Robbar

প্রেমের পাহারাদাররা আজ দিকশূন্যপুরে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 16, 2026 6:56 pm
  • Updated:March 16, 2026 6:56 pm  

এখন আর সন্ধে হলে গলির কোণে যুগলদের ভিড় থাকে না। কোনও রেস্তোরাঁয় বা পার্কে দেখা করতে যাওয়া এখন একান্তই ব্যক্তিগত হয়ে গিয়েছে। প্রেমের বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। নিরিবিলিতে প্রেম করার জন্য তৈরি হয়েছে নির্দিষ্ট স্থান। প্রেমকে রঙিন করতে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন উপাদেয় দ্রব্য। চকলেট, গোলাপের প্রেমটা এখন উধাও হয়েছে। প্রেমকে বোঝাতে তৈরি হয়েছে নতুন শব্দবন্ধনী। সিচুয়েশনশিপ, বেঞ্চিং, ওপেন রিলেশনশিপ ইত্যাদি শব্দের ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছে প্রেমের পাহারাদাররা।

আদিত্য ঘোষ

ভাটপাড়ার অলিগলি ভীষণ অন্ধকারে ভরা। সরু গলির দু’ধারে পেল্লাই পেল্লাই বাড়ি। প্রতিটি বাড়িই বেশ পুরনো। উত্তর কলকাতার ধাঁচে এখানেও বনেদি বাড়ির সারি। সেই বাড়িগুলোর জানলা সন্ধের পর থেকে বন্ধ। খুব একটা লোক চলাচলও করে না এই গলিতে। সারা গলিতে একটা লাইটপোস্ট, অনেক গলিতে আবার সেটাও নেই। প্রতিটা গলি, অন্য একটা গলিতে মিশেছে। প্রতিটা গলির চমকপ্রদ নাম। উপরে হলুদ রঙের সাইনবোর্ড। যারা এই গলিতে নতুন, তাদের কাছে ভাটপাড়ার গলিগুলো ভুলভুলাইয়া। কোন গলি যে কোথায় নিয়ে যাবে, কে জানে! অনেকটা জীবনের মতো রহস্যময়। এই সরু গলিতেই, জীবনের প্রথম পাহারাদারের কাজ শুরু করি।

তখন স্কুল জীবনে। সদ্য ঘরে ঘরে টাচ-স্ক্রিন মোবাইল আসতে শুরু করেছে। রঙিন জীবনগুলো ধীরে ধীরে পাখনা মেলতে চাইছে। সেই সঙ্গে বাংলা ব্যান্ডের জীবনমুখী গান জীবনের চাহিদাগুলোকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে চুপিসারে। আমরা স্কুলফেরত প্রাইভেট টিউশনি পড়ে বাড়ি ফিরি, তখন আমাদের এই গলিগুলো দিয়েই ফিরতে হত। নির্জন, নিঝুম এই গলিগুলোতে আমাদের স্কুল বুটের শব্দে ঝনঝন করে উঠত। নীরবে প্রেম করা যুগলরা আমাদের বুটের শব্দে অস্বস্তি বোধ করত। তখনও প্রেমের সংজ্ঞা আমাদের কাছে ঘোলাটে, হয়তো এখনও। তখন খুব কাছের বন্ধুদের দুম করে প্রেমে পড়া দেখে কিছুটা হিংসে হত, কিন্তু তার চেয়েও খারাপ লাগত যখন সেই বন্ধুই আমার সঙ্গে গলি পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে বলত, ‘একটু অপেক্ষা কর, আমি দেখা করে আসি।’ ঐ দূরে দেখা যেত সালোয়ার কামিজ পরা, চুলে বিনুনি করা একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লাইটপোস্টের আলোয় তার গালের একটা অংশ সোনালি হয়ে গিয়েছে। মনের ভিতরটা হু হু করে উঠত। কিন্তু বন্ধুর জন্য তখন জান উজাড়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা উল্টোদিকে মুখ করে বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করা। শত শত মশার কামড় খেয়েও বন্ধুর জন্য হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা। গলিতে আচমকা কেউ এসে গেলে, বন্ধুকে সতর্ক করে দেওয়া। এইসব কাজের দায়িত্ব ছিল কাঁধে। তখন আমি ছিলাম প্রেমের পাহারাদার। প্রেমের পাহারাদাররা এখন হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের মানচিত্র থেকে। সমাজমাধ্যমের দৌলতে প্রেম এখন সহজ। এখন আর পাহারাদারের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় না নিঝুম গলির একটা অন্ধকার জায়গা, এখন প্রেম আরও আরও বিস্তৃত এবং বাণিজ্যিক।

‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবিতে প্রেমের অনুঘটক

একজন নামকরা লেখক ব্যক্তিগত আড্ডায় বলেছিলেন, পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথন আদতে প্রেমের পাহারাদারের গল্প। তাঁর কথায়, পূর্ণেন্দু পত্রীকে দাঁড় করিয়ে রেখে তাঁর বন্ধু প্রেম করতেন। এই দাঁড়িয়ে থাকা সময়ে তাঁর কানে যা যা পৌঁছত, সেটাই পরবর্তীকালে কথোপকথন আকারে প্রকাশ পেয়েছে। আমি তখনও পূর্ণেন্দু পত্রী কে, চিনি না। তাঁর লেখা পড়া তো অনেক দূরের ব্যাপার। তবে আমারও কানে পৌঁছত কিছু ঝগড়ার শব্দ, আদর, আবদার, অভিমানের ধ্বনি। কখনও একটু হাত ছুঁয়ে দেখার জন্য কত আবদার, আবার কাল কেন আসোনি সেইজন্য কত অভিমান। স্কুলের পোশাকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতাম দেওয়ালের দিকে মুখ করে। আমার পিছনে দু’জন যুগল, যারা আমার উপস্থিতি পেয়ে স্বস্তি অনুভব করত। আমার পিছনে তখন একটা অন্য গল্প লেখা হত, দু’জন যুগলের নিরাসক্ত প্রেমের গল্প। সেখানে কাম ছিল না। সেখানে শুধু ছিল এক আদুরে উদ্দীপনা। দেওয়ালের দিকে মুখ করেও, বারবার মনে হয়েছিল কোনও এক মহৎ কাজ করছি। দু’জন মানুষের এই এক হওয়াতে আমার অবদানের কথা ভেবে, নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে নিতাম। একদিন এক হুঁকোমুখো হ্যাংলা গোছের দাদা বাড়ির দরজা খুলে বলেছিল, ‘এই গলিতে কী সব নোংরামি চলছে? তাও আবার স্কুল পোশাকে?’ ততক্ষণে আমার উল্টোদিকে থাকা যুগল গলি ছেড়ে পালিয়েছে অন্য গলিতে, তাদের আগে থেকেই সংকেত দিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম পাঁচিল হয়ে, অনেকটা রাহুল দ্রাবিড়ের মতো। যত পাল্টা হাওয়া ধেয়ে এল, সব সহ্য করে নিলাম। প্রেমের পাহারাদার হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় একটু খামতি রাখলাম না। বছর ঘুরল। সালোয়ার কামিজ পরা মেয়েটির পরিবর্তে জিন্স, টপ পরিহিত একজন সুন্দরী এসে দাঁড়াল বন্ধুর পাশে। সিনেমাহলে কোনের সিট বুক হল, তিনটে। বন্ধুর বাড়ি থেকে জানে সে আমার সঙ্গে সিনেমায় যাচ্ছে। আমি সঙ্গে গেলে বন্ধুর বাড়ি নিশ্চিন্ত। তিনজনে মিলে সিনেমা দেখলাম। আমি যতটা সম্ভব বাঁদিকে মুখ ঘোরানোর সাহস দেখালাম না। চোখ সর্বদা আটকে রেখেছিলাম সিনেমা হলের পর্দায়। চেষ্টা করেছি, বন্ধুর প্রেমকে অক্ষুণ্ণ রাখার। সিনেমাহলে কেউ পরিচিত বেরিয়ে গেলেও, বন্ধুকে সতর্ক করে দিতাম। কেউ যদি দেখে নিত, তাহলে ঐ অজানা মেয়েটিকে নিজের বোন পরিচয়েও পরিচিতি করাতাম। কারণ আমি তো প্রেমের পাহারাদার ছিলাম। প্রেমের পাহারাদাররা এমনই ছিল। অকুতোভয়, চমৎকার এবং সব সমস্যার মুশকিল আসান। কতবার আমার বন্ধু প্রেমকে বাঁচাতে আমার কাঁধেই দোষ চাপিয়ে দিয়েছে। তবুও সেসব দোষ হাসিমুখে স্বীকার করে নিয়ে প্রেমকে বাঁচিয়েছি। কারণ বন্ধুর প্রেমকে বাঁচানোই তো আমার মূল লক্ষ্য।

‘হারবার্ট’ ছবিতে পাহারাদার রবি

তখন চিঠির যুগ শেষ। মেসেজেই সব কাজ হয়ে যায়। এক বন্ধু এসে বলল, একটা কবিতা লিখে দিতে। বান্ধবীকে কবিতা দিয়ে ঘায়েল করতে চায় সে। লিখেও দিলাম। সেই বন্ধু কবিতা নিজের নামেও চালিয়ে দিয়ে দিল্লি জয় করে ফেলল। আমার ভেতরটা খুশিতে ভরে গেল। কোনওদিন তার বান্ধবীকে জানতে দিইনি সেই কবিতা আমার লেখা। প্রেমের পাহারাদাররা নিঃশব্দে কত কিছু করে যায়, তাদের কথা কেউই জানতে পারে না। প্রেমে পড়লে আমরা ভীতু হয়ে পড়ি। সেই ভয় থেকে প্রয়োজন হয়ে পড়ে এমন একজনের, যে আমাদের পূর্বপরিচিত। তাকে আমরা সবটা খুলে বলি। তার থেকে পরামর্শ নিই। প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাকে বগলদাবা করে নিয়ে যায়। কিন্তু তাকে বলি, একটু নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকতে। আমরা একইসঙ্গে ব্যক্তিগত সময়ও চাই, আবার পূর্বপরিচিত মানুষের ভরসাও চাই। তখন সদ্য ইকোপার্ক হয়েছে। এক বন্ধু বাড়ি থেকে আমার সঙ্গে বেরিয়েছে, ইকোপার্ক যাবে বলে, কিন্তু পরিকল্পনা অন্য। তার বান্ধবী আসছে। ইকোপার্কে পৌঁছনো মাত্রই বন্ধুটি বলে উঠল, একটু দূরে দূরে থাকবি। আমাদের একটু একা থাকতে দিস। প্রেমের পাহারাদার তো, ওইসব ততদিনে সহ্য হয়ে গিয়েছে। কোনও কথায় আর ছিটকে এসে লাগে না। জীবনানন্দের মতো উদাসীন হতে শিখে গিয়েছে এই জীবন। 

‘গল্প হলেও সত্যি’ ছবিতে ধনঞ্জয় যেন প্রেমের পাহারাদার

হু হু করে সময় বদলাল। একটা নতুন প্রজন্ম এল। সমাজ মাধ্যমের বিপুল পরিবর্তন প্রেমের ভিত্তিকে পালটে ফেলল। লাইক, কমেন্ট, রিঅ্যাক্ট বন্ধু হয়ে উঠল। মেসেজের লাস্ট সিন হয়ে উঠল প্রেমের নতুন পাহারাদার। এআই দিয়ে চট করে কবিতা লিখে প্রেমিকাকে ঘায়েল করা নতুন প্রজন্ম চিনল না প্রেমের পাহারাদারদের। এখন আর কেউ প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে কোনও পূর্বপরিচিতদের সঙ্গে নেয় না। এখন আর সন্ধে হলে গলির কোণে যুগলদের ভিড় থাকে না। কোনও রেস্তোরাঁয় বা পার্কে দেখা করতে যাওয়া এখন একান্তই ব্যক্তিগত হয়ে গিয়েছে। প্রেমের বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। নিরিবিলিতে প্রেম করার জন্য তৈরি হয়েছে নির্দিষ্ট স্থান। প্রেমকে রঙিন করতে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন উপাদেয় দ্রব্য। চকলেট, গোলাপের প্রেমটা এখন উধাও হয়েছে। প্রেমকে বোঝাতে তৈরি হয়েছে নতুন শব্দবন্ধনী। সিচুয়েশনশিপ, বেঞ্চিং, ওপেন রিলেশনশিপ ইত্যাদি শব্দের ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছে প্রেমের পাহারাদাররা। এখন আর সেই ছেলেটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না, যে তার বন্ধুর চিঠি প্রবল দায়িত্ব সহকারে তার ভালো-লাগা মেয়েটির কাছে পৌঁছে দিত। টিউশনি শেষে যে ছেলেটা তার সদ্য-প্রেমে-পড়া বন্ধুর জন্য একের পর বাস ছেড়েছে; যে ছেলেটা তার বন্ধুর চরম ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে চোখ বন্ধ করে থেকেছে– সেই ছেলেটা এখন মিলিয়ে গিয়েছে দিকশূন্যপুরে। ফলোয়ার্সের যুগে প্রেমের পাহারাদারদের মতো বিশ্বস্ত বন্ধু এখন কোথায়? একটা ভালোবাসা পরিপূর্ণ হতে অনেক মানুষের অবদান থাকে, যাদের পাশে থাকা বৃত্তকে পূর্ণ করে। প্রেমের মতো একটা বৃহৎ বৃত্ত থেকে এখন সেই মানুষগুলো ক্রমশ সরে যাচ্ছে। ছোট হয়ে আসছে বৃত্ত। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রেম এখন একটা কনটেন্ট হয়ে উঠেছে। এইসব ভিড়ের মাঝে সেই সব প্রেমের পাহারাদাররা এখন ফিকে হয়ে গিয়েছে। আমাদের রোজকার জীবনেও তো আমরা কত কিছু পাহারা দিই, আগলে রাখি। প্রেম, চাকরি, ব্যক্তিগত চিঠি, উপহার, পরিবার, বন্ধু এবং আরও কতকিছু। মনের ভিতরে অন্য একটা মনকে পাহারা দিই, যাতে আঘাত না লাগে। ব্যথা না পাই। অজস্র নক্ষত্রের রাতে আঁকড়ে ধরে সেই সব প্রেমের পাহারাদাররা, যারা আজ মিলিয়ে গিয়েছে নিরুদ্দেশে। বাঙালির প্রেমের সঙ্গে প্রেমের পাহারাদাররা চিরকাল জড়িত। যারা কাঁধে হাত রেখে বলেছে, আমরা আছি তো। সেই কাঁধে হাত রাখা মানুষগুলো আজ উড়ে উবে গিয়েছে। জীবনের বৃত্তে আজও সেই মানুষগুলোকে বড্ড মনে পড়ে, যারা না থাকলে হয়তো প্রেমটাই অসম্পূর্ণ থেকে যেত।