

রিয়ালিটি শো নীতিশিক্ষা দেয় কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হল, আমরা কেন ধরে নিই যে, অন্যের নৈতিকতা মাপার অধিকার আমাদের আছে? অনুষ্ঠানটি তো আর কারও চরিত্রের শংসাপত্র বিলি করছে না। আমরাই বিলি করছি, তাও বিনামূল্যে। মানুষকে বুঝতে সময় লাগে। বিচার করতে লাগে কয়েক সেকেন্ড। তাছাড়া অন্যের বিরুদ্ধে রায় দিতে পারলে নিজের সম্পর্কে ভালো ধারণাটিও অক্ষত থাকে। নৈতিকতার বাজারে এর চেয়ে লাভজনক ব্যবসা আর কী!
ধরা যাক, কোনও এক গবেষণাগারের দৃশ্য। কাচের ডালাবন্ধ বাক্সে রাখা রয়েছে একদল ইঁদুর। সময়ে খাবার পাচ্ছে, সঙ্গী পাচ্ছে, কেবল চাইলে বেরতে পারছে না। এভাবেই কাটছে দিন। কখনও তারা তেড়েফুঁড়ে আক্রমণ করছে একে অপরকে। কখনও আবার ঝিম মেরে কাছাকাছি বসে পার করছে সুসময়। যাই করুক না কেন, বাইরে থেকে তা নজর রাখা হচ্ছে। ঘন ঘন মেপে, বের করা হচ্ছে জটিল সব সিদ্ধান্ত।
ঘটনা খানিক এমনই। বদ্ধ চার দেওয়ালের ভিতর ঝগড়া-রাগ-খুনসুটি-প্রেমপিরিতি। কেবল তফাত এটুকুই– এক্ষেত্রে কাচের দুইপারেই রয়েছে মানুষ। হয়তো ভাবছেন, ‘ইউনিভার্স ২৫’-এর চাইতেও জটিল কোনও গবেষণার কথা বলছি। আজ্ঞে না, রিয়ালিটি শো। মার্কিন মুলুকে এমন শো চলছে অনেক আগে থেকেই, ভারতেও অন্যান্য ভাষায় তার জনপ্রিয়তা এগিয়েছে দুর্বার গতিতে। এইবার বাংলার পালা। সদ্য সম্প্রচার হওয়া এই রিয়ালিটি শো ইতিমধ্যেই বেজায় জনপ্রিয় হয়েছে। ইতিউতি সে সম্পর্কে নানা কথার ফুলঝুরি। কে ভালো, কে মন্দ, কে কুচুটে, কে ধোয়া তুলসী– তা নিয়ে নানা গুণীর নানা মত।

অথচ রিয়ালিটি শো নীতিশিক্ষা দিতে আসে না। রিয়ালিটি শো পঞ্চতন্ত্র, উপনিষদ, রামকৃষ্ণের মুখে শোনা গল্প গোছের কিছু তো নয়। সত্যি বলতে, তার সে দায়ও নেই। সে বিনোদনের স্বার্থে এসেছে। এই শোয়ের ক্ষেত্রে সে মানুষ দেখায়। ঝগড়া দেখায়। কান্না দেখায়। কে কার সঙ্গে কী করল, সেসব দেখায় কেবল।
আমাদের কাজ ছিল দেখা। কিন্তু আমরা স্রেফ দেখে থামতে পারি না, বিবেক নিয়ে বসি। যেন জীবনে কোনওদিন কাউকে মিথ্যে বলিনি, কারও নামে বদনাম করিনি, রাগত হয়ে কটুবাক্য ছিটাইনি। পর্দায় লোকটা ভুল করলেই আমাদের ভিতরের মহাত্মা উঠে দাঁড়ায়। কেউ রেগে গেল– ‘কী অসভ্য!’ কেউ মিথ্যে বলল– ‘কী ভণ্ড!’ কাঁদল মানেই– ‘নাটক করছে।’ চুপ করে থাকল– ‘অহংকারী।’ অর্থাৎ তিনি যা করবেন, তার নৈতিক ব্যাখ্যা আমাদের তৈরি। এমনকী, তিনি কিছু না-করলেও। একজন মানুষকে এখন আচরণ করতে হয় না, দর্শকের বিচার পাওয়ার জন্য শুধু পর্দায় থাকলেই চলে।
মজার ব্যাপার হল, বাস্তবে নিজেদের জীবনে আমরা কিন্তু এতটা কঠোর নই। নিজেদের রাগের নেপথ্যে কারণ থাকে– অপমান ছিল। চাপে ছিলাম। মাথা গরম ছিল। পরিস্থিতি খারাপ ছিল। অন্যের রাগের নেপথ্যে? চরিত্র খারাপ! নিজে মিথ্যে বললে, তা প্রয়োজনের। অন্যে মিথ্যে বলছে মানেই এমনটা তার স্বভাবসিদ্ধ। নিজের হিংসে হলে ধরে নিই, তা নেহাতই প্রতিযোগী মনোভাবের ফসল। অথচ অন্যের হিংসে নীচতা বই তো আর কিছু নয়। বিবেকেরও যে এত সুন্দর পক্ষপাত থাকতে পারে, তা আমরা রিয়ালিটি শো না দেখলে জানতামই না!

আর কী আত্মবিশ্বাস আমাদের! একজন মানুষকে কয়েকটি দৃশ্যে দেখেই বলে দিই, লোকটা আসলে এইরকম। ‘আসলে’ শব্দটি ভয়ানক সুবিধার। এই একটি শব্দ বললেই বাকি জীবনটাকে বাতিল করা যায়। তাঁর শৈশব-ভয়-অপমান-সম্পর্ক– কিছুই জানি না। ক্যামেরার বাইরে তিনি কেমন, তার খবর রাখি না। তবু ‘আসলে’ তিনি কে, সে-বিষয়ে আমাদের মতামত পাকা।
রিয়ালিটি শো-তে মানুষটিকে দেখা যায়, জানা যায় না। এই সামান্য বিষয়টুকু আমরা ভুলে যাই। কয়েক মিনিটের আচরণকে জীবনের সারাংশ বানিয়ে ফেলি। একটি ঝগড়াই তার স্বভাব নির্ধারণ করে। একটি মিথ্যেই হয়ে যায় চরিত্রের নির্ণায়ক। আর একটি ভুলই তার পরিচয়। মানুষ যে মাঝেমধ্যে নিজের সঙ্গেও অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ করে বসতে পারে, সেটুকু বিলাসিতার অবকাশ তাকে দিই না। আমরা চাই, লোকটি একরৈখিক হোক। খলনায়ক হলে পুরোপুরি খলনায়ক। নায়ক হলে এক্কেবারে দেবতুল্য। মাঝখানে যে ধূসর একটা গোলমেলে জায়গা আছে, তা মনেই রাখতে চাই না। সেখানে ঢুকলে বিচার করতে অসুবিধে হয় যে!
নীতিশিক্ষার জন্য পৃথিবীতে জিনিসপত্রের অভাব কোনওদিন ছিল না। স্কুল-বই-শিক্ষক-বাবা-মা-ঈশপ থেকে শুরু করে গীতা-কোরান-বাইবেল কী না ছিল! মানুষকে ভালো হওয়ার কথা বলার জন্য মানবসভ্যতা কম খাটেনি। শুধু সেই শিক্ষাটা নিজের ওপর প্রয়োগ করা হয়ে ওঠে না।
আমাদের এই নৈতিক উৎসাহের মধ্যে একটু আরামও আছে। অন্যের ভুল বাছতে বসলে নিজের ভালত্বের দাম বাড়ে। অন্যের চরিত্র খারাপ প্রমাণিত হলেই নিজেরটা আপনাআপনি গঙ্গাজলে ধুয়ে যায়। সাবান লাগে না। আত্মসমালোচনা লাগে না। শুধু পর্দার সামনে বসে থাকলেই চলে। একজন কাদায় পড়েছে। আমরা তীরে দাঁড়িয়ে জামাকাপড় ঝাড়তে থাকি।

প্রশ্ন তাই রিয়ালিটি শো নীতিশিক্ষা দেয় কি না, সে নিয়ে নয়। প্রশ্ন হল, আমরা কেন ধরে নিই যে, অন্যের নৈতিকতা মাপার অধিকার আমাদের আছে? অনুষ্ঠানটি তো আর কারও চরিত্রের শংসাপত্র বিলি করছে না। আমরাই বিলি করছি, তাও বিনামূল্যে। মানুষকে বুঝতে চাইলে সময় লাগে। বিচার করতে লাগে কয়েক সেকেন্ড। তাছাড়া অন্যের বিরুদ্ধে রায় দিতে পারলে নিজের সম্পর্কে ভালো ধারণাটিও অক্ষত থাকে। নৈতিকতার বাজারে এর চেয়ে লাভজনক ব্যবসা আর কী!
রিয়ালিটি শো শেষ হয়ে যায়। দর্শকের নৈতিকতার পরীক্ষা আর শেষ হয় না। নতুন মানুষ আসে। ঝগড়া আসে। খলনায়ক আসে। আমরা আবার বিবেকের পইতে পরে বসি। যেন জীবনে আমাদের কোনও অন্ধকার ঘর নেই। যেন আমাদের কোনও ভুলের আলমারি নেই। যেন আয়নাটা কেবল অন্যের দিকেই ফেরানো।
পর্দায় মানুষটি ভুল করেছে, তার সমালোচনা হতেই পারে। কিন্তু তাকে দেখে নিজের পবিত্রতার সার্টিফিকেট বের করার যে উৎসাহ, সেটাই খানিক ভাবনা জাগায়। কারণ নীতিবোধের গল্পে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা তো আর কেবল অন্যের দোষ খুঁজে পাওয়া নয়, বরং নিজের বিবেকবোধের সাপেক্ষে তা কতখানি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে বিচার করা যায়, তা-ই দেখা।

এ পরীক্ষা অবশ্য রিয়ালিটি শো নেয় না। সেটি যে আদ্যোপান্ত বিনোদনের অনুষ্ঠান, সে-বিষয়ে তো সন্দেহ নেই। তাই সমাজের খানিক চেনাপরিচিত মুখের একদল মানুষকে বেছে, তাদের ২৪ ঘণ্টা থেকে নির্দিষ্ট কয়েক মিনিটই তুলে নেওয়া হয়– এডিট টেবিল পেরিয়ে যা মুচমুচে গসিপ হয়ে পৌঁছয় আমাদের কাছে। আগে রিয়ালিটি শো টেলিভিশনের পর্দায় শেষ হত। এখন তা হয় না। মানুষ যখন তখন চাইলেই দেখতে পায় ফোনের পর্দায়। ফলে ঘুম থেকে উঠেই, ভিড় বাসে ধাক্কা সামলে, বসের কাঁচা খিস্তি শুনতে শুনতে চাইলেই সে পক্ষ নিতে পারে, মন্তব্য করতে পারে, ভালবাসতে পারে, ‘ক্যানসেল’ করতে পারে কেবলমাত্র মুখচেনা একদল মানুষকে।
নীতিপরীক্ষা নেওয়ার এই গুরুভার আমরা নিজেরাই কাঁধে তুলে নিয়েছি। পরীক্ষায় শর্ত একটিই, পরীক্ষার্থীটি হতে হবে মানুষ, নিজে বাদে অন্য কেউ।
……………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন রোববার ডিজিটাল ডেস্ক-এর অন্যান্য লেখা
……………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved