Robbar

আমাকে ডাকো তোমার নামে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 15, 2026 5:37 pm
  • Updated:June 15, 2026 5:37 pm  

গ্রীষ্মের বাগান, পরিষ্কার ছড়ানো নীল আকাশ, সরু পথের দু’ ধারে সবুজের অনন্ত বিস্তার, ছবির মতন শান্ত গাছের ছায়াঘেরা জলাশয়, পিচ, আ্যপ্রিকট ফলের সুগন্ধে সম্পৃক্ত বাতাস– এ যেন সত্যি সত্যিই ‘গার্ডেন অফ ইডেন’। সেই ঈশ্বরের বাগানে প্রেম-খেলায় মেতে উঠেছে এক কিশোর ও এক যুবক। রাগ-রাগিনীর ধীর বিস্তারের মতোই দু’জনের প্রেমের বিস্তার ঘটছে সময় নিয়ে, রহস্যময়তা বজায় রেখে।

রবীনা মিত্র

প্যারাডাইস কী? কাকে বলে স্বর্গলাভ? মৃত্যুর পর যে স্বর্গে যাওয়ার লোভে আমরা পাপকর্ম থেকে নিজেদের বিরত রাখি, সেই স্বর্গ কিন্তু অনায়াসেই রচিত হতে পারে আমাদের জীবদ্দশাতেই। 

কীভাবে তা সম্ভব?

এই স্বর্গলাভ সম্ভব, যদি মানুষ মন থেকে মুছে ফেলতে পারে অমূলক ভয়। যদি উন্মুক্ত মন নিয়ে সে তাকাতে পারে এই বৈচিত্রময় পৃথিবীর দিকে। যদি নিজের এবং সমাজের চেনা দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে সে দেখতে পারে মনুষ্যরূপ কত বর্ণময়! মানুষের কতরকম চিন্তা, কত বিচিত্র সেই চিন্তার প্রকাশ, কত বিচিত্র তার লিঙ্গ-পরিচয়, কতরকমভাবে সে পারে অপর একজন মানুষকে ভালোবাসতে। ভালোবাসার পবিত্রতার মধ্যে কেন জোর করে চাপানো হবে পাপ-পুণ্যের বোঝা? পুরুষের পুরুষের প্রতি আকর্ষণ, নারীর নারীর প্রতি আকর্ষণ, একজন পুরুষ বা নারীর উভয়লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণকে কেন দাগিয়ে দেওয়া হবে ‘পাপ’ বলে? 

‘Whoever does not love, does not know God, because God is love.’ –First John (Bible, New Testament) 

ঈশ্বর মানেই প্রেম এবং প্রেমই ঈশ্বর। 

কবি জন কীটসের কথা মনে পড়ে যায় এই প্রসঙ্গে। কবি লিখছেন– 

‘Beauty is truth, truth beauty,– that is all
Ye know on earth, and all ye need to know.’

অর্থাৎ সত্যই সুন্দর এবং সুন্দরই সত্য। কীটসের এই দু’টি লাইনের সঙ্গে পরিচিত নন এমন মানুষ বিরল, অথচ এই কথার মর্মার্থকে স্পর্শ করতে আমরা কতজন পেরেছি? যদি পারতাম তাহলে প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত নারী-পুরুষের প্রেমের বাইরে জনগণের চোখে স্বাভাবিক নয়, সেইরকম সমস্ত প্রেমকে অগ্রাহ্য, তাচ্ছিল্য, অবহেলা করতাম কি? সমকামী, ট্রান্সজেন্ডার, উভকামী প্রেমে আবদ্ধ মানুষদের দিতাম কি চরমতম শাস্তি? আমরা সৌন্দর্যকে অনুধাবন করি বাইরে থেকে। সৌন্দর্যের অন্তরে প্রবেশ করি না। আর তা করি না বলেই সত্য ধরা দেয় না আমাদের মননে। আমরা বুঝি না প্রেম আসলে কী!

Call Me by Your Name ছবির পোস্টার

সমকালীন ‘প্রাইড’ বা কুইয়ার সাহিত্যের আঙিনায় এক স্বতন্ত্র স্বরপ্রতিষ্ঠা করেছে মার্কিন-ইতালীয় সাহিত্যিক আন্দ্রে আসিমান লিখিত উপন্যাস ‘Call Me by Your Name’। বইটি প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। এই বই প্রাইড সাহিত্যে একটি মাইলফলক তৈরি করেছে, কারণ এই গল্পের দুই মুখ্য চরিত্র এলিও এবং অলিভারের সমকামী প্রেমের কাহিনি হয়ে উঠেছে এক নিবিড় মানবিক অভিজ্ঞতা। এই গল্পে জোরালোভাবে উঠে আসেনি কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক সংকট, তৈরি হয়নি কোনও পারিবারিক অস্বস্তির আবহাওয়াও। পাঠকের মনে তাই গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে সাধারণ দু’টি মানুষের প্রেমের উপাখ্যান। 

এই উপন্যাসে আমরা দেখি আটের দশকের এক ঝকঝকে, মনোরম ‘Italian summer’। ১৭ বছরের কিশোর এলিও তার পরিবারের সঙ্গে রয়েছে ইতালির এক গ্রামের বাড়িতে। এই বাড়িতে প্রতি গ্রীষ্মেই এলিওর বাবার সঙ্গে গবেষণার কাজ করতে আসেন একজন স্কলার। সেই বছর গবেষণার কাজ করতে আসেন ২৪ বছর বয়সি এক সুঠাম চেহারার সুপুরুষ যুবক, অলিভার। এলিওর প্রাথমিকভাবে অলিভারকে অত্যন্ত দাম্ভিক এবং অহংকারী বলে মনে হলেও, ধীরে ধীরে দু’জনের মধ্যে গড়ে ওঠে এক তীব্র আকর্ষণ। দু’জনের মধ্যে দিনে দিনে গাঢ় হয়ে উঠতে থাকা প্রেম যেন এই মনোরম ‘Italian summer’-এরই এক অপ্রত্যক্ষ প্রতিফলন। উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তাঁর সনেটগুচ্ছের ১৮ নম্বর কবিতায় তাঁর প্রেমিকের বিষয়ে লিখেছিলেন– 

“Shall I compare thee to a summer’s day?
Thou art more lovely and more temperate:
Rough winds do shake the darling buds of May,
And summer’s lease hath all too short a date;” 

অদ্ভুতভাবে এই কবিতায় প্রেম এবং প্রেমিক উভয়ক্ষেত্রেই চলে এসেছে গ্রীষ্মের প্রসঙ্গ। প্রশ্ন হল, কেন? ভারতবর্ষে বসে মনে হতে পারে, প্রেমের মতো এত সুন্দর অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে লেখক এই প্যাচপ্যাচে, ভ্যাপসা গরমে নাভিশ্বাস উঠে যাওয়া একটি ঋতুর প্রসঙ্গ কেন টানছেন? সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে, ভারতের গ্রীষ্মকাল এবং ইউরোপীয় গ্রীষ্মকালের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। অধিকাংশ ইউরোপীয় দেশগুলিতে গ্রীষ্মকাল আসলে বসন্তেরই আরেক রূপ। তাই শেক্সপিয়ার তাঁর প্রেমিককে (আমরা সকলেই জানি তাঁর সনেটগুচ্ছের প্রথম ১২৬-টি সনেট তিনি লিখেছিলেন ‘ফেয়ার ইয়ুথ’ অর্থাৎ তাঁর এক পুরুষ প্রেমিকের উদ্দেশে) একটি গ্রীষ্মের দিনের মতো সুন্দর বলছেন। এবার আমরা যদি আমাদের গোটা জীবনকে একটি ঋতুচক্রের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে বসন্ত বা গ্রীষ্মকাল হল আমাদের যৌবনকাল। এই গ্রীষ্মকাল ক্ষণস্থায়ী (ইউরোপের নিরিখে), যেমন আমাদের যৌবনও চিরস্থায়ী নয়। তাই লেখক আন্দ্রে আসিমান এই গল্পে এক স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরি করেছেন একটি ইতালীয় গ্রীষ্মকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে। গ্রীষ্মের বাগান, পরিষ্কার ছড়ানো নীল আকাশ, সরু পথের দু’ ধারে সবুজের অনন্ত বিস্তার, ছবির মতন শান্ত গাছের ছায়াঘেরা জলাশয়, পিচ, আ্যপ্রিকট ফলের সুগন্ধে সম্পৃক্ত বাতাস– এ যেন সত্যি সত্যিই ‘গার্ডেন অফ ইডেন’। সেই ঈশ্বরের বাগানে প্রেম-খেলায় মেতে উঠেছে এক কিশোর ও এক যুবক। রাগ-রাগিনীর ধীর বিস্তারের মতোই দু’জনের প্রেমের বিস্তার ঘটছে সময় নিয়ে, রহস্যময়তা বজায় রেখে।

গ্রীষ্মের অলস দুপুরগুলিতে এলিও ও অলিভার সময় কাটায় সাহিত্য আলোচনা করে, কখনও বা একসাথে সাঁতার কাটে তারা, সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, এলিও অলিভারকে পিয়ানো বাজিয়ে শোনায়। একে অপরকে চিনতে শুরু করে তারা। এই ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া পারস্পরিক আকর্ষণের মধ্যে জায়গা করে নেয় দ্বিধা, অভিমান, কষ্ট, গভীর সান্নিধ্যের আবেগ। গ্রীষ্ম এই দুই প্রেমাবদ্ধ মানুষের কাছে হয়ে ওঠে নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করার অবকাশ, তাদের একান্ত নিজস্ব স্বর্গ। কিন্তু ঋতু যেমন পরিবর্তনশীল, তেমনই একসময় দু’জনের একসঙ্গে কাটানোর সময়ও শেষ হয়। শেষ হয় গ্রীষ্ম। 

শুরু হয় বিরহপর্ব। অলিভার ফিরে যায় আমেরিকায়। দু’জনের জীবন বইতে থাকে নিজের নিজের ছন্দে, কিন্তু এলিও ও অলিভার দু’জনের স্মৃতিতেই জেগে থাকে সেই অলৌকিক মায়াবী দিনগুলি। দু’জনের মধ্যে কেউই ভুলতে পারে না একে অপরের সান্নিধ্যে কাটানো সেই দীর্ঘ অলস গ্রীষ্ম-দুপুরগুলির নরম আবেশ, নিঃশব্দ অথচ তীব্র মিলনরাত্রির জাদুময়তা। অলিভার আমেরিকা ফিরে আসার আগে তারা দু’জন ঘুরতে যায় রোমে। সেখানে তাদের গোপন প্রেম হয়ে ওঠে আরও স্বাধীন ও বেপরোয়া। সেই সব সুখস্মৃতি যে দু’জনের শরীর-মনের কোষে কোষে হানা দিয়েছে বছরের পর বছর, তা পাঠক জানতে পারে এই উপন্যাসের শেষ চ্যাপ্টার ‘Ghost Spots’-এ এসে। 

১৩ বছর পর আবার দেখা হয় এলিও ও অলিভারের। অলিভার তখন আমেরিকার এক কলেজের অধ্যাপক, দুই পুত্রের পিতা। এলিও অলিভারের সঙ্গে দেখা করতে যায় তার কলেজে। শুরু হয় কথোপকথন। কথায় কথায় উঠে আসে তাদের সমস্ত ‘Ghost Spots’। এই স্পটগুলি হল সেইসব জায়গা, যেখানে রয়ে গিয়েছে ওদের একসাথে কাটানো প্রণয়-আক্রান্ত সময়ে ধকধক করা সব স্মৃতি। সেইসব স্মৃতি দু’জনেরই মনে সন্ধ্যাতারার মতো উজ্জ্বল হলেও, দু’জনেই প্রাণপণ চেষ্টা করে চলে ভিতরে চলতে থাকা তোলপাড় কোনওমতে লুকতে। কিন্তু যেখানে দু’টি হৃদয় গভীরভাবে একাত্ম হতে পারে, সেখানে কোনও না কোনও ফাঁকফোকর দিয়ে ঠিক বেরিয়ে পড়ে চেপে রাখা আবেগ, কোনও শব্দ অথবা চাহনি উসকে দেয় ভালোবাসার ছাইচাপা অঙ্গার। জ্বলে ওঠে অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার আগুন। 

একসময় যখন দু’জনের বিদায় নেওয়ার সময় হয়, তখন ওদের কথোপকথনে উঠে আসে একটি “মনে’স বার্ম”-এর ছবি দেওয়া পোস্টকার্ডের কথা, যেটি এলিও ইতালি থেকে অলিভারকে পাঠায় এবং অলিভার কলেজে নিজের অফিসে সেটা ফ্রেম করে রাখে। হাসি-ঠাট্টার মধ্যে এলিও অলিভারকে জিজ্ঞেস করে ওই পোস্টকার্ডটি ফ্রেম করার সময় সে পিছনে কী খোদাই করিয়েছে? উত্তরে অলিভার বলে– 

‘Just two words.’
Elio: ‘Let me guess: If not later, when?’ 

কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পরে এলিও হাল ছেড়ে দেয়। তখন অলিভার উত্তর দেয়– 

Cor cordium, heart of hearts, I’ve never said anything truer in my life to anyone.” 

এরপরের একটি লাইন এই গোটা ঘটনাটিকে দেয় এক অন্য আলো। গল্পের কথক এলিওর বয়ানে আমরা শুনতে পাই– 

‘It was good we were in a public place.’ 

এটি একটি সংকেত, একটি ইঙ্গিত। এই বাক্যের পিছনে লুকিয়ে আছে এক বাঁধ ভাঙতে চাওয়া আবেগের মহাসমুদ্র। শুধুমাত্র তারা একটি প্রকাশ্য জায়গায় থাকার কারণে সেই অনুভূতির দুরন্ত প্লাবন তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না। যদি তারা কোনও নিভৃত স্থানে থাকত, ওই মুহূর্তে কী ঘটতে পারত তা লেখক আমাদের স্পষ্ট করে না বললেও, আমরা তা আন্দাজ করতে পারি। 

আন্দ্রে আসিমান এই উপন্যাসে সমকামী প্রেমে শরীরের আবেদন ও চাহিদা, দৈহিক মিলনের উত্তেজনা, উন্মাদনা এবং সংবেদনশীলতাকে তুলে ধরেছেন– কখনও নানা প্রতীক চিহ্নের মাধ্যমে, আবার কখনও একেবারে খোলাখুলিভাবে। পীচ ফল, অলিভারের নীল শার্ট, অন্তর্বাস, মনে’স বার্মের (ফরাসি ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রকর ক্লদ মনে-র একটি ছবির সঙ্গে জায়গাটির মিল রয়েছে) পোস্টকার্ড– এই সমস্ত কিছুর মধ্যেই প্রচ্ছন্ন রয়েছে এলিও-অলিভারের পারস্পরিক শরীরী আকর্ষণ, দৈহিক মিলনের আহ্বান এবং একে-অপরের মধ্যে সম্পূর্ণ নিমজ্জনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। 

এই উপন্যাস অত্যন্ত সফলভাবে পুরুষত্বের পুনর্নির্মাণ করতেও সফল হয়েছে। এলিও এবং অলিভার দু’জনেই তাদের পুরুষ পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে, একে অপরের প্রতি হয়ে পড়েছে দুর্বল। এই প্রেমে দু’জনেই নিজের মতো করে দুঃখ পেয়েছে এবং সেই কষ্টের সঙ্গে লড়াই করেছে। তাদের হৃদয়ের কোমলতা, পুরুষমাত্রেই হতে হবে কঠোর– এই প্রচলিত ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি ছবি তৈরি করেছে। পুরুষের কান্না সমাজে এখনও গ্রহণযোগ্য নয়। পুরুষ হবে কঠিন, আবেগহীন, সমস্ত কোমল অনুভূতি থাকবে তার কঠোর নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এই উপন্যাসে দু’টি চরিত্রের অসহায়তা, আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ তাদের ভালোবাসার অভিজ্ঞতাকে করে তুলেছে আরও বেশিমাত্রায় মানবিক।

এই উপন্যাসের নামের মধ্যেই আছে এক আত্মপরিচয় ভেঙে নতুন এক পরিচয়কে আত্মস্থ করার অঙ্গীকার। ‘Call me by your name’ অর্থাৎ এমন তীব্র এই ভালোবাসা যে দু’জনের নামের বিনিময় ঘটছে, ঘটছে আত্মপরিচয়ের আদানপ্রদান। এলিও আর এলিও থাকছে না, হয়ে উঠছে অলিভার, অলিভার হয়ে উঠছে এলিও। এ যেন এক অন্তরাত্মার বিনিময়। এইভাবে এলিও এবং অলিভার সারাজীবন কাছে থাক বা দূরে, একে অপরকে বহন করবে নিজেদের মধ্যে, একজনের বেদনা অনুভব করবে অন্যজন, একজনের শূন্যতা হাহাকার করবে অন্যজনের বুকে, একজনের আনন্দ, হাসি এনে দেবে অন্যজনের মুখে। এইখানে ভিক্টোরিয়ান লেখিকা অ্যান ব্রন্টের উপন্যাস ‘Wuthering Heights’-এর কথা মনে পড়তে বাধ্য। সেখানে গল্পের নায়িকা ক্যাথরিন তার প্রেমিক হেথক্লিফের প্রতি তার অনুভূতি বোঝাতে গিয়ে বলছে কিছু আশ্চর্য কথা–

“Nelly, I am Heathcliff! He’s always, always in my mind: not as a pleasure, any more than I am always a pleasure to myself, but as my own being.” 

এ-ও কি নয় সেই সুতীব্র প্রেম, যেখানে হচ্ছে অন্তরাত্মার বিনিময়?

কুইয়ার সাহিত্যে এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সমকামিতা ইউরোপের মতো আধুনিক এবং প্রগতিশীল দেশেও এখনও সম্পূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি। এই প্রসঙ্গে Walt Whitman-এর একটি লাইন মনে পড়ে যায়: 

“I am he who aches with amorous love.” 

সুর এবং নীরবতা এই উপন্যাসের দু’টি মুখ্য চরিত্র। পাশ্চাত্য ধ্রুপদী মিউজিক এলিওর আত্মপরিচয়ের অংশ বলা যেতে পারে। এলিও জার্মান সুরকার বাখের সুর দ্বারা প্রভাবিত এবং বাখের সুরকে সে প্রায়ই নিজের মতো করে পুনর্নির্মাণ করে। সুরের ওঠা-নামা, বয়ে চলার মধ্যে দিয়ে আমরা এলিওর মনের অন্দরমহলে প্রবেশ করি। অলিভারের ভাষা হল নৈঃশব্দ্য। প্রায়ই আমরা তাকে চুপ করে ভাবতে দেখি। ধীরে ধীরে অলিভার এলিওর সুর এবং তার ভিতরকার বার্তা বুঝতে শুরু করে। আবার একইভাবে এলিও উপলব্ধি করে অলিভারের নীরবতার নিগূঢ় অর্থ। শব্দ ও নীরবতার মেলবন্ধন হয়। 

আসিমান উপন্যাসটি জুড়ে বিভিন্ন সময়ে এনেছেন গ্রিক ভাস্কর্য ও প্রত্নতত্ত্বের উল্লেখ। সাগর থেকে উদ্ধার করা হয় প্রাচীন গ্রিক মূর্তি, যার একটি হাত এবং মুখের অংশবিশেষ ভাঙা। সেই উদ্ধারকাজ দেখতে যায় এলিও ও অলিভার, এলিওর বাবার সঙ্গে। অসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সেই উদ্ধার হওয়া মূর্তি পুরুষ শরীরের নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যকে তুলে ধরে। এলিও এবং অলিভারের সম্পর্কও সামাজিকভাবে পূর্ণতা পায় না, তবে এই সম্পর্ক থেকে যায় সর্বতোভাবে সুন্দর। এলিও এবং অলিভার দু’জনেই যেন জীবন্ত গ্রিক ভাস্কর্য। অলিভারের শরীর মেদবিহীন, পেশিবহুল, পুরুষালি; আবার অন্যদিকে এলিওর কিশোরদেহ কৃশকায়, কৌমার্যের লালিত্যে পরিপূর্ণ। অলিভারের আবেগ অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত, প্রকাশবিমুখ। অন্যদিকে এলিও আবেগপ্রবণ, প্রেমিকের সঙ্গে মিলনের উত্তেজনায় সে ছটফট করে। অলিভার যদি হয় গভীর সমুদ্র, যে সমস্ত আবেগতরঙ্গকে ধারণ করবে বলে অপেক্ষারত, এলিও তবে এক স্রোতস্বিনী নদী, তার সমস্ত ব্যাকুলতা এবং হৃদয়োচ্ছ্বাস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় সীমাহীন সমুদ্রের বুকে। 

জুন মাস প্রাইড মান্থ। লিঙ্গ-পরিচয়ের নিরিখে সবরকম বৈচিত্র উদ্‌যাপনের সময় এই মাস। এই উদ্‌যাপন সফলতা পেয়েছে ১৯৬৯ সালের ২৮ জুন এলজিবিটিকিউএ+ মানুষদের বিরাট এক আন্দোলনের ফলস্বরূপ। ২৮ জুন গভীর রাতে আমেরিকার স্টোনওয়াল ইন-এ পুলিশ এলজিবিটিকিউএ+ মানুষদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গেলে, তাঁরা বহু দিনের অত্যাচার ও অবিচার সহ্য করার প্রতিক্রিয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবাদ করেন। পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘাত চলতে থাকে বহু দিন ধরে। এরপর ১৯৭০ সালে নিউইয়র্ক, শিকাগো এবং লস অ্যাঞ্জেলসে এলজিবিটিকিউএ+ মানুষেরা প্রথম প্রাইড মার্চ করেন। এই আন্দোলন ছিল প্রত্যেক মানুষের নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াই। এই আন্দোলন ছিল প্রেমের জন্য লড়াই। এই প্রাইড মার্চ থেকেই উঠে আসে ‘Love is love’ অথবা ‘Love knows no gender’-এর মতো স্লোগান। যে কোনওরকম প্রেমই প্রেম, এই সত্য আরও একবার প্রতিষ্ঠা করে এই উপন্যাস। এলিওর বাবা এবং মা উভয়েই তার অলিভারের সঙ্গে সম্পর্ককে সমর্থন করেন। এখানে, আসিমান, সমকামী সম্পর্কে পারিবারিক প্রত্যাখ্যানের যে স্বাভাবিক দৃষ্টান্ত দেখা যায়– সেক্ষেত্রেও এনেছেন স্পষ্ট ব্যতিক্রম। এই গল্পে তাই সব কিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে যা জেগে থাকে তা হল প্রেম। এই প্রেমকাহিনি যতটা বিরহের, ততটাই মিলনের, যতটা যন্ত্রণার, ততটাই আনন্দের, যেমন একাকিত্বের, তেমনই পূর্ণতার। এখানে সমকামিতা বড় কথা নয়, বড় কথা হল দু’টি মানুষের অন্তরাত্মার নিবিড় যোগাযোগ। তাই প্রেম, এখানে, তার সমস্ত পূর্ণতা ও ব্যর্থতা নিয়ে হয়ে উঠেছে এক অপূর্ব কবিতা। 

‘Whoever you are, now I place my hand upon you, that you be my poem.’ [Walt Whitman]