culture and heritage of palagaan in rainagar। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাহান্ন পাগলের পাগলামি

বাহান্ন পাগলের মূল যিনি থাকেন, তিনি পরিচিত হন– ‘বালা সন্ন্যাসী’ নামে। বাহান্ন পাগলের অনুষ্ঠানে কোনও চড়ক হয় না। নীলপুজোর দিন বাহান্ন পাগলরা বেরয়। বাহান্ন পাগলের নাচ শেষ হলে আসেন শিব-দুর্গা আর দুর্গার সতীন গঙ্গা। তিনজনের সাজ হয় দেখার মতো সুন্দর। ভক্তের বাড়িতে দেবতারা আসলে প্রথমে তার পা ধুইয়ে দেওয়া হয়। তারপর ধূপ, দীপ দেখানো হয়। চরণে ফুল দেওয়া হয়। যাঁরা শিব-দুর্গা কিংবা গঙ্গা সাজছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই পুরুষ।

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১৪, ২০২৬, ১৯:৪৫   
Facebook WhatsApp Messenger

লোকজীবনের নানা রং চারিপাশে ছড়িয়ে রয়েছে। এমনই এক বিষয়ের খোঁজ দিয়েছিল রাজু বিশ্বাস– লোকসংস্কৃতির কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কাজেই, ইচ্ছের সলতে একটু আগুনের ইন্ধন পেতে চলেই গেলাম বর্ষশেষে জীবনের নানা রকমের রং খুঁজতে।

ট্রেনে করে পৌঁছে গেলাম রানাঘাট। তারপর বেশ কিছুটা সময় অপেক্ষা করে বনগাঁ লোকাল ধরা। রানাঘাট স্টেশন ছাড়ালেই পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে নিউ রায়নগর হল্ট স্টেশন। ট্রেন থেকে রায়নগর স্টেশনে যখন নামলাম, সন্ধ্যা তখন আলিঙ্গন করেছে প্রকৃতিকে। রায়নগর স্টেশনটা খুবই ফাঁকা ফাঁকা। টিম টিমে মোমবাতির মতো স্টেশনের কয়েকটা আলো এক মায়াবী সন্ধে নিয়ে অপেক্ষায়। স্টেশনে নামতেই এসে হাজির রাজু। চাপদাড়ি। মুখে সব সময় মিষ্টি-হাসি। সারাদিন সে উপোস করেছিল। শিবের পুজো শেষ হলে, ডাবের জল আর একটু প্রসাদ পেয়ে সে আমাকে নিতে এসেছে। একটা চায়ের দোকানে বসে বাপুজি কেক খাওয়ার কথা বললে, কেকটা দোকানদারের হাত থেকে নিলেও, পুরে রাখে ওঁর কাঁধের সাইডব্যাগে। কেকটা না-খাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করতেই, বাকি কথা জানা হয়ে যায়।

চড়ে বসলাম লাল রঙের বাইকটায়। বাইকে উঠতেই সে জানায়, যে-রাস্তা দিয়ে আমরা যাব, সেই পথেই পড়বে হাঙর নদী। তাকে পেরিয়েই যেতে হবে গন্তব্যে। কাজেই আবারও দেখা হয়ে গেল হাঙর নদীর সঙ্গে। খালি চোখে দেখলে ওটাকে নদী বলা যায় না। এখন নদীর বুক পুরোটাই চাষের জমি। নদীর বুকের ওপর দিয়েই একটা ছোট কালভার্ট পেরিয়ে গ্রামে যাওয়ার কালো পিচের পাকা রাস্তা চলে গিয়েছে। মায়ের শাড়ির আঁচলের মতো বিছিয়ে থাকা ধানক্ষেত আর কংক্রিটের তৈরি হওয়া দোকানগুলো আলতো করে নদীর শরীরে কামড় বসিয়েছে। এটাই এ-রাজ্যে ছোট নদীগুলোর হারিয়ে যাওয়ার বারোমাসের পাঁচালি।

আমরা যাচ্ছি, ‘বাহান্ন পাগল’-এর খোঁজে। রানাঘাট ২ নম্বর ব্লকের ভিতরে নাশেরকুল বা নাশেরকুলি গ্রাম। গ্রামের মাঝখানে এসে খোঁজ করলাম– ‘কোথায় গেল বাহান্ন পাগলরা?’ গ্রামের একজন একটু সুর করে উত্তর দিল– ‘দখিন পাড়ার দিকে গেছে গা বাহান্নর দল’। দখিন বা দক্ষিণপাড়ার দিকে যেতেই পেয়ে গেলাম বাহান্ন পাগলের দলকে। বাড়ি বাড়ি দল তখন ঘুরছে। কয়েকটা ছেলেপিলে আমাদের পিছন পিছন এসে দলের সঙ্গে জুড়ে গেল। কী তাদের অঙ্গভঙ্গিমা করে নাচ! ওদের বয়স আর কত হবে? ১২ কিংবা ১৩।

কেন গ্রামের নাম এমনতর? মাথার মধ্যে ঘুরছিল প্রশ্নটা। গ্রামের এক বয়স্ককে কাছে পেতেই প্রশ্নটা করে ফেললাম। উত্তরটাও পেলাম চমৎকার! আগে এই গ্রামের নাম ছিল– বামন গাঁ বা ব্রাহ্মণ গ্রাম। তারপর গ্রামে লাগে মড়ক! কত যে মানুষ মারা যায় সেই মড়কে, তার হিসেব পাওয়া যায় না। সেই সময় গ্রামে ছিল ব্রাহ্মণ, দেবনাথ আর কিছু মাহিষ্য সম্প্রদায়ের মানুষ। মড়কে পরিবারের সকলে মারা গেলে কুল নাশ হয় বহুজনের। কাজেই কুল নাশ হওয়া গ্রামের নাম লোকমুখে হয়– ‘নাশেরকুল’।

ওদিকে গৃহস্থ-বাড়ির উঠোনে বাহান্ন পাগলের নাচ শেষ। বাড়ির দুই ছেলে বেরিয়ে আসল প্রসাদ নিয়ে। একটা বড় অ্যালুমিনিয়ামের গামলার মধ্যে মুড়ি, পাতলা গড়নের চিড়ে; যা জিভের লালা রসে ভিজে মিলিয়ে যায় মুখে, গুড় দিয়ে সাঁতলানো নারকেল-কুঁড়ো আর সঙ্গে সামান্য একটু কর্পূর দিয়ে একসঙ্গে মাখা। একফালি খবরের কাগজের ওপর একমুঠো করে সকলকে সেই প্রসাদ দিচ্ছেন তাঁরা। এই প্রসাদ দেওয়ার রীতিটাই এখানে চলন। হাত পেতে প্রসাদ নিলাম।

‘বাহান্ন পাগল’– এমন নামের নেপথ্যে কী কারণ? রাজু এই প্রশ্নের উত্তরটা খুব সুন্দর করে দেয় আমাকে।

এই এলাকাতে যাঁরা বাহান্ন পাগলের উৎসব করেন, তাঁরা সবাই এসেছেন ওপার, মানে বাংলাদেশ থেকে। ওপার বাংলার নোয়াখালিতে ছিল তাদের বাস। তা বহুদিন আগের কথা। নোয়াখালির গ্রামে দাস-জেলে সম্প্রদায়ের ৫৪ ঘর মানুষ একসঙ্গে বাস করত। চৈত্র মাসের শেষে, স্থানীয় এক বড় পুকুরে তাঁরা নিজস্ব ধর্মাচরণ করছেন। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক মুসলিম সম্প্রদায়ের জমিদার। এই সব দেখে পথচলতি এক ব্রাহ্মণকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এই সব কী চলছে এখানে?’ ব্রাহ্মণ উত্তর দেয়, ‘হুজুর, চুয়ান্ন পাগলের পাগলামি!’

জীবনের নানা ওঠাপড়া ও সামাজিক নানা চাপে এই ৫৪টি হিন্দু-পরিবারের থেকে দু’টি পরিবার মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করে। কাজেই বাকি থাকে ৫২টি পরিবার। আস্তে আস্তে ৫৪ থেকে ৫২ পরিবারের ধর্মীয় যাপন ‘বাহান্ন পাগলের পাগলামি’ বা ‘বাহান্ন পাগল’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। তবে বাহান্ন পাগলের কর্মকাণ্ডের মধ্যে বৈষ্ণব প্রভাব রয়েছে প্রচুর। অনুমান করা যেতে পারে, চৈতন্যদেবের পরবর্তী সময়ে সামাজিক বঞ্চনার হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতেই তাঁরা বৈষ্ণব-ধারার অনুগামী হয়ে ওঠে।

বাহান্ন পাগলের চরিত্রের সাজ অদ্ভুত। কেউ সাজে ভূত, ছাত্র ও শিক্ষক, সুন্দরী মেয়ে, পুতনা রাক্ষসী, নেতা-মন্ত্রী, পুতুল, রাজা-রানি– এমন সব বিচিত্র রকমের চরিত্র। নাশেরকুল গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকেই কেউ না-কেউ অংশগ্রহণ করে এই অনুষ্ঠানে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে এঁরা ভিক্ষে করেন।

বাহান্ন পাগলের মূল যিনি থাকেন, তিনি পরিচিত হন– ‘বালা সন্ন্যাসী’ নামে। বাহান্ন পাগলের অনুষ্ঠানে কোনও চড়ক হয় না। নীলপুজোর দিন বাহান্ন পাগলরা বেরয়। বাহান্ন পাগলের নাচ শেষ হলে আসেন শিব-দুর্গা আর দুর্গার সতীন গঙ্গা। তিনজনের সাজ হয় দেখার মতো সুন্দর। ভক্তের বাড়িতে দেবতারা আসলে প্রথমে তার পা ধুইয়ে দেওয়া হয়। তারপর ধূপ, দীপ দেখানো হয়। চরণে ফুল দেওয়া হয়। যাঁরা শিব-দুর্গা কিংবা গঙ্গা সাজছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই পুরুষ।

সমাজ-জীবনের ছোট ছোট ঘটনাগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে নানা ইঙ্গিত। শিব-দুর্গার সঙ্গে গঙ্গার পুজো কেন? গঙ্গা তো দুর্গার সতীন। একটা কারণ হতে পারে যে, এঁরা যেহেতু জেলে দাশ সম্প্রদায়, তাই নদীর সঙ্গে জীবিকার যোগ ছিল। কাজেই শিবের পুজোর সঙ্গে জীবিকার আধার নদী দেবতা গঙ্গাকে তাঁরা শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। নদী মরে গেলে জীবিকা মরে যায়। এক সময় এলাকার জেলে দাশরা হাঙর নদীতে মাছ ধরত। কয়েক দশকের মধ্যে নদী শুকিয়ে যাওয়ার, এঁরা বেশিরভাগ দিনমজুর কিংবা রাজ মিস্ত্রী।

ফেরা যাক, আগের কথায়। বছরশেষের আগেরদিন যে সাজসজ্জা বা আড়ম্বর আমরা দেখলাম, সেটা আগে ছিল খুবই সাদামাটা। গ্রামে যখন আলো পৌঁছয়নি, তখন হ্যাজাক জ্বালিয়ে সন্ধেবেলা বাহান্ন পাগল ঘুরত গ্রামে গ্রামে। এত সাজসজ্জার বাহার তখন ছিল না। এখন জেনারেটর ভাড়া করা হয়। তারসঙ্গে বাঁশের আগায় লাইট জুড়ে আলো নিয়ে বেরিয়ে পড়া হয়।

সময়ের সঙ্গে সবই পাল্টেছে। যশোদাবাল দাস, খগেন দাসের পর এখন যজ্ঞেশ্বর দাস সামলাচ্ছেন পুরো ব্যাপারটি– তিনি এখন ‘বালা সন্ন্যাসী’। তাঁর সঙ্গে দেখা হল। কথা হল। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর ডান হাত থরথর করে কাঁপে! অথচ মনে তাঁর দৃঢ় প্রত্যয়। শরীর-জুড়ে বয়সের ছাপ। রাতে স্কুল মাঠে বাহান্ন পাগল একসঙ্গে অনুষ্ঠান করবে। নানা রকমের নাচ-গান হবে। যজ্ঞেশ্বরবাবুকে বললাম, রাতে যে-সব গান গাইবেন তার মধ্যে থেকে একটা গান শোনাবেন? এককথায় রাজি হলেন। মিষ্টি সুরে গান ধরলেন নিমাই সন্ন্যাসের– ‘শুনো গো শচীরানি/ সন্ন্যাসে যাব আমি/ নিমাই নিমাই বলে আর কেঁদো না।’

zoom
‘বালা সন্ন্যাসী’ যজ্ঞেশ্বর দাস

দেখতে দেখতে রাত হয়ে গেল অনেকটা। এবার ফেরার পালা। ফেরার পথে কুপার্স থেকে গরম রসগোল্লা নিয়ে রাজুর বাইকে চেপে পৌঁছে গেলাম রানাঘাট স্টেশন। তবে হ্যাঁ, পুরো ঘটনাটা এখনও বলা হয়নি। বাকিটা তোলা থাকল, পরের বছরের জন্য।

……………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন সুপ্রতিম কর্মকার-এর অন্যান্য লেখা

……………………..

culture Gajan Lord shiva Rural Culture Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar পালাগান বাহান্ন পাগল লোকসংস্কৃতি

Share this article on