memoir of dwijen bandyopadhyay by her daughter | Robbar
Robbar
  • ৫ আশ্বিন ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাবার সঙ্গে সেই দিনগুলি

ছোট থেকে বাবা শুধু দুটো জিনিসই হতে চেয়েছে– হয় রিকশাওয়ালা না হলে মুদির দোকানের মালিক। একটা সময়ে বলত, ‘রিকশাওয়ালা তো হওয়া হল না। পায়ে খুব জোর লাগে। আমার তো ইউরিক অ্যাসিডের ব্যথা। পেরে উঠব না।’ তাহলে বাকি থাকছে কী? মুদির দোকানের মালিক। বাবার ইচ্ছে ছিল একটা বাড়ি বানাবে, তার নিচের তলায় হবে মুদির দোকান। সকাল হলেই দোকান খুলে সেখানে বসে বসে কাগজ পড়বে। আর কাস্টমার এলেই আমাকে ডেকে বলবে, ‘রূপসা দেখ্‌ তো কী চাইছে! আমি আর উঠছি না।’ এবং এইভাবেই গোটা দিনটা কাটবে।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ১৬:৪৬   
Facebook WhatsApp Messenger

‘…শৈশবে আর ফেরা যাবে না তো,
নেই পথ নেই, হারিয়ে গেছে সে দেশ…’

মহীনের ঘোড়াগুলির ‘ঘরে ফেরার গান’-এর এই দুটো লাইন বারবার ধাক্কা মারতে থাকে আমায়। শৈশব মানেই তো আমাদের বিজয়গড়ের একতলা ভাড়া বাড়ি, দু’দিক খোলা বারান্দা, ফেরিওয়ালার হাঁক, দুপুরে খড়খড়ি দেওয়া জানলা থেকে ঠিকরে আসা রোদ্দুরের কণা, পাড়ার সবুজ মাঠ, কুকুরদের বিস্কুট খাওয়ানো, বিকেলে খেলতে যাওয়ার সময়ে বন্ধুদের ডাক, সন্ধেবেলা রিহার্সালে গিয়ে বসে থাকা, আর রাতে বাড়ি ফিরে ঘুমনোর আগে বাবার কাছে ভূতের গল্প শোনা।

zoom
বাবার সঙ্গে

তখন ২০০১ সাল। আমার পাঁচ বছর বয়স। ‘চুনি পান্না’ সিরিয়াল নিয়ে তখন মাতামাতি চলছে গোটা রাজ্যে। বাবা কোনও এক কাজে ট্রেনে করে শিলিগুড়ি বা কোচবিহার যাচ্ছিল। আমি আর মা হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে গিয়েছি ছেড়ে আসতে। ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে জানলার বাইরে এসে মা ইশারায় কীসব বোঝানোর চেষ্টা করছে, আর আমি হেসে হেসে টাটা করছি। বাবাও ট্রেনের এসি কম্পার্টমেন্টের ভেতর থেকে বিভিন্নভাবে আমাকে হাসানোর চেষ্টা করছে। হঠাৎ পাশ থেকে একটা লোক এসে আমাদের কাণ্ডকারখানা দেখে বলে উঠল: ‘পান্নাকে দেখছেন, তাই তো? এই তো, এদিক দিয়ে দেখুন! এইখানটা আসুন! আরও ভালো করে দেখতে পাবেন। ওই তো পান্না!’ ছোট থেকেই আমার বেড়েপাকামো পছন্দ নয় (নিজেরটা ছাড়া)। তাই তৎক্ষণাৎ তাকে চোখ উল্টে বলতে যাচ্ছিলাম, ‘এই শুনুন! ওটা, না… আমার বাবা!’ কিন্তু তার আগেই মা মিটিমিটি হেসে আমার হাত চেপে ধরল। মাতব্বরি করে আর বলা হল না। বাবাও নিশ্চয়ই শুনতে পেয়েছিল একটু-আধটু। তাই ট্রেন ছাড়ার আগে শান্ত হয়ে ওই লোকটাকেও হেসে টাটা করল। আর আমাদেরও।

আমাদের তখনকার ভাড়াবাড়ির পিছনদিকে ছিল একটা উঠোন। সেই উঠোনে টগরফুল, নয়নতারা, কারিপাতা গাছ ইত্যাদি দিয়ে ছোট্ট একটা বাগান তৈরি করার চেষ্টা করেছিল মা। শোওয়ার ঘরের জানলা থেকে মাঝেমধ্যেই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম কত বড় হচ্ছে সেগুলো, বা আদৌ হচ্ছে কি না! আর আকাশ ভেঙে ঝমঝম করে যখনই বৃষ্টি নামত, তখনই আমি আর বাবা ছুটে চলে যেতাম তাদের মাঝে। দু’দিকে দু’হাত মেলে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতাম বেশ অনেকক্ষণ। আর এই ফাঁকেই ক্যামেরা এনে প্রত্যেকবার মা সেই মুহূর্তগুলো ক্যাপচার করে রাখত। তারপর বৃষ্টি থামলেই আরেক ঝামেলা– জ্বর এসে গেলে তো মুশকিল! তাই বাড়ির ভেতরে এসেই তাড়াহুড়ো করে বাবা তৎক্ষণাৎ তোয়ালে নিয়ে আমার মাথা মোছাতে শুরু করত। আর পাশ থেকে ভেসে আসত রেডিও-তে চলতে থাকা তখনকার বাংলা রক ব্যান্ডের সমস্ত গান। এই বৃষ্টিতে ভেজার ছবিগুলো আজও মাঝেমাঝে দেখি আর ভাবি… এতটা শান্তি বোধহয় আর কখনওই অনুভব করে উঠতে পারব না।

zoom
বাবার সঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজা

ছোটবেলা থেকেই ভীষণ ফিকল মাইন্ডেড আমি। বড় হয়ে কী হতে চাই, বুঝে উঠতে পারতাম না। একবার মনে হত ডাক্তার হব, একবার মনে হত অ্যাস্ট্রোনট, আবার পরে গিয়ে মনে হত ক্রিকেটার বা ব্যাডমিন্টন প্লেয়ার। কিন্তু বাবা এই ব্যাপারে খুবই ফোকাসড ছিল। ছোট থেকে বাবা শুধু দুটো জিনিসই হতে চেয়েছে– হয় রিকশাওয়ালা না হলে মুদির দোকানের মালিক। একটা সময়ে বলত, ‘রিকশাওয়ালা তো হওয়া হল না। পায়ে খুব জোর লাগে। আমার তো ইউরিক অ্যাসিডের ব্যথা। পেরে উঠব না।’ তাহলে বাকি থাকছে কী? মুদির দোকানের মালিক। বাবার ইচ্ছে ছিল একটা বাড়ি বানাবে, তার নিচের তলায় হবে মুদির দোকান। সকাল হলেই দোকান খুলে সেখানে বসে বসে কাগজ পড়বে। আর কাস্টমার এলেই আমাকে ডেকে বলবে, ‘রূপসা দেখ্‌ তো কী চাইছে! আমি আর উঠছি না।’ এবং এইভাবেই গোটা দিনটা কাটবে। নিজে বসে বসে খবরের কাগজ পড়বে, বই পড়বে, নিজের ডায়েরিতে লেখালেখি করবে। আর আমাকে দিয়ে করাবে দোকানের সমস্ত কাজ।

অনেক কম বয়স থেকে আমার মনে হত, সন্ধেবেলা হওয়া মানেই রিহার্সাল করা। সে বাবা-মায়ের নাটকেরই হোক আর আমার নাচেরই হোক। অতএব আমার বাকি বন্ধুরা যখন পড়াশোনা করত তখন আমি মন দিয়ে নাটকের রিহার্সাল দেখতে ব্যস্ত থাকতাম। বা তার ঠিক পাশের ঘরেই নিজের নাচের রিহার্সাল করতাম। রিহার্সালের ঘরে বাবা ছিল অন্য একটা মানুষ– একটু গম্ভীরও ছিল, আবার মজাদারও ছিল। তবে কখন কোন কথা সিরিয়াসলি বলছে, আবার কখন কোন কথা রসিকতা করে বলছে, তা ধরতে পারা কিছুটা মুশকিল ছিল বললেই ভালো। যদি সেই কোড কেউ ক্র্যাক করে ফেলতে পারে, তবে তার জীবন সহজ। আর না-পারলে, রাস্তা বেশ কঠিন, তবে অসম্ভব কিছু নয়। চেষ্টা জারি থাকত।

zoom

গড়িয়াহাটে রিহার্সাল শেষ করে সাদার্ন অ্যাভিনিউ দিয়ে লেক গার্ডেনস হয়ে বাড়ি ফেরার রাস্তাটা ছিল বাবার খুব প্রিয়। কিছুতেই সোজা রাস্তাটা নিয়ে ঢাকুরিয়া দিয়ে যেত না। গাড়ি ঘুরিয়ে ঠিক চলে যেত সাদার্ন এভিনিউয়ের দিকে। অত্যন্ত জেদি যাকে বলে আর কী! আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কেন? শুধু শুধু বেশি ঘুরে এই দিক দিয়ে যাওয়ার কী মানে?’ বাবা বলেছিল, ‘এদিকে অনেক গাছপালা। রাস্তাটাও সুন্দর। এখান দিয়ে গাড়ি চালাতে ভালো লাগে। ঢাকুরিয়াতে বড্ড আওয়াজ, বড্ড ভিড়। ধুর ধুর! কী দরকার?’

মাঝে মাঝে আমার, মায়ের আর বাবার খুব কম কথা হত। হয় আমার টিউশন, বা বাবার কাজ, বা মায়ের কোনও ব্যস্ততা। তাই মায়ের মনে হল আমাদের তিনজনের একটা কমন ডায়েরি দরকার। সেই ডায়েরিটা ছিল কিছুটা আজকালকার দিনের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মতো। যে যার ইচ্ছেমতো কিছু একটা লিখে রাখতাম, বা এঁকে রাখতাম। তারপরের জন এসে হয় সেটার উত্তরে কিছু লিখত, না হলে নিজের ইচ্ছেমতো অন্য কিছু আঁকিবুকি করে চলে যেত। মা হয়তো লিখত, ‘রূপসা আজকে বড্ড বেশি বদমাইশি করছে, সামলানো যাচ্ছে না!’ তাতে হয়তো আমি পরের পাতায় উত্তর দিতাম, ‘শাট আপ।’ তাই তার উত্তরে বাবা আবার সেই পাতাতেই লিখত, ‘উফফফ! কী হচ্ছে কী?’ তারপর তিনজনের দেখা হলেই সেই ডায়েরির এন্ট্রিগুলো নিয়েই শুরু হয়ে যেত প্রচণ্ড হাসাহাসি!

zoom
বাবা আর মায়ের সঙ্গে

একদিন গল্ফগ্রিন দিয়ে বাবা আমাকে সম্ভবত টিউশনে ছেড়ে আসতে যাচ্ছিল। গাড়ি চালাচ্ছিল বাবা, সামনের সিটে আমি। মা বোধহয় ছিল বাড়িতেই। হঠাৎ বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘বাবা, তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো? আমাকে, না মাকে? সত্যি করে বলবে কিন্তু!’ এক মুহূর্তের জন্যও না ভেবে উত্তর দিয়েছিল, ‘তোর মাকে!’ তখন বয়স আমার আট। আমাদের সমাজে বাচ্চাদের সবসময় তাদের মনমতো উত্তর দেওয়া হয়ে থাকে, যাতে তারা কোনওভাবে দুঃখ না পায়। কিন্তু বাবা সেটা করেনি। বাবা একদম সত্যি কথাটা বলেছিল। কথাটা শুনে আমার চোখ ছলছল করছিল ঠিকই। কিন্তু তৎক্ষণাৎ সামলে নিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল ‘কাঁদার কী আছে? সত্যিটাই তো বলা উচিত।’ এই সততা বাবার কাজ থেকেও কখনও-ই চলে যায়নি। বরং খুব কনশাসলি সেটা বজায় রাখার চেষ্টা করে গিয়েছে চিরকাল।

zoom
বাবা আর মা

কোনও কোনও সময়ে দেখতাম বাবা খুব চাপে। নিজের বা অন্য দলের নতুন নাটক নামবে ক’দিন পরেই। সারাদিন ধরে একটাই স্ক্রিপ্ট পড়ে যাচ্ছে। গাড়ি চালাতে চালাতে, সিগারেট খেতে খেতে বা টিভি দেখতে দেখতেও, সেই একই স্ক্রিপ্টের সংলাপ বলে যাচ্ছে। এরকমভাবে পরপর ক’টা দিন কাটার পর আমাকে বাবা নিজের স্টাডিতে ডাকত, স্ক্রিপ্টটা দিত আর বলত: ‘দেখতে থাক তো… ঠিকঠাক বলছি কি না। কাল শো, আজকে অন্তত মুখস্থ করতেই হবে!’ আমি এটা শুনে চোখ ওল্টাতাম, কারণ আমি জানতাম বাবা সংলাপ ভুলে গেলেও ম্যানেজ করতে এক্কেবারে এক্সপার্ট।

একদিন বাবার স্টাডিতে ঢুকেই দেখছি হাত-পা নেড়ে কাউকে খুব বকাবকি করছে। যথারীতি আমি ভেবেছি কোনও নাটকের সংলাপ বলছে হয়তো। কিন্তু আমাকে দেখামাত্রই বাবা কীরকম লজ্জা পেয়ে হাসতে হাসতে সিগারেটে টান দিতে লাগল। আর আমাকে আড়চোখে দেখতে লাগল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী?’ বাবা বলল, ‘না, তুই তো দেখে ফেললি আমি ঝগড়া করছি… তাই। সকালে একজনের ওপর খুব রাগ হয়েছিল। তখন কিছু বলতে পারিনি, তাই এখন তাকে সামনের চেয়ারে কল্পনা করে ঝগড়া করছি!’

zoom

এখনও মাঝে মাঝেই আমি শুনতে পাই বাবার গলা। কোনও স্পষ্ট কথা নয়, কোনও স্পষ্ট শব্দ নয়। বাড়ি জুড়ে শুধু শুনতে পাই বাবার গলার সেই আবছা এক আওয়াজ। ঘরদোর পেরিয়ে কখনও কখনও তা পৌঁছে যায় মহলাকক্ষে, গ্রিনরুমে, এমনকী, সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের রাস্তাগুলোতেও। আর ঠিক যখন রাতে ঘুমতে যাই বা স্টেজের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে দর্শকদের দিকে তাকাই, বাবার গলাটা যেন দু’-এক সেকেন্ডের জন্য হলেও খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে… আর সমস্ত আবছায়া কাটিয়ে কানের কাছে ভেসে আসে ‘মুষ্টিযোগ’ নাটকে বাবার সেই ইন্সপিরেশনাল সংলাপ: ‘তোর পাশেই আছি রে, যদু!’

Actor Dwijen Bandyopadhyay Indian actor Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on