Robbar

রক্তমাংসের গৌরাঙ্গদর্শন

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 22, 2026 6:16 pm
  • Updated:June 23, 2026 7:35 pm  
Nilanjan Halder: Umesh chandra saw chaitanya as an social activist | Robbar

শ্রীচৈতন্যের এক বিশাল, বহুমাত্রিক রূপ– যিনি একাধারে তার্কিক পণ্ডিত, আবার পরম বিনয়ী ভক্ত; যিনি একাধারে রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী নেতা, আবার প্রেমের বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়া এক সন্ন্যাসী– উমেশচন্দ্র বটব্যালের মতো একজন প্রত্যক্ষবাদী হয়তো তাঁকে পুরোপুরি ধরতে পারেননি। উমেশচন্দ্র কেবল তাঁর যুক্তি আর বিশ্লেষণের আতশকাচ দিয়ে মানুষটির বাহ্যিক রূপটিকে দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি সেই বীজের ফাটা খোলসটাকেই চরম সত্য বলে মেনে নিলেন, কিন্তু মহীরুহের অসীম ছায়াটাকে তিনি অস্বীকার করলেন।

প্রচ্ছদের ছবি: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

নীলাঞ্জন হালদার

‘মেরে করণ অর্জুন আয়েঙ্গে’ ডায়লগের সাথে আমরা পরিচিত। নিপীড়িত দুর্গা সিং ওরফে রাখী গুলজারের বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে করণ-অর্জুন-এর পুনর্জন্ম হয়। কারণ অপর আরেকটি সিনেমায় শাহরুখ খান তো বলেই গিয়েছেন, ‘কেহতে হ্যায় কি অগর কিসি চিজকো দিল সে চাহো, তো পুরি কায়নাত উসে তুমসে মিলানে কি কোশিশ মে লগ যা তি হ্যায়’!

এবার একটু সিরিয়াস কথায় আসা যাক। নিমাইয়ের জন্মের পূর্বের বাংলায় ইসলামি শাসনের কারণে সনাতনী ধর্মাচরণ নানারকম সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল, সেকথা আমরা জানি। জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের নদীয়া খণ্ডের যবন উপদ্রব অংশে লেখক জানাচ্ছেন, ‘ব্রাহ্মণ ধরিয়া রাজা জাতি প্রাণ লয়’। বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবতে দেখতে পাই, এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ‘শুনিয়া অদ্বৈত ক্রোধে অগ্নি হেন জ্বলে’ এবং আশ্বাস দেন, ‘শুন শ্রীনিবাস গঙ্গাদাস শুক্লাম্বর/ করাইব কৃষ্ণ সর্ব নয়ন-গোচর।।’ অর্থাৎ ওহে শ্রীনিবাস গঙ্গাদাস শুক্লাম্বর প্রভৃতি গাঁওবালো, মেরে করণ অর্জুন আয়েঙ্গে। কারণ যুগে যুগে দেবতা নেমে আসেন, তাঁকে আসতেই হবে অন পাবলিক ডিম্যান্ড– যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।/ অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্! 

এবার এই দেবতা তো রজনীকান্ত স্টাইলে আকাশ বা পাতাল ফুঁড়ে এসে উপস্থিত হন না, তিনি মানুষের মধ্যে থেকেই আসেন। মনুষ্য-অবতার! নরোত্তম। ঠিক যেমন প্রচণ্ড গুমোটের অসহ্য ঘামের মধ্যে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়া বৃষ্টির আসা মনে করতে থাকি, ছোটবেলায় পড়া ভূগোল এবং বিজ্ঞান মাথায় রেখেই। তেমনই সোশাল সাইকোলজির পাঠকও জানেন চৈতন্যদেব ঠিক কতটা দেবতা আর কতটা একজন ‘লড়াকু যোদ্ধা’, একজন অ্যাক্টিভিস্ট, একজণ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মী। 

ঠিক এই জায়গাটিতেই উনিশ শতকের এক প্রখর যুক্তিবাদী পণ্ডিত এবং গবেষক, উমেশচন্দ্র বটব্যাল, তাঁর তীক্ষ্ণ লেখনী ধারণ করেছিলেন। তিনি ফরাসি দার্শনিক অগাস্ত কোঁতের ‘প্রত্যক্ষবাদ’ (Positivism) এবং প্রাচীন ভারতের ‘সাংখ্য দর্শন’-এর শানিত যুক্তি দিয়ে ভক্তিবাদের বিনির্মাণ শুরু করেন। তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল, শত শত বছরের ভক্তির কুয়াশা সরিয়ে শ্রীচৈতন্যের রক্তমাংসের, মানবিক এবং লড়াকু সত্তাটিকে ইতিহাসের কষ্টিপাথরে যাচাই করা।

নন্দলাল বসুর আঁকা শ্রীচৈতন্য

উমেশচন্দ্র তাঁর গবেষণায় স্পষ্টতই অবতারবাদকে খারিজ করে দেন। অবতার যে স্বর্গ থেকে নেমে আসেন না, বরং হতাশ এবং অবদমিত সমাজের মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজনে তৈরি হন– তা বোঝাতে তিনি তৎকালীন তমলুকের জলামুঠা পরগণার ‘মাণিককালী’ নামক এক কুম্ভকারের চমকপ্রদ উদাহরণ টানেন। এই কদাকার, কৃষ্ণবর্ণ কুম্ভকার হঠাৎ করে নিজেকে ‘কল্কি অবতার’ বলে প্রচার করতে শুরু করেছিল, এবং আশ্চর্যের বিষয় হল, তৎকালীন সমাজের অন্তত দুই-তিন হাজার মানুষ তাকে সত্যিই ভগবান বলে মেনে নিয়েছিল। উমেশচন্দ্র এই উদাহরণটি দিয়ে প্রমাণ করতে চাইলেন যে, যখন কোনও সমাজ চরম হতাশা, দুর্দশা আর আত্মগ্লানির মধ্যে থাকে, তখন তারা নিজেদের মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য যে কোনও ব্যতিক্রমী আচরণের মানুষকে অবতার হিসেবে লুফে নেয়। উমেশচন্দ্রের চোখে শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যও ছিলেন পঞ্চদশ শতাব্দীর সেই অবক্ষয়িত, হতাশাগ্রস্ত হিন্দু সমাজের তেমনই এক মনস্তাত্ত্বিক সৃষ্টি।

এই সমাজতাত্ত্বিক কাঠামোটি দাঁড় করানোর পর উমেশচন্দ্র তাঁর নিজস্ব জীবনী-রীতি গড়ে তোলার জন্য এক অদ্ভুত কৌশল অবলম্বন করলেন। তিনি চৈতন্য-জীবনীকারদের সেই ‘পরিপূরকতা’-র শৃঙ্খলটাকে স্রেফ এক কোপে ভেঙে দিলেন। তিনি খুব সচেতনভাবেই কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থটিকে, অর্থাৎ চৈতন্যদেবের জীবনের শেষ চব্বিশ বছরের সেই সুগভীর দার্শনিক এবং বৌদ্ধিক পর্যায়টিকে প্রায় সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেলেন। কেন এড়িয়ে গেলেন? কারণ সন্ন্যাস-পরবর্তী চৈতন্যদেবের যে প্রশান্তি, যে প্রজ্ঞা এবং সমাজ-সংগঠনের যে বিপুল ক্ষমতা, তা উমেশচন্দ্রের অবতার-খণ্ডনের থিওরির সঙ্গে ঠিক খাপ খাচ্ছিল না। একজন মানুষ, যিনি গোটা পূর্ব ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রটা বদলে দিচ্ছেন, যাঁকে দেখে প্রতাপরুদ্রের মতো পরাক্রমশালী সম্রাট মাথা নত করছেন, তাঁকে নিছক সামাজিক হতাশার সৃষ্টি বা ‘মাণিককালী’ কুমোরের সমগোত্রীয় বলে প্রমাণ করাটা সহজ ছিল না।

তাই উমেশচন্দ্র তাঁর আতশকাচটি কেবল তাক করে রাখলেন বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবত’-এর ওপর, অর্থাৎ চৈতন্যদেবের জীবনের প্রথম ২৪ বছরের ওপর। উমেশচন্দ্র বুঝতে পেরেছিলেন যে, অলৌকিকতার পর্দাটা সরিয়ে নিলে এই নবদ্বীপ লীলার ভেতরেই লুকিয়ে আছে একজন সাধারণ, অভাবী এবং রক্তমাংসের তরুণের আসল গল্প। তিনি বৃন্দাবন দাসের লেখা থেকে কেবল সেই তথ্যগুলোই ছেঁকে নিলেন, যা তাঁর বস্তুবাদী তত্ত্বকে সমর্থন করে।

বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের পর থেকে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের রাজত্বকাল পর্যন্ত বাংলার হিন্দুসমাজ এক ভয়াবহ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শূন্যতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। একদিকে ইসলামি শাসকদের আস্ফালন, অন্যদিকে স্মার্ত রঘুনন্দনের রচিত অষ্টাবিংশতি তত্ত্বের মতো কঠোর ব্রাহ্মণ্য অনুশাসন এবং জাতপাতের নিষ্পেষণ– এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে সনাতন সমাজ কার্যত মুমূর্ষু হয়ে পড়েছিল। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে নবদ্বীপের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম নেওয়া নিমাই পণ্ডিত, উমেশচন্দ্রের চোখে কোনও অবতার ছিলেন না; তিনি ছিলেন সেই পচনশীল সমাজব্যবস্থাকে ভেতর থেকে আঘাত করতে আসা একজন প্রখর মেধাবী, লড়াকু এবং পুরুষশ্রেষ্ঠ সমাজ-সংস্কারক।

বাংলার ছাপাই ছবিতে গৌরাঙ্গ

উমেশচন্দ্র দেখিয়েছেন যে, নিমাইয়ের বাল্যকালের চপলতা বা ঔদ্ধত্য কোনও ঐশ্বরিক ‘বিদ্যা-বিলাস’ ছিল না। পিতা জগন্নাথ মিশ্রের অকালমৃত্যু এবং সংসারের নিদারুণ দারিদ্র নিমাইকে বাধ্য করেছিল খুব অল্প বয়সেই মুকুন্দ সঞ্জয়ের চণ্ডীমণ্ডপে ‘কলাপ ব্যাকরণ’-এর টোল খুলতে। সমাজ ও সমকালীন পণ্ডিতদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য তিনি যে বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণ (Intellectual Bullying) শানিয়েছিলেন, তা ছিল মূলত নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক আদিম, মানবিক লড়াই। দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত কেশব কাশ্মীরীর গঙ্গা-বন্দনা শ্লোকে ‘অবিমৃষ্টবিধেয়াংশ’ দোষ (অর্থাৎ অনুবাদ এবং বিধেয়ের ভুল ক্রম) ধরিয়ে দেওয়াটা কোনও ঐশ্বরিক ঘটনা ছিল না, তা ছিল একজন শ্রুতিধর তরুণের অসামান্য মেধা ও পাণ্ডিত্যের প্রমাণ মাত্র।

এই তার্কিক, দাম্ভিক নিমাই পণ্ডিত থেকে কী করে জন্ম নিলেন প্রেমোন্মত্ত, বিনয়ী মহাপ্রভু? উমেশচন্দ্র এই রূপান্তরটিকেও কোনও ঐশ্বরিক লীলা বলে মানতে নারাজ। তিনি এটিকে দেখেছেন এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া বা স্নায়বিক বৈকল্য হিসেবে, যাকে তিনি ‘বায়ুরোগ’ আখ্যা দিয়েছেন। গয়া থেকে পিতৃশ্রাদ্ধ সেরে ফেরার পর নিমাইয়ের আচরণে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তন দেখা যায়, উমেশচন্দ্র তাকে অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং শোকের ফল হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছেন। পিতা ও জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার বিচ্ছেদ, সংসারের নিদারুণ অভাব, এবং সমকালীন সমাজের অবক্ষয়– সব মিলিয়ে নিমাইয়ের সংবেদনশীল মনের ওপর যে প্রবল চাপ পড়েছিল, তা থেকেই হয়তো এই মানসিক অস্থিরতার জন্ম। কিন্তু আধুনিক গবেষকরা, এমনকী সেকালের অনেক মুক্তমনা চিন্তাবিদও মনে করেন, উমেশচন্দ্রের এই ‘বায়ুরোগ’ তত্ত্বটি অত্যন্ত একপেশে। নিমাইয়ের এই উন্মাদনার পেছনে হয়তো লুকিয়ে ছিল এক গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি, এক অসীম প্রেমের তৃষ্ণা, যা সমাজ ও ধর্মের প্রচলিত সীমানাকে ভেঙে ফেলতে চেয়েছিল।

চৈতন্য কীর্তন, শিল্পী: ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার

উমেশচন্দ্র বটব্যালের গবেষণার সূত্র ধরে হাঁটলে শ্রীচৈতন্যকে একজন ‘কালচারাল অ্যাক্টিভিস্ট’ বা সনাতনী সংস্কৃতির আন্দোলনকর্মী হিসেবেই আবিষ্কার করা যায়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নব্য-ন্যায়ের কূটতর্ক বা তান্ত্রিকদের বামাচার দিয়ে হিন্দু সমাজকে রক্ষা করা যাবে না। তাই তিনি ভক্তি ও প্রেমকে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত ‘নগর সংকীর্তন’ নিছক খোল-করতাল বাজিয়ে কান্নাকাটি করা ছিল না; বরং ছিল বর্ণ ও জাতপাত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষকে সংঘবদ্ধ করে কাজীর আদেশের বিরুদ্ধে এক অহিংস অথচ সুসংগঠিত গণ-অভ্যুত্থান। তিনি সনাতন ধর্মের সেই উদার রূপটিকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন, যেখানে চণ্ডাল এবং ব্রাহ্মণের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ থাকবে না।

এই নগর সংকীর্তন ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক অভূতপূর্ব সামাজিক প্রতিরোধ। নবদ্বীপের কাজীর নির্দেশে যখন কীর্তন নিষিদ্ধ হল, তখন নিমাই পণ্ডিত ঘরে বসে থাকেননি। তিনি হাজার হাজার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, মশাল জ্বালিয়ে কাজীর বাড়ির দিকে পদযাত্রা করেছিলেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল একজন আবেগসর্বস্ব ভক্ত ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ সংগঠক এবং নির্ভীক নেতা। তিনি জানতেন, কীভাবে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে, তাদের বঞ্চনাকে একটি সংগঠিত শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হয়। এই নগর সংকীর্তন ছিল তৎকালীন ব্রাহ্মণ্যবাদের জাতপাতের দেওয়াল ভাঙার এবং একইসঙ্গে ইসলামি শাসকের অন্যায্য আদেশের বিরুদ্ধে এক জোরালো চপেটাঘাত।

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা শ্রী চৈতন্যের নগর-সংকীর্তন

শ্রীচৈতন্যের এই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তাঁর ‘পরম বিনয়’। ‘তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা/ অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ’– এই মন্ত্রটি কেবল একটি আধ্যাত্মিক স্তবগান ছিল না, এটি ছিল এক চরম সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব। যে সমাজে মানুষের অহংকার জন্ম নিত তার জন্ম, জাত, রূপ, ধন বা পাণ্ডিত্য থেকে, সেখানে শ্রীচৈতন্য ঘোষণা করলেন যে, ঈশ্বরের দরবারে এই সব অহংকার তুচ্ছ। তিনি চণ্ডালের পদধূলি মাথায় নিয়ে প্রমাণ করলেন যে, ভক্তি এবং প্রেমের কাছে কোনও সামাজিক ভেদাভেদ টেকে না। উমেশচন্দ্র হয়তো এই বিনয়কে ‘পলায়নবাদ’ বা দুর্বলতা হিসেবে দেখেছিলেন, কিন্তু ইতিহাসের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায়, এই বিনয়ই ছিল শ্রীচৈতন্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার। অহংকারকে অহংকার দিয়ে ভাঙা যায় না, তাকে ভাঙতে হয় পরম বিনয় দিয়ে। শ্রীচৈতন্য ঠিক সেই কাজটিই করেছিলেন।

সন্ন্যাস গ্রহণের পর শ্রীচৈতন্যের নীলাচল বা পুরী যাত্রাও তাঁর এই লড়াকু মানসিকতারই আরেক প্রমাণ। ১৫১০ খ্রিস্টাব্দের সেই সময়ে বাংলা, ওড়িশা এবং বিজয়নগর– এই তিন বৃহৎ শক্তির মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক এবং সামরিক সংঘাত চলছিল। এই যুদ্ধবিধ্বস্ত, বিপদসংকুল পথ দিয়ে শ্রীচৈতন্য কোনও রক্ষীবাহিনী ছাড়াই, কেবল তাঁর ভক্তি আর প্রেমের জোরে হেঁটে গিয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, প্রকৃত সাহস তরবারিতে থাকে না, থাকে অন্তরের দৃঢ়তায়। পুরীতে গিয়ে তিনি পরাক্রমশালী গজপতি প্রতাপরুদ্র দেবকে যেভাবে ভক্তির বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন, তা কোনও সাধারণ সন্ন্যাসীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে ওড়িশা, আসাম এবং সুদূর মণিপুর পর্যন্ত তাঁর এই প্রেমধর্মের প্লাবন বইয়ে দিয়েছিলেন।

যামিনী রায়ের ছবিতে গীতবাদ্য সহযোগে চৈতন্যের নৃত্য

এই যে শ্রীচৈতন্যের এক বিশাল, বহুমাত্রিক রূপ– যিনি একাধারে তার্কিক পণ্ডিত, আবার পরম বিনয়ী ভক্ত; যিনি একাধারে রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী নেতা, আবার প্রেমের বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়া এক সন্ন্যাসী– উমেশচন্দ্র বটব্যালের মতো একজন প্রত্যক্ষবাদী হয়তো তাঁকে পুরোপুরি ধরতে পারেননি। উমেশচন্দ্র কেবল তাঁর যুক্তি আর বিশ্লেষণের আতশকাচ দিয়ে মানুষটির বাহ্যিক রূপটিকে দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি সেই বীজের ফাটা খোলসটাকেই চরম সত্য বলে মেনে নিলেন, কিন্তু মহীরুহের অসীম ছায়াটাকে তিনি অস্বীকার করলেন। তিনি চৈতন্যদেবের জীবনের প্রথমার্ধের মানবিক দুর্বলতা এবং জাগতিক টানাপোড়েনগুলোকে এত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করলেন যে, সেই মানুষটি যে পরবর্তীকালে ভক্তি-আন্দোলনের এক অপ্রতিরোধ্য সামাজিক সুনামি তৈরি করতে পারেন, তা উমেশচন্দ্রের নিজস্ব লজিকের ফ্রেমে আর ধরল না। তিনি কেবল মানুষটার তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াটা দেখলেন, কিন্তু মানুষটার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশটাকে তাঁর যুক্তির আওতার বাইরে রেখে দিলেন।

তবুও উমেশচন্দ্র বটব্যালের এই খণ্ডিত দৃষ্টিকে আমরা বাংলা জীবনী সাহিত্যের ইতিহাসে এক নেতিবাচক উপাদান বলে কিছুতেই উড়িয়ে দিতে পারি না। বরং উল্টোটাই সত্যি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুরারি গুপ্ত, বৃন্দাবন দাস বা কৃষ্ণদাস কবিরাজের মতো ভক্তেরা চৈতন্যদেবকে এমন এক অলৌকিকতার স্বর্গে তুলে রেখেছিলেন যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তাঁকে ছোঁওয়া বা তাঁর মানবিক লড়াইটাকে বোঝা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উমেশচন্দ্র বটব্যালই প্রথম সেই অলৌকিকতার শিকল ছিঁড়েছিলেন। তিনি যদি এই ‘খণ্ডিত’ কিন্তু চরম রূঢ় বস্তুবাদী দৃষ্টিটা না ফেলতেন, তবে আমরা হয়তো কোনওদিনই জানতে পারতাম না যে, দেবতার ওই সোনার সিংহাসনের নিচে লুকিয়ে আছে এক অভাবী ব্রাহ্মণের ছেলের না-খেতে-পাওয়া যন্ত্রণা আর নিজেকে প্রমাণ করার এক অমানুষিক জেদ। ভক্ত জীবনীকাররা আমাদের দিয়েছিলেন একজন পরিপূর্ণ, ত্রুটিহীন ‘মহাপ্রভু’-কে। আর উমেশচন্দ্র, তাঁর সমস্ত সীমাবদ্ধতা এবং একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও, আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন একজন লড়াই-করতে-জানা, ধুলোমাখা ‘মানুষ’-কে।

ধুলোমাখা ‘মানুষ’, শিল্পী: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজকের এই একুশ শতকে দাঁড়িয়ে, প্রয়োজন অলৌকিক দেবতার খোলস ছাড়িয়ে সেই অকুতোভয় সমাজ-সংস্কারককে চিনে নেওয়া, যিনি সমস্ত ভেদাভেদ মুছে সমাজকে এক সুতোয় বাঁধতে চেয়েছিলেন। আমাদের বুঝতে হবে যে, শ্রীচৈতন্য কেবল কোনও মন্দিরের বিগ্রহ নন, তিনি হলেন এক জীবন্ত ঐতিহাসিক সত্তা, যাঁর লড়াই, যাঁর প্রেম, যাঁর বিনয় আজও আমাদের পথ দেখাতে পারে। আর এই সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চার জন্য উমেশচন্দ্র বটব্যালের মতো এক আপসহীন, বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরও আমাদের কাছে সমানভাবে অপরিহার্য। ইতিহাস যেন আর কোনও শ্রীচৈতন্যকে মিথের আড়ালে হারিয়ে যেতে না দেয়– আজকের দিনে সেটাই হোক সবচেয়ে বড় বৌদ্ধিক লড়াই।