


আবার কি ফিরে আসবে প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় পেপার লিক হওয়া? বিগত প্রতি প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অসন্তোষ, কান্না, আর পাশ-ফেলের পর, আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার পর, আবারও কি ফিরে আসবে নতুন রূপে আমাদের সন্তানদের পীড়া?… যেমন ফেরে ব্রহ্মপুত্রের বন্যা, (আর ভেসে যায় কোটি টাকায় তৈরি সেতুগুলি) ফেরে আকাশ চিরে ক্লাউডবার্স্টে ধস নামা হিমাচলের ফোর লেনের অদৃশ্য হওয়া, ফেরে কলকাতার সল্টলেকের প্রাক্-পূজা সামান্য বর্ষণেই হাঁটুজল? ফিরে আসারই পুনর্নির্মাণ, প্রতি বছর দিল্লির কোচিং সেন্টারগুলোর বেআইনি নির্মাণ, ফলত মাটির তলার ঘরে শ্বাসরোধী নাট্য পুনরাভিনয়, কখনও বৃষ্টি কখনও আগুনে । সে-ও এক থেকে যাবে?
‘বারবার মহারাজে আশিস করিয়া, দেবদূত গেল চলি স্বর্গ অভিমুখে।’ বলতেই হঠাৎ কোত্থেকে, ‘আবার সে এসেছে ফিরিয়া’ বলে একগাল হাসতে হাসতে দাশু একেবারে সামনে এসে উপস্থিত। হঠাৎ এরকম বাধা পেয়ে মন্ত্রী তার বক্তৃতার খেই হারিয়ে ফেলল, আমরাও সকলে কিরকম যেন ঘাবড়িয়ে গেলাম– অভিনয় হঠাৎ বন্ধ হবার জোগাড় হয়ে এল। তাই দেখে দাশু খুব সর্দারি করে মন্ত্রীকে বলল, ‘বলে যাও কি বলিতেছিলে।’ তাতে মন্ত্রী আরো কেমন ঘাবড়িয়ে গেল। রাখাল প্রতিহারী সেজেছিল, সে দাশুকে কি যেন বলবার জন্য যেই একটু এগিয়ে গেছে, অমনি দাশু, ‘চেয়েছিল জোর করে ঠেকাতে আমারে এই হতভাগা’– বলে এক চাটি মেরে তার মাথার পাগড়ি ফেলে দিল। ফেলে দিয়েই সে রাজার শেষ বক্তৃতাটা ‘এ রাজ্যেতে নাহি রবে হিংসা, অত্যাচার, নাহি রবে দারিদ্র্য যাতনা’ ইত্যাদি– নিজেই গড়গড় করে বলে গিয়ে, ‘যাও সবে নিজ নিজ কাজে’ বলে অভিনয় শেষ করে দিল।
দাশুর খ্যাপামি, সুকুমার রায়

পাগলা দাশু-র এই সুবিখ্যাত মঞ্চে প্রত্যাবর্তন একটি চিরন্তন মুহূর্তের জন্ম দিয়েছিল। এই সেই মুহূর্ত, যার নাম, বিস্ময়-জুগুপ্সা-কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা। সম্পূর্ণ নাটকের স্ক্রিপ্ট-ডায়ালগ তছনছ করে ফিরে আসা যেন এই।
কিন্তু এই ভবসংসারে ক’জন এমন পারে। এভাবেও ফিরে আসা যায়! ক’জন দেখাতে পারে এই অভিভব, বিভূতি। এই চমৎকার। বেশির ভাগ ফিরে আসাই ক্লান্তিকর, উপদ্রবী, মেজাজ খেঁচড়ানো।
এই যেমন ছাতাটি বন্ধুর বাড়ি ফেলে এসে কয়েক ফার্লং হেঁটে বৃষ্টির মুখোমুখি হলে মুখ বেঁকে যায়, আবার বৃষ্টি এল! অথবা, ভুল বানানের সরস্বতী পুজোর চাঁদার স্লিপ কেটে পাড়ার একদল বাচ্চা ১০১ টাকা নিয়ে গেলে, তারপর বেল বাজলে, ‘কী হল’ দিয়ে আরেক সেট বাচ্চাকে দেখে আমরা বলে উঠব, ‘আবার!’
বারেবারে ফিরে এসে উৎপাত করে, অথচ প্রতিটি ফিরে আসাই আগেরটির সমান বিরক্তিকর ও বিস্ময়বিহীন। যেভাবে রাস্তায় গর্ত, যেভাবে ক্ষুধা সূচকের দোলাচল, যেভাবে একবেলা যেতে না যেতেই ক্ষুধা। পরিবারের প্রতি সদস্যের ক্ষুধা আর মেয়েদের প্রবেশ আবার রান্নাঘরে। যে মেয়েরা (কদাচিৎ পুরুষ সদস্য) প্রতি বেলায় রান্নাঘরে ঢোকে, তারা জানে, ‘এবলা-ওবলা’র অন্ন আহার আয়োজনে কী ভীষণ পিন্ডি গেলানোর দিনগত পাপক্ষয়, বিরক্তি ও ক্লান্তি মাখামাখি হয়ে থাকে। ‘রাঁধার পরে খাওয়া, আবার খাওয়ার পরে রাঁধা,/বাইশ বছর এক-চাকাতেই বাঁধা।’-র (পলাতকা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) পর কোন শখ-সুখ-সাধ অবশিষ্ট থাকে আর!

দিনগত এইসব ফিরে আসার পাশাপাশি মাসে মাসে ফিরে আসা ব্যথাবেদনার মতো আছে বাচ্চাদের জ্বর ফ্যাঁচফোঁচ, নারীদের মাসিক অথবা মধ্যবিত্তের কাছে কাগজ ও দুধওয়ালার বিল।
বাৎসরিক ফিরে আসাগুলোও তো ঢের দেখা হল। প্রতি বর্ষায় জল জমা, প্রতি শরতে রাস্তা ভাঙা– দুই বিশেষভাবে যুক্ত। প্রতি রথে দুর্গাপুজোর খুঁটিপুজো, পাড়ায় বাঁশ পড়া, রাস্তা বন্ধ করে পুজো আচ্চা। পথে পথে ‘বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব’-এ গাছ কেটে গাছের গায়ে গেঞ্জিজাঙিয়ার ফ্লেক্স দিয়ে সমস্ত জনপদ সুশোভিত করার কদর্য চক্ষুপীড়াদায়ী ‘সৌন্দর্যায়ন’, প্রতি পূজার শেষে শুভ বিজয়া, বিজয়া দশমীর সকাল থেকে বলা যায় না কি বিকেলে প্রথম ভাসানটি হওয়ার পরই মাত্র বলা যায় এই বিতর্ক। সবই ফিরে ফিরে আসে আর এসে এসে ক্লান্ত করে যায়। ভাইফোঁটার দিন বোনফোঁটা নয় কেন, জামাইষষ্ঠীর দিন বউমাষষ্ঠী নয় কেন– এই সব বিতর্ক এমন ফিরে ফিরে আসে।
তেমন, আবার কি ফিরে আসবে প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় পেপার লিক হওয়া? বিগত প্রতি প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অসন্তোষ, কান্না, আর পাশ-ফেলের পর, আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার পর, আবারও কি ফিরে আসবে নতুন রূপে আমাদের সন্তানদের পীড়া?… যেমন ফেরে ব্রহ্মপুত্রের বন্যা, (আর ভেসে যায় কোটি টাকায় তৈরি সেতুগুলি) ফেরে আকাশ চিরে ক্লাউডবার্স্টে ধস নামা হিমাচলের ফোর লেনের অদৃশ্য হওয়া, ফেরে কলকাতার সল্টলেকের প্রাক্-পূজা সামান্য বর্ষণেই হাঁটুজল? ফিরে আসারই পুনর্নির্মাণ, প্রতি বছর দিল্লির কোচিং সেন্টারগুলোর বেআইনি নির্মাণ, ফলত মাটির তলার ঘরে শ্বাসরোধী নাট্য পুনরাভিনয়, কখনও বৃষ্টি কখনও আগুনে। সে-ও এক থেকে যাবে?

পশ্চিম বাংলা থেকে চলে যাবে তো প্রতি চাকরির পরীক্ষায় টাকা লেনদেন? পরের চাকরির পরীক্ষারা ত্রুটিমুক্ত হোক।
বাস্তব জীবনে দেখেছি, কিছু ঘটনা সরাসরি ফিরে আসে, কিছু ঘটনা নব নব রূপে ফিরে আসে। চলে যায় চুরি, ফিরে আসে পুকুর চুরি। চলে যায় গুন্ডা, ফিরে আসে গুন্ডাদমন আইনের ভীতি। চলে যায় তোলা, ফিরে আসে খাটের তলার টাকার ঝোলা।
তবে আলোচনায় আলোচনায় ভেসে ভেসে পশ্চিম বাংলার বাচ্চাদের মিড ডে মিল থেকে থিওরিটিকাল স্পেকুলেটিভ যুক্তিতর্ক হাড্ডাহাড্ডি সব কিছুর মধ্যে অন্তর্ধানের পথে প্রায় চলে গিয়েও আবার যেভাবে ফিরে এল ডিম! এতটা সাড়ম্বরে এতটা সসম্মানে, এতটা প্রাণবন্তভাবে আর কোন কিছুকেই অতি সম্প্রতিতে ফিরে আসতে দেখিনি। বিবশ দিনে এই যে কুসুম কুসুম ভোর ফুটল!
এসেছ ডিম এসেছ আজ কী মহা সমারোহে!
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন যশোধরা রায়চৌধুরী-র অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved