Clay dolls of Majilpur Joynagar and Cultural History | Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

অতীতের গল্প বলে জয়নগরের পুতুল

সামাজিক পুতুলের পাশাপাশি পৌরাণিক দেবদেবীদেরও অনিন্দ্যসুন্দর আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে জয়নগর মজিলপুরের পুতুল-শৈলীর মধ্যে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল গণেশজননী।পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হস্তশিল্প মেলা-সহ একাধিক প্রদর্শনীতে দেখতে পাওয়া যায় জয়নগরের পুতুল। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে রপ্তানি হয় জয়নগর মজিলপুরের পুতুল।

Published by: Robbar Digital

Posted:May 16, 2026 4:57 pm | Updated:May 16, 2026 5:00 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

‘হে প্রাণনাথ, তুমি আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে বিরাজ করে থাকো। আমি সহধর্মিণী, সেবিকা হয়ে তোমার সেবা করে যাব। তবু আজ গোধূলিলগ্নে তুমি যেও না মোরে ছেড়ে। সেই রঙিন জলসাঘরের জৌলুস আমার ভালবাসার কাছে ফিকে।’ ১৮-১৯ শতকের বাংলার শহর, কলকাতার এক কুলবধূ তার জমিদার স্বামীর কাছে এই আর্জি জানিয়ে চলেছে। কিন্তু গোধূলিলগ্নে জমিদারের মন রাগ-রাগিনীতে আচ্ছন্ন জলসাঘরে থাকা বাইজির জন্য উদাস হয়ে যায়। গৃহের কূলবধূকে সে আশ্বস্ত করে বলে, ‘আর যাব না সেখানে। তবে আজ গোধূলিকালে শেষবারের মতো যেতে দাও।’ কেদারায় বসে থাকা স্বামীর পা-আঁকড়ে ধরে কূলবধূ। কিন্তু শেষরক্ষা হয় না। এই ঘটনাগুলিকে পুতুলের আদল দিয়েছেন মজিলপুরের মৃৎশিল্পীরা। বাঙালির ফেলে-আসা অতীতকে এভাবেই পুতুল-নির্মাণের মধ্যে দিয়ে বংশ-পরম্পরা মেনে আজও উজ্জ্বল করে রেখেছেন জয়নগর মজিলপুরের মৃৎশিল্পী শম্ভুনাথ দাস।

zoom
স্বামীর পা-আঁকড়ে ধরে কূলবধূ

আট প্রজন্ম ধরে, জয়নগর মজিলপুরের দাস পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের তৈরি পুতুলগুলো বাঙালির ফেলে আসা ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলে। আনুমানিক প্রায় ২০০ বছর আগে জয়নগর মজিলপুরের জমিদার কালিদাস দত্ত যশোহর থেকে শম্ভুনাথ দাসের পূর্বপুরুষকে এখানে নিয়ে আসেন। শম্ভুনাথবাবুর পূর্বপুরুষ মৃৎশিল্পের পাশাপাশি দত্তদের জমিদারির বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজকর্ম দেখাশোনা করতেন। জমিদারবাড়ির শিশুদের জন্য মাটির খেলনা তৈরির বরাত পান শম্ভুনাথের পূর্বপুরুষরা। সেখান থেকেই জয়নগর মজিলপুরের পুতুল-ঐতিহ্য শুরু। তাদের পুতুল-নির্মাণ সময়ের সঙ্গে বিকশিত হতে থাকে। টেপা পুতুল থেকে দুই-খোল ছাঁচের পোড়ামাটির রঙিন পুতুল। সেখানে সমকালীন সমাজ-জীবনের বিভিন্ন ঘটনাবলি, পুতুল-নির্মাণের চরিত্র হয়ে ওঠে। তাদের তুলির টানে বাংলার চিরাচরিত পটচিত্রের ব্রাশ স্ট্রোক খুব সুস্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। পূর্বপুরুষের সেই ধারা এই ২১ শতকেও বজায় রেখেছেন মৃৎশিল্পী শম্ভুনাথ দাস। তাঁর তৈরি সামাজিক পুতুলগুলি ফেলে-আসা অতীতের কথা বলে।

zoom
মহাদেবের দেশজ চেহারা ধরা পড়েছে মজিলপুরের পুতুলে

মাথার মাঝখানে সিঁথি। কাঁধ পর্যন্ত চুলের গোছা। গলায় মালা ও শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গে উত্তরীয়। পায়ের পাতা পর্যন্ত বেয়ে-চলা ধুতি। ডান হাতে ছড়ি। মাথা উঁচু করে, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন জমিদারবাবু। কোনও কিছুকে তোয়াক্কা না-করে চোখে চোখ রেখে বনেদিয়ানার গৌরব বহন করে চলেছে পুতুলটি। সেই সময়, প্রান্তিক শ্রেণির শ্রমজীবী মানুষেরা অনাহার-ক্লিষ্ট শরীরে, হাঁটু পর্যন্ত ধুতি পরত। অথচ জমিদাররা পায়ের পাতা পর্যন্ত ধুতির ব্যাপ্তিকে রেখে দিতেন। বিকেল হলে তাঁরা মেহফিলের আয়োজনে বোতামহীন পাঞ্জাবি পরে, বালিশে হেলান দিয়ে জীবনের স্বাদ গ্রহণ করতেন পূর্ণমাত্রায়।

zoom
পুতুলের অবয়বে বাংলার জমিদার

ব্রিটিশ যুগে সরকারি কার্যালয়ের পিয়নও পুতুলের চরিত্র হয়ে দেখা দিয়েছে। লম্বাটে গোলাকার লাল টুপি, পেল্লায় গোঁফ, অথবা হাতে নথি। সেকালের ফতুয়া পরিহিত পিয়ন-পুতুলের আবেদন আজও শিশুমনকে আন্দোলিত করে। এছাড়া বন্দুকধারী পুলিশ, ভিস্তিওয়ালা পুতুলের মধ্যেও সেই অতীত জীবনকেই ধরে রেখেছে জয়নগর মজিলপুরের মৃৎশিল্পের ঘরানা। অতীতের নারী-জীবনের স্পন্দনও প্রতিধ্বনিত হয়েছে পুতুল-নির্মাণের মধ্য দিয়ে। পুকুর থেকে স্নান করে কাঁখে কলসি নিয়ে এগিয়ে চলা এলোকেশী রমণী। ঘোমটা মাথায় দিয়ে স্থূল শরীরে, কাঁখে কলসি ও অন্য হাতে সন্তানকে নিয়ে এগিয়ে চলা-মা– পুতুলের চরিত্র হয়ে উঠেছে। মদ্যপ অবস্থায় রাস্তায় মাতলামি করা যুবক, সন্তানকে জড়িয়ে ধরে বাড়ি নিয়ে যাওয়া মায়ের অসহায়তা, সবই সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন শিল্পী।

zoom
পুতুলের মেলা

অভিজাত মুসলিম পরিবারের রমণীরা ঘোড়ায় চড়ে রাস্তায় ঘুরতে বের হত। সেই ঘটনাকেও পুতুলে রূপান্তর করা হয়েছে। মুঘল যুগ থেকে ইংরেজদের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বণিকরা বাংলায় আসতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হল পর্তুগিজ। অবিভক্ত বাংলার সুন্দরবন অঞ্চলে পর্তুগিজ নাবিকদের প্রভাব ছিল। পর্তুগিজ মেমপুতুলও রয়েছে জয়নগর মজিলপুরের সামাজিক পুতুলের তালিকায়। ঘোড়ায়-টানা ফিটন গাড়ি, পুরোটাই মাটি দিয়ে তৈরি! তার ওপর খুব সুন্দর ভাবে সাদা রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। তারপর তুলির সূক্ষ্ম টানে প্রাণবন্ত ও লোকজ হয়ে উঠেছে গাড়িটি। গাছতলায় বায়োস্কোপ পেতে শিশুদের খেলা দেখানোর আনন্দ, লক্ষ করা যায় শম্ভুনাথ দাসের তৈরি পুতুলে। এছাড়াও সামাজিক পুতুলের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল: সাহেব, খোকা, গোয়ালিনী, মেমপুতুল। এমনকী রূপকথার পরীরাও রয়েছে শম্ভুবাবুর পুতুলের ঝুলিতে!

zoom
ফিটন গাড়ির পুতুল

সামাজিক পুতুলের পাশাপাশি পৌরাণিক দেবদেবীদেরও অনিন্দ্যসুন্দর আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে জয়নগর মজিলপুরের পুতুল-শৈলীর মধ্যে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল গণেশজননী। মা দুর্গার কোলে শুয়ে রয়েছে শিশু গণেশ। দশভুজার বেশ ছেড়ে এখানে প্রকাশ পেয়েছে মাতৃত্বের স্বরূপ। শিবের বিভিন্ন অভিব্যক্তির পাশাপাশি শ্রীকৃষ্ণলীলা, দশভুজা দুর্গা, লক্ষ্মী-সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক, জগদ্ধাত্রী, ষড়ভুজ, মা গঙ্গা ও তাঁর বাহন মকর, দুই-হাত বিশিষ্ট জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরামের দেখা মেলে। শিবের সহযোগী নন্দী ও ভৃঙ্গিও রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের লীলা-মাহাত্ম্যের মধ্যে যে-সকল পুতুল রয়েছে, তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য– শ্রীকৃষ্ণের সখা সুবল। এই পুতুলটির বসার শৈলী, পাগড়ি, হাঁটু পর্যন্ত কুর্তা পরার ভঙ্গিতে মধ্যযুগীয় ইসলামিক সম্ভ্রান্ত শ্রেণির প্রভাব লক্ষ করা যায়। এছাড়াও লৌকিক দেব-দেবী যেমন দক্ষিণরায়, নারায়ণী, মাকাল ঠাকুর, পীর গোরাচাঁদ, মনসা-সহ সব মিলিয়ে প্রায় ৯০ রকমের পুতুল আজও তৈরি হয়।

zoom
জয়নগরের পুতুল

মৃৎশিল্পী শম্ভুনাথ দাসের পিতা পাঁচুগোপাল দাস ছিলেন বাংলার বিখ্যাত শিল্পী। তাঁর শিল্পের উত্তরাধিকারকে একার কাঁধে দায়িত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন শম্ভুনাথ। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে রপ্তানি হয় জয়নগর মজিলপুরের পুতুল। এই পুতুল-শৈলীর ঘরানা ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও পাড়ি দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হস্তশিল্প মেলা-সহ একাধিক প্রদর্শনীতে দেখতে পাওয়া যায় জয়নগরের পুতুল। পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে জয়নগরের পুতুলের এই শৈল্পিক ধারাকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার ইচ্ছা রয়েছে শম্ভুনাথের। তবে তার জন্য প্রশাসনকে সদর্থক ভূমিকা নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর কথায়, প্রশাসন পাশে না থাকলে, একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই শিল্পধারার চর্চাকে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া কঠিন। এখানে আরও একটি দিক উল্লেখযোগ্য হল, মুর্শিদাবাদের কাঠালিয়ার পুতুল-শৈলীর শেষ উত্তরাধিকার যেমন মৃৎশিল্পী সাধন পাল, তেমনই এখনও পর্যন্ত শম্ভুনাথ দাসও জয়নগর মজিলপুরের পুতুলশিল্পের শেষ উত্তরাধিকার।

zoom
বিভিন্ন শৈলীর পুতুল

জয়নগর মজিলপুরের পুতুলের মধ্যে অবিভক্ত ২৪ পরগনার সুন্দরবন অঞ্চলের লৌকিক চেতনা ও ধারা যে-রকম দেখতে পাওয়া যায়, ঠিক একইভাবে ঔপনিবেশিক যুগের সমাজজীবন এবং বাংলার  বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত সংস্কৃতিরও মেলবন্ধন ঘটেছে জয়নগর মজিলপুরের পুতুলের মধ্যে। মাটির পুতুলের প্রধান শর্ত হচ্ছে শিশুদের মনোরঞ্জন করা। কিন্তু বর্তমানে এই পুতুল শুধুমাত্র সংগ্রাহকদের আকর্ষণ করে চলেছে।

Bengal clay doll Clay dolls Durga Puja Heritage of Bengal Jamindar Joynagar Lord shiva Majilpur Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on