Inside the Underworld: The Lives of Mafia Figures। Robbar
Robbar
  • ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘ভাই’চারা

অজস্র ভারতীয় সিনেমায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রয়ে গিয়েছে হাজি মস্তান, করিম লালা, আর বরদাভাইয়ের দাগ। নামে-বেনামে হাজি মস্তান প্রোডিউস করেছিলেন বেশ কিছু ফিল্ম। শোনা যায়, একসময়ে অর্থাভাবে রাজ কাপুর এসেছিলেন তাঁর কাছে, টাকা চাইতে। দিলীপ কুমার, ফিরোজ খান, সঞ্জীব কুমারের মতো ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে ছিল তাঁর মেলামেশা। অমিতাভ বচ্চন নকল করেছিলেন বরদাভাইকে, ‘অগ্নিপথ’-এ (১৯৯০), বিজয় দীননাথ চৌহানের অননুকরণীয় উচ্চারণ শৈলীর জন্য।

গ্রাফিক্স: দীপঙ্কর ভৌমিক

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ২১:৪৭   
Facebook WhatsApp Messenger

ভাইয়ের কপালে ফোঁটা যত চওড়া, যমের দুয়ারে কাঁটা তত তীক্ষ্ণ– এই মন্ত্রগুপ্তিটা বম্বের আন্ডারওয়ার্ল্ডের থেকে খাঁটি বোধহয় আর কোথাও খাটে না। কেন-না, এ ‘ভাই’ তো যে-সে ভাই নয়! এ ‘ভাই’-এর তলব পেলে, মুখ আমসি হয়ে যায় আচ্ছা-আচ্ছা ধুরন্ধরের! গত শতকের বিখ্যাত বা কুখ্যাত ‘সংগঠিত অপরাধ’ (organized crime)– যা মোটেও কোনও হেঁজিপেঁজি কাজকম্ম নয়; বরং, সেসব করতে গেলে, সবার আগে দরকার একটা সুশৃঙ্খল সংগঠন এবং বেআইনি জিনিসপত্র আর পরিষেবার লাগাতার জোগান– তার তুমুল যজ্ঞ গড়ে উঠেছিল ‘ভারতের আর্থিক রাজধানী’ বম্বেকে ঘিরে। 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, এখনকার মহারাষ্ট্রে আর গুজরাতে (সেই সময়ে একত্রে ছিল ‘স্টেট অফ বম্বে’) অ্যালকোহল নিষিদ্ধ হওয়ায় (বম্বে প্রোহিবিশন অ্যাক্ট, ১৯৪৯) রমরমিয়ে উঠল বেআইনি মদের কারবার ও চোরাচালান। পাশাপাশি গজিয়ে উঠল অন্যান্য নিষিদ্ধ জিনিসের ব্যবসা (বুটলেগিং) আর অবৈধ জুয়ার ঠেক, যার নাম ‘মটকা’। মুনাফা লোটার কলকবজা বুঝে নিয়ে, উচ্চবিত্তের কুক্ষিগত জুয়াখেলাকে সর্বজনীন করে তুলে, কারখানায় খেটে-খাওয়া মজদুরদের কাছে প্রবল জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন করাচি থেকে আসা এক সিন্ধি, ‘মটকা কিং’ রতন খত্রি। অনেকের মতে, ‘ধর্মাত্মা’-য় (১৯৭৫) শেঠ ধরমদাসের চরিত্রে (অভিনয়ে, প্রেমনাথ) ছিল রতন খত্রির ছাপ।

zoom
(বাঁ-দিকে) রতন খত্রি, (ডানদিকে) ‘ধর্মাত্মা’-য় শেঠ ধরমদাসের চরিত্রে (অভিনয়ে, প্রেমনাথ) ছিল রতন খত্রির ছাপ

মূলত হিন্দি সিনেমার দৌলতে, আমরা জানি, আন্ডারওয়ার্ল্ডের এইসব নায়ক অথবা খলনায়ককে সবাই ডাকে ‘ভাই’ বলে। যতদূর ঠাহর হয়, এর আড়ালে রয়েছে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক ঔদ্ধত্যের বেলুন। সম্মান দেওয়ার পাশাপাশি, হয়তো অবচেতনে একটা চিন্তাধারা বয়ে চলে যে, ‘ভাই’ যা বলবে তা নতশিরে মানতে হবে এবং আমার কোনও বিপদ হলে ‘ভাই’ নিশ্চয়ই বাঁচাবে। 

