


ফ্রস্ট যখন মার্কিন দেশে প্রায় সেলেব্রিটি তারকা, তখন দেখা যেত তিনি নানা অঙ্গভঙ্গি করে নিজের কবিতা স্টেজে অভিনয় করতেন, নিজের কবিতার গল্প বলতেন, তবে একই কবিতা নিয়ে নানা গল্পও বলেছেন। এমনই সব পাঠের শেষে আয়োজিত পার্টিতে তাঁকে দেখা যেত সমস্ত বিখ্যাত কবিদের নাম ধরে ধরে নাকচ করে দিতে। একটু হুইস্কি পেটে পড়লেই শুরু হয়ে যেত তাঁর সমসাময়িক বিখ্যাত কবিরা কেন কোনও কবিই নয় তা প্রমাণ করে দিতে। এলিয়ট, পাউন্ড তো বটেই অন্যান্য সমস্ত কবিকেই তিনি ধুয়ে দিতেন সেইসব সভায়।
১.
দৃশ্যটা কল্পনা করা যাক। এক দেশের এক ঘ্যাম ইউনিভার্সিটির নক্ষত্র-খচিত ইংরেজি বিভাগে এসেছেন সেই দেশের সেই সময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আলোচিত কবি। তাঁকে ডাকা হয়েছে– বিএ ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কবিতা নিয়ে কথা বলবেন, কী করে সমসাময়িক কবিতা পড়া হবে, কীভাবে কবিতার কাছে আসা যাবে ইত্যাদি নিয়ে তিনি বুঝিয়ে বলবেন। সপ্ততিপর কবি ক্লাসের ছাত্রদের বলছেন একটি করে কবিতা পড়তে। বিশেষ করে যদি তাঁরা নিজেরা কিছু লিখে থাকেন। অনেকেই নিজেদের কাঁচা কৈশোরক কবিতা পড়লেন। কবি ছন্দের ভুল ধরিয়ে দিলেন, উপদেশ দিলেন ছন্দের ব্যবহার নিয়ে, তার গুরুত্ব নিয়ে। কেউ পড়লেন সামনে বসে থাকা সেই বিখ্যাত কবির কিছু কবিতা। কবির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কবি স্মৃতিমেদুর হয়ে সেইসব কবিতার রচনা-বৃত্তান্ত জানালেন। ক্লাস প্রায় শেষের দিকে, তখন এক ছাত্রী উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর নিজের একটি কবিতা পড়লেন। পড়া শেষ হতেই কবির মুখ লাল, প্রচণ্ড গর্জন করে মেয়েটিকে থামতে বললেন। মেয়েটি ভয় পেয়ে থেমে গেল। তারপর কবি শ্লেষভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, কবিতাটা আসলে কার লেখা? মেয়েটি মাথা নামিয়ে কাঁদতে শুরু করল। তারপর কবি নিজেই উঠে দাঁড়িয়ে পোডিয়ামে পায়চারি শুরু করলেন। তারপর বললেন, কবিতাটি টি এস এলিয়টের। সকলে ভাবল, বিখ্যাত কবি এবার কুম্ভীলকবৃত্তি নিয়ে কথা বলবেন। কিন্তু না! কবি তারপর ঝাড়া আধঘণ্টা সময় ধরে বোঝালেন– কেন সেই কবিতাটি কোনও কবিতাই নয় এবং আরও গভীরে গিয়ে বোঝালেন, এলিয়ট কেন কোনও গুরুত্বপূর্ণ কবি নন। সমস্ত কবিতার ছাত্রছাত্রীদের সেইসব ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মন দিতে হবে দেশের গভীরে। বলে তিনি নিজের দু’টি নতুন কবিতা শোনালেন। বিশ শতকের শিকড় আসলে নিজের শিকড়েই লুকিয়ে আছে। বিখ্যাত সেই কবির নাম রবার্ট ফ্রস্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হার্ভার্ড। যেখানে ফ্রস্ট নিজে পড়েছেন।

কবিরা সাধারণত হিংসুটে হন। পরশ্রীকাতর। সমস্ত লেখকরাই কমবেশি হয়ে থাকেন। ইতিহাস বহু পরে কাউকে মাথায় তুলে নিলেও সে কবির জীবদ্দশায় হয়তো অন্য কেউ বেশি জনগ্রাহ্য থাকেন। সেই সময়টা সাধারণত বেশ কণ্টকময়! ‘জীবিত অবহেলিত কবি’ ব্যাপারটা শুনতে এবং অনেক ক্ষেত্রে রোম্যান্টিক অর্থে আকর্ষণীয় হলেও প্রকৃত বড় কবির ক্ষেত্রে সেটা বেশ কষ্টকর। সে ঘটনা ঘটে চলেছে বোধহয় আদিকাল থেকেই। এই প্রসঙ্গের অবতারণা রবার্ট ফ্রস্টের প্রসঙ্গে। রবার্ট ফ্রস্ট মার্কিন দেশের শেষ কবি যাঁকে সে দেশের মধ্যবিত্ত সমাজের বইয়ের তাকে দেখা যেত শখের সংগ্রহের উপন্যাসগুচ্ছের মাঝখানে, হংস মধ্যে বক যথা। তাঁর সময়ের পরে কবিতা কেবলমাত্র সাহিত্যের ছাত্ররা পড়েন, বিশেষজ্ঞরা পড়েন, আর পড়েন কবিরা। (তবে পেশাদার কবিরা তাঁদের সমসাময়িক কবিদের কবিতা একটা বয়সের পর মোটের উপর পড়েন না মূলত ব্যক্তিগত ঈর্ষার কারণে।)

রবার্ট ফ্রস্টের জীবনে পরিচিতি এসেছিল অনেক পরে। তাঁর প্রথম কবিতার বই বেরয় ৪০ পেরনোর পর। ফ্রস্টের কবিতা অনুবাদ করতে গিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই ঘটনা থেকে বাংলার ছটফটে তরুণ কবিদের শিক্ষা নিতে বলেন। যখন তিনি মার্কিন দেশে প্রায় সেলেব্রিটি তারকা, তখন দেখা যেত তিনি নানা অঙ্গভঙ্গি করে নিজের কবিতা স্টেজে অভিনয় করতেন, নিজের কবিতার গল্প বলতেন, তবে একই কবিতা নিয়ে নানা গল্পও বলেছেন। এমনই সব পাঠের শেষে আয়োজিত পার্টিতে তাঁকে দেখা যেত সমস্ত বিখ্যাত কবিদের নাম ধরে ধরে নাকচ করে দিতে। একটু হুইস্কি পেটে পড়লেই শুরু হয়ে যেত তাঁর সমসাময়িক বিখ্যাত কবিরা কেন কোনও কবিই নয় তা প্রমাণ করে দিতে। এলিয়ট, পাউন্ড তো বটেই অন্যান্য সমস্ত কবিকেই তিনি ধুয়ে দিতেন সেইসব সভায়। তাঁর অনেক প্রাক্তন ছাত্র ও কবিরা এতে বিরক্ত হলেও বলার কিছু ছিল না, কারণ ততদিনে রবার্ট ফ্রস্ট গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে ঈশ্বরের রূপ।

এই কুচুটে ফ্রস্টকে দিয়ে একটি বিরাট কাজ করানো গিয়েছিল। মার্কিন তথা বিশ্বকবিতার স্তম্ভ এজরা পাউন্ড তখন ওয়াশিংটন ডি সি শহরের সেন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগে বন্দি। সবাই জানেন, পাউন্ড দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মুসোলিনির হয়ে ইতালির রেডিও থেকে মার্কিন-বিরোধী ধারাবাহিক বক্তৃতা দেন। (এই ইতিহাস নিয়ে পরে লেখা যাবে এক সম্পূর্ণ নিবন্ধ) যুদ্ধশেষে মার্কিন সেনা তাঁকে গ্রেফতার করে প্রথমে খাঁচায় পোরে। তারপর তাকে জনসমক্ষে প্রায় প্রদর্শিত করা হয়। তারপর নানা মহলের হস্তক্ষেপে তাঁকে মানসিক রোগী হিসেবে সেন্ট এলিজাবেথে স্থানান্তর করা হয়। পাউন্ড সেখানে ১২ বছর থাকেন যুদ্ধবন্দি মনোরোগী হিসেবে। এই বন্দিদশা তাঁর কবি-লেখক-অনুরাগী বন্ধুদের আর ভালো লাগছিল না। তাঁরা চাইছিলেন, পাউন্ডকে যেন অন্তত কোনও মুচলেকা দিয়ে বের করে আনা যায়। সমস্ত মার্কিন লেখক জগৎ মার্কিন কংগ্রেসকে চিঠির পর চিঠি লিখে চলে। কিন্তু সবই বিফল। সে দেশে কবি-লেখকদের সামাজিকভাবে কেউই তেমন পাত্তা দেয় না, রাজনীতির জগতে তো একেবারেই নয়। মার্কিন দেশে রাজনীতিবিদরা যে সাহিত্য পড়বেন না– সেটা ততদিনে সবাই মেনে নিয়েছে (পরিস্থিতিটা কেমন চেনা মনে হচ্ছে না?)। যে এজরা পাউন্ডের প্রভাব ততদিনে বিশ্বের কবিতায় ধরা পড়েছে। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থ এবং তাঁর হাত ধরে কবিতায় আসা কবিদল মার্কিন কবিতায় সবচেয়ে বেশি দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। বিট প্রজন্মের হাত ধরে পাউন্ডের বন্ধু উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস মার্কিন কবিতার ভাষায় বোধহয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছেন (উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের তুলনা আমাদের জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে করা যায়। যদিও উইলিয়ামস বেঁচে থাকতেই পেয়েছেন সমস্ত স্বীকৃতি)। যার ফলস্বরূপ উইলিয়ামসের প্রিয় কবিবন্ধু এজরা পাউন্ডকে বন্দি রাখাটা বোধহয় মার্কিন গণতান্ত্রিক পাঠকসমাজে একটা অস্বস্তি তৈরি করছিল।

ততদিনে মার্কিন সাহিত্য পাঠকমহলে (আবার মনে করাই, ‘সাহিত্য পাঠক’ মানে সাহিত্য রচনাকারী এবং ছাত্রছাত্রী) এজরা পাউন্ড মানে উন্মাদ ফ্যাসিবাদী অথচ কবিতায় তাঁর অবদান গদ্যে জেমস জয়েসের অবদানের সমতুল্য। এমন এক রঙিন চরিত্রকে যুদ্ধবন্দি করে রাখা সকলের কাছেই কণ্টকময়। কবিতায় দু’বার পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী কবি আর্চিবল্ড ম্যাকলিশ সবরকমের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে, শেষে একটি ফন্দি এঁটে জানালেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারজয়ী ঔপন্যাসিক উইলিয়াম ফকনারকে। কী সেই ফন্দি? ফকনার গিয়ে রবার্ট ফ্রস্টকে জানাবেন যে, মার্কিন সাহিত্য জগৎ ইদানীং ফ্যাসিবাদী এজরা পাউন্ডকে নিয়ে বড্ড বেশি কথা বলছে। রবার্ট ফ্রস্ট বেঁচে থাকতে তাঁর নিজের প্রাপ্য সময় অন্য কেউ নিয়ে নিক এটা কি ঠিক হচ্ছে? প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ম্যাকলিশ ততদিনে ফ্রস্টের বাতিল খাতায় চলে এসেছেন। এবং ফ্রস্টের ঈর্ষা ততদিনে মার্কিন লেখক-মহলে বিখ্যাত। ফকনার ঠিক তাই করলেন এবং ফল হাতেনাতে! মার্কিন দেশে জীবিত রবার্ট ফ্রস্টকে ফেলে লোকে এক যুদ্ধাপরাধী পাগলকে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে এটা হতে পারে না। আগেই বলেছি ফ্রস্ট ছিলেন মার্কিন দেশের শেষ পাবলিক কবি। মার্কিন কংগ্রেস অন্তত তাঁর নামটা জানত। অনেক জননেতা তাঁর কবিতাও আওড়াতে পারতেন। তা ফ্রস্ট লিখলেন এক বিরাট চিঠি। গণতন্ত্রের পক্ষে একজন ফ্যাসিবাদী কবিকে ধরে রাখা কতটা অনুচিত সেটা বুঝিয়ে। এবং তাতেই কাজ হল। পাউন্ড ছাড়া পেয়ে চিরতরে চলে গেলেন ইতালিতে। জনমানস থেকে মুছে গেলেন। ম্যাকলিশ পরে লেখেন, যদি ফকনার তাঁর বুদ্ধিটা না-নিতেন তা হলে কী হত বলা মুশকিল। কারণ কবিদের একেবারে দু’ চক্ষে দেখতে পারতেন না ফ্রস্ট!

আর এইসব ঘটনা একের পর এক লিপিবদ্ধ করে গেছেন ফ্রস্টের হার্ভার্ডের ছাত্র ও প্রাক্তন মার্কিন পোয়েট লরিয়েট, কবি ডোনাল্ড হল, তাঁর ‘Old Poets, reminiscences and opinions’ বইতে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved