

‘আগন্তক’ সিনেমায় প্রশ্ন তোলা হয়েছিল– কে বেশি সভ্য? বন্য মানুষ না শহুরে ভদ্রলোক? যে একটা বোতাম টিপে আস্ত একটা সভ্যতা ধ্বংস করতে পারে না কি গুহাবাসী আদিম মানব? ভাষা শিখে, আদবকায়দা জেনে দুর্বলের ওপর সবলের প্রভুত্ব আমরা গত হাজার বছর ধরে দেখে আসছি, সেই একই নকশা অন্য প্রজাতির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হবে না, এমন প্রতিশ্রুতি কোনও বৈজ্ঞানিক বা ইতিহাসবিদ দিতে পারেননি। সামান্য কাঁটাতার যেখানে নির্ধারণ করে দেয় কোন মানুষের মৃত্যুতে শোক আসবে, আর কার নিধনে উল্লাস, সেখানে অন্য প্রজাতির ভাষা শিখে, উপলব্ধি করে, সংবেদনশীলতার পরিচয় দেব আমরা: এই ভাবনা নিরর্থক।
গ্রাফিক্স: দীপঙ্কর ভৌমিক
“বনের পাখি বলে, ‘খাঁচার পাখি ভাই, বনেতে যাই দোঁহে মিলে।’
খাঁচার পাখি বলে, ‘বনের পাখি আয়, খাঁচায় থাকি নিরিবিলে।’
বনের পাখি বলে, ‘না, আমি শিকলে ধরা নাহি দিব।’
খাঁচার পাখি বলে, ‘হায়, আমি কেমনে বনে বাহিরিব।’’
রবীন্দ্রনাথের রূপক গান আমাদের আত্মানুসন্ধানে সাহায্য করে। বনের পাখি আর খাঁচার পাখির অচিন ভাষায় আমরা মানব জীবনের কত অভিজ্ঞতা সাজিয়ে নিই। শুধু রবিঠাকুর কেন, পঞ্চতন্ত্র বা বুদ্ধজাতকেও তো শিয়াল, সিংহ বা তোতার মুখে শোনা যায় আমাদেরই জীবন-মরণের গল্প। ভারত ছাড়িয়ে মিশর বা ব্যাবিলনীয় উপকথাতেও উঠে এসেছে পশুপাখির বিচিত্র রূপ, তাদের ভাষা, রীতি-রেওয়াজ। কিন্তু এই সবই লেখা হয়েছে মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে। সাহিত্য, দর্শন বা মৌখিক ঐতিহ্যে নিজেদের চেতনার রঙে অন্য প্রজাতির অভিজ্ঞতা লিখে চলেছি আমরা যুগের পর যুগ। কিন্তু আজ হঠাৎ বিজ্ঞানীরা বলছেন– এমন কল্পনার প্রয়োজন বুঝি ফুরিয়েছে! খাঁচার পাখির যাতনা আজ আর আলাদা করে মানুষকে অনুমান করতে হবে না, কারণ তার জন্য নিরলস গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বায়োলজিস্ট, এনভায়রোমেন্টালিস্ট কিংবা বায়ো-ডাইভারসিটি নিয়ে কর্মরত বিজ্ঞানীরা। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পশুপাখির ভাষা, আবেগ, যৌথতা বা মিথষ্ক্রিয়া বোঝা সম্ভব হবে শীঘ্রই।

আজ থেকে কয়েক বছর পর, নন-হিউম্যানদের ভাষা যদি সম্পূর্ণ রপ্ত করা যায়, যদি না থাকে আর কোনও দুর্বোধ্য রহস্য, তাহলে রবিঠাকুরের খাঁচার পাখি বা জাতকের গল্প কি উদ্ভট মনে হবে আমাদের? জেন জি, জেন আলফার পর যে প্রজন্ম আসতে চলেছে, তাদের কাছে ধানসিঁড়ি নদীর পাশে ‘সোনালী ডানার চিল’ হাস্যাস্পদ ঠেকবে? এই যে সব কিছু জেনে ফেলার অহমিকা; ‘ফোমো’ বলে একটি শব্দ অতি প্রচলিত, কিছুই যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে না থাকে! এই জানা আসলে কতটা গভীর? এতে কি প্রতি মুহূর্তে আমাদের আত্মগরিমা একটু একটু করে আকাশ ছুঁয়ে ফেলে? এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে নখদর্পণে আনার তীব্র বাসনা; পাখি, ডলফিন, পিঁপড়ের ভাষা বুঝে ফেলার আকাঙ্ক্ষা আমাদেরকে আরও বেশি সহানুভূতিশীল করে তুলবে? না কি অন্য প্রজাতিকে নিয়ন্ত্রণ করার হাতিয়ার চলে আসবে মানুষের কাছে? বিজ্ঞানীরা যদিও বলছেন, অন্যের ভাষা বোঝা মানে পরিবেশের আরও কাছাকাছি চলে আসা, একটা ‘ইঙ্কলুসিভিটি’ বা অন্তর্ভুক্তির ধারণা প্রোথিত হওয়া। কিন্তু সত্যিই কি এমন সহমর্মিতা মানুষের ইতিহাসে ধরা পড়ে?
২০১৭ সালে নির্মিত হয় ‘আর্থ স্পিসিস প্রজেক্ট’ নামে একটি ‘নন প্রফিট’ সংস্থা। মেশিন লার্নিং, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা আরও নানা পদ্ধতির মাধ্যমে এখানে বিজ্ঞানীরা না-মানুষদের স্বর বা শব্দ বোঝার চেষ্টা করে। কোনও একটি পশুর ওপর এককভাবে গবেষণা না চালিয়ে, আন্তঃপ্রজাতীয় নকশায় আবিষ্কার হয় কোন শব্দে, ব্যাঙ বা সমগোত্রীয় প্রজাতি একইভাবে সাড়া দেবে। কিংবা কর্ভিড (কাক যে শ্রেণির মধ্যে পড়ে) যেভাবে জটিল সমাজ তৈরি করতে পারে, তার সঙ্গে মিলে যায় মানুষের কৌম জীবন (মানুষের মতো তারাও কিন বা ব্লাড রিলেটিভদের সঙ্গে থাকে এবং সামাজিক যোগাযোগের অনবদ্য পরিচয় দেয়)।

