Robbar

কলকাতায় ব্রুসলীলা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 20, 2026 6:07 pm
  • Updated:July 20, 2026 6:07 pm  

পাড়ায় পাড়ায় ব্রতচারীর স্কুল দেখেছি ছোটবেলায়। ব্রুস লি-র ধাক্কায় সব ক্যারাটে স্কুল হয়ে গেল। বাচ্চা ছেলেরা এবং কিছুদিন পর মেয়েরাও ক্যারাটে ড্রেস পরে ট্রেনিং-এ যেতে থাকল। মনে আছে বড় রাস্তার দিকে ‘কিয়োকুশিন ক্যারাটে’-র একটি ট্রেনিং সেন্টার চালু হয়েছিল। পাড়ার একটি ছেলে ব্রাউন বেল্ট পেয়েছিল কয়েক বছর পর, তার বাবা-মা যারপরনাই গর্বিত। বাড়ি বাড়ি ঘুরছেন নাবালক ব্রুস লি-কে নিয়ে।

অনুব্রত চক্রবর্তী

ব্রুস লি-কে নিয়ে একটি জোক বহুল প্রচলিত। তবু না বললেই নয়। প্রথম শুনি আটের দশকের শেষের দিকে কোনও একটি কলেজ ফেস্টে, ‘ক্যাও ক্যুইজ’ নামে একটি কম্পিটিশনে। প্রশ্নটি ছিল, কোন ব্যক্তি মৃত্যুর পর আরও ভয়ংকর? উত্তর, ব্রুস লি। কারণ মারা যাওয়ার পর তিনি হয়ে যান ‘ডেড লি’।

ব্রুস লি

ব্রুস লি মারা গিয়েছেন তার বছর পনেরো আগে, ’৭০ সালের গোড়ার দিকে। অথচ তাঁকে নিয়ে আলোচনা আমাদের বাল্যকাল, কৈশোর এবং প্রথম যৌবন-জুড়ে। পাড়ায় যেদিন ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’-এর আলোচনা শুনলাম বড়দের মুখে, মনে হল এই ছবি না দেখলে জীবন বৃথা। অথচ উপায় নেই, কারণ বাচ্চাদের ঢুকতে দেবে না সিনেমাহলে। পরে, সাবালক হয়ে ‘রিটার্ন অব দ্য ড্রাগন’ দেখতে গিয়েও ঘাড় ধাক্কা খাব ফড়েপুকুরের হলে, কারণ বয়স হলেও গোঁফ গজায়নি ভালো করে। তার ফলে আমার কপালে ব্রুস লি-র সিনেমা দেখার সৌভাগ্য হয়নি বড় স্ক্রিনে। হয় পাড়ার ক্লাবে অথবা কোনও বন্ধুর বাড়িতে গরমের ছুটির দুপুরে ভাড়া করা ভি-সি-পি-তে ক্যাসেট গুঁজে ব্রুস লি দেখেছি। সেই ক্যাসেট বহুদর্শনে ক্লান্ত, মাঝে মাঝেই টিভির স্ক্রিন জুড়ে উজ্জ্বল সাদা সমান্তরাল ব্যান্ড নিচে থেকে ওপরে উঠে যাচ্ছে। খুবই বিরক্তিকর এইভাবে দেখা, তবু আমরা হাঁ করে তাঁর শরীর দেখছি। কোমর থেকে পিঠ, বেতের মতো ছিপছিপে শরীর রেগে গেলেই ফুলে ইংরাজি ‘ভি’ আকার ধারণ করছে। আর ওঁর মুখনিঃসৃত মার্জারসম আওয়াজ, পাতা না পড়া জ্বলন্ত চোখ, এক লাফে টেবিলের ওপর উঠে পড়া, হাতের মুভমেন্ট। পরে জেনেছিলাম একে বলে ‘মার্শাল আর্ট’। সঙ্গে অদ্ভুত এক অস্ত্র– নানচাকু। চেইন দিয়ে জোড়া দু’টি ডান্ডা বাঁই বাঁই করে ঘোরাচ্ছেন আর মাঝে মাঝে একটি ডান্ডা দিয়ে শত্রুর মুখে ঝামা ঘষে দিচ্ছেন। এমনিতেই খালি হাতে পাঁচ-ছ’জনকে পেড়ে ফেলা ওঁর পক্ষে কিছু ব্যাপার নয়, কিন্তু ওই নানচাকুর কেরামতি দেখার জন্য আমরা রি-ওয়াইন্ড করে সিকোয়েন্সটি বারবার দেখি। পাড়ার রকে ওই অস্ত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আর মার্শাল আর্টের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণের মধ্যে থেকে ‘ক্যারাটে’ শব্দটি কেন কে জানে আলাদা গুরুত্ব পায়। কুংফু, জুডো, চাইনিজ বক্সিং আমাদের শব্দচয়নে সেভাবে জায়গা বানাতে পারেনি।

‘এন্টার দি ড্রাগন’ ছবির পোস্টার

স্কুলে ব্রতচারী করতাম। হাত ছড়াও, ওপর নিচ ডাইনে বাঁয়ে। পা ফাঁক করে, কোমরে হাত রেখে এদিক ওদিক হেলে পড়ো। ঘাড় ঘোরাও। ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ। পাড়ায় পাড়ায় ব্রতচারীর স্কুল দেখেছি ছোটবেলায়। ব্রুস লি-র ধাক্কায় সব ক্যারাটে স্কুল হয়ে গেল। বাচ্চা ছেলেরা এবং কিছুদিন পর মেয়েরাও ক্যারাটে ড্রেস পরে ট্রেনিং-এ যেতে থাকল। মনে আছে বড় রাস্তার দিকে ‘কিয়োকুশিন ক্যারাটে’-র একটি ট্রেনিং সেন্টার চালু হয়েছিল। পাড়ার একটি ছেলে ব্রাউন বেল্ট পেয়েছিল কয়েক বছর পর, তার বাবা-মা যারপরনাই গর্বিত। বাড়ি বাড়ি ঘুরছেন নাবালক ব্রুস লি-কে নিয়ে। সমস্যা হল আমাদের জেনারেশনের, যারা ওই ব্রতচারী, খো-খো, চু-কিতকিত, ছোট রাবারের বলে ফুটবল আর আন্ডারআর্ম ক্রিকেট খেলে বড় হয়েছে। মনে বেজায় ইচ্ছে ব্রুস লি হব, পাড়ার সব বোনদের রক্ষা করব (সিনেমায় নায়ক যদিও পারেননি, বোনটি হারাকিরি করে)। কিন্তু টিপিক্যাল মধ্যবিত্ত দোলাচলে আটকে যাচ্ছি। তবে খুচরো গুন্ডা মান্‌কে-কে দেখে আমরা একটু উত্তেজিত হলাম। ততদিনে বখাটে ছেলেপিলেরা মিঠুন চক্রবর্তীর ‘ক্যারাটে’ ছবিটিও দেখে ফেলেছে। ব্রুস লি-র সিনেমা তো বটেই। যখন যেরকম রিলিজ বা রি-রিলিজ হত। এতদিন পর্যন্ত এ-পাড়া ও-পাড়ার ঝঞ্ঝাটে সাধারণত পেটো পড়ত। কেউ কেউ জং ধরা তরোয়াল নিয়ে দৌড়ে যেত, কেউ আবার ওয়ান শটার হাতে। এরকমই একটি উটকো ঝামেলায় একদিন মান্‌কে নানচাকু নিয়ে এল। ফ্যান্সি মার্কেট থেকে কেনা প্লাস্টিকের মাল নয়, এ একেবারে আলকাতরা মাখানো অরিজিনাল জিনিস। তার অপোনেন্ট-ও সিনেমাগুলো দেখেছে। তার ধারণা নানচাকু যদি ঠিকমতো ঘোরানো যায় তাহলে গুলি করলেও ছিটকে এসে নিজের গায়েই লাগতে পারে। সেই ভয়ে সে ব্যাকগিয়ার দিল। জনতা মান্‌কে-কে নিয়ে প্রায় মাথায় তোলে। এরই মধ্যে কেউ বলে বসেছে, মান্‌কেদা একটু ঘুরিয়ে দেখাও না। সে আর ঘোরাতে চায় না, বলে গুরুর বারণ আছে। প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। গুরু মানে তো ব্রুস লি আর মিঠুনদা। বাপি বলল, সে আমি ম্যানেজ করে নেব। ওর দশ-বাই-দশ ঘরের স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়ালে দু’জনেরই ছবি সাঁটানো আছে। আজন্ম আমাশায় ভোগা চেহারা নিয়ে সে রোজ সকালে ছবিগুলোয় ধূপ-ধুনো দেয়। সস্তা জনপ্রিয়তার চাপ বড় চাপ। মান্‌কে ঘুরিয়ে ফেলল। ঠকাং শব্দ। পরক্ষণেই কপাল ফুলে ডিমের মতো। তাকে ধরাধরি করে টিউকলের (টিউবওয়েল) সামনে বসানো হল। নানচাকু আর সাধারণ চাকুর পার্থক্য সে কপালে হাত বুলিয়ে বুঝতে পারল, আমরা দূর থেকেও তা অনুধাবন করলাম। 

নানচাকু হাতে ব্রুস লি

তবে, ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ দেখে ফেলুদাও যে ক্যারাটে চর্চা করছে সেই গল্প পড়ে বাবলা আর থাকতে পারল না। ঠিক হল আমাদের উঠোনেই ক্যারাটে প্র্যাকটিস হবে। কাপড় শুকোতে দেওয়ার জন্য যে তার টাঙানো আছে এই দেওয়াল থেকে ওই দেওয়াল, সেখানে একটা পা তুলে ঠেকাতে হবে। অন্য পা উঠোনের পারপেন্ডিকুলার। প্রথম দু’বার বাবলার পা কোমরের ওপরেই উঠল না। তৃতীয়বার মুখ দিয়ে ‘পুউউউউ’ করে অদ্ভুত আওয়াজ বের করে যেই তুলেছে, ফ্যাঁসসসস। চিচিং ফাঁক। খিলখিল হাসি শুনে ওপরে তাকিয়ে দেখি বাড়িওয়ালার মেয়ে বারান্দা থেকে দৌড়ে ঘরে ঢুকছে। সে যে এতক্ষণ আমাদের কার্যকলাপে নজর রাখছিল সেটা বুঝতে পারিনি। যেমন সে বুঝতে পারেনি যে তাকে প্রোটেকশন দেওয়া আমাদের এই ঘাম ঝরানোর অন্যতম উদ্দেশ্য। পা বেশি তোলা যাবে না বুঝতে পেরে আমরা হাতের ওপর নজর দিলাম। এ-পাড়া ও-পাড়া থেকে খবর আসছে ক্যারাটে বিশারদরা হাত দিয়ে খানচারেক ইট ভেঙে দিচ্ছে, কিন্তু হাতে একটা দাগও পড়ছে না। এক ব্যায়ামবীর দাদাকে ধরা গেল। তিনি এতদিন মনোহর আইচ-কে অনুসরণ করে মাসল বানিয়েছেন। সেগুলো জামার ফাঁক দিয়ে ফেটে বেরচ্ছে। হাত ফাঁক করে রাস্তায় হাঁটতে হচ্ছে, না হলে মাসলের ঘষা লেগে বগলে ফোস্কা পড়ে যাবে। উনি এতদিন আমাদের পাত্তা দিতেন না, কিন্তু ইদানীং একটু মনমরা। কারণ ওই ব্রুস লি। ছিপছিপে পেটানো চেহারা এখন ইন-থিং। মাসল যখন দরকার তখন চাপ দিয়ে বডি ফুলিয়ে বানিয়ে নেব। উনি কিছুতেই আইচ থেকে লি হতে পারছেন না। তাই দুঃখ। তা আমাদের বিনা পয়সায় জ্ঞান দিলেন। ইটভাটার সঙ্গে ইটভাঙার পার্থক্য বোঝালেন। বললেন, নাকলস অর্থাৎ আঙুলের গাঁট শক্ত করতে হবে। যেমন শোনা তেমন কাজ। দমাদ্দম দেওয়ালে চালালাম কয়েকটা পাঞ্চ। ওরে বাবা, ভাঙেনি এই ভাগ্য। বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানোর বদলে আমরা গাঁট ফুলিয়ে বাজারে ছুটলাম। বরফের চাঁই থেকে কয়েক পিস ভেঙে নিয়ে হাত ঠান্ডা করি। আমরা বুঝলাম, ব্রুস লি হতে পারব না। বাপি ওর দেওয়াল থেকে ছবিগুলো নামিয়ে দিল। ভাবছি কবে এই আপদ আমাদের মন থেকে বিদায় হবে। আসলে কিন্তু যা ঘটছে সবই তাঁর চিরবিদায়ের পর। পাড়ার রকে একদিন ছোকরাদের তুমুল তর্ক, ব্রুস লি মারা গেছিলেন কীভাবে! কেউ বলছে, ড্রাগ ওভারডোজ, কারওর থিওরি কোনও একটা গ্যাং বিষ খাইয়ে মেরেছে। যাদের কাছে ব্রুস লি ভগবান, তারা বলল, ওপরওয়ালা প্রকৃত প্রতিভাধরদের একটু আগেই টেনে নেন। তা বলে বত্রিশ-তেত্রিশে? রকে পা মুড়ে বসে সিগারেটের ধোঁয়ায় কয়েকটা রিং ছেড়ে রবিদা বললেন, ওকে সিআইএ মেরেছে। সবাই চুপ করে গেল। রবিদা সব জানেন। ওঁর কোনও এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় আমেরিকায় থাকেন। 

আমরা সবাই ব্রুস লি হতে চেয়েছিলাম

কালের নিয়মে একসময় ব্রুস লি একটু ফিকে হয়ে গেলেন। ক্যারাটে তাঁর নামের সমার্থক শব্দে পরিণত হল। জাদুঘরের সামনের ফুটপাথে তাঁর পোস্টারগুলো একদিন আর দেখতে পেলাম না। অথচ আবার তিনি ফিরে এলেন আমার জীবনে ওই কলেজ ফেস্টের ক্যাও ক্যুইজে। আর তারও এক দশক বাদে তাঁর অমোঘ অস্ত্র নিয়ে চন্দ্রবিন্দুর গানে, ‘কালচার কাকু দিনে নানচাকু, রাত্রে কর্মখালি’। আমার এবং আগে-পরে গোটা তিনেক জেনারেশনের কাছে ব্রুস লি প্রকৃত অর্থেই ‘ডেডলি’। তাঁর আদর্শ শিরোধার্য করে এখনকার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা যদি নিয়মিত নানচাকু ঘোরানো প্র্যাকটিস করতেন, তাহলে নিদেনপক্ষে ডিমের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারতেন– এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।