memory of shankha ghosh and pratima ghosh by Srabanti Bhowmik | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চলব আমি নিজের আলো ধরে

বিয়ের আসরে জলপাইগুড়ির সুন্দরীশ্রেষ্ঠার বর দেখতে ছুটে এসেছিলেন লোকজন। খুবই মনখারাপ নিয়ে ফিরেছিলেন সবাই। দেবেশ রায়ের স্ত্রী, গায়িকা, আমার কাকলি কাকিমার কাছে শুনেছি, তখন কাকিমার নয় বছর বয়স, বর দেখে এমন বিশ্রী লেগেছিল, নেমন্তন্ন না-খেয়েই এক ছুটে বাড়ি চলে গিয়েছিল। মায়ের মাসিরা ঠাট্টা করে বললেন: ‘দ্যাখো, আমাদের মেয়ের সঙ্গে মিশে গায়ের রং যদি একটু পালটায়!’ বাবার জবাব: ‘উল্টোটাও তো হতে পারে!’

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১৯:৩৬   
Facebook WhatsApp Messenger
memory of shankha ghosh and pratima ghosh by Srabanti Bhowmik | Robbar

আমার মা, প্রতিমা ঘোষ, বিদুষী, অধ্যাপক, লেখক, সুন্দরী, সুভাষিণী, সুহাসিনী, শান্ত, ধৈর্যশীলা, আর কবি অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষের ২০ বছর বয়স থেকে বান্ধবী এবং ২৪ বছর বয়স থেকে অর্ধাঙ্গিনী। অনেক পরিচয়। এই প্রত্যেকটি বিষয় নিয়ে অনেক অনেক কথা লেখা সম্ভব। কিন্তু আজ মনে হল, একটি প্রশ্ন নিয়ে একটু ভাবি আর লিখে রাখি, আমার মা কি সেই সময়ের নিরিখে ঠিক ঠিক ‘আধুনিকা’? প্রগতিশীল?

zoom
প্রতিমা ঘোষ

ভাবনাটা এল এই জন্য যে, আমাদের বাড়িতে যাঁরা আসতেন– কবি, সাহিত্যিক, ছাত্রছাত্রীরা, বা বাবার বন্ধুরা, তাঁদের কারও কারও প্রখর সমালোচনা ছিল, মা বাবার ছায়ায় ঢাকা জীবন কাটিয়েছে, একটি সুখী গৃহকোণ তৈরি করেছে কেবল, যাকে ঠিক আধুনিকের পর্যায়ে ফেলা যায় না। আমার কম বয়সে আমার শিক্ষা নিয়েও সংশয় উঠতে দেখেছি। নারীবাদীরা কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন সোজাসুজি, ‘মিঠি কেন রান্নাঘরের দিকে যাবে!’ অর্থাৎ, মা-বাবা আমাকেও যথেষ্ট আধুনিক করে তোলার কোনও চেষ্টা করছে না কেন!

উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি শহরের মেয়ে আমার মা। ওকালতি করতেন মায়ের ঠাকুরদা তারাপ্রসাদ বিশ্বাস এবং বাবা সত্যেন্দ্রপ্রসাদ। আমার দিদিমা, বহরমপুরের প্রখ্যাত আইনজ্ঞ, সমাজকর্মী, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান এবং আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের ঘনিষ্ঠ ছাত্র অম্বিকাচরণ রায়ের নয়জন কন্যার একজন। নাম সুহাসিনী। স্কুলে যাননি কখনও, কিন্তু মেধাবী ছিলেন খুবই। অঙ্ক, বাংলা আর সংস্কৃতে পাণ্ডিত্য ছিল। মুক্তোর মতো হাতের লেখা, কণ্ঠস্থ থাকত মহাভারতের অংশবিশেষ, এবং বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা, রবীন্দ্রনাথ আর অতুলপ্রসাদের গান।

zoom
পরিবারের সঙ্গে শঙ্খ ও প্রতিমা ঘোষ

আমার মায়েরা পাঁচ ভাই, দুই বোন। তিনজন দাদার পর সুন্দরী মা কোঁকড়া একঢাল চুল আর গোলাপি গায়ের রং নিয়ে জন্মায় যখন, সঙ্গে সঙ্গেই ওই বাড়ির, আর পরে গোটা জলপাইগুড়ি শহরের চোখের মণি হয়ে ওঠে। শুধু ‘শ্রীময়ী’ বলেই নয়, দুই বাড়ির মিলিত চরিত্রের কারণে আমার মা-সহ সব মামা-মাসি অতি শান্ত, সুন্দর স্বভাব আর মেধা নিয়েই জন্মেছিল। মা একটু বড় হতেই, শুনেছি, তাদের বাগান, উঠোন আর বড় বাড়ির সামনের মাঠ পেরিয়ে রাস্তার দিকে সুপুরি গাছের সারির ধারে যে-পাঁচিল, তার ওপার থেকে উঁকিঝুঁকি শুরু হয়ে গিয়েছিল উঠতি বয়সের ছেলেদের। মা আমাদের গল্প করেছে, এসবের জন্য একা রাস্তায় চলতে কোনও অসুবিধে হয়নি কখনও। করলা নদীর ধারের স্কুল পর্যন্ত বা মাইল খানেক দূরের কলেজ পর্যন্ত হেঁটেই যেত। কেননা, মায়ের বিশ্বাস মাথা সোজা রেখে চললে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এ অবশ্য চারের দশকের কথা, তখন পুরুষরাও সাবধান ছিলেন নিশ্চয়ই আজকের দিনের চেয়ে অনেক বেশি।

১৯৫২ সালে জলপাইগুড়ির আনন্দচন্দ্র কলেজ থেকে বাংলা অনার্স নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পরীক্ষায় প্রথম হয় আমার মা। সকলের মনে আছে নিশ্চয়ই, সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্তই ছিল। তাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্থান পাওয়া মানে গোটা পশ্চিমবঙ্গেই প্রথম। এরপর এমএ পড়তে হবে, মা আসবে কলকাতায়। এইখানে বাধল একটু ঝঞ্ঝাট। আমার দাদুর ইচ্ছে নয়, মা কলকাতায় আসে, বরং পাত্র জোগাড় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি।

zoom
জন্মদিন, মিষ্টিমুখ

অনেক আবেদন নিবেদনেও যখন কাজ হল না, মা অল্প কিছু জিনিস ছোট ব্যাগে গুছিয়ে নিয়ে, আমার দিদিমাকে বলে, দাদু কোর্ট থেকে ফেরার আগেই চলে গেল রেল স্টেশনে। কলকাতা যাবে, তারপর সেখান থেকে ট্রেন ধরে চলে যাবে বম্বে! ওখানেই তখন থাকেন আমার মেজমামা সুকুমারপ্রসাদ, ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানী। গম্ভীরভাবে মা একা দাদার কাছে চলেছে স্বেচ্ছায়, উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতা হয়ে আরব সাগর তীরে, শুধু লেখাপড়া শেষ না-করে বিয়ে হতে পারে না– এই মত নিয়ে।

স্টেশনে বসে আছে বেঞ্চে। হঠাৎই ‘ইভা’ বলে পিছন থেকে পরিচিত কণ্ঠের আহ্বান, কাঁধে হাতের স্পর্শ, পিছনে তাকিয়ে মা দ্যাখে, দাদু, মায়ের বাবা সত্যেন্দ্রপ্রসাদ। তখনও কোর্টের জামাকাপড়েই আছেন। বরাবরই কম কথার মানুষ। বললেন, ‘যাবে যে, টাকা লাগবে না? এই নাও।’

এই কাহিনির আগেও এ জাতীয় ঘটনা ঘটে গিয়েছে একটা। তখনও শেষ হয়নি মায়ের বিএ পড়া। দাদুর বন্ধুস্থানীয় একজন তাঁর ছেলের জন্য সম্বন্ধ চাইছেন, চলেই এসেছেন মেয়ে দেখতে। শুনে মা ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দিয়েছে। দিদিমাকে বলেছে, ‘কাল আমার পরীক্ষা আছে, আমি কিছুতেই সেজেগুজে বসব না।’ দিদিমা একটু বিপদেই পড়েছিলেন সেদিন, পরিচিত ভদ্রলোককে দাদু ডেকে এনেছেন বাড়িতে! কিন্তু মাকে দরজা খোলাতে পারেননি কিছুতেই।

zoom
পরিবারের সঙ্গে

লক্ষ করার বিষয়, এসব নিয়ে বাড়িতে যে বিরাট কিছু তর্জন-গর্জন হত, তা নয়। মায়ের বড়দা মুকুন্দপ্রসাদ কিছুই বলতেন না, দাদুও শান্ত থাকতেন বেশ। সেটা এই জন্যই যে মায়ের ওপর খুবই ভরসা ছিল বাড়ির সকলের। মায়ের ঠাকুরদার আমল থেকেই তাই। কলকাতা থেকে বড় বড়ে বাক্স ভর্তি বই আনাতেন তারাপ্রসাদ। মা-কে ডেকে খোলাতেন সেই বাক্স। প্রতিটি বই ঠিকঠাক আছে কি না, লিস্ট মিলিয়ে তুলবে তাঁর নাতনিই। তখনও যা, পরেও তাই, আমরাও দেখেছি, মাকে না-জিজ্ঞেস করে মামারা কোনও বড় কাজে সিদ্ধান্ত নিতেন না।

একবার মা কলেজ থেকে ফিরে শোবার ঘর সংলগ্ন কাপড় বদলানোর ঘরে আছে, শুনতে পেয়েছে, দাদু দিদিমাকে বলছেন, দূরে একটা বড় জমি আছে ওঁদের, ওই পাড়ার লোকেরা সেখানে একটা হাই স্কুল করবে বলে জমিটা কিনতে চাইছে। কী করা যায়, দেবেন কি না, কত দামই বা চাইবেন, এইসব। মা ওই বন্ধ ঘর থেকে বলে দেয়, ‘মা, বাবাকে বলো জমি অবশ্যই দিয়ে দিতে। আর যেহেতু ওঁরা স্কুল করবেন বলছেন, একটা টাকাও নেওয়া যাবে না। জমি দান করো। একটা শুধু শর্ত, স্কুলের নাম রাখতে হবে ঠাকুরদার নামে।’ এখনও, শিলিগুড়ির দিক থেকে জলপাইগুড়ি শহরে ঢুকতে গেলে শহরের একটু আগে গাড়ি থেকে মাথা ঝুঁকিয়ে আমরা দেখি, বিরাট মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ‘তারাপ্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়’। সেদিন বন্ধ ঘর থেকে মায়ের কথা শুনে দাদু হাসিমুখে নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, ‘যাক্, এই তো ঠিক সমাধান হয়ে গেল!’

zoom
জুটি

এর কিছুদিন পরে, ওই লোকজন আরও একটু জমি চেয়ে নেন মেয়েদের স্কুল তৈরির জন্য। দাদু বললেন, ‘তাহলে তোমাদের ঠাকুমার নামে মেয়েদের স্কুল তৈরি করতে বলি।’ দৃঢ় স্বরে মা বলেছিল, ‘না। কেন? মেয়েদের স্কুলের নামও হবে ‘তারাপ্রসাদ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়’। মায়ের ঠাকুমা ছিলেন প্রাচীন ধারণার বাহক, খুবই সংস্কারগ্রস্ত। অন্যদিকে ঠাকুরদার পাণ্ডিত্য, কর্মকুশলতা আর স্নেহ-মমতায় মোহিত ছিল মা। আর মেয়েদের স্কুলের নাম পুরুষের নামে হতে পারবে কেন, অথবা উল্টোটাও, এই প্রশ্ন ছিল মা-র মনে। ওই স্কুলটিও আছে এখনও ওই নামেই। বড় বাড়ির আহ্লাদী মেয়ে, কিন্তু বুদ্ধিমান আর অত্যন্ত দৃঢ়চিত্ত মানুষটিকে আমার মামাবাড়ির প্রত্যেকেই সম্মান করতেন, একথা শুনেছি, দেখেওছি।

জলপাইগুড়ি থেকে দু’জন সহপাঠিনী আর জনা চারেক সহপাঠীর সঙ্গে ট্রেনের পথে কলকাতায় এল মা, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট হোস্টেলে থেকে শুরু হল এমএ পড়া। এঁদের মধ্যেই ছিলেন অশ্রুকুমার শিকদার, দিনেশ রায়, পরে হীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর স্ত্রী হয়েছেন যিনি, সেই গায়ত্রী চক্রবর্তী আর মায়ের ছোটবেলার প্রিয় বন্ধু রীনা বিশ্বাস। এই ট্রেনের পথ কিন্তু আজকের মতো সহজ ছিল না, ফারাক্কা ব্রিজ হয়নি তখনও, গঙ্গা পেরতে হত স্টিমারে, খেজুরিয়া ঘাট এপারে, আর ওপারে ফারাক্কা, দুই টুকরো ট্রেন। রাতের অন্ধকারে এই স্টিমারে ওঠা-নামা বালির ঢালু ঘাট পেরিয়ে, কুলির মাথায় লটবহর চাপিয়ে।

এমএ পড়ার সময়েই বাবার সঙ্গে মায়ের ভাব হয়। কী করে হল, সে একটা খুব সুন্দর গল্প, বাবা-মা দু’জনেই খুব মজা করে বলত। কিন্তু সে গল্প এখন নয়। এখন বলি বাবা মায়ের বিবাহ-প্রসঙ্গ। সব দর্শনপ্রার্থী এলেই তো দুয়ার দেয় মা ঘরের। এমনিতেই সেজেগুজে বসবেই না কারও সামনে। আর তখন তো বদলে গিয়েছে পরিস্থিতি, কাকে বিয়ে করবে– সে তো ঠিকই করে ফেলেছে। এদিকে এমএ পরীক্ষা দিয়েই বহরমপুরের গার্লস কলেজে চাকরি শুরু করেছে মা, রেজাল্ট বেরনোর আগে থেকেই। বহরমপুরে তো মায়ের দাদুর বাড়ি, আর মায়ের বিএ পরীক্ষার এই বিপুল রেজাল্টের খ্যাতিতে চাকরি তখন এমনিতেই হল। বাবা পরীক্ষা দেয়নি ১৯৫৪-এ, ফলে চাকরি শুরুও করেছে দেরিতে। ’৫৫ সালে, তখনও চাকরির খোঁজে আছে বাবা। মায়ের দাদু অম্বিকাচরণ চিঠি দিয়ে জানালেন জলপাইগুড়ির বাড়িতে, ইভার বিয়ের চেষ্টা যেন না-করা হয়, ইভা নিজেই স্থির করেছে তার বিয়ের পাত্র।

এর ওপর কোনও কথা হওয়া অসম্ভব। আমার দিদিমা চুল বাঁধছেন মায়ের, রাতের ঘুমের আগে। এবং সেই সময়ে আমার মা আর দিদিমার একটি কথোপকথন:
–কী করে ছেলে? চাকরি?
–না। পরে করবে। তখন বিয়ে হবে।
–দেখতে কেমন?
–ভালো না।
–গায়ের রং কেমন?
–খুব কালো।
–শরীর স্বাস্থ্য কেমন?
–খুবই খারাপ।
–বাড়িঘর আছে?
–না।
এবার দিদিমার মুখে কাপড় চেপে খিলখিল হাসি।
বিয়ের সময় বড়মামা জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কোন মাপের গেঞ্জি কিনব?’
মায়ের উত্তর, ‘যত ছোট পাওয়া যায়।’
এবার বড়মামারও হাসি।