ক্যালিফোর্নিয়ার এই বৈজ্ঞানিক ঘাঁটিতে অনুদান দিয়ে চলেছে ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ থেকে শুরু করে অন্যান্য ক্লাইমেট ফিলানথ্রপিস্টরা। ‘ক্লাইমেট জাস্টিস’, ‘ক্লাইমেট ফিলানথ্রপিস্ট’: এমন সব শব্দবন্ধ শুনলে মনে হয় পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার আরও নানা কৌশল রপ্ত হল বটে। আমরা জানি, কীভাবে আগের শতক থেকেই ‘anthropocentric’ দর্শন ক্রমশ তার গুরুত্ব হারিয়েছে। তার জায়গায় ইকো-সেন্ট্রিক বা বায়োসেন্ট্রিক ভাবনা গুরুত্ব পেয়েছে।
মানুষই সর্বাপেক্ষা উন্নত জীব, তার ভাষা আছে, সমাজ, সভ্যতা, শিল্প আছে– এই ধারণা থেকে বেড়িয়ে আসছে সকলে, সমস্ত ডিসিপ্লিন বা একাডেমিয়া। কিন্তু মুশকিল হল– এআই, মেশিন লার্নিং বা ‘LLM’ (লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল) দিয়ে আমরা যখন ডলফিনের যৌনবার্তা বোঝার চেষ্টা করি কিংবা গৃহপালিত পশুর আবেগ, তখন সেই জানা ঠিক কোথায় গিয়ে থামে? তার বিস্তৃতি বা সীমা কতটা? এই বুঝতে পারা কি তাদের হিতে না মানুষের সুবিধার্থে?

‘আর্থ স্পিসিস প্রজেক্ট’-এর সহ প্রতিষ্ঠাতা আজা রাসকিন কিছুদিন আগে বিবিসির একটি সাক্ষাৎকারে বলেন যে, কোনও ডেয়ারি ফার্মের মালিক যদি বুঝতে পারে যে, সদ্য মা হওয়া গাভী বিষাদে থাকলে (স্ট্রেস হরমন বেড়ে গেলে) তার দুধ উৎপাদনের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তাহলে তার পরিণাম ঠিক কী হতে পারে? ক্যাথরিন ক্রকফোর্ড ১৯৯০ সাল থেকে আফ্রিকার শিম্পাঞ্জিদের ভাষা ও ব্যবহার অনুধাবন করে চলেছেন। তারা শান্ত থাকলে কী শব্দ করে, শিশু প্রতিপালনের সময় কী ভঙ্গিমা রাখে, আক্রমণ করতে হলে কী বলে, এমন নানা ধ্বনি বা স্বরকে শক্তিশালী মাইক্রোফোন দিয়ে রেকর্ড করে সেগুলিকে মেশিন লার্নিং-এ ব্যবহার করা হয়। শুধু তাদের ভাষা বোঝা নয়, ‘টু-ওয়ে কমিউনিকেশন’-এ শিম্পাঞ্জিদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টাও চলছে। কিন্তু আজা রাসকিনের মতোই ক্যাথরিন মনে করেন– এই আবিষ্কারের প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। সিএনএন-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন:
“আমরা যদি এই পথে এগতে থাকি, তাহলে ‘talking with chimps’ নামে কোনও টুরিজম শুরু হয়ে গেলে খুব একটা অবাক হব না… এতে বনমানুষ, গরিলা বা শিম্পাঞ্জিরা বারবার বিভ্রান্ত হবে, তারা বুঝবে না, কেন তাদের অনবরত কিছু সংকেত দেওয়া হচ্ছে, কোথাও যেতে বলা হচ্ছে বা খেলার ছলে কিছু বোঝানো হচ্ছে…।”

ডেয়ারি ফার্মে দুধ উৎপাদন থেকে শিম্পাঞ্জি পর্যটন– এই সমস্ত ক্ষেত্রে যে সিঁদুরে মেঘ দেখেছেন বিজ্ঞানীরা তার মূলে রয়েছে অবিরাম ভোগবাদ বা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। যারা টুরিজম ইন্ডাস্ট্রিকে তোল্লাই দিতে দিতে হড়পা বান, বেআইনি হোটেল নির্মাণ বা বাস্তুতন্ত্র তছনছ করে প্রত্যেক বর্ষায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ডেকে আনতে পারে, তারা পশুপাখির কথা বলাকে কেন্দ্র করে অন্যায্য ফাঁদ পাতবে না, এটা আশা করা মুশকিল।
বিজ্ঞানীরা যে এথিক্যাল বা নৈতিক পথ অবলম্বনের কথা বলছেন, যেখানে কোনও প্রাণীকে যাতে ভায়োলেট (নিগ্রহ) করা না হয়, সেই সীমা বোঝার ক্ষমতা কতজন মানুষের আছে? এই গবেষণালব্ধ তথ্য যাতে চূড়ান্ত ভোগবাদ, অ্যামিউসমেন্ট পার্ক বা ‘কমোডিটি ফেটিসিজম’ বাড়িয়ে না তোলে, সেই দায়িত্ব নেবে কে? হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী মার্টিন সর্বক বলছেন, হয়তো কিছু সময়ের মধ্যেই আমরা ‘টু ওয়ে কমিউনিকেশন’-এ সফলতা পাব, কিন্তু প্রশ্ন হল:
“আমরা যদি তাদের সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম হই (বন্য এবং বিশেষত বাড়ির পোষ্যদের সঙ্গে), তাহলে আমরা কি আদৌ শুনতে প্রস্তুত তারা কী বলতে চায়?”

‘ডিজিটাল এথিক্স’ নিয়ে ইদানীং ক্রমশ চর্চা বাড়ছে। পশুপাখিদের বোঝার চেষ্টা শুধু নয়, তারা যাতে মানুষের মতোই ব্যবহার করে, সেই প্রত্যাশা রাখা, তা করতে ব্যর্থ হলে তাদের ধর্তব্যের মধ্যে না আনা, এমন প্রতিযোগিতামূলক রিসার্চসমূহ বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে মনে করছেন একদল বিজ্ঞানী।
অন্যের ভাষা, সংকেত বা সমাজকে বোঝার চেষ্টা চালিয়ে ঔপনিবেশিকতার পথ প্রশস্ত হওয়ার কাহিনি আমরা ইতিহাসে পড়েছি। সুদূর আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকায় ট্রান্সলেটর নিয়ে যেত সাম্রাজ্যবাদীরা। কুখ্যাত ফ্রান্সিসকো পিজারো বা হারনান করতেজের অভিযানের কথা অজানা নয় (মায়া, আজটেক সভ্যতা ধ্বংসের মূলে যারা)। অন্যের জল, জমি, সম্পদে আধিপত্য জমানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় অচেনা ভাষা জেনেই। প্রথমে অনুবাদকের সাহায্য, তারপর সরাসরি যোগাযোগ, পরবর্তীতে নানা ম্যানুপুলেশন (কারসাজি), সেই কৌশলও কাজ না করলে প্রবল যুদ্ধ।
কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম বা এশিয়াটিক সোসাইটিতে চলত ভারতীয় ভাষা শিক্ষা। কীভাবে পরাজিতের ভাষা শিখে তাদের আরও ভালো নিয়ন্ত্রণ করা যায়, লুণ্ঠন করা যায় এ দেশের কাঁচামাল, তার সুসংবদ্ধ পরিকল্পনা বা ব্লু প্রিন্ট। এই সমস্ত ঐতিহাসিক পর্ব বিজ্ঞানীদের নিশ্চয় জানা। তাই প্রশ্ন ওঠে, যে মানুষ নিজের প্রজাতির বিনাশেই উদ্যত, তারা কি অন্য প্রজাতিকে রেয়াত দেবে?

‘আগন্তুক’ সিনেমায় প্রশ্ন তোলা হয়েছিল– কে বেশি সভ্য? বন্য মানুষ না শহুরে ভদ্রলোক? যে একটা বোতাম টিপে আস্ত একটা সভ্যতা ধ্বংস করতে পারে না কি গুহাবাসী আদিম মানব? ভাষা শিখে, আদবকায়দা জেনে দুর্বলের ওপর সবলের প্রভুত্ব আমরা গত হাজার বছর ধরে দেখে আসছি, সেই একই নকশা অন্য প্রজাতির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হবে না, এমন প্রতিশ্রুতি কোনও বৈজ্ঞানিক বা ইতিহাসবিদ দিতে পারেননি। সামান্য কাঁটাতার যেখানে নির্ধারণ করে দেয় কোন মানুষের মৃত্যুতে শোক আসবে, আর কার নিধনে উল্লাস, সেখানে অন্য প্রজাতির ভাষা শিখে, উপলব্ধি করে, সংবেদনশীলতার পরিচয় দেব আমরা: এই ভাবনা নিরর্থক।
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন সম্প্রীতি চক্রবর্তী-র অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved