা হল এলজিবিটিকিউআইএ সম্প্রদায়ের মানুষদের স্বকীয় পরিচয় সমাজে প্রতিষ্ঠা করবার নিরন্তর লড়াই, অথবা তাদের প্রেমকে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক ভালোবাসার সম্পর্কের মতোই সমাজে সমান স্বীকৃতি যাতে দেওয়া হয়, তার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা৷

সেই কারণেই সমকামী, উভকামী, অযৌন অথবা অন্যান্য প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের মধ্যে যখন প্রেম আসে তখন সেই প্রেমই হয়ে ওঠে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কথা। ক্যাটালান কবি ও সাহিত্যিক Eva Baltasar-এর ‘Boulder’ উপন্যাসের ক্ষেত্রেও সেরকমটাই আশা করেছিলাম। সামাজিক সব বাধা কাটিয়ে দুই নারীর প্রেমের সম্পর্কের জয় হবে। কিন্তু শুরুতেই একাকিত্বের কথা বললেন কেন লেখক? একটু তলিয়ে ভাবতে গিয়ে বই বন্ধ হল। মনে হল, সত্যিই তো, যদি যে কোনও প্রেমের সম্পর্ককেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে সমকামী সম্পর্কেও নারী-পুরুষের সম্পর্কের মতো চাপানউতোর, টানাপোড়েন থাকাটাই স্বাভাবিক। যদি সমকামী সম্পর্কের উপর এই বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয় যে, প্রেম এবং প্রেমিক বা প্রেমিকাই তাদের জীবনের সবটা অধিকার করে থাকবে, যেহেতু সমাজের সঙ্গে প্রতিনিয়ত মানসিক লড়াই করে এই প্রেমকে টিকিয়ে রাখতে হয়– সেক্ষেত্রে যা একসময় হানা দেবে তা হল পরাধীনতা। সমকামী প্রেমের পথে প্রতিকূলতা প্রচুর, কিন্তু সেই প্রতিকূল স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে, সমস্ত সামাজিক পরাধীনতার বাঁধন ছিন্ন করে যে প্রেম জয়ী হল, একদিন সেই প্রেমই কি কয়েদখানা হয়ে উঠতে পারে না? খুবই পারে। নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা হামেশাই তা হতে দেখি। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে নারী এবং পুরুষ সকলেই সম্পর্কের বাইরে গিয়েও নিজের একটা স্বাধীন পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চায়। প্রত্যেকের চিন্তাভাবনার পরিসর ভিন্ন; এবং প্রেমের সম্পর্কে লিপ্ত থাকলেও একজন মানুষ তার নিজের ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষা, জীবনদর্শনকে গুরুত্ব দেবেন সেটাই কাম্য। তবেই সেই প্রেম স্থায়িত্বের দিকে যেতে পারে। রাইনার মারিয়া রিলকে এই প্রসঙ্গে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছেন–
‘Love consists in this, that two solitudes protect and touch and greet each other.’
দু’টি একাকিত্ব একে অপরকে দেবে নিরাপত্তা, প্রতিদিন জানাবে শুভেচ্ছা। তার মানে কী দাঁড়াল? ভালোবাসার একক হল একাকিত্ব। একটি একাকিত্ব যখন অন্য একটি একাকিত্বকে সঙ্গ দেয়, তাই হল প্রেম। ব্রিটিশ মেটাফিজিক্যাল কবি John Donne-এর কবিতা ‘The Good Morrow’-তে তিনি লিখছেন প্রেম বিষয়ে অপূর্ব এক ধারণার কথা–
‘Let us possess one world, each hath one, and is one.’

অর্থাৎ প্রেমের অর্থ অন্য একজন মানুষের মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলা নয়, বরং এমন এক জগৎ তৈরি করা, যে জগতের মধ্যে দু’টি মানুষের দু’টি আলাদা জগতও থাকবে! সেই দু’টি ভিন্ন জগৎ মিলবে না একে অপরের সঙ্গে। সেখানে যে যার নিজস্ব পৃথিবীতে স্বাধীন। এই দুই জগতকে বেষ্টন করে থাকবে একটি বৃহত্তর জগৎ, যেখানে মিলন হবে দু’টি মানুষের অনুভূতির। দু’জন স্বাধীন মানুষের প্রেম মিলিত হবে। সেই প্রেমে থাকবে না কোনও পরাধীনতার যন্ত্রণা। প্রেম তখনই জেলখানা হয়ে ওঠে, যখন একজন অন্যজনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। ভালোবাসা, অধিকার ফলানোর জায়গা নয়। সমঝোতার জায়গাও নয়। ভালোবাসা অনুভব করার জায়গা। অধিকারহীন সমর্পণের খোলা মাঠ। এইসব কথা বলা সহজ হলেও বাস্তব পরিস্থিতি এমন স্বাধীনতা মানুষকে দেয় না। অর্থাৎ সমকামী সম্পর্কেও প্রেমের থেকে কখনও কখনও বড় হয়ে উঠতে পারে সম্পর্কে থাকা মানুষগুলোর একাকিত্ব। তাই ‘love’ হয়ে যায় ‘solitary thing’! এখানে ‘thing’ কথাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসা অনুভূতির স্তর থেকে নেমে এসে এখানে বস্তুগত বৈশিষ্ট্য ধারণ করছে। অর্থাৎ এই বাক্য যিনি লিখছেন, প্রেম তাঁর কাছে পরিণত হয়েছে একটি জিনিসে বা বস্তুতে, যা জড়, যার মধ্যে আর জীবন নেই। এত দূর ভাবনাচিন্তার পর বই খোলা হল আবার। এবার গল্পে প্রবেশ।
ক্যাটালান সাহিত্যিক Eva Baltasar-এর এই কাহিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন Julia Sanches। এটি Baltasar-এর ‘Triptych Trilogy’-র দ্বিতীয় উপন্যাস, যেটি ২০২৩ সালে International Booker Prize-এর শর্ট-লিস্টে স্থান পেয়েছিল। এই গল্পের মুখ্য চরিত্র এক নারী, যাঁর প্রকৃত নাম জানাননি লেখক। সকলে তাকে চেনে ‘বোল্ডার’ নামে। এই নারী একটি জাহাজের শেফ। বন্দর থেকে বন্দরে ভেসে যান এই স্বাধীনচেতা, একলা মানুষটি এবং এই পিছুটানবিহীন ইচ্ছেমতো বাঁক নেওয়া জীবনপ্রবাহের মধ্যে থাকতেই পছন্দ করেন তিনি। সংসার বা স্থায়িত্বের প্রতি একেবারে মোহহীন এই নারীর সঙ্গে একসময় দেখা হয় সামসা নামে অন্য এক নারীর। সামসা, বোল্ডারের জীবনে আসে ভালোবাসার উষ্ণ ওম এবং অনাবিল প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে প্রেম জন্মায়। সামসাই ‘বোল্ডার’ নামটি দেয় তার প্রেমিকাকে। সে একসময় কাজের সূত্রে আইসল্যান্ডে যাওয়ার সুযোয় পায়। প্রেমের টানে বোল্ডারও সামসার সঙ্গে আইসল্যান্ডে গিয়ে থাকতে শুরু করে। এই প্রথম নিজের স্রোতময় জীবনকে পিছনে ফেলে স্থায়িত্ব খোঁজে বোল্ডার। প্রাথমিকভাবে তার এই স্বাধীন জীবনের প্রতি টান এবং চারিত্রিক স্বতন্ত্রতার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল সামসা। দু’জনে একসঙ্গে থাকতে শুরু করার পর ধীরে ধীরে বোল্ডার উপলব্ধি করতে শুরু করে যে, এই সংসারজীবন ঠিক তার জন্য নয়। সমস্যা আরও বড় আকার নেয় যখন সামসা মা হওয়ার ইচ্ছেপ্রকাশ করে। সে মাতৃত্বের অনুভূতিকে উপভোগ করতে চায়। কিন্তু বোল্ডার বুঝতে পারে, সামসার প্রতি তাঁর এই গভীর প্রেমের মাঝখানে সন্তান এসে পড়লেই সেই সম্পর্ক বদলে যাবে। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে সামসা সন্তান ধারণ করে। তারপর থেকে ভীষণরকম বদলে যায় দু’জনের সম্পর্কের সমীকরণ। মাতৃত্ব সামসাকে দেয় নারীত্বের পূর্ণতার অনুভূতি। সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার সন্তানকে নিয়ে। অন্যদিকে বোল্ডার এই সন্তানের প্রতি সামসার মতন টান অনুভব করে না। যখন সামসার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে তার সন্তান, বোল্ডার তখন অনুভব করে গভীর, গোপন এক শূন্যতা। সামসাকে সে যেভাবে কাছে