বিয়ের আসরে জলপাইগুড়ির সুন্দরীশ্রেষ্ঠার বর দেখতে ছুটে এসেছিলেন লোকজন। খুবই মনখারাপ নিয়ে ফিরেছিলেন সবাই। দেবেশ রায়ের স্ত্রী, গায়িকা, আমার কাকলি কাকিমার কাছে শুনেছি, তখন কাকিমার নয় বছর বয়স, বর দেখে এমন বিশ্রী লেগেছিল, নেমন্তন্ন না-খেয়েই এক ছুটে বাড়ি চলে গিয়েছিল। মায়ের মাসিরা ঠাট্টা করে বললেন: ‘দ্যাখো, আমাদের মেয়ের সঙ্গে মিশে গায়ের রং যদি একটু পালটায়!’ বাবার জবাব: ‘উল্টোটাও তো হতে পারে!’

zoom
বিয়ের ছবি

একটি বাগানবাড়ির সুন্দরী কন্যা অধ্যাপক ‘প্রতিমা বিশ্বাস’ থেকে ‘প্রতিমা ঘোষ’ হয়ে এসে পড়ল উদ্বাস্তু পরিবারের টানাটানির সংসারে। দু’টি ঘর, আর দু’টি বারান্দার বাড়ি, জেঠুর চাকরির সুবাদে পাওয়া নারকেলডাঙার রেলওয়ে কোয়ার্টার। সংসারে মোট জনসংখ্যা ১১ জন, প্রতিদিন দীর্ঘ সময়ের জন্য এসে থাকেন, অনেক সময় রাতেও থাকেন আরও জন ১৫ তো বটেই! এঁরা প্রত্যেকেই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, অথবা দাদু মণীন্দ্রকুমার ঘোষের পরিচিত মাননীয় মানুষজন। বারান্দাকে ঘর ভেবে নিয়ে খসখস টাঙিয়ে তৈরি হয়েছিল দাদুর ঘর। পিছনের বারান্দায় খাওয়ার চেয়ার-টেবিল সরিয়ে ঘুমত রমেশকাকু। এই কাকু পরিবারের দেখাশোনা করত, আমরা জানতাম নিজেরই কাকু। আসল শোবার ঘর অবশ্যই জেঠু বড়মার। আর মাঝের ঘরে মাটিতে ঢালা বিছানায় ঘুমত বাবারা তিন ভাই, ছোট একটি খাটে দিদা, দুই পিসি, আর মা। কেউ আড়ে, কেউ বহরে। অর্থাৎ, পায়ের দিকেও শুতে তো হতই কাউকে কাউকে। তিন বছর পরে অবশ্য বাবা-মা বেলগাছিয়ায় আড়াই জনের জন্য তিনটি ঘরের ফ্ল্যাট ভাড়া করে নেয়। খুবই বিলাসিতা তখন, আমার বয়স দুই। মায়ের দাপট এমনই যে, বিয়ের পরেই আমার দাদু (ঠাকুরদা)-কে বলেছে, ‘আচ্ছা, মা তো ধবধবে ফরসা, আপনারও তো পরিষ্কার রং, শঙ্খ এরকম কেন?’ মায়ের যে কী সৌভাগ্য, তাই ভাবি। এখানেও একই ব্যাপার, মায়ের প্রশ্ন শুনে দাদুর ‘হা হা’ করে হাসি! দু’টি বাড়িই নির্মল আনন্দময়। দাদুও প্রশ্ন করেন মাকে, ‘তুমি কি শঙ্খর হাতের লেখা নকল করেছ?’ মায়ের জবাব, ‘উল্টোটাও তো হতে পারে!’ আবার দাদুর হাসি। সত্যি আশ্চর্য, বাবা-মার হাতের লেখা এত একরকম যে কী করে!

এবার চলে যাই ১৯৬৮ সালের কাহিনিতে। ’৬৭-র অক্টোবর মাসে নয় মাসের জন্য বাবা চলে যায় আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রাম’-এর ডাক পেয়ে। নয় মাস শেষ হবে জুন, ১৯৬৮-তে। বাবা-মা স্থির করে ওই সময়ে মা চলে যাবে আমেরিকায়, দেড় মাস ইউরোপ একসঙ্গে বেড়িয়ে ফিরে আসবে দেশে। [এখানে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, সেই সময় বিদেশ থেকে দেশে বা দেশ থেকে বিদেশে টাকা আনা বা নিয়ে যাওয়ার অনেক বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু বাবার তো উপার্জন হয়েছে ওদেশে। সেই টাকা খরচ করার জন্যই এই বেড়ানো। এছাড়া বহু বই, রেকর্ড, রেকর্ড চেঞ্জার আর টেপ রেকর্ডার এসেছিল জাহাজে চড়ে।] মা-র আমেরিকা যাওয়ার প্রস্তুতি তো চলছিল। যেদিন রওনা হবে একা মা, সেদিন জানা গেল ভিসা মঞ্জুর হয়নি। এমনকী, আত্মীয়রা এসেছেন বিদায় দিতে, আমাকে দাদু স্কুল থেকে হাফ ছুটি করিয়ে আমাকে বাড়ি এনেছে। দেখি অঝোর কান্না মায়ের। যাওয়া হবে না।

zoom
মণীন্দ্রকুমার ঘোষ

এরপর ভাঙা মন নিয়ে বাবা একাই আমেরিকা থেকে বেরিয়ে পড়ল ইউরোপের উদ্দেশে। কয়েকদিন পরে আমরা হঠাৎই জানলাম, মা নিজেই দৌড়োদৌড়ি করে, কারও কোনও সাহায্য ছাড়াই, ব্যবস্থা করেছে ইউরোপ যাওয়ার ভিসার। আমেরিকা যাওয়া হল না, ঠিক আছে। মা ব্যবস্থা করে ফেলেছে জার্মানি হয়ে লন্ডন যাওয়ার। সেখানেই যোগ দেবে বাবার সঙ্গে, তারপর বেড়াবে। আমরা কেউ জানি না, বাবাও জানে না। বাবাকে জানানোর কোনও সুযোগ নেই। আমেরিকার নির্দিষ্ট ফোন নম্বরে আর পাওয়া যাবে না। ভরসা শুধু বাবার লেখা চিঠি। তাতেই মা জানতে পারছে কবে কোথায়, কখন বাবা পৌঁছবে বা থাকবে। এদিক থেকে উত্তর দেওয়া যাবে না, বাবার কোনও ঠিকানা তো নেই।

‘পথিক বাবা’কে পাওয়ার আশ্চর্য উপায় বের করেছে মা। আমার সেজমামা, প্রবোধকুমার, অনেক কাল ধরেই জার্মানিনিবাসী। মা ভিসার অ্যাপ্লাই করেছে এই দাদার কাছে যাচ্ছে দেখিয়ে। এবং তাতে তো সত্যিই কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়, ওই মামার চিঠিপত্রেই ভিসা অফিস সন্তুষ্ট। টাকা ধার করে জার্মানির টিকিট কেটেছে মা। সেখান থেকে যাবে লন্ডন, একদিন পরেই। সেই দিনই তার কাছাকাছি সময় বাবা পৌঁছবে লন্ডন, মা তো চিঠিতে জানে! লন্ডনে থাকতেন কবি উৎপলকুমার বসু, মায়ের মাসতুতো ভাই। সেখানেই মিলন হবে দোঁহে! আমি আছি আমার দাদু-ঠাকুমার জিম্মায়, আনন্দেই কেটেছিল আমার দেড় মাস। শুধু মাকে বিদায় জানিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে বাথরুমে ঢুকে চুপিচুপি একটু কেঁদে নিয়েছিলাম মনে পড়ে। আমার তখন দশ।

যাওয়ার দিন এল। আমাদের বস্তুতপক্ষে একান্নবর্তী পরিবারই ছিল তখনও, অন্ন ছাড়া আর সমস্ত প্রয়োজনীয় জীবনবৃন্ত দিয়ে যুক্ত ছিল বাবার পরিবার। সবাই এসেছে। মায়ের এই আশ্চর্য আয়োজনে সবাই হতচকিত এবং সকলের চোখ-মুখ প্রশংসায় উজ্জ্বল। আমাদের কালাচাঁদ সান্যাল লেনের বাড়ির এসে দাঁড়াল পাঁচ-ছয়টি ট্যাক্সি। সবাই যাবে এয়ারপোর্ট। ‘বীরাঙ্গনা’, বললেন আমার জেঠু, সত্যপ্রিয় ঘোষ। মা নামল সিঁড়ি দিয়ে। বাড়ির শেষ সিঁড়ি যখন নামছে, হঠাৎ ফুলকাকু (ছোটকাকু) অভ্র ঘোষ শুরু করল হাততালি, আর তখন সমবেত হাততালিতে শ্যামবাজার ট্রামডিপোর গলিতে কী হই চই। সবাই ছুটি নিয়ে মাকে বিদায় অভিনন্দন জানাতে চলেছে।

তারপর? জার্মানি পৌঁছেই দাদার কাছে বায়না, এক্ষুনি লন্ডনের টিকিট করে দাও। হতচকিত রাঙামামা (এই নামেই সেজমামাকে ডাকতাম) সব জেনে, শঙ্খকে নিয়ে লন্ডন থেকে আবার জার্মানিতে ফেরার শর্তে টিকিট কেটে দিল। লন্ডনে আগে পৌঁছে গিয়েছিল বাবা। বাবাকে একটা কফিশপে বসিয়ে আমার খুশিমামা (উৎপলকুমার বসু) বলেন, ‘একটু বসুন। জার্মানি থেকে একজন বন্ধু আসছে, তাকে রিসিভ করে একসঙ্গেই বাড়ি যাব।’ বাবার মাথায় হাত, ‘এতদিন পরে একটু বাংলায় কথা বলতাম উৎপলের সঙ্গে, আবার ইংরেজি বলতে হবে!’ একটু পরেই মাকে নিয়ে খুশিমামার প্রবেশ, আর বাবার মূর্চ্ছা যাওয়ার উপক্রম! পরে এই গল্প শুনে দাদু একটু রাগত স্বরেই বলেছিলেন, ‘উৎপলের উচিত ছিল স্মেলিং সল্ট রাখা! শঙ্খ অজ্ঞান হয়ে যেতে পারত!’ সমস্ত পরিকল্পনার কথা জেনে মাকে একটা ‘বীরচক্র’ গোছের কিছু উপাধি দিয়েছিল বাবা। এরপর, মা আর বাবা ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ইতালি আর গ্রিস বেড়িয়ে দেশে ফেরে। মায়ের বেশভূষাও ছিল দুর্দান্ত, স্লিভলেস ব্লাউজ, ফুল ভয়েলের আর সিল্কের শাড়ি, হাতে একটা কায়দার লাল ভ্যানিটি ব্যাগ, চোখে কালো চশমা!

উৎপলকুমার বসু ও শঙ্খ ঘোষ

আমার জন্মের পর থেকেই মাকে খুব অসুখে ভুগতে দেখেছি। অ্যালোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক, কবিরাজি, সবরকম ওষুধ দিয়ে সারানোর চেষ্টা হত। কতগুলি অপারেশন যে হয়েছে! কিন্তু বাবা যাতে ঠিকমতো সৃষ্টিশীল থাকে, দুর্বলতা যেন বেশি বাড়ে না, আমরা দুই বোন যেন যা চাই, ঠিক তাই করতে পারি, এসব নিয়ে এত সজাগ দৃষ্টি ছিল, যে খানিক হয়তো নিজের অযত্ন করেছে। ভোর সোয়া ছ’টার কলেজ, অনেক দায়িত্ব পালন করে একটা-দেড়টার আগে ফিরতে দেখিনি কখনও, সঙ্গে ঝোলায় থাকত কলেজের কাছে শ্রীমানী মার্কেট থেকে নিয়ে আসা সবজি আর অন্যান্য সাংসারিক রসদ। বাজার, ব্যাঙ্ক, এমনকী, আমাদের উল্টোডাঙার নিজস্ব ফ্ল্যাটটির পরিকল্পনার শুরু থেকেই মা একা সব কাজ করেছে। যখন সত্যিই একটা শেপ পেল বাড়ি, তখন তার ভিতরের সাজগোজ নিয়ে ভাবতে দেখেছি বাবাকে।

ফিরে আসি সেই রান্নাঘর প্রসঙ্গে। একান্নবর্তী পরিবারের রীতি আমরা যেন ভুলে না-যাই, এ বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি ছিল বাবার। তাই প্রয়োজনে আমাদের দু’জনকে রান্নাঘরের কাজে হাত লাগাতে দিয়েছে নিশ্চয়ই। বাবা চাইত বাড়ির সব অতিথি অভ্যাগতদের যেন যথেষ্ট আপ্যায়ন করা হয়। কিনে এনে নয়, বাবার ইচ্ছে করত বাড়িতে তৈরি খাবার সবাইকে দিতে। এতসব তো সাহায্যকারিণীদের দিয়ে হয় না! অন্যদিকে, এ-ও দেখেছি, আমার বোন যখন বিদেশে যাবে, সবাই মাকে বলছে, ‘একটু রান্না শেখাও! একা থাকবে, কী করে করবে সব?’ দৃঢ়স্বরে মা বলছে, ‘কিছুই শেখাতে হবে না, সব পারবে দরকার হলেই। এখন পড়াশোনা করুক। এত কিছু কঠিন নয় রান্না করা।’ বড় বাড়ির মেয়ে আমার মা, নিজেও কি বিয়ের আগে ঘরের কাজ করেছে তেমন? আহ্লাদেই থাকত। ‘রান্নাঘর’ তো নয়, আমার মামাবাড়িতে ছিল ‘রান্নাবাড়ি’! সেখানে আমিষ, নিরামিষ রান্নার আলাদা ঘর, চায়ের ঘর, ভাঁড়ার ঘর, বাসন মাজার ঘর এবং একটা লম্বা খাওয়ার ঘর, যার একপাশে থাকত শুধু দাদামশাইয়ের খাওয়ার জন্য সুন্দর কাঠের টেবিল চেয়ার, আর লম্বা করে পাতা থাকত সারি বেঁধে অন্যদের খাওয়ার টেবিল-চেয়ার। লোকলশকর লাগত অনেক। এছাড়াও বড়মামিমা আর দিদিমার পরিচালনা তো ছিলই। কলেজে পড়ার সময়েও শুনেছি, মা খেয়ে উঠে হাতমুখ ধুয়ে আমার দিদিমার আঁচলে মুখ মুছে নিত!

সেই মা-ই তো কতরকম সুখাদ্য তৈরি করেছে আমাদের প্রত্যেকের জন্য, পিসিদের পায়ের কাছে শুয়ে নববধূর রাত কাটিয়েছে, ভোরে উঠে তাড়াতাড়ি মাটি থেকে শয্যা গুটিয়ে মাদুর পেতে দাদুর এগজামিনার আর স্ক্রুটিনিয়ারদের বসবার জায়গা সাজিয়েছে। তাই মা জানত, মেয়েরা প্রয়োজনে সব পারে। ঘর সামলানোর পর, বাবার কবিতা বা প্রবন্ধের প্রথম পাঠকের দায়িত্ব নিয়েছে, যখন আমাদের আলাদা ভাড়াবাড়িতে ঠাঁই হয়। লেখা শেষ হলেই বাবা ডাকত মাকে। শুনবে, বুঝবে, আর মতামত দেবে। বিশেষত প্রবন্ধ। বাবার অশান্তি থাকত মনে হয়, দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখার পর। অনেক টুকরো টুকরো কাগজে নোট নেওয়ার পর, যখন দাঁড়াত গোটা প্রবন্ধ, মাকে না-শুনিয়ে শান্ত হত না। এ অবশ্য আমার কম বয়সের অভিজ্ঞতা। লোকসমাগম অনেক বেড়ে যাওয়ার পরে আর সময় হত না এই সুন্দর অবসরের।

প্রগতিশীল, আধুনিক নারী বলতে কী যে বোঝায়, আমি এখনও ঠিক জানি না।

Indian writer pratima ghosh Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shankha Ghosh utpal kumar basu

Share this article on