chaitanya mahaprabhu and forgetting bangla kirtan। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলা কীর্তনের বিস্মরণ

পদাবলি কীর্তনকে যদি ক্লাসিক্যাল মিউজিকের মতো একটি ক্লাস অর্থাৎ একটি শ্রেণির শ্রোতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হত, তাহলে এই অবনমন ঘটত না। পদাবলির উন্নত সাহিত্য, জটিল সাংগীতিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি উপভোগ করতে হলে শ্রোতার যে পূর্বপ্রস্তুতি ও রসবোধ প্রয়োজন, তা সব শ্রেণির শ্রোতার ক্ষেত্রে কাম্য নয়। এই ‘শ্রেণিবিভাজন’ আমার কল্পনপ্রসূত নয়। স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভুই সাধারণ ভক্তদের সঙ্গে হরিনাম সংকীর্তন করেছেন এবং অন্তরঙ্গমণ্ডলীর সঙ্গে পদাবলির রসাস্বাদন করেছেন এমন বর্ণনা পাওয়া যায় বিভিন্ন গ্রন্থে। বহুল প্রচারের উদ্দেশ্যে সাধারণ শ্রোতার মনোরঞ্জন করতে গিয়ে ক্রমশ নিম্নগামী হয়েছে কীর্তন গানের মান।

প্রচ্ছদ শিল্পী: ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার

শেষ আপডেট: মার্চ ২, ২০২৬, ২১:১১   
Facebook WhatsApp Messenger

ফাল্গুন পূর্ণিমা তিথি নক্ষত্র ফাল্গুনী।
শুভক্ষণে জনমিলা গোরা দ্বিজমণি।।

(রচয়িতা– বাসুদেব ঘোষ)

রং খেলা, বসন্ত উৎসবের ভিড়ে নদীয়ার চাঁদ গৌরসুন্দরের জন্মদিনটির কথা ক’জন বাঙালি মনে রাখে আজ? একদিকে পিকনিকের আসর থেকে ভেসে আসা উচ্চৈস্বরের বলিউডি গান আর অন্যদিকে বসন্ত উৎসবের চোঙ থেকে ভেসে আসা ‘ওরে গৃহবাসী’– গানের দাপট মিলেমিশে ম্লান করে দেয় সংকীর্তনের শ্রীখোল-করতাল ধ্বনি। বাংলার সম্পদ কীর্তন গান বাঙালির কাছেই ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হয়ে পড়ে থাকে এক কোণে।

‘সংস্কৃতি সচেতন’ নামে পরিচিত একদল বাঙালি কীর্তন ও শ্রীচৈতন্যকে কেবলই বৈষ্ণব ধর্ম ও তাঁর চর্চাকারীদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে কীর্তনের অপরায়ণ ঘটিয়ে দিয়েছেন। যেন সাধারণ মাছে-ভাতে থাকা বুদ্ধিজীবী বাঙালির ‘কেত্তন’ নিয়ে কোনও আগ্রহ নেই। এদেরই আবার দেখি– উনিশ শতক ও ঠাকুরবাড়ি-কেন্দ্রিক নবজাগরণের আগে নিজেদের গৌরবময় ইতিহাস হাতড়ে বেড়াতে।

বাঙালির সংগীত, সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন ইত্যাদি ক্ষেত্রে চৈতন্য মহাপ্রভুর অবদান বা প্রভাব যে কতখানি, তা বহু বিদগ্ধ জ্ঞানীজন নিজেদের কলমে বর্ণনা করেছেন, আমার স্বল্পজ্ঞানের পুঁজি নিয়ে এই প্রসঙ্গে চর্চা তাই অপ্রয়োজনীয়। আমি এই পরিসরে আলোচনা করার চেষ্টা করতে চাই কেবলমাত্র বাংলার কীর্তন গান এবং তার বিস্মরণ নিয়ে।

প্রথমে এই প্রশ্ন আসাই স্বাভাবিক যে, কীর্তন নিয়ে বাঙালির গৌরব বোধ করার মতো কী আছে? যেহেতু কীর্তন মূলত একটি সংগীত ধারা, তাই শুরুতে সাংগীতিক প্রসঙ্গেই আসি। শাস্ত্রীয় তথা উপশাস্ত্রীয় গানকে ‘উচ্চাঙ্গ’ বলে গর্ব করার প্রবণতা অনেকেরই দেখেছি। সেই প্রবণতাকেই সামনে রেখে যদি বাংলার কীর্তনকে ভারতের অন্যতম ‘উপশাস্ত্রীয় সংগীতধারা’ বলি, তাহলে গৌরব করার মতো একটি কারণ হয়তো বাঙালি পেতে পারেন। তবে বাংলার কীর্তনকে ‘শাস্ত্রীয়’ বলার ভিত্তি কী? ‘শাস্ত্রীয় গান’ বলতে সহজ কথায় বুঝি– যে গানের শাস্ত্র রয়েছে। এক্ষেত্রে, ‘শাস্ত্র’ অর্থাৎ একটি বিধি বা সীমারেখা, যাতে গানটির সুর-তাল নিয়ে অতিমাত্রায় স্বেচ্ছাচারিতা না করা যায়। পূর্ণ বা শুদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীতের (Pure Classical Music) ক্ষেত্রে এই বিধি-নিষেধের দারুণ কড়াকড়ি থাকলেও উপশাস্ত্রীয় সংগীতের (Semi Classical Music) ক্ষেত্রে তা অনেকটাই শিথিল। ঠিক যেমনটা দেখতে পাই বাংলার পদাবলি কীর্তনে। কীর্তনের মৌলিক তাল পদ্ধতি বিদ্যমান, যা ভারতের অন্যান্য সংগীত ধারা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এই গানে একাধিক মধ্য গতি ও বিলম্বিত গতির জটিল তাল যেমন তিওট (মাত্রা সংখ্যা ১৪), বড় দশকোশি (মাত্রা সংখ্যা ২৮), শশীশেখর (মাত্রা সংখ্যা ৪৪) , বড় সোম (মাত্রা সংখ্যা ৫৬) ইত্যাদি প্রযুক্ত হলেও ভাবের প্রয়োজনে সুরটি রাগ-রাগিণীর শুদ্ধতা মেনে গাওয়া হয় না। কীর্তনের এই বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘…রাগরাগিণীর রূপের প্রতি তার মন নেই, ভাবের রসের প্রতিই তার ঝোঁক।’ (সূত্র: সঙ্গীতচিন্তা)

অর্থাৎ, কীর্তনে শাস্ত্রের বাঁধন আছে ঠিকই, তবে সেটা ভাবের শ্বাসরোধ করে দেয়নি। বাংলা পদাবলি কীর্তনের প্রথম সাহিত্য নিদর্শন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এও (পঞ্চদশ শতক) গ্রন্থকার বড়ু চণ্ডীদাস পদের শীর্ষে ‘প্রকীন্ন’ বা ‘পকীন্নক’ শব্দগুলির ব্যবহার করেছেন, অর্থাৎ চণ্ডীদাস তাঁর রচিত পদগানগুলিকে ‘প্রকীর্ণ’ শ্রেণির গান বলে জানিয়েছেন। এই ‘প্রকীর্ণ’ বা ‘Classico-Folk’ শ্রেণির গান বলতে একপ্রকার উপশাস্ত্রীয় সংগীতকেই বোঝানো হত। অথচ দুঃখের বিষয়– ঠুমরি, দাদরা, চৈতি, ভজন ইত্যাদি ধারার গান উপশাস্ত্রীয় সংগীত হওয়ার দরুন যে মর্যাদা পায়, বাংলার কীর্তন তাঁর কিয়দংশও পায় না। আবার অন্য আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই প্রকীর্ণ শ্রেণির গান প্রবন্ধ গানের সমান প্রাচীন, তাই কীর্তন যে প্রাচীনত্বের দিক থেকেও অনেক অগ্রজপ্রতিম– সে গৌরবও আমাদের বেশিরভাগ বাঙালির অজানা। সাধারণত কোনও বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের শিলমোহর থাকলে আমরা মান্যতা দিই সহজে। তাই আবারও এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কথাই উদ্ধৃত করছি–

‘বাঙালির কীর্তনগানে সাহিত্যে সঙ্গীতে মিলে এক অপূর্ব সৃষ্টি হয়েছিল– তাকে প্রিমিটিভ এবং ফোক্ ম্যুজিক বলে উড়িয়ে দিলে চলবে না। উচ্চ অঙ্গের কীর্তন গানের আঙ্গিক খুব জটিল ও বিচিত্র, তার তাল ব্যাপক ও দুরূহ, তার পরিসর হিন্দুস্থানী গানের চেয়ে বড়ো। তার মধ্যে যে বহুশাখায়িত নাট্যরস আছে তা হিন্দুস্থানী গানে নেই।’ (সূত্র: সঙ্গীতচিন্তা)

zoom
শিল্পী: ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার

বাংলা সাহিত্যের গোড়ার সময় থেকেই বৈষ্ণব পদাবলি এর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষার অন্যতম নিদর্শনই বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-সহ দ্বিজ চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির পদাবলি। বিদ্যাপতি রচিত পদাবলির হাত ধরেই বাংলার কাব্যভাষা ‘ব্রজবুলি’র জন্ম। সগর্বে বলতে পারি, ব্রজবুলির মতো এত শ্রুতিমধুর ভাষা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। বৈষ্ণব পদকর্তাগণ তাঁদের পদাবলিতে নতুন শব্দ এবং বিভিন্ন অলংকারের প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলা ভাষার উৎকর্ষতাও বৃদ্ধি করে গিয়েছেন নিরন্তর। একটি উদাহরণ দেখা যাক–

কানু সে বিনোদ রায়।
বিনোদ চিকুরে      বিনোদ বরিহা
উড়িছে বিনোদ বায়।
বিনোদ কপালে   বিনোদ তিলক
বিনোদ বিনোদ সাজে।
বিনোদ অধরে    বিনোদ মুরলী
বিনোদ বিনোদ বাজে।।
বিনোদ গলায়   বিনোদ মালা
বিনোদ বিনোদ দোলে।
কোন বিনোদিনী   বিনোদ গাঁথনী
গেঁথেছে বিনোদ ফুলে।
বিনোদ কটিতে   বিনোদ ধটি
বিনোদ বিনোদ সাজে।
বিনোদ চরণে  বিনোদ নূপুর
বিনোদ বিনোদ বাজে।
কহে যদুনাথ   বিনোদ নাগর
বিনোদ কদম্ব মূলে।
কত বিনোদিনী  বিনোদ হেরিয়া
কলসী ভাসাইল জলে। (রচয়িতা: যদুনাথ দাস)

এই পদটিতে যেমন ‘বিনোদ’ শব্দটিকে নিয়ে পদকার অনুপ্রাস অলংকারের যে মাধুর্য বুনেছেন, তা আস্বাদন করলে মুগ্ধ হতে হয়। পদকর্তাগণের নান্দনিকবোধ এমনই সূক্ষ্ম ছিল যে, তাঁরা কেবল পদের অর্থগত সৌন্দর্যকেই গুরুত্ব দেননি বরং পদাবলির ধ্বনিমাধুর্যও সমানভাবে খেয়াল রেখেছেন। এককথায় বলতে গেলে, পদাবলিকে কেন্দ্র করেই একসময় বাংলা কাব্যের সৌন্দর্যায়ন ঘটেছে।

zoom
বাংলার প্রাচীন পুঁথি

আলোচনার গোড়াতেই বলেছিলাম কয়েকটি ভাগে বাংলার কীর্তনের গুণকীর্তন করব। কিন্তু কীর্তনের মধ্যে এতগুলি দৃষ্টিকোণ বা দিক রয়েছে যে, তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা ও আলোচনা একটিমাত্র প্রবন্ধে সম্ভব নয়। পদকর্তাগণ তাঁদের পদাবলিতে নিজের সাধনলব্ধ গুহ্য আধ্যাত্মিক বোধের কথা যেমন লিখে গিয়েছেন, তেমনই পদের মাধ্যমেই সরল মনে, নয়ন জলে জগদীশ্বরকে ব্যক্ত করেছেন নিজের মনের প্রার্থনা। এই পদাবলির অথৈ সাগরেই ভেসে উঠেছে নায়ক-নায়িকা প্রেমের প্রতিটি সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব, তৎকালীন সমাজতত্ত্ব কিংবা লিঙ্গ-রাজনীতি ও প্রান্তিক যৌনতার কথা। বাংলা ভাষায় প্রথম রসশাস্ত্র বলতেও এই পদাবলি কীর্তনই। আবার সেই কীর্তনকেই গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু যখন ব্যক্তিগত স্তরের ঊর্ধ্বে জাতির সংহতি স্থাপনের মাধ্যম রূপে ব্যবহার করলেন, তখন তার নাম হল ‘সংকীর্তন’। এছাড়াও এর নাট্যপ্রবণতা, শ্রীখোলের মৌলিক বাদনশৈলী, প্রাচীন রাগরূপের প্রয়োগ, ভাবের উৎকর্ষতা, আধ্যাত্মিক ভিত্তি-সহ আরও কত শত বিষয়ে যে বাংলার কীর্তনকে নিয়ে গর্ব যায়, তার কোনও শেষ নেই। কীর্তনের গুণমুগ্ধেরা তাই একে ‘কীর্তন কী রতন’ বলেন।

zoom
নগর-কীর্তন, শিল্পীর চোখে

তবে, কীর্তনের বর্তমান অবস্থা বাংলা প্রবাদের সেই গেঁয়ো যোগীর মতো। বাংলা গানের অন্যান্য ধারা অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথের গান বা পুরাতনী গানের পাশাপাশি একই মঞ্চে কীর্তন পরিবেশিত হয় না। বাংলার রাজ্যসংগীত আকাদেমিতে রবীন্দ্রনাথের গান, নজরুলের গান, অতুলপ্রসাদের গান কিংবা বাংলা রাগপ্রধান স্বতন্ত্র স্থান পেলেও কীর্তন প্রাচীন বাংলা গান শ্রেণির অন্তর্গত হয়ে বাংলা টপ্পা ও পুরাতনী বাংলা গানের সঙ্গে টিকে রয়েছে কোনও মতে। বাংলার বেতার ও দূরদর্শন চ্যানেলগুলিও কীর্তন সম্পর্কে যথেষ্ট উদাসীন। কালে-ভদ্রে কয়েকটি কীর্তন নামাঙ্কিত কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হলেও কীর্তন বিষয়ে পরিচালকমণ্ডলীর জ্ঞান এতই কম যে, লোকগানকেও ‘কীর্তন’ বলে উল্লেখ করে ফেলেন। কীর্তন গানের প্রচার, প্রসার বা শিক্ষা নিয়ে কোনওরূপ সরকারি উদ্যোগ নেই। কোনও শিক্ষার্থী কীর্তন গান নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা বা গবেষণা করতে চাইলে সারা বাংলায় ভরসা কেবল একটি বা দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়।

কীর্তনের এরূপ পরিণতির জন্য কেবলই এই উদাসীন বাঙালিদের দায়ী করলে চলবে না। সমানভাবে দায়ী আরেকদল মানুষও। এঁরা লোকগান, বাংলা পুরাতনী বা ভজন শ্রেণির গানকে ‘কীর্তন’ বলে পরিবেশন করে থাকেন প্রায়শ। আবার সাধারণ শ্রোতার মনোরঞ্জনের জন্য কীর্তনের নিজস্ব তাল-রাগ ছেড়ে লঘু সুরের গান গেয়ে ক্রমাগত কীর্তনের অপপ্রচার ও অবমাননাও করে চলেছেন। এই দলের লোকেরা সাধারণ মানুষের কীর্তনকেন্দ্রিক ধর্মীয় ভাবাবেগকে ব্যবহার করে রাধা-কৃষ্ণ বা গৌরের নামে যে কোনও গানকে ‘কীর্তন’ বলে দিব্য চালিয়ে দিচ্ছেন দিনের পর দিন। ফলত শ্রোতারাও কীর্তন গানের নিজস্ব শৈলী বা বৈশিষ্ট্য ক্রমশ ভুলে যাচ্ছেন বা শুনতে অনভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন।

খেয়াল, ধ্রুপদ, ঠুমরি-সহ বাংলা গানেরও প্রায় সব ধারারই অল্পবিস্তর বিবর্তন বা সংস্কার ঘটেছে এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে সেটা ঘটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলার কীর্তনের মতো এমন রুচির অবনমন হয়তো আর কোনও গানেরই ঘটেনি। এই অবনমনের প্রধান কারণ হল, অযোগ্য ব্যক্তিদের হাত ধরে এর বিবর্তন ও প্রচার। বৈষ্ণব পদকর্তাগণ যে-পাণ্ডিত্য নিয়ে পদগুলি লিখেছিলেন বা বৈষ্ণব মহাজনেরা সেই পদগুলিতে সুরারোপ করেছিলেন, দুর্ভাগ্যবশত এঁদের উত্তরসূরিদের মধ্যে সেই পর্যায়ের সমর্পণ বা জ্ঞান কোনওটিই ছিল না। তাই আগের উন্নত মান বজায় রেখে তাঁরা কীর্তনের বিবর্তন ঘটাতে বা বহন করে নিয়ে যেতে সক্ষম হননি। হয়তো দু’-চারজন ব্যক্তি তখনও ছিলেন বা আজও আছেন– যাঁরা কীর্তনের সেই উন্নত মানকেই ধরে রাখতে চেয়েছিলেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাঁদের প্রচেষ্টা বৃহদাংশ শ্রোতার কাছে পৌঁছয়নি বা পৌঁছলেও জনপ্রিয়তা পায়নি।

এছাড়াও আমার মনে হয় পদাবলি কীর্তনকে যদি ক্লাসিক্যাল মিউজিকের মতো একটি ক্লাস অর্থাৎ, একটি শ্রেণির শ্রোতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হত, তাহলে এই অবনমন ঘটত না। পদাবলির উন্নত সাহিত্য, জটিল সাংগীতিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি উপভোগ করতে হলে শ্রোতার যে পূর্বপ্রস্তুতি ও রসবোধ প্রয়োজন, তা সব শ্রেণির শ্রোতার ক্ষেত্রে কাম্য নয়। এই ‘শ্রেণিবিভাজন’ আমার কল্পনপ্রসূত নয়। স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভুই সাধারণ ভক্তদের সঙ্গে হরিনাম সংকীর্তন করেছেন এবং অন্তরঙ্গমণ্ডলীর সঙ্গে পদাবলির রসাস্বাদন করেছেন এমন বর্ণনা পাওয়া যায় বিভিন্ন গ্রন্থে। বহুল প্রচারের উদ্দেশ্যে সাধারণ শ্রোতার মনোরঞ্জন করতে গিয়ে ক্রমশ নিম্নগামী হয়েছে কীর্তন গানের মান।

তবে কি এইভাবেই ক্রমশ বিলুপ্তির পথে হারিয়ে যাবে বাংলার একমাত্র শাস্ত্রীয় গানের ধারা কীর্তন? নাকি সুদূর ভবিষ্যতে হলেও নতুন মোড়কে পূর্বের গৌরব নিয়ে আবারও প্রস্ফুটিত হবে পদাবলি? বাংলা ছাড়িয়ে ভারত তথা বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে তার সৌরভ!

কেবলই বৎসরান্তরে কোনও শৌখিন টিভি অনুষ্ঠানে কীর্তন নিয়ে কয়েকটি ভাব গদগদ এপিসোড নয়, কীর্তনের প্রয়োজন অন্যান্য সংগীত ধারার পাশে গান হিসাবে নিজের দৃঢ় মঞ্চ। ধর্মীয় সংগীত হওয়ার সুবাদে কীর্তনকে বিচারের ঊর্ধ্বে তুলে দেওয়া নয়, বরং প্রয়োজন নতুন উৎসাহে কীর্তন শিক্ষার প্রচার। প্রয়োজন সচেতনতা, সংস্করণ এবং পুনর্নির্মাণ।

এত নৈরাশ্যের মাঝেও আনন্দের বিষয় যে, বর্তমান যুবসমাজের একাংশ কীর্তনের এই পুনরুত্থান কর্মসূচিতে যথেষ্ট আগ্রহী। তাঁদের সংখ্যা যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন বাংলার পদাবলি কীর্তন নিয়ে আমাদের আশাবাদী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।

… পড়ুন লহ গৌরাঙ্গ-এর অন্যান্য লেখা এক ক্লিকে …

Chaitanya Mahaprabhu Holi kirtan culture Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar কীর্তন দোলযাত্রা নগর-কীর্তন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন শ্রীচৈতন্য

Share this article on