যদিও, শুধু ‘ভাই’ নয়; সম্বোধনের তালিকায় রয়েছে ‘দাদা’ (যেমন, বাসুদাদা; যাঁর কাছে অপরাধের হাতেখড়ি নিয়েছিলেন দাউদ ইব্রাহিম), ‘আন্না’ (সন্তোষ শেট্টি, শরদ শেট্টি), ‘নানা’ (রাজেন্দ্র নিকালজে ওরফে ছোটা রাজন), বা ‘ড্যাডি’ (অরুণ গউলি)। তবে, খুব সম্ভবত, সর্বভারতীয় দর্শকের কাছে, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে, যে-কোনও নামের সঙ্গে ‘ভাই’ জুড়ে যেতে পারে বলেই, হয়তো, ভারতের ফিল্মি আঙিনায় এত ‘ভাই’-এর বংশবিস্তার।

zoom
দাউদের সঙ্গে ছোটা রাজন ওরফে রাজেন্দ্র নিকালজে

কোনও এক অলিখিত নিয়মে, অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মতো, সিনেমাতেও পুরুষ ‘ডন’-এর যত বাড়াবাড়ি, সেই তুলনায় নারীরা থেকেছেন অগোচরেই। লিঙ্গ-রাজনীতির ঘেরাটোপ থেকে বাঁচতে, আপাতত এটাও বলা উচিত যে, শুধু ‘ভাই’ নয়; এ দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড গন্ডায় গন্ডায় দেখেছে মহিলাদেরও। যেমন, বেলা আন্টি, শশিকলা পাটানকার, জেনাবাঈ দারুওয়ালা, রুবিনা সঈদ, সন্তোকবেন জাডেজা। অনেকেই জানেন, সন্তোকবেনের প্রেক্ষিতে তৈরি হয়েছিল ‘গডমাদার’ (১৯৯৯; নাম-ভূমিকায়, শাবানা আজমি)।

zoom
ছেলের সঙ্গে বসে আছেন ‘গ্যাংস্টার’ সন্তোকবেন, (ডানদিকে) ‘গডমাদার’-এ তাঁর চরিত্রে শাবানা আজমি

কিছুকাল আগেও প্রচ্ছন্ন ছিল, তবে ইদানীং যেভাবে চতুর্দিকে হুড়োহুড়ি করছে প্রাদেশিকতার অন্ধ আগুন– বম্বেতে অটো-রিক্সা চালাতে হলে অবশ্যই মারাঠি বলতে হবে; বা কেরল থেকে ফরিদাবাদে আসা আটজন মহিলা এমএলএ অবশ্যই হিন্দি জানবেন, কারণ ওয়ার্কশপটা চলছে উত্তর ভারতে– আশঙ্কা হয়, আমরা কি প্রাদেশিক অহংকারকেই সাজিয়ে তুলছি এ-দেশের অলংকার হিসেবে? মজার ব্যাপার হল, মাত্র কয়েক দশক আগেও, বম্বের আপাত-আঁধার দুনিয়ার বেতাজ বাদশা ছিলেন এমন তিনজন, যাঁরা কেউই মহারাষ্ট্রের নন– হাজি মস্তান, করিম লালা, আর বরদাভাই– যে ‘ত্রিমূর্তি’ একই সময়ে কাজ করতেন; একসঙ্গে; নিজের নিজের এলাকায়; কেউ কারও দিকে আঙুল ওঠাননি।

‘ভারতের প্রথম ডন’ মস্তান হায়দার মির্জা ওরফে ‘বাবা’ ওরফে সুলতান মির্জা ওরফে হাজি মস্তান এসেছিলেন তামিলনাড়ুর একটা ছোট্ট গ্রাম, পানাইকুলাম থেকে। বম্বের ক্রফোর্ড মার্কেটে ছিল তাঁর সাইকেল সারানোর একচিলতে দোকান। সুকুর নারায়ণ বাখিয়ার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর, দু’জনে মিলে গড়ে তুলেছিলেন স্মাগলিংয়ের রাজপাট। মস্তানের সেই মস্তানি তীব্র ছিল এমন, যা চলকে চলকে উঠত তাঁর এলেমদার জীবনে। পুলিশ, সরকারি দফতর, মিডিয়া হাউজের হর্তাকর্তা, নেতা-মন্ত্রী, তাবড় তাবড় ফিল্মস্টার– সকলের সঙ্গে ছিল তাঁর নিত্য ওঠা-বসা। পেডার রোডের (এখন, গোপালরাও দেশমুখ মার্গ) চোখ-ধাঁধানো এলাকায় ছিল তাঁর সুবিশাল প্রাসাদ; নাম, ‘বেইত-উল-সুরুর’ (বাংলায় অর্থ, ‘আনন্দের আলয়’)। হরহামেশা তাঁর ঠোঁটে ঝুলত দামি বিলেতি সিগারেট; আর, তাঁর বাহন ছিল ঝকঝকে মার্সিডিজ-বেঞ্জ, যা সেই সময়ের দুর্দম এক ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’।

zoom
হাজি মস্তান

আফগানিস্তানের কুনার থেকে এসেছিলেন ‘এ দেশের মাফিয়া-রাজের অন্যতম পথিকৃৎ’ আবদুল করিম শের খান ওরফে ‘করিম লালা’। সোনা-গয়না-হাশিশের চোরাকারবারের পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছিলেন অবৈধ জুয়া-মদের ঠেক। এবং কয়েক দশক যাবৎ বম্বেতে সেই ব্যবসার একচ্ছত্র সম্রাট ছিলেন তিনি। তাঁর বাড়িতে দাওয়াত পেলে ধন্য হয়ে যেতেন তখনকার সেলিব্রিটিরা। শোনা যায়, ‘জঞ্জির’-এ (১৯৭৩) শের খানের চরিত্রে (অভিনয়ে, প্রাণ) ছিল করিম লালার আদল। আর, ‘দিওয়ার’-এ (১৯৭৫) বিজয় বর্মার (অভিনয়ে, অমিতাভ বচ্চন) কাহিনির নেপথ্যে ছিল হাজি মস্তানের উত্থান।

zoom
আবদুল করিম শের খান ওরফে ‘করিম লালা’, ‘জঞ্জির’-এ তাঁর আদলে তৈরি হয়েছিল শের খানের চরিত্র (অভিনয়ে প্রাণ)

তামিলনাড়ুর তুতুকুড়ি থেকে এসে, বম্বের ভিক্টোরিয়া টার্মিনাসে (এখন, ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাস) কুলির কাজ করতেন বরদারাজন মুদলিয়ার ওরফে ‘বরদাভাই’। কাছাকাছি বিসমিল্লা শাহ বাবার দরগায় প্রতিদিন খাওয়াতেন দুঃস্থদের। গরিব মানুষের মসিহা হয়ে, ছয়ের দশক থেকে খুন, অপহরণ, জমি দখল, জুয়া আর চোলাই মদের আড্ডা ঘিরে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর অপ্রতিরোধ্য আন্ডারওয়ার্ল্ড সাম্রাজ্য। চেম্বুরের ঝলমলে এলাকায় ছিল তাঁর আলিশান বাংলো, ‘বর্ষা’; যেখানে নিরন্তর যাতায়াত ছিল তখনকার নামজাদা লোকজনের। 

অপরাধ জগতের মসনদে বসেও, তিনি নিজে ছুঁতেন না মদ বা সিগারেট। বম্বের যে-কোনও সাধারণ মানুষের মতো, তাঁরও প্রিয় খাবার ছিল বড়া-পাও। ধারাভির বস্তি এলাকায় তামিল জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি ছিলেন প্রায় ঈশ্বরের প্রতিরূপ। সেখানের যে-কোনও সমস্যায়, যে-কোনও ঝামেলায় মানুষ পৌঁছত তাঁর কাছে। আর, তারা মাথা পেতে নিত তাঁর রায়। মাটুঙ্গা স্টেশনের পাশে তাঁর গণপতি পুজোর প্যান্ডেল দেখতে আমজনতা তো বটেই, হাজির হতেন তখনকার কেউকেটারাও। ধারাভি, সায়ন, আর মাটুঙ্গা জুড়ে বিস্তীর্ণ কোলিওয়াড়া অঞ্চলে কোনও রাষ্ট্র নয়, প্রায় আড়াই দশক ধরে চলেছিল বরদাভাইয়ের ন্যায়সংহিতা।

zoom
বরদারাজন মুদলিয়ার ওরফে ‘বরদাভাই’

আন্দাজ করা হয়, ‘অর্ধ সত্য’-তে (১৯৮৩) রামা শেট্টি (অভিনয়ে, সদাশিব অম্রপুরকার) আর ‘মশাল’-এ (১৯৮৪) এস. কে. বর্ধনের চরিত্রে (অভিনয়ে, অমরিশ পুরি) নেওয়া হয়েছিল বরদারাজনের ছাঁচ। ওদিকে, যুবক মণি রত্নম যখন হাত দিলেন ‘নায়কন’-এর (১৯৮৭) কাজে, জানা গেল তিনি পর্দায় অনেকটাই ধরতে চাইছেন বরদাভাইয়ের জীবন। শুটিংয়ের মাঝেই, একদিন একটা রহস্যময় ফোন এল পরিচালকের কাছে– ‘আপনি কি একবার ‘ভাই’-এর সঙ্গে দেখা করতে চান?’

zoom
‘মশাল’ (১৯৮৪)-তে অমরেশ পুরি যেন হয়ে উঠেছিলেন বাস্তবের ‘ডন’ বরদারাজন

বরদারাজন তখন থাকতেন ময়িলাপুরের সেন্থম রোডের বাড়িতে; সেই সময়ে পুলিশের জ্বালায় বম্বেতে থাকার পরিস্থিতি তাঁর ছিল না। খানিকটা ঝুঁকি নিয়ে, দুরুদুরু বুকে, সেখানে পৌঁছলেন বছর ত্রিশের রত্নম। আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, সৌম্য, শান্ত, সাদাসিধে চেহারার মানুষটার পরনে ধবধবে ধুতি, কপালে তাজা তিলক; আর, সিনেমার খুঁটিনাটি জানতে তাঁর অপার কৌতূহল। শিশুর মতো অনর্গল জিজ্ঞাসা তাঁর, ‘হিরো কি গলায় লাল রঙের রুমাল বেঁধে ঘুরবে? যখন-তখন লোকজনকে মারধর করবে? কানে কর্ডলেস ফোন লাগিয়ে চেঁচামেচি করবে? চোখ রাঙিয়ে হুকুম দেবে না কি?’ পরিচালক বুঝতে পারলেন, প্রথাগত ভারতীয় সিনেমায় অত্যাচারী ‘ডন’-দের যেভাবে দেখানো হয়, সেসব প্রায় মুখস্থ এই ‘ভাই’-য়ের।

মন দিয়ে মণি রত্নম শুনছিলেন বরদার কথা। ‘ভাই’ তাঁকে বলছিলেন, ‘যা-ই করুন, আপনার কাহিনিতে কিন্তু কারও কোনও পক্ষ নেবেন না। এই পৃথিবীতে কেউই, এমনকী কোনও মাফিয়া ডনও ততটা খারাপ নয়, যতটা সিনেমায় তাদের দেখানো হয়। একটা কথা ভাবুন, আন্ডারওয়ার্ল্ড সবসময় পুলিশের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকে কেন? আমরা তো কোনও সাংঘাতিক সুযোগ-সুবিধা পাই না! বা আমাদের কোনও বিশাল বাহিনীও নেই! কিন্তু আমরা কাজটা করতে পারি; কারণ, আমরা বুদ্ধিমান! আমাদের সেটুকু দক্ষতা আছে!’

zoom
‘নায়কন’-এর (১৯৮৭) শুটিং-এ পরিচালক মণি রত্নম

বাস্তবিক, বরদারাজন চাইলে ‘নায়কন’-এর শুটিংই আটকে দিতে পারতেন। কিন্তু, তিনি তা চাননি। বরং, তিনি চেয়েছিলেন সেই নিন্দিত ডনের চরিত্র যেন যথাযথ হয়। এবং তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সদ্য সাড়া-জাগানো পরিচালকও কাজে লাগিয়েছিলেন সেই সুযোগ। বম্বে গিয়ে দেখা করেছিলেন বরদারাজনের উত্তরাধিকারী, মোহনের সঙ্গে। প্রথমদিকে, নায়ক কমল হাসান দোনামোনা করলেও, তিনিও দু’বার গিয়েছিলেন ‘ভাই’-কে কাছ থেকে দেখতে। আর, হাঁ হয়ে দেখেছিলেন, যাঁর নাম শুনলেই থরহরি কম্পমান হয় আপামর দুনিয়া, তিনি সমস্ত তেজ ও ক্ষমতায় বলীয়ান হয়েও, কী অসম্ভব মায়াময় হয়ে উঠতে পারেন পৃথিবীতে পিছিয়ে-পড়া মানুষদের কাছে! কী সাংঘাতিক নাটকীয় বৈপরীত্য থাকতে পারে বাস্তবে জলজ্যান্ত একটা মানুষের ভিতর! 

প্রচলিত কাহিনির প্রথা মেনে, গ্যাংস্টার নায়ককে মরতেই হয়; নইলে, বেজায় চাপ হয় সেন্সরের সার্টিফিকেট পেতে। কিন্তু, ‘নায়কন’-এর মৃত্যু কীভাবে হবে, সে নিয়ে কোনও কিনারা করতে পারছিলেন না মণি রত্নম। অগত্যা, তিনি দ্বারস্থ হলেন খোদ সেই ‘ভাই’-এর কাছেই। সুস্থির বরদারাজন বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ চিন্তা-ভাবনা করে বললেন, ‘আমি তো চাই শান্তিতে মরতে! কিন্তু, মনে হয় না আমার কপালে সেরকম হবে!’ তাঁর কল্পনায় যেমনটি ছিল নিজের ভবিষ্য-মরণ, পর্দায় অনেকটা সেই পথেই মারা গেল ভারতীয় সিনেমার এক ক্লাসিক ‘ডন’, শক্তিবেল বেলু নাইকার।

zoom
‘ডন’ শক্তিবেল বেলু নাইকার

ফিল্ম রিলিজের আগে, অক্টোবরের এক সন্ধ্যায়, মণি রত্নম আমন্ত্রণ করলেন বরদারাজনকে, টি. নগর প্রিভিউ থিয়েটারে। উদ্দেশ্য: কাহিনিতে ‘কাল্পনিক’ মুখ্য চরিত্রের বাস্তব ‘প্রেরণাদাতা’ মানুষটাকেই প্রথম দেখানো হোক ‘নায়কন’। পরদিন সকালে ফোন বাজল মণি রত্নমের ঘরে। সিনেমার যথেষ্ট প্রশংসা করে ‘ভাই’ বললেন, ‘আমার একটা কথা রাখবেন, প্লিজ? কাউকে কখনও বলবেন না যে, বেলুর চরিত্রটা আমাকে নিয়েই ভেবেছিলেন!’ মণি রত্নম আর কমল হাসান– দু’জনেই মাথায় রেখেছেন তাঁর অনুরোধ। পরবর্তীকালে, প্রসঙ্গ উঠলেই, তাঁরা সবসময় জানিয়েছেন, বেলু নাইকারের ভিতরে বরদারাজনের আলগা ছোঁয়া আছে বটে; কিন্তু, পুরোপুরি তিনি নন।

অজস্র ভারতীয় সিনেমায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রয়ে গিয়েছে হাজি মস্তান, করিম লালা, আর বরদাভাইয়ের দাগ। নামে-বেনামে হাজি মস্তান প্রোডিউস করেছিলেন বেশ কিছু ফিল্ম। শোনা যায়, একসময়ে অর্থাভাবে রাজ কাপুর এসেছিলেন তাঁর কাছে, টাকা চাইতে। দিলীপ কুমার, ফিরোজ খান, সঞ্জীব কুমারের মতো ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে ছিল তাঁর মেলামেশা। অমিতাভ বচ্চন নকল করেছিলেন বরদাভাইকে, ‘অগ্নিপথ’-এ (১৯৯০), বিজয় দীননাথ চৌহানের অননুকরণীয় উচ্চারণ শৈলীর জন্য।

zoom
‘ডন’ রতন খত্রির সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন রাজ কাপুর

ফিরে আসি ‘নায়কন’-এর কথায়। সিনেমাটা রিলিজ হওয়ার পর মাস তিনেকের মধ্যে, হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যান বরদারাজন! ‘ভাই’-এর ইচ্ছা অনুযায়ী, শেষকৃত্যের জন্য, বম্বেতে মরদেহ নিয়ে আসেন হাজি মস্তান, ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের চার্টার্ড ফ্লাইট ভাড়া করে। ধারাভি, মাটুঙ্গা, সায়নের পথেঘাটে নেমে আসে শোকের ছায়া। ঘরে ঘরে শোনা যায় প্রিয়জন বিয়োগের ক্রন্দন। রাস্তায় নেমে আসে মানুষের ঢল। দোকান-বাজার সব বন্ধ হয়ে যায়– শেষবার, একটিবার ‘ভাই’-কে দেখার জন্য।

আর, তা হবে নাই-বা কেন? তামিলনাড়ুর তথাকথিত ‘উচ্চবর্ণের হিন্দু’ বরদারাজন মুদলিয়ার তাঁর গর্হিত কর্মজীবনে জাত-ধর্ম-গোত্রের ভিত্তিতে কখনও আলাদা করেননি কাউকে। নিজে দেবতা মুরুগানের (কার্তিক) ভক্ত হয়েও, দু’হাতে বিলিয়েছেন বম্বের দরগায় আর গণেশ পুজোয়, গরিবদের। তাদের উন্নতির জন্য অকাতরে ব্যবস্থা করেছেন লেখাপড়ার, চিকিৎসার, খাওয়া-থাকার। হয়তো, নির্ঘাত টের পেয়েছিলেন তিনি, খাঁটি খিদের কোনও ধর্ম হয় না।

তথ্যসূত্র:

“দিওয়ার: দ্য ‘ফিকশন’ অফ ফিল্ম অ্যান্ড ‘ফ্যাক্ট’ অফ পলিটিক্স”, জ্যোতিকা ভিরদি, জাম্প কাট, নং ৩৮, জুন ১৯৯৩

‘দ্য মেকিং অফ এ ডন’, ভাবনা সোমায়া, দ্য হিন্দু, অক্টোবর ৬, ১৯৯৫ 

‘দ্য চেঞ্জিং ক্যারেকটার অফ দ্য মুম্বই মাফিয়া’, প্রফুল্ল কেটকার, ইন্সটিটিউট অফ পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ, আর্টিকেল নং ৯৭২, মার্চ ৪, ২০০৩ 

‘ডন অফ এ নিউ এরা’, ভেল্লি তেভার, দ্য টেলিগ্রাফ, জুলাই ১৬, ২০০৬

‘অমিতাভ বচ্চন রিকলস দ্য ওল্ড ডনস অফ বম্বে অফ ইওর’, বিজয় সিং, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, জুলাই ৩, ২০১১ 

‘দ্য মাফিয়া অ্যাক্টস’, আভাস শর্মা, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, জুন ১৬, ২০১২ 

‘থ্রি আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনস হু রোড বম্বে ফ্রম দ্য সিক্সটিজ টু আর্লি এইট্টিজ’, দেব কোটাক, ডিএনএ, অগাস্ট ৪, ২০১৫

‘হোয়েন তামিল ডনস রুলড বম্বে’, সিডিএস মণি এবং আবদুল্লা নুরুল্লা, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, নভেম্বর ২, ২০১৫ 

‘প্রোহিবিশন অফ লিকার ইন গুজরাট: ডিক্রিমিনালাইজেশন অর রেগুলেশন?’, আদিত্য দালাল, সুপ্রিমো অ্যামিকাস, ভলিউম ২৫, আগস্ট ২০২১ 

‘বরদারাজন মুদলিয়ার: টোয়েন্টি লেসার-নোন ফ্যাক্টস অ্যাবাউট দ্য প্রমিনেন্ট মুম্বই মাফিয়া ডন’, ভনেসা এম, ডিসকভার ওয়াকস, ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২৪ 

“হাজি মস্তান’স কানেকশন উইথ বলিউড”, ঈশা শিন্দে, পার্সপেক্টিভস অন ব্ল্যাক মার্কেটস, ভলিউম ৪, সম্পাদনা: মাইকেল মোরোনে, ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি

Agneepath Amitabh Bachchan Bombay Brotherhood chhota rajan dawood ibrahim Godmother Haji Mastan Kamal Hassan Karim Lala Mani Ratnam Matka king Nayakan Ratan khatri Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Santokben jadeja Underworld Stories Varadarajan Mudaliar

Share this article on