পেতে চায়, সেভাবে আর পায় না। প্রতিদিনের একঘেয়ে জীবনপ্রবাহ, যার মধ্যে নেই কোনও রোমাঞ্চ বা প্রেমকে উদ্যাপন করার আনন্দ– সেই জীবন বোল্ডারকে ভিতর থেকে ক্লান্ত করে তোলে। কিন্তু যে ব্যাপারটি পাঠককে আশ্চর্য করে, তা হল– যেহেতু বোল্ডার নিজেও একজন নারী তাই সামসার গর্ভধারণের সুখানুভূতিকে সে নিজের মতো করে অনুভব করতে পারে। সামসার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরে যাওয়ার ফলে তার ভিতর একাকিত্ব জন্মালেও, সঙ্গিনীর গর্ভবতী অবস্থায় বোল্ডারের মনের অন্তস্থলে তৈরি হয় কিছু এমন অনুভূতির তরঙ্গ, যা আসলে মাতৃত্বেরই অন্তরের কথা। এর থেকেই বোঝা যায় একজন নারী মাতৃত্বের মধ্যে পূর্ণতা, শান্তি ইত্যাদি সামাজিকভাবে প্রত্যাশিত অনুভূতি খুঁজে না-পেলেও, কোনও এক জাদুমন্ত্রবলে সে গর্ভাবস্থার অন্তর্নিহিত সৃষ্টিসুখ টের পায়। সে বুঝতে পারে সৃষ্টির আদিকথা, স্পর্শ করতে পারে এক ব্যাখ্যাতীত রহস্যকে। সে নিজে মাতৃত্ব উপভোগ করতে না চাইলেও এবং এই অবস্থাকে একরকম পরাধীনতা বলে মনে করলেও, একজন গর্ভবতী মহিলা তার কাছে হয়ে ওঠে এক বিস্ময়! তাই বোল্ডার বলে–
“But a newly pregnant woman, a woman in her first trimester… now she’s a hand grenade, a ticking bomb that sleeps beside you. Her uterus is the sensor that holds the diamond, it’s a reactor, it contains the Big Bang, a surplus of neutrons and nitroglycerine. The smallest disturbance can set it off.”

অন্যদিকে আবার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় যত এগিয়ে আসে, বোল্ডার ভয় পায় যে, গর্ভের এই শিশু সামসার শরীরকে গ্রাস করে নেবে। সে ভাবে–
“Samsa might fall into a coma and be consumed by the baby, who would drain her from head to toe, leaving behind only the useless husk of her skin. I don’t know why I have the feeling that if this were to happen, the baby would crawl out of her mouth. A mouth like a snake’s, jaw unhinged.”
কী ভয়াবহ এই কল্পনা! Judith Butler তাঁর ‘Gender Trouble’ প্রবন্ধে পাঠকদের জানান–
‘Gender is the repeated stylization of the body.’
অর্থাৎ নারী অথবা পুরুষ হয়ে জন্মানো কোনও প্রাকৃতিক সত্য নয়। নারীত্ব বা পুরুষত্ব একটি শরীরের উপর চাপানো হয় সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে। সুতরাং নারীত্ব এবং পুরুষত্ব দু’টিই আরোপিত সত্য। Sara Ahmed তাঁর ‘The Promise of Happiness’ প্রবন্ধে বলেছেন যে, সমাজ কিছু নির্দিষ্ট বিষয়কে সুখপ্রাপ্তির চাবিকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যেমন– বিবাহ, পরিবার গঠন বা সন্তান জন্ম দেওয়া। একটি শিশুর পৃথিবীতে আগমনের ঘটনাকে সমাজ বরাবরই আনন্দানুভূতির সঙ্গে সংযুক্ত করে এসেছে। এই উপন্যাসে বোল্ডার এই চিরাচরিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। প্রচলিত নারীত্বের ধারণাকে বোল্ডার চরিত্রটি প্রবলভাবে ধাক্কা দেয় এবং সে বুঝতে পারে সংসার, স্থায়িত্ব, নারীত্বের প্রত্যাশিত সুখানুভূতি– এইসব থেকে তার মন আসলে বহুদূরে। এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে ভেসে বেড়ানো এই নারী আসলে একজন স্বাধীন ভ্রামণিক। বোল্ডারের কাছে ভালোবাসা হল স্বাধীনতার অন্য নাম। প্রেম যদি পরিণত হয় এক মণি-মানিক্যখচিত খাঁচাতে, তবে প্রাণ পাখি খাঁচা ভেঙে আকাশের দিকে উড়ে যেতে চাইবে সেটাই স্বাভাবিক।
গল্পের শেষে আমরা পাই আরেকটি চমক। একদিকে পাঠক বোল্ডারের নিবিড় একাকিত্ব টের পায়। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সে কিন্তু সামসার ইচ্ছে বা ভালো-লাগায় কোনওরকম হস্তক্ষেপ করে না। সে নিজের ইচ্ছের ভার একবারও তার প্রেমিকার উপর চাপাতেও চেষ্টা করে না। নিজের বিষাদকে পাহাড়া দেয় বোল্ডার, যাতে সেই যন্ত্রণা তার ভালোবাসার মানুষের ভালো থাকার উপর কোনও প্রভাব না ফেলে। নিজের মনের একলা ঘরে দুঃখ পোহায় সে। এখানেই ‘বোল্ডার’ নামটির সার্থকতা। অন্তরের গহীনতম নির্জনতায় তার একাকিত্ব, প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার দুঃখ, সামসার সঙ্গে আত্মার নিবিড় যোগাযোগ স্থগিত হওয়ার কষ্ট– সবকিছু মিলেমিশে শক্ত পাথরের মতো জমাট বেঁধে থাকে। প্রকৃত অর্থেই সে হয়ে ওঠে ‘বোল্ডার’– একটি পাথর। জড় পদার্থ। এবারে পাঠক বুঝতে পারছেন, কেন ‘love’ বা প্রেমের মতো একটি অ্যাবস্ট্র্যাক্ট বিষয়, যা বিচরণ করে মানুষের অনুভবের দুনিয়ায়, তা পরিণত হচ্ছে একটি ‘thing’ বা জড়বস্তুতে। অন্যদিকে দেখা যায়, সামসার প্রত্যাশিত লিঙ্গ ভূমিকায় যথার্থ পারফর্ম করতে অক্ষম বোল্ডারের কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যায় সে। পাঠক এবং বোল্ডার একইসঙ্গে আবিষ্কার করে সামসার নতুন প্রেমিকাকে। শয়নকক্ষে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে লেখক এখানে সম্পর্কের বৈধতা অথবা অবৈধতা নিয়ে কোনওরকম প্রশ্ন তোলেননি। বোল্ডারকে উপন্যাসের অন্তিম পর্বে আমরা আবার সমুদ্রের কাছে ফিরে যেতে দেখি। সে ফিরে যায় তার স্বাধীন তরঙ্গময় জীবনের কাছে। তবে যে কোনও ধরনের পরাধীনতা জীবনের উপর একরকম স্থায়ী ছাপ ফেলে যায়। পরাধীনতার মধ্যে বেঁচে থাকতে থাকতে একজন স্বাধীন মানুষও হারিয়ে ফেলে তার আত্মার অংশ। তাই সমুদ্রে ভাসতে ভাসতেও বোল্ডার বলে–
“I am driven by someone who isn’t me. Someone who is no more than a voice.”

এই উপন্যাসে আরও একটি সূক্ষ্ম কিন্তু প্রচলিত ধারণার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। সাধারণভাবে অধিকাংশ মানুষের ধারণা, কোনও নারী শিশুদের পছন্দ করে মানেই সে মাতৃত্ব উপভোগ করতে চায়। বোল্ডারের চরিত্র এই ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। উপন্যাসটির শেষ স্তবকে বোল্ডারের বয়ানে আমরা শুনতে পাচ্ছি এমন কিছু কথা, যা সমাজ দ্বারা প্রত্যাশিত নারীত্ব এবং মাতৃত্বের উপর পূর্বারোপিত সমস্ত বৈশিষ্ট্যকে প্রত্যাখ্যান করছে। বোল্ডারের সঙ্গে সামসার বিচ্ছেদ হওয়ার পর সে কিন্তু টিনা অর্থাৎ সামসার শিশু কন্যার সঙ্গে মাসে চার-পাঁচ দিন দেখা করে। টিনার সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসে বোল্ডার। কিন্তু সামসা যেরকম মাতৃত্ব প্রত্যাশা করে সেই প্রত্যাশা পূরণে অনিচ্ছুক এবং অপারগ সে।
“I don’t feel the need to be a mother to her, at least not the kind Samsa thinks I should be. I am not interested in the web of daily obligations that ensnares Tinna, all I want is to spend time with her, to be with her.”
যেখানে অধিকাংশ সমকামী সম্পর্কের ক্ষেত্রে চরিত্রদের লড়াই করতে দেখা যায় সম্পর্কটির বাইরের প্রতিকূলতার সঙ্গে, সেখানে Eva Baltasar-এর এই উপন্যাসে উঠে এসেছে একটি সমলিঙ্গ সম্পর্কের অন্তর্দ্বন্দ্ব। সুতরাং প্রান্তিক যৌনতার যে কোনও সম্পর্কে সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও প্রেমকে একটি মানবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখাটাই হয়তো শ্রেয়। প্রেমের জন্য লড়াই বা প্রতিবাদ করা যেতেই পারে, কিন্তু তা কোনওভাবেই সম্পর্কে থাকা মানুষগুলির স্বাধীনতা বিক্রয় করে নয়। এই প্রসঙ্গেই মনে পড়ল মার্কিন কবি Joy Harjo-র একটি উক্তি–
‘Remember the sky that you were born under’
আবার বন্ধ হল বই। খুলে গেল চিন্তার সহস্র দরজা।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved