taslima nasreen remembering friendship with joy goswami | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমার বন্ধু জয়

যাঁরা আমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করেন, কিন্তু জয়ের কথা বলার অধিকার মানেন না, তাঁরা আসলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অর্থ বোঝেননি। স্বাধীনতা শুধু পছন্দের মানুষের জন্য নয়। যে কথা আমার ভালো লাগে, শুধু সেই কথার স্বাধীনতা দাবি করার নাম বাক্‌স্বাধীনতা নয়। যে মানুষের নীরবতায় আমি একদিন কষ্ট পেয়েছি, তাঁর কণ্ঠরোধ হতে দেখে আমি নীরব থাকতে পারি না।

শেষ আপডেট: আগস্ট ৮, ২০২৬, ১৯:০৩   
Facebook WhatsApp Messenger

জয় গোস্বামী আমার প্রিয় কবি। একটু-আধটু প্রিয় নয়, অনেক প্রিয়। কোনও কবির দু’-চারটি কবিতা ভালো লাগতে পারে, কিন্তু সেই ভালো লাগা আর একজন কবিকে ভালোবাসা এক জিনিস নয়। জয়ের কবিতা আমি শুধু পড়ি না, তাঁর কবিতার ভিতর ঢুকে পড়ি। কখনও সেখানে পথ হারাই, কখনও নিজেরই কোনও অচেনা মুখ দেখতে পাই। তাঁর কবিতার ভাষা একই সঙ্গে ঘরের এবং মহাকাশের, মাটির এবং স্বপ্নের, শরীরের এবং শরীরাতীত। তিনি চেনা শব্দকে এমনভাবে ব্যবহার করেন যে শব্দটি হঠাৎ অচেনা আলোয় জ্বলে ওঠে।

২০০২ সালে কলকাতার অ্যাকাডেমিতে আমাদের দুজনের কবিতাপাঠের অনুষ্ঠান ছিল। শুধু আমি আর জয়। আবৃত্তিলোক আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে আমাদের কবিতার ফাঁকে ফাঁকে ছিল মোহন সিংয়ের গান। যাঁরা অনুষ্ঠানটি দেখেছিলেন, আজও তাঁরা সেটির কথা বলেন। নন্দনের অংশু শূর আমাকে কতবার বলেছেন, এমন অসাধারণ কবিতার অনুষ্ঠান তিনি তাঁর ইহজীবনে দেখেননি।

zoom
জয় গোস্বামী ও তসলিমা নাসরিন

আমরা ঠিক করেছিলাম, কবিতাগুলো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হবে– প্রেম, বিরহ, নারীর অধিকার, দেশ, মানবতা। কখনও আমার কবিতার পরে জয় পড়ছেন, কখনও জয়ের কবিতার পরে আমি। মাঝখানে গান। সব শেষে আমি পড়ব জয়কে নিয়ে লেখা একটি কবিতা, আর জয় পড়বেন আমাকে নিয়ে লেখা তাঁর কবিতা।

কানায় কানায় ভরে ছিল অ্যাকাডেমি। এত মানুষ, অথচ কী আশ্চর্য নীরবতা! পিনপতন নীরবতার মধ্যে আমরা কবিতা পড়েছি। মনে হচ্ছিল, শ্রোতারা শুধু শুনছেন না, আমাদের সঙ্গে কবিতার ভিতর দিয়ে হেঁটে চলেছেন। অনুষ্ঠানটির কোনও রেকর্ড কারও কাছে আছে কি না জানি না। খুব ইচ্ছে করে আবার ফিরে দেখতে। মানুষ সময়ের কাছে বারবার ফিরে যেতে চায় কেন? সম্ভবত অতীতকে বদলানোর জন্য নয়; একবার অন্তত আবার ছুঁয়ে দেখার জন্য। আহা, কী চমৎকার ছিল সেই দিন!

আরও একটি স্মৃতি আমার কাছে অমূল্য। গোর্কি সদনে আমার ‘উতল হাওয়া’ বইটির উদ্বোধন করেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী ও জয় গোস্বামী। বাংলা সাহিত্যের দুই অসামান্য মানুষ আমার বইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন– এ আমার জীবনের এক বিরাট সম্মান। জয়ের সেই উদারতা আমি কখনও ভুলিনি; তাঁর মহানুভবতার সত্যিই তুলনা হয় না।

zoom
গোর্কি সদনে ‘উতল হাওয়া’ বইটির উদ্বোধন অনুষ্ঠান, উপস্থিত মহাশ্বেতা দেবী ও জয় গোস্বামী

জয়ের কবিতার বিষয়বৈচিত্র আমাকে মুগ্ধ করে। প্রেমের কোমলতা থেকে মৃত্যুযন্ত্রণা, মাতৃবিয়োগ থেকে সাধারণ মানুষের জীবন, গ্রাম-মফস্‌সল-শহর থেকে শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ– সবকিছুর জন্যই যেন তাঁর আলাদা ভাষা আছে। অথচ বিষয়গুলো তাঁর কবিতায় আলাদা আলাদা ঘরে বন্দি থাকে না। প্রেমের কবিতায় ঢুকে পড়ে মৃত্যু, মৃত্যুর কবিতায় জেগে ওঠে আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিগত ক্ষত হঠাৎ হয়ে ওঠে একটি যুগের ক্ষত।

‘মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়’ বা ‘মেঘবালিকার জন্য রূপকথা’র বিপুল জনপ্রিয়তার বাইরেও জয়ের কবিতার এক বিশাল, গভীর ও পরীক্ষাময় জগৎ আছে। ‘উন্মাদের পাঠক্রম’, ‘ভুতুমভগবান’, ‘ঘুমিয়েছো, ঝাউপাতা?’, ‘পাগলী, তোমার সঙ্গে’, ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল’, ‘পাতার পোশাক’– একটি বই থেকে আরেকটি বইয়ে তিনি নিজেকেই ভেঙেছেন, আবার নতুন করে নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতায় কখনও কথ্য ভাষার সহজ প্রবাহ, কখনও মন্ত্রের মতো ধ্বনি, কখনও নাটকীয়তা, কখনও অদ্ভুত ও ভয়াবহ চিত্রকল্প। তিনি কবিতাকে সুন্দর করে সাজিয়ে নিরাপদ জায়গায় বসিয়ে রাখেন না; কবিতার শরীর চিরে তার রক্ত, হাড়, স্বপ্ন এবং গোপন অসুখ দেখিয়ে দেন।

২০০৭ সালে আমার জন্য আরও একটি বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। জয় তাঁর লেখা একটি কবিতার বই আমাকে উৎসর্গ করলেন– ‘আমার শ্যামশ্রী ইচ্ছে আমার স্বাগতা ইচ্ছেগুলি’। উৎসর্গের পাতায় লেখা, ‘আমাদের সময়ের উজ্জ্বল ফলক তসলিমা নাসরিনকে।’ কথাটি পড়ে আমার চোখে জল চলে এসেছিল।

সেই বইয়ে ‘তসলিমা নাসরিনকে’ নামে একটি কবিতাও ছিল। জয় লিখেছিলেন–

আমাদের কাউকে যদি তোমার লড়াই লড়তে হতো?

দূরে দূরে নিরাপদ আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে
আমরা তোমার কত দোষ খুঁজে বার করলাম
আগুনের সামনে গিয়ে দেখলাম না আঙুলটি বাড়িয়ে

জানলায় দড়ির মই ঝোলানোই ছিল, কিন্তু তুমি
বেরিয়ে আসার কোনও সুযোগ নিলে না
জ্বলন্ত বাড়ির মধ্যে থেকে যাওয়াটাই বেছে নিলে
তোমার যুদ্ধের কাছে,
আমার জীবন কিছু নয়।

এখন আমার পিঠে ঠেকেছে দেওয়াল
এরপর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে
আমার জীবনটি ওই ধানক্ষেতে
ফেলে দিয়ে যাবে
নায়েব, গোমস্তা, লাঠিয়াল।

না, আমি তোমার মতো
ঘুরে পালটা লড়তে পারব না

এমনকী অবস্থানটুকু
জানাতে যাব না কাউকে পতাকা নাড়িয়ে।
যদি বন্ধু মনে করো, শুধু এ শুভেচ্ছাটুকু দাও। সাহসিকা,
অন্তত ঘাড় গুঁজে যেন মরতে পারি, –একা একা–স্বধর্মে দাঁড়িয়ে।

কবিতাটি এখন আবার পড়লে আশ্চর্য লাগে। জয় লিখেছিলেন, নিরাপদ আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে আমরা তোমার কত দোষ খুঁজে বার করলাম। তিনি শুধু অন্যদের কথা বলেননি, নিজেকেও সেই ‘আমরা’র মধ্যে রেখেছিলেন। আমার লড়াইকে তিনি দূর থেকে দেখেছিলেন, কিন্তু আগুনটিও চিনেছিলেন। সবাই যখন আমার দোষ খুঁজতে ব্যস্ত, তখন তিনি অন্তত বুঝেছিলেন, আমি জ্বলন্ত বাড়িটির মধ্যে কেন দাঁড়িয়ে আছি। পালানোর জন্য দড়ির মই হয়তো ছিল, কিন্তু নিজের বিশ্বাস ফেলে পালানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

জয় যখন ‘রোববার’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, একদিন ঋতুপর্ণ ঘোষ এবং অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে আমার রডন স্ট্রিটের বাড়িতে এসেছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন, আমি ‘রোববার’-এ নিয়মিত কলাম লিখি। ‘রোববার’ তখন আমার অত্যন্ত প্রিয় পত্রিকা, ঋতুপর্ণ ছিলেন পত্রিকাটির সম্পাদক। আমার প্রিয় কবি, প্রিয় চলচ্চিত্রনির্মাতা এবং প্রিয় কণ্ঠশিল্পী আমার বাড়িতে এসে আমাকে লিখতে বলছেন– কী যে খুশি হয়েছিলাম!

এরপর আমাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে, এমনকী ভারত থেকেও নির্বাসিত হতে হয়েছিল। আমেরিকার পাট চুকিয়ে কয়েক বছর পর আবার যখন ভারতে এসে থাকতে শুরু করেছি, একদিন শুনলাম, জয় দিল্লির ‘ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার’-এ কবিতা পড়তে এসেছেন। আমি ছুটে গেলাম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু সেদিন জয়কে আমার খুব দূরের মানুষ বলে মনে হয়েছিল। যেন হাজার মাইল দূর থেকে আমার সঙ্গে কথা বলছেন, যেন আমাকে ঠিক চিনতে পারছেন না।

এই জয়ই কি আমাকে একটি বই উৎসর্গ করেছিলেন? এই জয়ই কি আমাকে ‘আমাদের সময়ের উজ্জ্বল ফলক’ বলেছিলেন? এই জয়ই কি আমার লড়াই নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন?

আমি বরং কাবেরীর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললাম। জয় হয়তো তাতে স্বস্তি পেয়েছিলেন। তাঁকে আমার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছিলাম, কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি আসতে পারেননি। তখন আমার অভিমানী মন অবশ্য নানা প্রশ্ন তুলেছিল; আজ আর সেসব বিচার করতে চাই না। সেই রাতে আমি ঘুমতে পারিনি, সারারাত ছটফট করেছি। আমার প্রিয় কবিকে এমন আড়ষ্ট অবস্থায় দেখে আমার ভীষণ কষ্ট হয়েছিল। প্রিয় মানুষের সামান্য দূরত্বও কখনও কখনও অপরিচিত মানুষের বিরাট আঘাতের চেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

কেন জয় একটি রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছিলেন, আমি জানি না। তাঁকে আমি কখনও দলীয় রাজনীতির মানুষ বলে ভাবতে পারিনি। আমার বিশ্বাস, কবিদের স্বাধীন হওয়া উচিত। শাসকের পাশে দাঁড়িয়ে নয়, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের কবিতা লেখা উচিত। ইতিহাসে কবি ও ক্ষমতার সম্পর্ক কখনও সহজ ছিল না; জীবিকা, পৃষ্ঠপোষকতা ও স্বাধীনতার টানাপোড়েন তাঁদের বারবার কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু কবিরাও রক্তমাংসের মানুষ। তাঁদের পরিবার আছে, জীবিকা আছে, ভয় আছে, নির্ভরতা আছে, অসুস্থতা আছে, অপারগতা আছে। একজন মানুষের একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দিয়ে তাঁর সমগ্র জীবন, হৃদয় এবং সাহিত্যকে বিচার করা ঠিক নয়।

জয় যে রাজনীতির সঙ্গেই যুক্ত থাকুন, তাঁর রাজনীতি আমার অপছন্দের হলেও তাঁর কবিতা মুছে যায় না। কবির কোনও সিদ্ধান্তে আমি কষ্ট পেতে পারি, কিন্তু তাঁর কবিতার সত্যকে অস্বীকার করতে পারি না। প্রিয় মানুষের সঙ্গে মতভেদ হলেও ভালোবাসা মুছে যায় না। জয়ের ক্ষেত্রেও তা-ই।

‘দ্বিখণ্ডিত’ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কারা নিয়েছিলেন, কেন নিয়েছিলেন এবং আমাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিতাড়িত করার পেছনে কারা ছিলেন– আমি যতটা জানি, জয় সম্ভবত তার চেয়ে বেশি জানেন। এ-নিয়ে তিনি আমাকে অনেক কথা বলেছেনও। সাহিত্যজগতের কারা আমার বিরোধিতায় সক্রিয় ছিলেন, সেকথাও জানিয়েছিলেন। কতটা বিশ্বাস এবং মমতা থাকলে একজন মানুষ অস্বস্তিকর সত্যগুলো আরেকজনকে জানাতে পারেন! আমাদের নিয়মিত দেখা হয়নি, কথা হয়নি, কিন্তু তাঁর সেই বিশ্বাসটুকু আমি ভুলিনি।

কবিতার জগতে জয় যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, সেই তুলনায় আমি তৃণসম। আমার কাছে জয় বর্তমান বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। তার পরও তিনি আমার সঙ্গে যৌথ কবিতাপাঠ করেছেন, আমাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, নিজের একটি কাব্যগ্রন্থ আমাকে উৎসর্গ করেছেন। আমার প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে কথা বলেন। কখনও কখনও প্রশংসা একটু বাড়িয়েই করেন। এত প্রশংসার যোগ্য আমি হয়তো নই, কিন্তু সেই প্রশংসার ভিতর তাঁর হৃদয়ের উষ্ণতা টের পাই।

আমি জানি, প্রকাশ্যে যারা আমার স্তবগান করে, পিঠ চাপড়ে ‘সাবাশ’ বলে, তাদের কেউ কেউ আড়ালে আমার ধ্বংস চায়। আবার এমন মানুষও আছেন, যাঁরা প্রকাশ্যে কিছু বলেন না, কিন্তু নিঃশব্দে আমার মঙ্গল চান। জয় তাঁদেরই একজন। সম্প্রতি জয় বলেছেন, ১৫ বছর তিনি আমাকে ফিরিয়ে আনার দাবি করেননি, আমার পক্ষে মুখ খোলেননি। কিন্তু সেই স্বীকারোক্তিতে তাঁকে নিয়ে আমার ধারণার কোনও হেরফের হয়নি। তিনি একথা না বললেও তাঁকে আমি আমার শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু বলেই জানতাম। পরিস্থিতি তাঁকে হয়তো সবসময় আমার ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে দেয়নি; তবু নীরব জয়ের সরব শুভকামনা আমার সঙ্গে থেকেছে– আমি তা অনুভব করেছি।

zoom
১ আগস্ট ২০২৬, রবীন্দ্রসদনে জয় ও তসলিমা সাক্ষাৎ

১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে রবীন্দ্রসদনের দর্শকাসনে যখন জয়কে দেখলাম, তাঁকে মঞ্চে ডাকলাম। চেয়েছিলাম, তিনি কিছু বলুন। কিন্তু দর্শকদের একাংশ প্রবল আপত্তি জানালেন। চিৎকারের মধ্যে জয় মঞ্চে উঠেও কথা না বলে নেমে গেলেন। ঘটনাটি আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। জয়কে অপমান করা শুধু জয়কে অপমান করা নয়; তাঁকে যিনি মঞ্চে ডেকেছেন, সেই আমাকেও অপমান করা। কবিতাকে অপমান করা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অপমান করা।

২৪ বছর আগে একই শহরে পিনপতন নীরবতার মধ্যে আমরা দু’জন পাশাপাশি কবিতা পড়েছিলাম। ২৪ বছর পর আমি তাঁকে মঞ্চে ডাকলাম, অথচ কিছু মানুষ তাঁর কণ্ঠ শুনতে চাইলেন না। সময় কখনও কখনও কী নিষ্ঠুর দৃশ্য নির্মাণ করে!

যাঁরা আমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করেন, কিন্তু জয়ের কথা বলার অধিকার মানেন না, তাঁরা আসলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অর্থ বোঝেননি। স্বাধীনতা শুধু পছন্দের মানুষের জন্য নয়। যে কথা আমার ভালো লাগে, শুধু সেই কথার স্বাধীনতা দাবি করার নাম বাক্‌স্বাধীনতা নয়। যে মানুষের নীরবতায় আমি একদিন কষ্ট পেয়েছি, তাঁর কণ্ঠরোধ হতে দেখে আমি নীরব থাকতে পারি না।

জয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব প্রচলিত অর্থে ঘনিষ্ঠ নয়। আমাদের মধ্যে দীর্ঘ দূরত্ব আছে, নীরবতা আছে, অভিমান আছে। কিন্তু সেই দূরত্বের ওপর একটি সেতুও আছে– কবিতার সেতু। রাজনীতি সেই সেতুর কিছুটা ক্ষতি করতে পারে, সময় তার গায়ে ধুলো জমাতে পারে, কিন্তু তাকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলতে পারে না।

জয় যে রাজনীতির সঙ্গেই যুক্ত থাকুন, সেই রাজনীতি আমার অপছন্দের হলেও তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা অটুট থাকবে। শুধু তিনি আমার কাছে বর্তমান বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি বলে নয়; শুধু তিনি আমাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন বা বই উৎসর্গ করেছেন বলে নয়। তাঁর বড় হৃদয়ও এই শ্রদ্ধার কারণ। তিনি অন্য মানুষের সাহস চিনতে পারেন এবং সেই সাহসকে অকুণ্ঠে সম্মান করেন। দূরত্ব ও নীরবতার আড়ালেও তাঁর মমতা হারিয়ে যায় না।

জয় গোস্বামী আমার প্রিয় কবি। একটু-আধটু প্রিয় নয়, অনেক প্রিয়। কিছু অভিমান আছে, কিছু প্রশ্ন আছে, কিছু ক্ষতও হয়তো আছে। কিন্তু ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তবে তার মধ্যে শুধু প্রশংসাই থাকে না– কষ্ট, ক্ষমা, স্মৃতি এবং স্বাধীনতারও জায়গা থাকে।

bengali poet Joy Goswami Joy Goswami Taslima Nasrin Poetry Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Taslima Nasrin

Share this article on