

‘রবিনসন ক্রুসো’ ও ‘গালিভারের ভ্রমণকাহিনি’-কে কেবল দু’টি ভ্রমণকাহিনি বা দুঃসাহসিক অভিযানের উপন্যাস হিসেবে পড়লে তাদের গভীর দার্শনিক সংঘাত ধরা পড়ে না। ক্রুসো বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে নিজের জীবনকে নতুন অর্থ দিতে শেখে। গালিভার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পুরনো অর্থগুলোকে ভেঙে ফেললেও নতুন কোনও স্থিতিশীল অর্থ নির্মাণ করতে পারে না। ১৭১৯ সালে প্রকাশিত ‘রবিনসন ক্রুসো’ এবং ১৭২৬ সালের ‘গালিভারের ভ্রমণকাহিনি’– সময়ের হিসাবে খুব বেশি দূরের রচনা নয়। মানুষের উপর আস্থা, যুক্তির ক্ষমতা,অথচ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক আর সভ্যতার নৈতিক ভিত্তি নিয়ে তৈরি দুই দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর ফারাক।
রাজনীতি থেকে যুদ্ধ, প্রকৃতি থেকে বিজ্ঞান, জীবন সংগ্রাম থেকে জ্ঞানচর্চা, আবিষ্কারের নেশা থেকে সাম্রাজ্যবাদ– মানুষের স্বপ্ন, মুক্তির খোঁজ, অহংকার, ক্ষমতার লোভ আর যুক্তিবোধের সীমাবদ্ধতাকে দেখানোর পদ্ধতি কেমন হতে পারে, কোথায় সেই জাদু আয়না; ১৭১৯ সালে প্রকাশিত ‘রবিনসন ক্রুসো’ এবং ১৭২৬ সালের ‘গালিভারের ভ্রমণকাহিনি’– সময়ের হিসাবে খুব বেশি দূরের রচনা নয়। মানুষের উপর আস্থা, যুক্তির ক্ষমতা, অথচ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক আর সভ্যতার নৈতিক ভিত্তি নিয়ে তৈরি দুই দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর ফারাক। ক্রুসো জাহাজডুবির পরে নির্জন দ্বীপে আটকে পড়ে শ্রম, বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার সাহায্যে বেঁচে থাকার উপায় খুঁজে নেয়। গালিভার একের পর এক অচেনা দেশে ঘুরে আবিষ্কার করে, মানুষের পরিচিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা, জ্ঞানচর্চা ও আত্মশ্রেষ্ঠত্বের ধারণা কতখানি হাস্যকর, কখনও বা ভয়ংকর।

নির্মম ব্যঙ্গের আলোয় নিজেকে তুলে ধরেছিল জোনাথন সুইফ্টের “গালিভার’স ট্রাভেলস”। আজ থেকে ৩০০ বছর আগে, ১৭২৬ সালের ২৮ অক্টোবর লন্ডনে বেঞ্জামিন মোটের প্রকাশনা থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ‘ট্রাভেলস ইনটু সেভারাল রিমোট নেশনস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে। লেখক হিসাবে সেখানে সুইফ্টের নাম ছিল না। কাল্পনিক নাবিক ও শল্যচিকিৎসক লেমুয়েল গালিভারের ভ্রমণবৃত্তান্তের আকারে প্রকাশিত হয়েছিল বইটি। সাড়া পড়ে যায় গোটা বিশ্বে। বহু ভাষায় অনূদিত হতে থাকে চমকপ্রদ কাহিনি।
প্রকাশের ৩০০ বছর পার হল এ বছর। সে উপলক্ষে আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত হয়েছে প্রদর্শনী, সাহিত্য উৎসব, আলোচনা সভা, শিল্প প্রতিযোগিতা এবং কর্মশালা। জোনাথন সুইফটের প্রাক্তন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজেও বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। সুইফটের রচনা, তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তী সময়ে বইটির নানা রূপান্তর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কলেজের সংগ্রহে থাকা কয়েকশো সংস্করণ ও জনপ্রিয় রূপান্তর থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে নানা উপাদান। তার মধ্যে রয়েছে পুরনো খোদাইচিত্র, পাতা খুললে ত্রিমাত্রিক দৃশ্য ফুটে ওঠে এমন বই, ১৯৭৬ সালের মার্ভেল কমিকসের সংস্করণ, ১৭৬১ সালে প্রকাশিত একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণের একমাত্র পরিচিত টিকে থাকা কপি রয়েছে।

লিলিপুটের ক্ষুদ্রকায় মানুষ, ব্রবডিংন্যাগের দৈত্যাকার অধিবাসী, আকাশে ভাসমান লাপুটা দ্বীপ কিংবা যুক্তিবাদী ঘোড়াদের দেশ হুইনিম– শৈশবের কল্পনার জগতে এসব নামের সঙ্গে পরিচয় হয়নি, এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া কঠিন। অথচ বিস্ময়কর অভিযানের অদ্ভুত আখ্যানের আড়ালে যে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিদ্রুপ, সামাজিক সমালোচনা এবং মানবসভ্যতার অন্তর্নিহিত অসংগতির নির্মম ব্যবচ্ছেদ লুকিয়ে রয়েছে, তা অনেক সময়েই আড়ালে থেকে যায়। কল্পিত ভ্রমণের বিবরণকে বাস্তব অভিজ্ঞতার মতো করে সাজিয়ে সুইফ্ট এমন এক জগৎ নির্মাণ করেছেন, যেখানে পরিচিত পৃথিবীর রাজনীতি, ধর্মীয় বিরোধ, যুদ্ধ, বিজ্ঞানচর্চা এবং সামাজিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নতুন আলোয় ধরা পড়ে। পাঠক প্রথমে বিস্মিত হন, তারপরে হাসেন, আবার শেষ পর্যন্ত হাসির মধ্যেই চারপাশের পরিচিত মুখগুলো চিনতে পারেন।
ড্যানিয়েল ডিফোর ‘রবিনসন ক্রুসো’ ইতিমধ্যেই প্রকাশের ৩০০ বছর পার করেছে। তার বয়স এখন ৩০৫ বছর। ১৭১৯ সালের ২৫ এপ্রিল লন্ডনে প্রকাশিত হয়েছিল ‘The Life and Strange Surprizing Adventures of Robinson Crusoe’– শিরোনামেই মানুষের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, অজানা ভূখণ্ডে বেঁচে থাকা, নিজের হাতে নতুন করে জীবন গড়ে তোলার রোমাঞ্চকর প্রতিশ্রুতি। এ লেখার ভিত্তি আঠারো শতকের গোড়ার ইংল্যান্ডের বদলে যাওয়া সমাজ: সমুদ্রবাণিজ্যের বিস্তার, ঔপনিবেশিক অভিযান, দাসব্যবসা, ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা আর ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা মধ্যবিত্ত মানসিকতা। ডিফো তাঁর সময়ের ভ্রমণকাহিনি, নাবিকদের অভিজ্ঞতা, আত্মজীবনীমূলক বয়ান, বাস্তব ঘটনার সঙ্গে অনন্য কল্পনাকে মিলিয়ে এমন এক আখ্যান তৈরি করেন– যার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের শ্রম, বুদ্ধি ও হিসাবি মন দিয়ে প্রতিকূল প্রকৃতিকে টিকে থাকার চেষ্টা। স্কটিশ নাবিক আলেকজান্ডার সেলকার্কের নির্জন দ্বীপে কাটানো জীবনের কথা উপন্যাসটির সম্ভাব্য প্রেরণা হিসেবে প্রায়ই আলোচিত হয়, যদিও ক্রুসোর কাহিনি কোনওভাবেই সেলকার্কের জীবনের সরাসরি বিবরণ নয়। এ উপন্যাসের প্রথম প্রকাশের সময়ও সুইফ্টের মতোই লেখক হিসেবে ডিফোর নাম প্রচ্ছদে ছিল না; কাহিনিটি যেন ক্রুসোর নিজের অভিজ্ঞতার সত্য বিবরণ, এমন বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করাই ছিল তার অন্যতম কৌশল।

প্রকাশের অল্প সময়ের মধ্যেই বইটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়; একই বছরের মধ্যে একাধিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়, ছড়িয়ে পড়ে অননুমোদিত পুনর্মুদ্রণ ও সংক্ষিপ্ত সংস্করণও। ইংরেজি থেকে ফরাসি, জার্মান-সহ নানা ভাষায় অনুবাদ ও পুনর্লিখনের মধ্য দিয়ে ক্রুসোর দ্বীপ হয়ে ওঠে বিশ্বসাহিত্যের পরিচিত ভূখণ্ড; পরবর্তী সময়ে ‘রবিনসোনেড’ নামে গড়ে ওঠে এমন এক সাহিত্যধারা, যেখানে নির্জনতা, বিপর্যয় ও আত্মনির্ভরতার কাহিনি নতুন নতুন রূপ পায়। অনুবাদের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে উপন্যাসটির অর্থও। একদিকে এটি মানুষের শ্রম, যুক্তি, ঈশ্বরবিশ্বাস আর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার কাহিনি; অন্যদিকে ক্রুসোর দ্বীপকে নিজের সম্পত্তিতে পরিণত করা, ফ্রাইডের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, প্রকৃতিকে ব্যবহারযোগ্য সম্পদ হিসেবে দেখার মধ্যে ধরা পড়ে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক মানসিকতা। ফলে এ উপন্যাস কেবল দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প নয়– আধুনিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, পুঁজিবাদী সম্পত্তিবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাম্রাজ্য বিস্তারের দীর্ঘ ইতিহাসেরও পাঠ। সময়ের সঙ্গে পাঠকের চোখ বদলেছে বলেই ক্রুসো কখনও আত্মনির্ভর মানুষের প্রতীক, কখনও আবার সেইসব সভ্যতার প্রতিনিধি, যারা বেঁচে থাকার অধিকারকে অন্যের উপর শাসন করার অধিকারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে।

দুই উপন্যাসের দর্শন, কাহিনি নির্মাণ আলাদা হলেও, একটিই সাধারণ প্রশ্ন তোলে– মানুষ যখন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে, সে কি শুধু পরিচিতর সীমা পেরিয়ে যেতে চায়, না কি নিজের ভিতরে জমে থাকা সংস্কার, বিশ্বাস ও অহংকারের সীমানাও অতিক্রম করতে চায়? ভ্রমণসাহিত্যের আলোচনায় এ প্রশ্নও নতুন নয়। কিন্তু আঠেরো শতকের গোড়ায় প্রকাশিত দুই কাহিনি এ প্রশ্নকে এমন দুই বিপরীত অভিমুখে নিয়ে যায় যে, মানুষের সভ্যতাবোধ, আত্মপরিচয়, প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয় বইকি। দু’টি উপন্যাসেরই কেন্দ্রে রয়েছে ভ্রমণ, বিচ্ছিন্নতা এবং অপরিচিত জগতের মুখোমুখি হওয়া। একজন জাহাজডুবির পরে জনমানবহীন দ্বীপে আটকে পড়ে নিজের শ্রম, বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সেখানে জীবন গড়ে তোলে। অন্যজন একের পর এক অদ্ভুত দেশে ঘুরে বেড়ায়, যেখানে মানুষের পরিচিত সামাজিক বিন্যাস, রাজনৈতিক ক্ষমতা, যুক্তিবোধ এবং শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা প্রতিবারই নতুন পরীক্ষার মুখে পড়ে। অথচ দুই যাত্রার পরিণতি এক নয়। ক্রুসোর কাছে বিচ্ছিন্নতা ক্রমশ আত্মপ্রতিষ্ঠার পথ; গালিভারের কাছে ভ্রমণ শেষ পর্যন্ত নিজের প্রজাতি, নিজের সমাজ, এমনকী নিজের মানবিক পরিচয়ের প্রতিই গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
ডিফো যেন জানতে চান, সমস্ত সামাজিক অবলম্বন হারিয়ে ফেললে মানুষ কতখানি নিজের শক্তিতে একটি পৃথিবী পুনর্নির্মাণ করতে পারে। সুইফ্টের প্রশ্ন আরও অস্বস্তিকর: যে পৃথিবীকে মানুষ সভ্যতা বলে গর্ব করে, তার ভেতরেই যদি অযৌক্তিকতা, হিংসা, লোভ, ক্ষমতার লালসা এবং আত্মপ্রবঞ্চনা বাসা বেঁধে থাকে, তবে সেই সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের দাবির ভিত্তি কোথায়? দুই প্রশ্নের মাঝখানেই গড়ে ওঠে ক্রুসো ও গালিভারের স্বতন্ত্র অঞ্চল। একটিতে মানুষ নিজের চারপাশের জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়; অন্যটিতে সে নিয়ন্ত্রণের দাবিকেই বারবার ব্যঙ্গের মুখে দাঁড় করায়। একটিতে দ্বীপ সভ্যতা পুনর্গঠনের পরীক্ষাগার, অন্যটিতে অচেনা দেশগুলি হয়ে ওঠে পরিচিত সভ্যতার মুখোশ খুলে দেওয়ার আয়না। ক্রুসোর যাত্রা শুরু হয় এক ধরনের অসন্তোষ থেকে। বাবার চাওয়া নিরাপদ, মধ্যপন্থী জীবন তার মনঃপূত নয়। সে চায় অন্য জীবন, অন্য সম্ভাবনা, সম্পদ ও স্বাধীনতার এমন এক পরিসর, যেখানে নিজের ভাগ্য নিজেই নির্মাণ করা যায়। সমুদ্র তার কাছে মুক্তির প্রতিশ্রুতি। কিন্তু যে যাত্রা তাকে সামাজিক সীমাবদ্ধতার বাইরে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে হয়েছিল, সে যাত্রাই তাকে একদিন সমস্ত সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। জাহাজডুবির পরে ক্রুসোর সামনে যে দ্বীপটি উপস্থিত হয়, তা প্রথমে নিছক বিপর্যয়ের ভূগোল। সেখানে নেই পরিচিত জনপদ, নেই বাজার, নেই রাষ্ট্রের সুরক্ষা, নেই দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তোলার কোনও সামাজিক পরিকাঠামো। অথচ এই শূন্যতার মধ্যেই ক্রুসো ধীরে ধীরে আবিষ্কার করে, মানুষের পৃথিবী কেবল বাইরে থেকে পাওয়া কোনও সম্পূর্ণ ব্যবস্থা নয়– শ্রম, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি এবং কল্পনার সাহায্যে সেই পৃথিবীকে নতুন করে নির্মাণও করা যায়।

ক্রুসোর আত্মপ্রতিষ্ঠার ভিতরে সূক্ষ্ম বৈপরীত্যও রয়েছে। সে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও সমাজ নির্মিত মানুষ হিসেবে তার পরিচয় অক্ষত রাখতে চায়। তার হাতে যে যন্ত্র, তার চাষাবাদের জ্ঞান, খাদ্য সংরক্ষণের কৌশল, সময়ের হিসাব রাখার অভ্যাস– সবই তার পূর্ববর্তী সামাজিক জীবনের উত্তরাধিকার। দ্বীপে এসে সে সভ্যতার সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলে নতুন মানুষ বা ‘নেই মানুষ’ হয়ে ওঠে না; বরং সভ্যতার স্মৃতি ও উপকরণগুলিকেই নতুন পরিবেশে কাজে লাগায়। গালিভারের ভ্রমণ অন্য পথে এগয়। তার যাত্রা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ী জীবন গড়ে তোলার কাহিনি নয়। লিলিপুট, ব্রবডিংনাগ, লাপুটা ও হুইনহ্নমদের দেশে তার প্রতিটি আগমন পরিচিত পৃথিবীকে নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি করে। যে মানুষ নিজেকে ইউরোপীয় সভ্যতার প্রতিনিধি বলে মনে করে, প্রতিটি নতুন ভূখণ্ডে গিয়ে সে আবিষ্কার করে, তার পরিচিত মানদণ্ড কখনওই সর্বজনীন নয়।
লিলিপুটে গালিভার দৈত্যাকার; ব্রবডিংনাগ সে প্রায় খেলনার মতো ক্ষুদ্র। শারীরিক এ মাপের ওলটপালট কেবল কাহিনি নির্মাণের কৌশল নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে ক্ষমতা ও গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণার গভীর প্রশ্ন। যে সমাজে গালিভার নিজেকে স্বাভাবিক মাপের মানুষ বলে জানে, অন্য এক সমাজে সেই শরীরই তাকে অসহায়, নির্ভরশীল ও পরিহাসের পাত্র করে তোলে। নিজের আকার সম্পর্কে তার ধারণা যেমন আপেক্ষিক, তেমনই আপেক্ষিক হয়ে পড়ে তার শ্রেষ্ঠত্বের বোধও। ভ্রমণ এখানে নতুন দেশ দেখার, রোমাঞ্চের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। তা নিজের পরিচিত জগতের বাইরে দাঁড়িয়ে সে জগতের সীমাবদ্ধতা বুঝতে শেখায়। ক্রুসো অচেনা দ্বীপে গিয়ে নিজের ক্ষমতার সম্ভাবনা আবিষ্কার করে; গালিভার অচেনা সমাজে গিয়ে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণাটিকেই হারিয়ে ফেলে।

পলায়নকে সাধারণত মুক্তির সঙ্গে এক করে দেখা হয়। কিন্তু এ দুই উপন্যাসে পলায়নের অভিজ্ঞতা দেখায়, স্থান বদলালেই মুক্তি আসে না। কখনও মানুষ যে শৃঙ্খল থেকে পালাতে চায়, নতুন পরিবেশে গিয়েও সে শৃঙ্খলেরই অন্য রূপ নির্মাণ করে। ক্রুসো প্রথমে পালাতে চায় পরিবার নির্ধারিত জীবনের সীমা থেকে। কিন্তু সমুদ্র তাকে এমন এক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে নিক্ষেপ করে, যেখানে স্বাধীনতা রোমাঞ্চকর প্রতিশ্রুতি নয়, প্রতিদিনের বেঁচে থাকার কঠিন দায়িত্ব। তাকে খাদ্য সংগ্রহ করতে হয়, আশ্রয় নির্মাণ করতে হয়, বিপদের সম্ভাবনা বিচার করতে হয়, সময় ও শ্রমের ব্যবহার শিখতে হয়। যে মানুষ নিজের ইচ্ছায় পৃথিবী দেখতে বেরিয়েছিল, সে-ই শেষ পর্যন্ত এমন এক ভূখণ্ডে বন্দি হয়, যেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ তার হাতে নেই। তবু ক্রুসো এই বন্দিত্বকে সম্পূর্ণ পরাজয় হিসেবে গ্রহণ করে না। দ্বীপের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে করতে সে তার সীমাবদ্ধতাকে আংশিকভাবে অতিক্রম করে। নিজের জন্য একটি ঘর, খাদ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং দৈনন্দিন কাজের শৃঙ্খলা তৈরি করে সে বন্দিত্বের ভিতরেই স্বাধীনতার একটি সীমিত পরিসর নির্মাণ করে।
গালিভারের বন্দিত্বের রূপ আরও বহুমাত্রিক। লিলিপুটে সে শারীরিকভাবে আবদ্ধ; কিন্তু তার মুক্তি রাজনৈতিক শর্তের উপর নির্ভরশীল। ব্রবডিংনাগে তার অস্তিত্ব অন্যের কৌতূহল ও মালিকানার বিষয় হয়ে ওঠে। সে কথা বলতে পারে, যুক্তি দিতে পারে, নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারে; কিন্তু নিজের শরীর ও জীবনের উপর তার কর্তৃত্ব সীমিত। সবচেয়ে গভীর বন্দিত্ব অবশ্য তার শেষ যাত্রার পরে। হুইনহ্নমদের দেশ থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে আসার পর গালিভার আর স্বাভাবিকভাবে মানুষের সঙ্গে মিশতে পারে না। মানুষের লোভ, হিংসা, আত্মম্ভরিতা ও প্রতারণা তার কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। নিজের প্রজাতির মধ্যেই সে যেন নির্বাসিত। এখানেই দুই উপন্যাসের মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়। ক্রুসোর কাছে বিচ্ছিন্নতা ধীরে ধীরে বাসযোগ্য হয়ে ওঠে; গালিভারের কাছে অভিজ্ঞতার সঞ্চয় তাকে এমন এক মানসিক নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দেয়, যেখান থেকে ফিরে আসার কোনও সহজ পথ নেই।

‘রবিনসন ক্রুসো’-র সবচেয়ে স্মরণীয় অংশগুলির একটি হল– দ্বীপে তার বেঁচে থাকার দীর্ঘ বিবরণ। জাহাজডুবির পরে সে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ থেকে যন্ত্রপাতি, খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস উদ্ধার করে। এই উদ্ধারপর্ব গুরুত্বপূর্ণ, ক্রুসোর আত্মনির্ভরতার কাহিনি সম্পূর্ণ শূন্যতা থেকে শুরু হয় না, তার হাতে থাকে হারিয়ে যাওয়া জগতের কিছু অবশেষ, যেগুলিকে কাজে লাগিয়ে সে নতুন জীবন নির্মাণ করতে পারে। এর পরে শুরু হয় শ্রমের দীর্ঘ অধ্যায়। আশ্রয় তৈরি, খাদ্য সংগ্রহ, শস্য উৎপাদন, পশুপালন, যন্ত্র নির্মাণ ও সঞ্চয়ের ব্যবস্থা– প্রতিটি কাজের মধ্যে ক্রুসোর ব্যবহারিক বুদ্ধি ও ধৈর্যের পরিচয় রয়েছে। কোনও কাজই একদিনে সম্পূর্ণ হয় না। ভুল হয়, পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, প্রকৃতির বাধা আসে। অভিজ্ঞতা থেকে শেখে, নিজের পদ্ধতি সংশোধন করে। শ্রম কেবল শরীরকে বাঁচিয়ে রাখে না, তা তার মানসিক জীবনকেও একটি কাঠামো দেয়। প্রতিদিনের কাজ, হিসাব, ডায়েরি আর সময়ের বিন্যাস তাকে হতাশার মধ্যে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে দেয় না। ক্রুসো নিজের জীবনকে নিজেই পরিচালনা করতে শেখে। এই আত্মনির্ভরতার কাহিনিকে নিছক ব্যক্তিগত প্রতিভার জয় হিসেবে দেখলেও তার সরল অথচ জটিল মনস্তত্ত্বের দিকটি হারিয়ে যায়। ক্রুসোর সাফল্য নির্ভর করে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জ্ঞান, উদ্ধার করা যন্ত্রপাতি এবং প্রকৃতির আনুকূল্যের উপর। পরবর্তী সময়ে ফ্রাইডের আগমনও তার একাকী অস্তিত্বকে সামাজিক জীবনের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
অন্যদিকে, গালিভারের বেঁচে থাকা অন্য ধরনের। তাকে প্রতিটি নতুন সমাজের নিয়ম বুঝতে হয়, অপরিচিত পরিস্থিতিতে নিজের আচরণ বদলাতে হয়, শরীরের অসহায়ত্ব মেনে নিতে হয়। তার বেঁচে থাকা মূলত অভিযোজনের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সে অভিযোজনের চরম মূল্যও রয়েছে। হুইনহ্নমদের জীবনযাত্রাকে নিজের জীবনের আদর্শ করে তুলতে গিয়ে সে এমন এক আত্মবিরোধে পৌঁছয়, যেখানে মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কই তার কাছে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ক্রুসো বেঁচে থাকার মধ্য দিয়ে স্থিতিশীল পরিচয় নির্মাণ করে। গালিভার বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই নিজের পরিচয়ের স্থিরতা হারায়। এখানে বৃহত্তর প্রশ্ন উঠে আসে: মানুষ কি নিজের শ্রম ও বুদ্ধির সাহায্যে সম্পূর্ণ স্বাধীন হতে পারে? না কি বেঁচে থাকার প্রতিটি সাফল্যের ভিতরে প্রকৃতি, প্রযুক্তি, সামাজিক স্মৃতি ও অন্য মানুষের অবদান নীরবে কাজ করে যায়? দু’টি উপন্যাসই এ প্রশ্নের সরল উত্তর দেয় না। তবে ক্রুসো যেখানে মানুষের কর্মক্ষমতার সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসেন, সুইফ্ট সেখানে মানুষের আত্মবিশ্বাসের সীমা দেখিয়ে দেন।

ক্রুসোর দ্বীপ ধীরে ধীরে একটি ক্ষুদ্র সভ্যতার রূপ নেয়। সেখানে আছে বাসস্থান, খাদ্য উৎপাদন, সম্পদ সংরক্ষণ, শ্রমের পরিকল্পনা আর নিরাপত্তার ব্যবস্থা। প্রথমে যা ছিল বেঁচে থাকার সংগ্রাম, তা ক্রমে হয়ে ওঠে একটি সুসংগঠিত জীবনযাপনের প্রকল্প। এই রূপান্তরে আঠেরো শতকের বাণিজ্যিক সমাজের মূল্যবোধ স্পষ্ট। ক্রুসো সম্পদকে শ্রেণিবদ্ধ করে, উৎপাদনকে গুরুত্ব দেয়, নিজের শ্রমের ফলকে সঞ্চয় করে এবং পরিবেশকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করে। বাজার নেই, ক্রেতা নেই, সামাজিক প্রতিযোগিতা নেই– তবু তার ভিতরে হিসাবি অর্থনৈতিক মানুষটি সক্রিয় থাকে। অনিবার্য সেই প্রশ্ন তোলে, সভ্যতা কি কেবল রাষ্ট্র, বাজার, নগর কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি? না কি সভ্যতা মানুষের আচরণ, চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষার ভেতরেও বাস করে? ক্রুসোর দ্বীপ যেন দ্বিতীয় সম্ভাবনাটাই সামনে আনে। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও মানুষ তার সমাজের তৈরি অভ্যাস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারে না।
সুইফ্ট একই সমস্যাকে উল্টোদিক থেকে দেখেন। তাঁর কল্পিত সমাজগুলি যেন সভ্যতার বিভিন্ন অসুখকে বড় করে দেখানোর জন্য নির্মিত। লিলিপুটে সামান্য রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতভেদ থেকে রাষ্ট্রের সংঘাত তৈরি হয়। ডিমের কোন দিক থেকে খোসা ভাঙতে হবে, আপাততুচ্ছ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে বিরোধ, তা মানুষের মতাদর্শগত জেদ, ক্ষমতার রাজনীতির হাস্যকর অথচ ভয়াবহ রূপকে নগ্ন করে সামনে আনে। ব্রবডিংনাগে ইউরোপের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও যুদ্ধনীতির বিবরণ শুনে রাজা যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানান, তা ইউরোপীয় সভ্যতার আত্মপ্রশংসাকে বহিরাগত দৃষ্টির সামনে অসহায় করে তোলে। লাপুটার জগতে জ্ঞানচর্চা ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা অনেক সময় মানুষের বাস্তব প্রয়োজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সুইফ্ট জ্ঞানকে অস্বীকার করেন না; তিনি প্রশ্ন তোলেন এমন জ্ঞানচর্চা নিয়ে, যা মানুষের জীবনকে উন্নত করার পরিবর্তে নিজের কৃত্রিম জটিলতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে।

আর হুইনহ্নমদের দেশে এসে প্রশ্নটি আরও গভীর হয়। সেখানে যুক্তিবোধ ও আত্মসংযমের অধিকারী ঘোড়ারা মানুষের মতো দেখতে ইয়াহুদের বিপরীতে এক বিকল্প সামাজিক আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু সে আদর্শের মুখোমুখি হয়ে গালিভারের প্রতিক্রিয়া ক্রমশ এত চরম হয়ে ওঠে যে, মানুষ সম্পর্কে সমালোচনা শেষ পর্যন্ত মানুষকেই অস্বীকার করার দিকে এগয়। ডিফো সভ্যতাকে পুনর্গঠনের সম্ভাবনা দেখান; সুইফ্ট সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্ন করেন। ডিফোর দ্বীপও নির্দোষ নয়, সেখানে উৎপাদন ও শৃঙ্খলার সঙ্গে মালিকানা ও কর্তৃত্বের ধারণা জড়িয়ে যায়। আবার সুইফ্টের বিকল্প সমাজগুলিও নিখুঁত আদর্শ নয়; তাদের মধ্যেও এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা পাঠককে যুক্তি, আবেগ ও মানবিকতার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সভ্যতা গড়ে তোলা, সে সভ্যতার ন্যায্যতা প্রমাণ করা যে এক বিষয় নয়, দুই লেখকের তুলনামূলক পাঠে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ক্রুসোর দ্বীপে প্রকৃতি প্রথমে প্রতিপক্ষ। সমুদ্র তাকে বিচ্ছিন্ন করেছে, দ্বীপ তাকে বেঁচে থাকার নতুন নিয়ম শিখতে বাধ্য করেছে। তাকে আবহাওয়া, মাটি, খাদ্য, প্রাণীর স্বভাব বুঝতে হয়েছে। প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক মূলত পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা আর ব্যবহারের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। এ সম্পর্কের ভিতরে মানুষের শ্রমের গুরুত্ব যেমন আছে, তেমনই আছে প্রকৃতির উপর তার নির্ভরতা। ক্রুসো পরিবেশকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সাজাতে পারে, কিন্তু পরিবেশকে সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছাধীন করতে পারে না। তার প্রতিটি সাফল্য নির্ভর করে এমন কিছু শর্তের উপর, যেগুলো তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সুইফ্ট প্রকৃতিকে অন্যভাবে ব্যবহার করেন। তাঁর কল্পনার জগতে শরীরের মাপ বদলে যায়, পরিচিত প্রাণী ও মানুষের সম্পর্ক উল্টে যায়, আর মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা বারবার বিপর্যস্ত হয়। লিলিপুটে গালিভারের দৈত্যাকার শরীর তাকে শক্তিশালী করে; ব্রবডিংনাগে সেই শরীরই তাকে দুর্বল ও নির্ভরশীল করে তোলে। এই ওলটপালট দেখায়, শক্তি ও গুরুত্ব অনেক সময় অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল।

হুইনহ্নমদের দেশে এসে প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়। মানুষ নিজেকে যুক্তিবান প্রাণী বলে যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে, সেই যুক্তিবোধেরই বিকল্প রূপ দেখা যায় ঘোড়াদের সমাজে। অন্যদিকে ইয়াহুদের মধ্যে মানুষের লোভ, হিংসা ও অধিকারবোধের বিকৃত প্রতিচ্ছবি উপস্থিত হয়। তবে এই পর্বকে কেবল প্রকৃতির কাছে মানুষের আত্মসমর্পণ হিসেবে পড়া যায় না। সুইফ্টের ঘোড়াদের সমাজও একটি কল্পিত নির্মাণ, যার কঠোর যুক্তিবাদী শৃঙ্খলা মানবিক সম্পর্কের জটিলতাকে কতটা জায়গা দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তবে, দুই উপন্যাসকে সমকালীন পরিবেশচেতনার আলোয় পড়লে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য চোখে পড়ে। ক্রুসোর জগতে প্রকৃতি এমন এক সম্পদভাণ্ডার, যাকে জ্ঞান ও শ্রমের সাহায্যে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা যায়। সুইফ্টের জগতে প্রকৃতি ও অমানবিক প্রাণীর উপস্থিতি মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতার সীমা উন্মোচন করে। দু’টি উপন্যাসই আধুনিক অর্থে পরিবেশবাদী রচনা নয়। তবু উভয়েই এমন প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়, যা আজও প্রাসঙ্গিক: প্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই কি মানুষের সাফল্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড, না কি প্রকৃতির সঙ্গে নিজের সম্পর্কের সীমা বুঝতে পারাও সভ্যতার একটি অপরিহার্য শর্ত?
‘রবিনসন ক্রুসো’, ‘গালিভারস ট্রাভেলস’-কে নিছক আত্মনির্ভর মানুষের রোমাঞ্চকর কাহিনি হিসেবে পড়লে তার অন্তরীণের তাৎপর্য অনেকাংশে আড়ালেই থেকে যায়। দ্বীপে ক্রুসোর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পত্তি, শ্রম, অধিকার এবং অন্য মানুষের উপর ক্ষমতা প্রয়োগের ধারণা জড়িয়ে রয়েছে। দ্বীপটি প্রথমে তার কাছে বেঁচে থাকার স্থান। কিন্তু ক্রমে সে সেখানে মালিকানার বোধ তৈরি করে। তার শ্রম যেন ভূখণ্ডটির উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার যুক্তি হয়ে ওঠে। এ ভাবনার সঙ্গে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ইতিহাসের একটি গভীর যোগ রয়েছে, যেখানে নতুন ভূখণ্ডকে আবিষ্কার, ব্যবহার, শাসনের যোগ্য স্থান হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। ফ্রাইডের আগমন সে প্রশ্নকে আরও জটিল করে। ক্রুসো তাঁকে উদ্ধার করে, তার নাম দেয়, তাকে নিজের ভাষা শেখায় এবং নিজধর্মে দীক্ষিত করে। এ সম্পর্কের মধ্যে সঙ্গ ও সহযোগিতার সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনই আছে স্পষ্ট ক্ষমতার অসমতা। ফ্রাইডের নিজের সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে ক্রুসো তাকে নিজের পৃথিবীর অংশ করে তোলে, কিন্তু সে অন্তর্ভুক্তির শর্ত নির্ধারণ করে মূলত ক্রুসো নিজেই। এখানে নতুন নামকরণের পিছনেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট। ফ্রাইডের নিজস্ব পরিচয় ও পূর্ববর্তী জীবন থাকলেও ক্রুসোর দেওয়া নাম তাকে ক্রুসোর সময়বোধ ও ভাষার কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে। তাকে ‘মাস্টার’ বলে সম্বোধন করতে শেখানোও এই সম্পর্কের ক্ষমতাগত বিন্যাসকে স্পষ্ট করে।

অন্যদিকে সুইফ্টের উপন্যাসে ক্ষমতার হাস্যকর ও হিংস্র রূপ বারবার প্রকাশিত হয়। লিলিপুটের দরবারে রাজনৈতিক আনুগত্য, দলাদলি, শাসকের অনুগ্রহের উপর ব্যক্তির অবস্থান নির্ভরশীল। গালিভারের বিশাল শরীর রাষ্ট্রের কাছে একটি সামরিক সম্পদ; তার ব্যক্তিসত্তার চেয়ে তার উপযোগিতাই সেখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে যতক্ষণ রাষ্ট্রের কাজে লাগে, ততক্ষণ তার অস্তিত্ব মূল্যবান। রাজনৈতিক স্বার্থ বদলে গেলে সেই মূল্যও বদলে যেতে পারে। ব্রবডিংনাগের রাজার চোখে ইউরোপীয় রাষ্ট্রনীতি ও যুদ্ধের বিবরণ এক ভিন্ন নৈতিক অর্থ পায়। যে যুদ্ধকে গালিভার জাতীয় গৌরব বা রাষ্ট্রের শক্তির নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে, বাইরের এক দৃষ্টিতে তা মানুষের ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তির প্রমাণ হয়ে ওঠে। তবু সুইফ্টকে সরল অর্থে ঔপনিবেশিকতার সম্পূর্ণ বিরোধী লেখক হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। তাঁর ব্যঙ্গ ইউরোপীয় অহংকারকে আঘাত করে ঠিকই, কিন্তু তাঁর কল্পিত সমাজ ও অমানবিক প্রাণীদের উপস্থাপনাও আঠেরো শতকের নানা সাংস্কৃতিক পূর্বধারণার দ্বারা সীমাবদ্ধ। দুই লেখকের পার্থক্যটি তাই সূক্ষ্ম। ডিফোর দ্বীপে ঔপনিবেশিক কল্পনা এক নতুন জগৎ নির্মাণের ভাষা পায়; সুইফ্টের ভ্রমণকাহিনিতে সেই জগতের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি বারবার অস্থির হয়ে ওঠে।
ক্রুসোর অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তার ধর্মীয় আত্মসমীক্ষা। দ্বীপে একাকিত্ব তাকে নিজের অতীত আচরণ নিয়ে ভাবার সুযোগ দেয়। প্রথমদিকে সে বিপর্যয়কে প্রধানত দুর্ভাগ্য ও বাস্তব সমস্যার দৃষ্টিতে দেখে। পরে তার কাছে সেই অভিজ্ঞতা ঈশ্বরের বিধান, পাপ, অনুতাপ আর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে। ডায়েরি লেখা, নিজের অবস্থার হিসাব রাখা এবং অতীতের ঘটনাগুলোকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার মধ্যে দিয়ে ক্রুসো তার জীবনে একটি নৈতিক ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা করে। যে বিপর্যয় প্রথমে অর্থহীন বলে মনে হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা তার কাছে আত্মসমালোচনা ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। এ কারণে ক্রুসোর শ্রম কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়। তা আত্মশৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করারও একটি পদ্ধতি। সে প্রকৃতির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও, নিজের অভিজ্ঞতাকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কৃতিত্ব বলে ব্যাখ্যা করতে পারে না; তার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি সেই সাফল্যকে বৃহত্তর এক বিধানের সঙ্গে যুক্ত করে।

সুইফ্টের দর্শন এক্ষেত্রে অনেক বেশি সন্দেহপ্রবণ। লাপুটার বিজ্ঞানীরা জ্ঞান ও উদ্ভাবনের নামে এমন সব কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত, যার সঙ্গে মানুষের বাস্তব জীবনের সম্পর্ক দুর্বল। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেন মনে করিয়ে দেয়, যুক্তিবাদী বলে পরিচিত প্রতিটি কর্মকাণ্ডই যে যুক্তিসঙ্গত ফল উৎপন্ন করবে, তার নিশ্চয়তা নেই। সুইফ্টের আপত্তি জ্ঞানের বিরুদ্ধে নয়; বরং জ্ঞান যখন নিজের উদ্দেশ্য ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে অন্ধ হয়ে পড়ে, তখন তার বিরুদ্ধে। এই সমালোচনা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও মানুষের আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়। মানুষ নিজের যুক্তিবোধকে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বলে মনে করে, অথচ সেই যুক্তিবোধের সাহায্যেই সে যুদ্ধ, শোষণ ও প্রতারণাকে ন্যায্যতা দিতে পারে। হুইনহ্নমদের দেশে গুলিভারের অভিজ্ঞতা এ দ্বন্দ্বকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। সে এমন এক সমাজ দেখে, যেখানে যুক্তিবোধ ও আত্মসংযম মানুষের চেয়ে অমানবিক প্রাণীর মধ্যে বেশি বিকশিত বলে মনে হয়। কিন্তু সে উপলব্ধি তাকে ভারসাম্যপূর্ণ আত্মসমালোচনার দিকে না নিয়ে গিয়ে নিজের প্রজাতির প্রতি ঘৃণার দিকে ঠেলে দেয়।
এখানে সুইফ্টের ব্যঙ্গের গভীরতা। মানুষের ভণ্ডামি আবিষ্কার করা এক বিষয়, আর মানুষের সমস্ত সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা অন্য বিষয়। গালিভার প্রথমটি থেকে দ্বিতীয়টিতে পৌঁছে যায়। তার দৃষ্টিতে মানবসভ্যতার সমস্ত ত্রুটি এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, মানুষের সঙ্গে বসবাসের সামান্য সম্ভাবনাও তার কাছে আর গ্রহণযোগ্য থাকে না। ক্রুসো বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে নিজের জীবনকে নতুন অর্থ দিতে শেখে। গালিভার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পুরনো অর্থগুলোকে ভেঙে ফেললেও নতুন কোনও স্থিতিশীল অর্থ নির্মাণ করতে পারে না। ফলে, শেষ পর্যন্ত, ‘রবিনসন ক্রুসো’ ও ‘গালিভারের ভ্রমণকাহিনি’-কে কেবল দু’টি ভ্রমণকাহিনি বা দুঃসাহসিক অভিযানের উপন্যাস হিসেবে পড়লে তাদের গভীর দার্শনিক সংঘাত ধরা পড়ে না। দুই রচনাতেই ভ্রমণ পরিচিত জগতের বাইরে যাওয়ার অভূতপূর্ব উপায়, কিন্তু সেখান থেকে বেরনোর কিংবা থেকে যাওয়ার পথ আর পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved