Bengali Litterateurs and Photography | Robbar
Robbar
  • ৪ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ২২ আগস্ট ২০২৬

ক্যামেরার লেন্সে লেখকের জগৎ

ক্যামেরা হাতে বাঙালির ইতিহাসচেতনা খানিকটা হলেও রক্ষা করেছে আমাদের লুপ্ত ইতিহাসের ঝলক। ১৯৬১ সালে পূর্ণেন্দু পত্রী ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সদ্য ভেঙে ফেলা সেনেট হলের স্মৃতিচিত্র ধরে রাখতে। বাঙালির ফটোগ্রাফির প্রথম যুগ একেবারে নারী বর্জিতও ছিল না। তার মধ্যে অন্নপূর্ণা গোস্বামীর মতো লেখকও ছিলেন।

Published by: Robbar Digital

Posted:August 22, 2026 9:44 pm | Updated:August 22, 2026 9:44 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

ফোটোগ্রাফিকে আদৌ কোনও শিল্পমাধ্যম বলে মানতেন রবীন্দ্রনাথ? ধন্ধটা হয় ক্যামেরা নিয়ে তাঁর নানা সময়ের মন্তব্য দেখে। জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে– ১৯৩৭-এ প্রকাশিত ‘কালান্তর’-এ আছে ১৯১৭-য় লেখা ‘ছোটো ও বড়ো’ প্রবন্ধটি। সে-প্রবন্ধে যখন তিনি শাসক ইংরেজ আর ‘ষোলো-আনা মানুষ’ বড়ো ইংরেজের মধ্যে তফাত করতে চাইছেন, তখন খানিকটা আকস্মিকভাবেই ক্যামেরার প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর কথা ছিল– ‘ফোটোগ্রাফের ক্যামেরাকে কৃত্রিম চোখ বলিতে পারি। এই ক্যামেরা খুব স্পষ্ট ক্রিয়া দেখে কিন্তু সম্পূর্ণ ক্রিয়া দেখে না, তাহা চলতিকে দেখে না। যাহাকে দেখা যায় না তাহাকে দেখে না। এইজন্য বলা যায় যে, ক্যামেরা অন্ধ হইয়া দেখে। সজীব চোখের পিছনে সমগ্র মানুষ আছে বলিয়া তাহার দেখা কোনো আংশিক প্রয়োজনের পক্ষে যত অসম্পূর্ণ হোক মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পূর্ণ ব্যবহারক্ষেত্রে তাহাই সম্পূর্ণতর। বিধাতার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ যে তিনি চোখের বদলে আমাদিগকে ক্যামেরা দেন নাই।’ এটাকে ক্যামেরা বা ফোটোগ্রাফি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের নন্দনতাত্ত্বিক অবস্থান বলা যাবে কি না সে বিষয়ে মন্তব্য করা শক্ত। তবে সমকালের ফোটোগ্রাফির একটা সমালোচনা তো বটেই। যদিও তাঁর সময়ে রবীন্দ্রনাথই সম্ভবত সে-ই মানুষ যাঁর সবচেয়ে বেশি ছবি তোলা হয়েছে। সাম্প্রতিককালে শান্তিনিকেতনে শম্ভু সাহার তোলা আগে না-দেখা রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা ছবি দেখার পর,  ফোটোগ্রাফি নান্দনিক শিল্পকলা নয়– এমনটা রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন বলে মনে হয় না। কিন্তু এহ বাহ্য। রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখায় ফোটোগ্রাফির উল্লেখ কম করেননি।

zoom
আলোকচিত্রী শম্ভু সাহা ও তাঁর তোলা রবীন্দ্রনাথের ছবি

প্রখ্যাত গবেষক সিদ্ধার্থ ঘোষ জানিয়েছেন ১৮৪০-এ কলকাতায় প্রথম ক্যামেরা আসার কথা। তবে ফোটোগ্রাফ সাধারণ মানুষের নাগালে আসে উনিশ শতকের আট ও নয়ের দশকে। তবে ক্যামেরা কেনা, ছবি তোলা, ডেভেলপ করা– এসবই যে সমাজের উচ্চকোটির আওতায় ছিল তা সহজেই অনুমেয়। ১৯২৯ সালে  প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে যেমন– কলকাতায় এসে কুমুদিনী দেশের বাড়ির ‘প্রাণময় পরিমণ্ডল’ হারিয়ে নিতান্তই নাজেহাল। যখন তার মনে হচ্ছে এই শহরের আকাশ-আলো তাকে বেগানা লোকের মতো নজরে দেখে। কলকাতাকে তার মনে হচ্ছে– ‘এ যেন মস্ত একটা সমুদ্র কিন্তু কোথায় একফোঁটা পিপাসার জল ?’ তখন তার দাদা বিপ্রদাস তাকে আরও কাছে টেনে নিল। দাবা খেলা শেখাল। কুমুর ছিল যেকোনো জিনিস শিখে নেওয়ার সহজাত দক্ষতা, তাই দাবার বোর্ডে শুরুর দিকে নাদান দাবাড়ুর চাল কিছু দিনের মধ্যেই এমন কূট হয়ে উঠল যে বিপ্রদাসকে সামলে চলতে হত। এই পর্বেই রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন– ‘বিপ্রদাসের ফোটোগ্রাফ তোলার শখ, কুমুও তাই শিখে নিলে। ওরা কেউ-বা নেয় ছবি, কেউ-বা সেটিকে ফুটিয়ে তোলে।’

এসব লেখার ঢের আগে, ১৯০৩ সালে বই আকারে প্রকাশিত ‘চোখের বালি’তে মহেন্দ্ররও এমনই ফোটোগ্রাফির বাই ছিল। কিন্তু সে-নেশা বেশি দিন থাকেনি। আবার যখন ফিরল ততদিনে আশার চোখের বালি তাদের বাড়িতে এসেছে। বিনোদিনীর সঙ্গলাভের ইচ্ছে প্রবল হলেও মহেন্দ্র স্বাভাবিক কারণেই সে-কথা চেপেই রাখতে চায়। তবে সেসময় তার পুরনো নেশা ফের চাগাড় দেয়। ক্যামেরা মেরামত করে, আরক কিনে শুরু করে ‘বাড়ির চাকর-বেহারাদের’ও ছবি তোলা। তখন আশা তাকে বলে বিনোদিনীর ছবি তুলতে হবে। মহেন্দ্রর আশা পূর্ণ হয়। তবে বিস্তারে সে বিবরণ ঔপন্যাসিকের অপূর্ব বিবরণে পড়াই সংগত। তবু উল্লেখটুকু থাক–

‘‘‘ছবি লওয়া হইল। কিন্তু প্রথম ছবিটা খারাপ হইয়া গেল। সুতরাং পরের দিন আর-একটা ছবি না লইয়া চিত্রকর ছাড়িল না। তার পরে আবার দুই সখীকে একত্র করিয়া বন্ধুত্বের চিরনিদর্শনস্বরূপ একখানি ছবি তোলার প্রস্তাবে বিনোদিনী ‘না’ বলিতে পারিল না। কহিল, “কিন্তু এইটেই শেষ ছবি।”

শুনিয়া মহেন্দ্র সে ছবিটাকে নষ্ট করিয়া ফেলিল। এমনি করিয়া ছবি তুলিতে তুলিতে আলাপ পরিচয় বহুদূর অগ্রসর হইয়া গেল।’”

মহেন্দ্রকে ক্যামেরা-সূত্রে বহুদূর এগিয়ে দিলেও ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের বছরেই বই হয়ে বেরনো ‘শেষের কবিতা’র ‘অমিট রায়ে’ উপন্যাসের দ্বিতীয় অধ্যায়ে যখন ‘বেছে বেছে শিলঙ পাহাড়ে’ যায় তখন সে সবাইকে বলে গিয়েছিল, যাচ্ছে নির্জনতা ভোগের জন্য। যদিও জনতা না থাকলে নির্জনতার স্বাদ পাওয়া যায় না সেকথা ঔপন্যাসিক আমাদের মনে করিয়ে দেবেন, তবু অমিত সম্পর্কে বলা হয়েছে– ‘ক্যামেরা হাতে দৃশ্য দেখে বেড়াবার শখ অমিতের নেই। সেই বলে আমি টুরিস্ট না, মন দিয়ে দেখার ধাত আমার, চোখ দিয়ে গিলে খাবার ধাত একেবারেই না।’

zoom
শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ও সস্ত্রীক মহাত্মা গান্ধি

ক্যামেরা বা ফোটোগ্রাফ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস বা নান্দনিক অবস্থান যেমনই হোক না কেন, তাঁর ‘সুহৃত্তম’ রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী কিন্তু ফোটোগ্রাফির ক্ষমতায় বিশ্বাসীই শুধু ছিলেন না, তাকে রীতিমতো শৈল্পিক কাজ বলেই মনে করেছেন। ১৮৮৩ সালে ‘জন্মভূমি’ পত্রিকায় তিনি ‘ফটোগ্রাফি’ শিরোনামে রীতিমতো একখানি প্রবন্ধ লেখেন। সে-লেখায় পরে আরও একটি প্রবন্ধ লেখার অঙ্গীকার ছিল, যদিও সে-কাজটা হয়ে ওঠেনি। রামেন্দ্রসুন্দর ‘ফটোগ্রাফি’ প্রবন্ধে লিখছেন– ‘ফটোগ্রাফি বৈজ্ঞানিকের অন্যতম অসাধারণ আবিষ্কার। অসাধারণ– কেন না, ফটোগ্রাফির মাহাত্ম্যের পরিমাণ করা যায় না। সকলের নিকট ইহার আদর। দূরকে নিকটবর্তী করে, অতীতকে ভবিষ্যৎ পর্যন্ত ধরিয়া রাখে বলিয়া মনুষ্যজাতি অন্তরের সহিত ফটোগ্রাফিকে শ্রদ্ধা করে। ফটোগ্রাফি যখন প্রথম বাহির হয়, তখন সূক্ষ্ম শিল্প ইহার প্রতি কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া হাসিত। এখন ফটোগ্রাফি সূক্ষ্ম শিল্পকে হারাইয়াছে। বোধ করি, বর্তমান সময়ে সূক্ষ্ম শিল্পের মধ্যে ফটোগ্রাফিই সূক্ষ্মতম। বিজ্ঞানের হাতে ইহার মত তীক্ষ্ণ অস্ত্র অল্পই আছে। গত কয়েক বৎসর মধ্যে ফটোগ্রাফির অভূতপূর্ব্ব উন্নতি ঘটিয়াছে। মানুষের চোখ যাহা দেখিতে পায় না, ফটোগ্রাফারের ক্যামেরা তাহা দেখিতে পায়। এমন কি, যাহা ভাল দূরবীণের সাহায্যে নজরে পড়ে না, ফটোগ্রাফি তাহা ধরিয়া দেয়। ইহার দৃষ্টি এত তীক্ষ্ণ। ফটোগ্রাফি শব্দের অর্থ আলোর দ্বারা চিত্র অঙ্কন। মানুষ তুলির দ্বারা ছবি আঁকে; এখানে আলোকরশ্মি আপনা হইতে সেইরূপ ছবি টানিয়া থাকে।’ রামেন্দ্রসুন্দরের এই লেখাটি বাংলায় ফোটোগ্রাফির প্রথমদিকের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা। আর মুর্শিদাবাদ জেলার মহকুমা শহর কান্দির অন্তঃপাতী জেমো গ্রামে বড় হওয়া রামেন্দ্রসুন্দরের কথা যখন উঠল তখন মুর্শিদাবাদের জেলা সদর বহরমপুরের অম্বিকাচরণ রায়ের কথা না বললেই নয়। বহরমপুরের রাস্তাঘাটের প্রধান ধমনী খাগড়ার ‘হরিবাবুর ঢালু’ দিয়ে দিনে যত মানুষ চলাফেরা করেন তাঁরাও হয়তো মনে রাখেননি অম্বিকাচরণকে। কিন্তু ফিল্ম ক্যামেরা যুগের প্রথম দিকের মডেল ১৯০২ সালের একটি কোডাক ক্যামেরা অম্বিকাচরণের সংগ্রহে ছিল। কথাটা এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, বিশ শতকের একেবারে প্রথম দিকেই মফস্‌সল শহরগুলোতেও ফোটোগ্রাফি চর্চা তখন জোরকদমে শুরু হয়েছে। ১৯৬৪ সালে মুর্শিদাবাদের ফোটোগ্রাফিক সোসাইটি যখন দ্বিতীয় ‘অল ইন্ডিয়া সালোন’ আয়োজন করে বহরমপুরে অম্বিকাচরণ ছিলেন তার সভাপতি। সেই সোসাইটির মুখপত্রে তিনি লিখেছিলেন– ‘এবার ছবির কথা বলি। এগুলিকে নীরব কবিতা ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়। এই নীরব কবিতাগুলি ব্যক্ত করছে প্রকৃতির ঐশ্বর্য, মানুষের বিবিধ অভিব্যক্তি, পশুদের কৌতুক আচরণ এবং আরো কত বিষয়। দেখে এমন সব চিন্তা জাগে যা সচরাচর থাকে মনের অতলে সুপ্ত। দেওয়ালের গায়ে মিষ্টি একটা মুখ দেখে কবির সঙ্গে সুর মিলিয়ে উচ্ছ্বাস ভরে বলতেও ইচ্ছা করে, “আহা ! ওই অধর কি বাণীময় হয়ে উঠতে পারে না ?”’ বহরমপুরই সম্ভবত একমাত্র মফস্‌সল শহর যেখানে অল ইন্ডিয়া ফোটোগ্রাফিক সালোনের আসর বসেছে।

zoom
পাঁচ নম্বর জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে অবনীন্দ্রনাথ, সত্যপ্রসাদ গঙ্গপাধ্যায়, সমরেন্দ্রনাথ ও অরুণেন্দ্রনাথ; ছবি: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর গৃহীত

মফস্‌সল ছেড়ে ফের কলকাতায় এলে, প্রথমেই বলা দরকার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির কথা। বাংলার রেনেসাঁসে বিবিধ বিষয়ের অগ্রপথিকরাই এই বাড়িরই বাসিন্দা। সম্ভবত জোড়াসাঁকোয় গগনেন্দ্রনাথ ছিলেন ফোটোগ্রাফির ভগীরথ। ‘ঘরের মানুষ গগনেন্দ্রনাথ’ বইয়ে দ্বিজেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় লিখছেন ১৮৯২ নাগাদ গগনেন্দ্রনাথ ছবি তোলায় হাত পাকিয়ে ফেলেছেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন– ‘এই সময় কলকাতায় প্রথম ফটোগ্রাফীর চলন হয়েছে। গগনেন্দ্রর সখ হল ফটোগ্রাফী শেখা, এল সে সম্বন্ধে নানান বই, পড়া চলতে লাগল, বিলাত থেকে এল বড় প্লেট ক্যামেরা ও ছবি ছাপার নানান সরঞ্জাম। বইয়ের নক্সা দেখে নিজেই কাঠ দিয়ে আট ফুট বাই চার ফুট ঘর তৈরী করলেন। সেটার ভিতর কালো কাপড় মুড়ে dark room হল। তারপর শুরু হল ছবি তোলা, যাকেই সামনে পাচ্ছেন তারই ছবি তুলে ছেপে ফেলছেন।’ রবীন্দ্রনাথ আবার ১৯০০ সালে শিলাইদহ থেকে গগনেন্দ্রকে লেখা একটি চিঠিতে জানিয়েছিলেন– ‘নিশ্চয়ই আসবার চেষ্টা কোরো। ফোটোগ্রাফের সরঞ্জাম এনো। আজকাল শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্নায় পদ্মার চর যে কি চমৎকার দেখতে হয় চক্ষে না দেখলে বুঝতে পারবে না।’ সত্যি বলতে কী, রবীন্দ্রনাথের মতো চির-আধুনিক মনের মানুষ ফোটোগ্রাফির জাদু বুঝবেন না একথা মানতে এই প্রতিবেদকের মন চায় না। তবে গগনেন্দ্র নিজের স্বভাব অনুযায়ী বেশিদিন এক জিনিসে আবদ্ধ থাকতে পারেননি।

zoom
সুকুমার রায়ের তোলা রবীন্দ্রনাথের আলোকচিত্র

জোড়াসাঁকো কাছেই উপেন্দ্রকিশোর যখন ১৩ নম্বর কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটে থাকেন, সেই ১৮৮৬ সাল নাগাদ ফোটোগ্রাফিকেই সম্ভবত পেশা হিসেবেই নিয়েছিলেন। পুণ্যলতা চক্রবর্তী ‘ছেলেবেলার দিনগুলি’তে লিখেছেন– ‘বাড়িতে কয়েকটা ঘর ছিল যাতে আমরা ছোটরা ঢুকতাম না। গল্পে যেমন শোনা যায় বিশাল রাজপুরীর কোনো একটা ঘর তালাবন্ধ, তার ভিতরে কি আছে কেউ জানে না, তেমনি এই ঘরগুলির মধ্যে কি আছে ভাল করে জানতাম না ব’লেই মনের মধ্যে কেমন একটা ভয় মেশানো কৌতূহল থাকত। একটাকে আমরা বলতাম ‘কঙ্কালের ঘর’;… আরেকটা ছিল ‘অন্ধকার ঘর’, তার চারিদিক বন্ধ। ভিতরে লাল কাচের ঝাপ্‌সা ভূতুড়ে আলোয় আবছায়া দেখা যেত, বড় বড় সাদা চৌকোনা ডিশ্, আরো অনেক শিশি বোতল ও যন্ত্রপাতি। এটা ছিল ফটোগ্রাফির ‘ডার্ক-রুম’। আমরা চৌকাঠ থেকে উঁকি মেরে এ-সব দেখতাম, ভিতরে ঢুকতাম না।’ উপেন্দ্রকিশোরের ভাই কুলদারঞ্জনও ফটোগ্রাফি-আসক্ত ছিলেন। ‘যখন ছোটো ছিলাম’-এ সত্যজিৎ রায় লিখেছেন– ‘গড়পারে সবচেয়ে বেশি মনে আছে ধনদাদু কুলদারঞ্জন রায়কে। উনি থাকতেন একতলায় আমাদের শোবার ঘরের ঠিক নিচের ঘরে। দাদু মুগুর ভাঁজতেন, দাদু মৃত লোকের ছবি এনলার্জ করতেন, দাদু আমাকে পুরাণের গল্প বলতেন, আর দাদু এককালে ক্রিকেট খেলতেন।… দাদুর পেশা ছিল ছবি এনলার্জ করা। ছোট থেকে বড় করা ছবি আঁকার জন্য যেমন ইজেল থাকে, তেমনি ইজেলে এনলার্জ করা ছবি খাড়া করে রেখে পা দিয়ে একটা হাপরের মতো জিনিস দাবিয়ে হাতে ধরা এয়ার ব্রাশের সরু মুখ দিয়ে রঙের স্প্রে বার করে ফিনিশ করার কাজ চলত, আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। বেশিরভাগ ছবিই হত কালচে বা খয়েরি রঙে। কিন্তু একবার মনে আছে নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনারায়ণের ছবি ফিনিশ করছেন রং দিয়ে, গাছপালায় সবুজ, কাশ্মিরী শালের গায়ে লাল। পাশে বসে নতুন মহারাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ দাদুর কাজ দেখছেন এটাও মনে আছে।’ উপেন্দ্রকিশোর ফোটোগ্রাফি নিয়ে লেখালিখিও করেছেন। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় তার নমুনা ছড়িয়ে আছে। আর সুকুমার রায় রয়্যাল ফোটোগ্রাফিক সোসাইটিতে প্রদ্যোৎকুমার ঠাকুরের পর দ্বিতীয় ভারতীয় সদস্য হন।

zoom
প্রদ্যোৎকুমার ঠাকুরের আত্মপ্রতিকৃতি

পুণ্যলতা চক্রবর্তী সুকুমারের কম বয়সের কথা প্রসঙ্গে লিখেছেন– ‘ফটোগ্রাফির শখ এসময়ে দাদার খুব হয়েছিল। সুন্দর সুন্দর ফটো তুলে ও মজার ছবি এঁকে বিলাতে ‘বয়েজ ওন্‌ পেপার’, ‘চাম্‌স’ প্রভৃতি ছেলেদের কাগজে পাঠাত আর কত পুরস্কার ও প্রশংসাপত্র পেত। আমাদের কত রকমের ছবি দাদা তুলত, পাড়ার অনেক বৌ মানুষ ছিলেন যাঁদের ফটো তোলবার ভারি সাধ কিন্তু দোকানে গিয়ে ছবি তোলাতে পারেন না, দাদা সকলের ছবি তুলে দিয়েছিল।’ সুকুমার রবীন্দ্রনাথের যে পোর্টেটটা তুলেছিলেন তা আমাদের সকলের চেনা। ‘প্রবাসী’ পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩১৮ সংখ্যায় সুকুমার রায়ের অনবদ্য প্রবন্ধ ‘ফটোগ্রাফী’ অনেকেরই পড়া। সেখানে তিনি বলছেন আর্ট জিনিসটা তুলি কাগজ রঙ বা ফোটোগ্রাফিক ক্যামেরার মধ্যে থাকে না। তা আসলে নিহিত থাকে শিল্পীর সৌন্দর্যচেতনায়। সম্ভবত সুকুমার রায়ই প্রথম বাঙালি যিনি স্পষ্ট করে লিখলেন– ‘‘ ‘সুন্দর’ বস্তু বা দৃশ্যের যথাযথ ফটোগ্রাফ লইলেই তাহা ‘সুন্দর’ ফটোগ্রাফ হয় না।’’ এই কথাটা আমরা আজও কতটা হৃদয়ঙ্গম করেছি বলা মুশকিল। যদিও আমরা ফটোগ্রাফি শিল্প কি শিল্প নয় এ-আলোচনাকে অনেক পিছনে ফেলে এগিয়ে গেছি। বহু বাঙালির হাতে ফটোগ্রাফি এতটাই শিল্পময় হয়েছে যে এ নিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার মতোই আমাদেরও আলোচনা করা মানে সময় নষ্ট করা।

zoom
পরিমল গোস্বামী

বাঙালির ছবি তোলা নিয়ে লিখতে বসে পরিমল গোস্বামীকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া অসম্ভব। পরিমল গোস্বামীর ছবি তোলা, ক্যামেরা প্রীতি, এমনকী তাঁর ক্যামেরা চুরির ঘটনাও তাঁর অসামান্য বই ‘স্মৃতিচিত্রণ’-এর মাধ্যমে আমাদের জানা। ছোটো থেকেই পরিমল গোস্বামী অবাক বিস্ময়ে দেখতেন ফোটোগ্রাফ। সেসব মূলত পারিবারিক ছবি। তাঁর নিজের প্রথম ছবি তোলা হয় স্কুলে, ক্লাস থ্রি-র গ্রুপ ফোটো। বাচ্চা ছেলে যেমন জলছাপ দেখে মজা পায় তিনি একই রকম আকর্ষণ অনুভব করতেন ফোটোগ্রাফ দেখে। এই মানুষটি প্রথম বড়ো ফিল্ড ক্যামেরা দেখেন ১৯১৩ সালে, দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে। তার আগে ১৯১২ নাগাদ হাইস্কুলের ছাত্র থাকাকালীনই তিনি কলকাতার হাউটন-বুচার থেকে ছোটো ক্যামেরার একটি ক্যাটালগ আনিয়ে নিয়েছিলেন যা বহুকাল ধরে ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। সেই ক্যাটালগ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন– ‘বইখানি ৫ ইঞ্চি × ৪ ইঞ্চি হবে, মোটা কাগজে বাঁধানো। তাতে ছোট ক্যামেরার বিজ্ঞাপন ছিল। নানা আকারের ছবির জন্য নানা আকারের মিনিয়েচার ক্যামেরা। ক্যামেরার ছবির পাশে পাশে সেই ক্যামেরায় তোলা ছবিও একটি করে ছাপা ছিল– কী আকারের ছবি ওঠে তার ধারণা জন্মানোর জন্য। তার মধ্যে সবচেয়ে ছোট যে ক্যামেরা– তার নাম Ticca Watch Camera (টিকা পকেটঘড়ি ক্যামেরা), দেখতে পকেটঘড়ির মত, তার ছবির আকার ডাক টিকিটের আকার।’ ১৯১৭ সালে মেট্রোপলিটন কলেজের (এখনকার বিদ্যাসাগর কলেজ) মেসে থাকাকালীন তাঁর বন্ধু ও পরবর্তীকালের শিশু সাহিত্যিক জ্ঞানেন্দ্রনাথ রায়ের সঙ্গে ছবি তুলতে এম. দত্ত-র দোকানে গিয়ে তাঁর ছবি তোলার জগতটা খুলে যায়। পরিমল গোস্বামী লিখেছেন–

‘এম. দত্তের কোনো স্টুডিও ছিল না, বাইরের আলোতে তুলতেন। জ্ঞানেন্দ্রনাথের চুল ছিল ঝাঁকড়া এবং ঢেউখেলানো। তাঁর শখ হয়েছিল সাহেবী পোষাকে ছবি তোলাবেন। সেজন্য তিনি কলার নেকটাই এবং একটি কোট কোথা থেকে সংগ্রহ করে এনেছিলেন। দোকানে গিয়ে সেজে নিলেন এবং ঘাড় পর্যন্ত ফোটো তোলালেন। পুরো ছবি হল না, ধুতির সঙ্গে কোট কলার নেকটাই আর চলবে কি করে। (মাদ্রাজে চলে, ছবিতে দেখেছি।)

তাঁর তোলা হলে বললেন, আপনিও কলার টাই পরে নিন। প্রস্তাবটি মনোহর। সাহেব সাজা গেল ধারকরা পোশাকে। ফোটো তোলার পর এম. দত্ত (মনোমোহন দত্ত)-কে বললাম প্লেটে কি করে ছবি ওঠে দেখিয়ে দিন। মনোমোহনবাবু খুব অমায়িক লোক ছিলেন, আমাক ডার্ক রুমে নিয়ে গেলেন এবং ডেভেলপ করা দেখালেন। তখন প্যানক্রোমেটিসম্-এর জন্ম হয়নি, তখন সাধারণ প্লেটে ছবি তোলা হত এবং সব প্লেটেই কড়া লাল আলোতে নিরাপদে ডেভেলপ করা চলত।

জীবনে এই প্রথম প্লেট ডেভেলপ করা দেখলাম। প্রত্যেকটি ধাপ খুব মনোযোগের সঙ্গে দেখলাম। ডেভেলপিং ফিক্সিং ও তার পরে জলে অনেকক্ষণ ধোয়া। ডার্ক রুমের কাজ দেখা যাবে এই আশায় মনোমোহন দত্তের কাছে আমি নিজে অনেকবার ছবি তুলিয়েছি। তখন পাইরো-সোডা ডেভেলপিং খুব চলত। এতে প্লেট ডেভেলপ করলে প্লেটে চেহারার যে ছাপ উঠত, তার বাইরের লাইন অর্থাৎ চোখ কান নাক ও মুখের লাইন প্লেটে গভীর দাগ কেটে যেত। তখন পি-ও-পি (প্রিন্টিং আউট পেপার) ও ডেভেলপিং-আউট পেপার বা ব্রোমাইড পেপার– দুইই চলত, ক্রেতার পছন্দ যেটি। অনেকের ধারণা ছিল ব্রোমাইড কাগজে ছবি বেশিদিন স্থায়ী হয়। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। পি-ও-পি প্রিন্টই দীর্ঘস্থায়ী হয়। অবশ্য ব্রোমাইড প্রিন্ট পরে সেপিয়া করলে তা প্রায় চিরস্থায়ী হয়ে থাকে।

যাই হোক, মনোমোহন দত্তের সংস্পর্শে এসে আমার ক্যামেরার আকর্ষণ ক্রমে বেড়ে গেল, এবং তাঁরই সাহায্যে ১৯১৯ সালে হসপিটাল স্ট্রীটের গোপীনাথ দত্তের দোকান থেকে একটি কোয়ার্টার-প্লেট ক্যামেরা কিনলাম। সেকেন্ড-হ্যান্ড ক্যামেরা, ট্রাইপড সহ দাম দিলাম ৪৫ টাকা। ক্যামেরায় ছিল বেক সিমেট্রিক্যাল এফ-৮ ও লেন্স ধাতুনির্মিত শাটার।

zoom
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়; ছবি: পরিমল গোস্বামী

পরিমল গোস্বামী পরে অসংখ্য ক্যামেরায় ছবি তুলবেন এবং এমন অনেক মানুষের ছবি তুলবেন, যাঁদের সম্ভবত ওই একটিই ছবি তোলা হয়েছে বা রক্ষিত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই বরেণ্য সাহিত্যিক– শুধু এই কারণেই বাঙালির তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। প্রসঙ্গত, পরিমল গোস্বামী ফোটোগ্রাফি নিয়ে দু’টি বইও লিখেছিলেন– ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘ক্যামেরার ছবি’ আর এপ্রিল ১৯৫১-য় ‘আধুনিক আলোকচিত্রণ’।

পরিমল গোস্বামীর প্রসঙ্গে কেবল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গল্প না-বলে থাকা যায় না। ‘বিভূতিভূষণের সঙ্গে সম্বলপুর’ অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন–

‘বঙ্গশ্রীর প্রথম যুদ্ধে [যুগে] আমি কিছুদিন ক্যামেরাহীন ছিলাম। আমার দ্বিতীয় প্রিয় ক্যামেরাটি কিছুকাল আগে চুরি হয়ে গেছে। এ সময় ক্যামেরার দরকার হলে কুইক ফোটো সার্ভিসের হরিপদ সেন আমাকে তাঁদের যে-কোনও ছোট বা বড় ফিল্ড ক্যামেরা আমাকে অবলীলাক্রমে ধার দিতেন। আমি যে ক্যামেরাপ্রিয় এ কথা তখন কারোই অজানা ছিল না, এবং বিভূতিবাবু যে কখনো ক্যামেরা বিষয়ে উৎসুক ছিলেন এমন আভাস কখনো পাইনি। তাই হঠাৎ এক দিন (৩রা মার্চ ১৯৩৩) দুপুরে বিভূতিবাবু খুব ব্যস্তসমস্তভাবে এসেই বললেন, “আমাকে এখুনি ফোটো তোলা শিখিয়ে দিতে পারেন মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ?”

জেরা করে জানা গেল বিভূতিবাবু জীবনে কখনো ক্যামেরা স্পর্শ করেননি এবং সঙ্গেও কোনো ক্যামেরা আনেননি, কিন্তু দরকারটা জরুরি, কাজেই না শিখলেই যে নয়। জানা গেল তিনি সেই দিনই সন্ধ্যায় সম্বলপুর জেলার এক দূর পল্লীপথে অদ্ভুত এক জনহীন অরণ্যরাজ্যে চলেছেন একটি পুরাতাত্ত্বিক আবিষ্কার দেখতে। জায়গাটার নাম বিক্রমখোল, সেখানে এক পাহাড়ের গায়ে ইতিহাসপূর্ব যুগের এক আশ্চর্য সাংকেতিক শিলালিপি দেখতে পাওয়া গেছে এবং পুরাতাত্ত্বিকেরা তা দেখে তার জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে তখন জল্পনাকল্পনা করছেন। এই খানেই চলেছেন বিভূতিবাবু তাঁর এক বন্ধু (প্রমদ দাসগুপ্ত, সাবডেপুটি) সহ। বিভূতিবাবু সজনীকান্তের কাছে প্রস্তাব করেছেন বঙ্গশ্রী থেকে খরচ দিলে তার বিনিময়ে তিনি বিক্রমখোলা শিলালিপি সম্পর্কে একটি রচনা দেবেন বঙ্গশ্রীতে। মাত্র দশটি টাকার ব্যাপার। একটি প্রবন্ধের দামও তখন দশ টাকা। গুরুতর আদৌ নয়। প্রমদবাবু অবশ্য একটি ক্যামেরা নেবেন, কিন্তু প্রমদবাবুর উপর বিভূতিবাবুর তেমন আস্থা নেই, তাই তিনি নিজ পট করে শিখে নিয়ে নিজহাতে ছবি তুলবেন, এই আশায় আমার কাছে এসেছেন।

আমি সব শুনেই বুঝতে পারলাম বিভূতিবাবু এ সব ব্যাপারে যে টুকু শিশু ছিলেন তার চেয়েও শিশু হয়ে পড়েছেন, অতএব এ সুযোগ ছাড়া হবে না। আমি আমার প্রলুব্ধ করার সমস্তশক্তিকে মনে মনে আহ্বান করে বিভূতিবাবুকে কাত করলাম। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারলেন আমাকে সঙ্গে না নিয়ে উপায় নেই। অতএব আমার জন্যও দশ টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল। কিছু পরে শুনি কিরণের [কিরণকুমার রায় ?] জন্যও দশ টাকার ব্যবস্থা হয়েছে! তার দাবীটি কোন্ দিক থেকে উঠেছিল জানি না।

ভ্রমণ পথে বিভূতিবাবুকে এই একটি বার মাত্র আনন্দে উন্মাদ হতে দেখেছি।…’

এই রকমই আরেকটি ভ্রমণের কথা আছে কবি নরেশ গুহর জীবনেও। তবে সে-ভ্রমণ তাঁর ভাষায় ‘তীর্থভ্রমণ’। ১৯৩৯-এর পৌষ মাসে বন্ধু শৈলেন গুহর সঙ্গে পায়ে হেঁটে তিনি কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনে যান রবীন্দ্রনাথের ছবি তুলবেন বলে। ঘটনাটা শান্তিনিকেতনে বেশ চাউর হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তিনি পৌঁছেও যান কবির সামনে। রবীন্দ্রনাথ বলেন– ‘তুমিই সেই ছেলে যে কলকাতা থেকে পায়ে হেঁটে এখানে এসেছে ?’ কবির সম্মতিতে নরেশ তাঁর বেবি ব্রাউনি ক্যামেরায় ছবিও তোলেন। তবে সেটা পরের দিন। সেদিন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকা থেকে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ আবার সেদিনই আসবেন কলকাতায়। ঢাকার ছাত্রদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার এসেছিলেন। কিন্তু ছবির নেশায় মাতোয়ারা নরেশ সেই পেশাদারকে পাশ কাটিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে এসে কাঙ্ক্ষিত ছবিটি তুলে নেন। ছবি শিকারির ক্ষিপ্রতা দেখে গাড়িতে ওঠার সময় রবীন্দ্রনাথ মৃদু হেসে বলেছিলেন– ‘গাড়ি চাপা পড়বে না কি গো?’

zoom
নরেশ গুহর তোলা রবীন্দ্রনাথের ছবি (১৯৩৯)

হিরণকুমার সান্যালের সাক্ষ্য অনুযায়ী, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ছবি তোলার শখ ছিল। আর শোনা যায়, সৈয়দ মুজতবা আলী না কি দিল্লিতে থাকাকালীন ফি-রোববার কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে বেড়িয়ে পড়তেন ছবি তুলতে। তবে বুদ্ধদেব বসুর ‘আমার ছেলেবেলা’তে একটা ফটোগ্রাফের কথা আছে যেরকম ছবি এককালে কোনও-কোনও বাঙালি বাড়িতে দেখা যেত। বুদ্ধদেবের মা বিনয়কুমারীর মৃত্যু হয় ষোলো বছর বয়সে– বুদ্ধদেবের জন্মের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই প্রসবোত্তর ধনুষ্টঙ্কার রোগে। তাঁর দিদিমার কাছে একটি ফটোগ্রাফ ছিল যা তিনি সযত্নে টিকিয়ে রেখেছিলেন। বুদ্ধদেব ছবিটি প্রসঙ্গে লিখছেন– ‘ক্ষীণাঙ্গ এক যুবক, তার কাঁধে মাথা রেখেছে এক তরুণী– তরুণীটির মুখখানা গোল ছাঁদের, পিঠ-ছাপানো একঢাল চুল, কিন্তু চোখ তার বোজা, যুবকটি তাকে কোমরে জড়িয়ে ধরে আছে। মৃতা পত্নীকে নিয়ে আমার পিতা এই ছবি তুলিয়েছিলেন, তা জেনেও ছবিটির প্রতি কোনো আকর্ষণ বা আগ্রহ আমি অনুভব করিনি। আমি যখন কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা, আছি রাসবিহারী অ্যাভিনিউর ফ্ল্যাটে, তখনও সেটি চোখে পড়েছে আমার– কিন্তু শুধু চোখেই পড়েছে, আমি সত্যি কখনো ছবিটির দিকে তাকিয়ে দেখেছিলাম এমন আমার মনে পড়ে না। বৈধব্যপ্রাপ্ত দিদিমার ঠাকুরপুজোর কোণটিতে প্রথমে থাকতো সেটি– ততদিনে হলদে এবং ঝাপসা হয়ে গিয়েছে…’।

zoom
অন্নপূর্ণা গোস্বামীর বইয়ের আখ্যাপত্র

তবে বাঙালির ফটোগ্রাফির প্রথম যুগ একেবারে নারী বর্জিতও ছিল না। তার মধ্যে অন্নপূর্ণা গোস্বামীর মতো লেখকও ছিলেন। এখন চট করে হয়তো অন্নপূর্ণা গোস্বামীর কথা মনে পড়ে না। কিন্তু এক সময় প্রগতিশীল লেখালিখির জগতে অন্নপূর্ণা গোস্বামী একটি উল্লেখযোগ্য নাম ছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘লীলা পুরস্কার’ প্রদান করেছিল। ১৯৫৪ সালে তাঁর লেখা ‘নয়া ইতিহাস’ বইটিকে ভারত সরকার ‘গণ-সাহিত্য’ হিসেবে নির্বাচন করেছিল। অন্নপূর্ণার উপন্যাস ও ছোটোগল্পের বইগুলির মধ্যে আছে– ‘বাঁধন হারা’, ‘এবার অবগুণ্ঠন খোল’, ‘মৃগতৃষ্ণিকা’, ‘রেল লাইনের ধারে’ এবং ‘একফালি বারান্দা’, ‘সঙ্গোপনে’ ইত্যাদি। ১৯৩০ দশকে অন্নপূর্ণা পরিমল গোস্বামীর কাছে কিছুদিন ফোটোগ্রাফি শিখেছিলেন। তাঁর তোলা দরিদ্র উদ্বাস্তু পরিবারের ছবিগুলি একটা সময়ের দলিল হয়ে থাকবে। মাত্র ৪১ বছরের আয়ু না হলে অন্নপূর্ণার কলম ও ক্যামেরা হয়তো আরও বাঙ্ময় হয়ে উঠত।

zoom
কলকাতার সেনেট হল ভাঙা হচ্ছে; ছবি: পূর্ণেন্দু পত্রী

ক্যামেরা হাতে আরেক বাঙালির ইতিহাসচেতনা খানিকটা হলেও রক্ষা করেছে আমাদের লুপ্ত ইতিহাসের ঝলক। ১৯৬১ সালে পূর্ণেন্দু পত্রী ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেনেট হলের স্মৃতিচিত্র ধরে রাখতে। বাঙালির অনেককালের ঐতিহ্য তখন ভেঙে ফেলার আয়োজন চলছে। পূর্ণেন্দু লিখেছেন–

‘ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজ পড়ার নেশা তৈরি হয়নি তখনও। বিকেলের দিকে কোথায় যেন সকালের কাগজটা ওল্টাতে গিয়ে চমকে উঠি। প্রথম পাতাতেই চার কলামের ছবি। সেনেট হলের সদর দরজা থেকে প্রসন্ন ঠাকুরের প্রস্তর মূর্তিটাকে দড়ি বেঁধে বাঁশে ঝুলিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বাইরে। কেন ? কেন ? সেনেট হল ভাঙা হবে।

সেনেট হল ভাঙা হবে। ঐ বিশাল স্থাপত্য ? ঐ ভয়ঙ্কর ব্যক্তিত্ব ? গোটা কলকাতায় মাথা যার কাছে নোয়ানো ? থাকবে না সেনেট হলের সিঁড়ি ? মানুষ তাহলে আরোহণ কাকে বলে চিনবে কী করে ?

zoom
ভাঙা সেনেট হলে পায়রার ঝাক; ছবি: পূর্ণেন্দু পত্রী

ব্যথায় ঝনঝনিয়ে উঠলো বুক। কিন্তু আমি সেনেট হলের কে ? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার সুযোগ পাইনি জীবনে। কী এমন সম্পর্ক, কতটুকুই বা চেনা-পরিচয় যে এতখানি বিচলিত হতে হবে আমাকে ? এ-ব্যথা নিশ্চয়ই বাজছে কলকাতার বহুজনের বুকে। নিশ্চয়ই আগামিকালের কাগজে দেখবো সারা দেশের শিক্ষিত মানুষের প্রতিবাদ। বিশেষত এখান থেকে সম্মানিত হয়েছেন যাঁরা, তাঁরা তো ফেটেই পড়বেন তীব্রতর প্রতিবাদে। কিন্তু না, পরের দিনটা হয়ে উঠল না বিশেষ কোনওদিন। তবে কি এমন হতে পারে যে প্রতিবাদ ঘটেছে ভিতরে ভিতরে ? আর সেই প্রতিবাদে বন্ধ হয়ে গেছে ভাঙাভাঙি। সেই কারণেই সংবাদ নেই সংবাদপত্রে। সত্যি কিনা ছুটে গিয়েছিলাম দেখতে। না, বিরতি ঘটেনি কোথাও। পুরোদমেই তোড়জোড় চলছে ভাঙার।…

zoom
ভাঙা সেনেট হলে দাঁড়িয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় , দীপক মজুমদার, প্রণব মুখোপাধ্যায়, পূর্ণেন্দু পত্রী

সেই দিনই কিনে ফেলি এক আগফা আইসোলেট ক্যামেরা। আর পরের সকাল থেকে সেনেট হলই হয়ে যায় আমার প্রায় সর্বক্ষণের আস্তানা। প্রথম শাবল গাইতির কোপ পড়ছে শিখরে থেকে ভূলুণ্ঠিত পতনে তার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত ওখানেই। ছবির সংখ্যা হাজার পেরোল। বন্ধুবান্ধব ভাঙা সেনেট হলের সঙ্গে দেখতে আসতো আমাকেও। তখন সেনেট হলের ভাঙাভাঙির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছি আমি। সুনীল, শক্তি, দীপক মজুমদার, প্রণব মুখোপাধ্যায়, উৎপল রায়চৌধুরী, প্রমুখেরাও এসেছে কয়েকবার। একদিন এল পৃথ্বীশ গাঙ্গুলী। ওকে বললাম, কাল তুই স্কেচ খাতাটা নিয়ে এখানে চলে আয়।

কেন?

তুই স্কেচ করে রাখ কয়েকটা। তুই স্কেচ করছিস, সেটাও তুলে রাখব

ক্যামেরায়। যদি কোনওদিন সেনেটকে নিয়ে ডকুমেন্টারি করে উঠতে পারি কাজে লাগবে।

zoom
সেনেট হলের স্কেচ করছেন পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়

ডকুমেন্টারি হয়নি। জীবনের আরো অনেক না-হওয়া কাজের মধ্যে রয়ে গেল ওটাও। এই কল্পনাহীন দেশে ভাঙা সেনেটও যে হতে পারে জ্যান্ত শিল্পের বিষয়, সেটা সরকারি মাথা-মাতব্বরদের মাথায় না ঢোকাটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক।…’

নতুন শতকে ছবি তোলার কায়দা-কানুন পালটেছে তেজি ঘোড়ার গতিতে। কিন্তু বাঙালির ছবি তোলা বন্ধ হয়নি। ক্যামেরা নিয়ে আবেগ নিশ্চয় খানিকটা কমেছে কারণ মোবাইলের দৌলতে ক্যামেরা এখন সবার পকেটে। তবে ডিজিটালযুগেও ছবির নান্দনিকতা বদলে যায়নি। বাঙালি নিশ্চয় মনে রাখছে সুকুমার রায়ের কথাগুলো– ‘‘ ‘সুন্দর’ বস্তু বা দৃশ্যের যথাযথ ফটোগ্রাফ লইলেই তাহা ‘সুন্দর’ ফটোগ্রাফ হয় না।’’

 

ঋণ :

১. ছবি তোলা/ বাঙালির ফোটোগ্রাফি-চর্চা– সিদ্ধার্থ ঘোষ, আনন্দ পাবলিশার্স, ৩য় মুদ্রণ, জুন ২০২৩

২. রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োদশ খণ্ড), পশ্চিমবঙ্গ সরকার, নভেম্বর ১৯৯০

৩. রবীন্দ্র উপন্যাস-সংগ্রহ, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, ১৯৯০

৪. রামেন্দ্র-রচনাবলী (ষষ্ঠ খণ্ড), সম্পাদনা সজনীকান্ত দাস, বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ, চৈত্র ১৩৬৩

৫. চিঠিপত্র (পঞ্চদশ খণ্ড)– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, শ্রাবণ ১৪০২

৬. ছেলেবেলার দিনগুলি– পুণ্যলতা চক্রবর্তী (সত্যজিৎ রায় ও সুবোধ দাশগুপ্ত অলংকৃত), নিউ স্ক্রিপ্ট, আশ্বিন

১৮৮০ শকাব্দ

৭. যখন ছোট ছিলাম– সত্যজিৎ রায়, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৮২

৮. স্মৃতিচিত্রণ– পরিমল গোস্বামী, প্রতিক্ষণ, বৈশাখ ১৪০০

৯. দ্বিতীয় স্মৃতি– পরিমল গোস্বামী, প্রতিক্ষণ, অগাস্ট ১৯৯৪

১০. বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধসমগ্র (প্রথম খণ্ড)– সম্পাদকমণ্ডলী : শঙ্খ ঘোষ, অমিয় দেব, মানবেন্দ্র

বন্দ্যোপাধ্যায়, দময়ন্তী বসু সিং, প্রভাতকুমার দাস, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, চতুর্থ মুদ্রণ, ২০২২

১১. বঙ্গসাহিত্যাভিধান (প্রথম খণ্ড, অ-চ)– হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য, ফার্মা কেএলএম প্রাঃ লিঃ, ১৯৮৭

১২. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (প্রথম খণ্ড)– সম্পাদনা অঞ্জলি বসু (প্রধান সম্পাদক সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত),

সাহিত্য সংসদ, সংশোধিত পঞ্চম সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০১৩

১৩. কলকাতা সমগ্র (দ্বিতীয় খণ্ড)– পূর্ণেন্দু পত্রী, অয়ন দত্ত সম্পাদিত, দে’জ পাবলিশিং, জানুয়ারি ২০২৬

Bengal photography Buddhadeb basu Naresh Guha Photographers Photography Purnendu Pattrea Rabindranath Tagore Ramendrasundar Tribedi Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar women photographers

Share this article on