


ব্রিটিশ সরকারের চোখ এড়িয়ে জাপান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের প্রস্তুতি হিসেবে সুভাষচন্দ্রকে যিনি সাহায্য করেছিলেন, তিনি আনন্দমোহন সহায়, পূর্ব এশিয়ায় রাসবিহারী বসুর নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগের অন্যতম নেতা। এই গোপন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাঁর স্ত্রী সতী (সেন), যিনি ছিলেন বাংলার মেয়ে। সুভাষচন্দ্রের এই গোপন পরিকল্পনার কাহিনি জানতে পেরেছিলাম স্বয়ং আনন্দমোহন সহায়ের কাছ থেকে!
প্রচ্ছদে ব্যবহৃত প্রতিকৃতি: অতুল বসু
৯০ দিনের এক দুঃসাহসিক ও নজিরবিহীন সাবমেরিন যাত্রায় জার্মানি থেকে মালয় হয়ে জাপানে এসে পৌঁছন সুভাষচন্দ্র বসু। সেটা ছিল ১৯৪৩ সালের মে মাস। এরপর তাঁর প্রায় দেড় দু’মাস তাঁর কেটে গিয়েছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাপানের সহযোগিতার জন্য আলোচনা সম্পন্ন করে, পূর্ব এশিয়ায় ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ ও আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্বভার গ্রহণ করতে। যদিও অন্তত তিন বছর আগে থেকেই সুভাষচন্দ্র জাপানে আসার ব্যাপারে পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন।

১৯৪১ সালে গোপনে ভারতত্যাগের আগেও সুভাষচন্দ্র, ভারতের স্বাধীনতার স্বপক্ষে সমর্থন অর্জনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তিনের দশকে ভারত থেকে নির্বাসিত সুভাষচন্দ্র যখন পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সফর করছিলেন, তখন ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য জার্মানি ও ইতালি ছাড়াও পোল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি প্রভৃতি দেশের একাধিক নেতা ও রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। ১৯৩৮ সালে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার আগেও ব্রিটেন সফরের সময় সুভাষচন্দ্র গোপনে সাক্ষাৎ করেছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আইরিশ রাষ্ট্রনায়ক ডি’ ভ্যালেরার সঙ্গে। এছাড়াও কলকাতার চিনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করেন সুভাষচন্দ্র। প্রয়োজনে চিনে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে পারেন কি না, সেই খোঁজ খবরও করেছিলেন তিনি। সে-সময় সুভাষচন্দ্র চিন সফরের জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে পাসপোর্টের আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু সুভাষচন্দ্রকে তাঁর বৈদেশিক সংযোগের সন্দেহে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাঁকে সেই অনুমতি দেয়নি। কিন্তু এই দেশগুলি ছাড়াও যে আরেকটি শক্তিশালী দেশের সঙ্গে সুভাষচন্দ্র বহুদিন সংযোগ-স্থাপনের চেষ্টা করেছেন, সে-কাহিনি এক প্রকার অকথিতই থেকে গিয়েছে, সেই রাষ্ট্র– জাপান।

ব্রিটিশ সরকারের চোখ এড়িয়ে জাপান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের প্রস্তুতি হিসেবে সুভাষচন্দ্রকে যিনি সাহায্য করেছিলেন, তিনি আনন্দমোহন সহায়, পূর্ব এশিয়ায় রাসবিহারী বসুর নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগের অন্যতম নেতা। এই গোপন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাঁর স্ত্রী সতী (সেন), যিনি ছিলেন বাংলার মেয়ে। সুভাষচন্দ্রের এই গোপন পরিকল্পনার কাহিনি জানতে পেরেছিলাম স্বয়ং আনন্দমোহন সহায়ের কাছ থেকে!

বিহারের ভাগলপুরের সন্তান আনন্দমোহন তরুণ বয়সেই ডাক্তারি পড়া ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন অসহযোগ আন্দোলনে। ১৯২২ সালে গয়া কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। আনন্দমোহনের স্ত্রী সতীর বাবা অনন্তনারায়ণ সেন ছিলেন শান্তিনিকেতনের বাসিন্দা। তাঁর প্রথম স্ত্রী (অর্থাৎ, সতীর মা) সোফিয়া নীরজার মৃত্যুর পর তাঁর বিয়ে হয় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের বোন উর্মিলা দেবীর সঙ্গে। অনন্তনারায়ণের মৃত্যুর পর বিশের দশকে উর্মিলা দেবী কলকাতায় রাজনীতিতে যোগদান করেন ও কংগ্রেসের অন্যতম নেত্রী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। যেহেতু তাঁর নিজের কোনও সন্তান ছিল না, সতী ও আনন্দমোহনই তাঁর কন্যা-জামাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯২৭ সালে সতীর সঙ্গে তাঁর বিয়ের পর সে-বছরই তিনি জাপানে গিয়ে কোবেতে বসবাস শুরু করেন। পূর্ব এশিয়ায় ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের শাখা স্থাপন করে স্বাধীনতার দাবি প্রচারের যে উদ্যোগ তখন চলছিল, আনন্দমোহনও তাতে যোগ দেন।

চারের দশকে সেখানে যখন ভারত থেকে স্বেচ্ছানির্বাসিত বিপ্লবী রাসবিহারী বসু ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ গড়ে তোলেন, সেই পরিকল্পনায় আনন্দমোহনও ক্রমশ জড়িয়ে পড়েন ও কালক্রমে একজন জনপ্রিয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এসব কাজের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সংযোগ রেখেছেন ভারতের কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গেও, এমনকী শ্রীনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের পল্লি-উন্নয়ন কর্মসূচিতেও নানাভাবে সহায়তা করেছেন। এই বর্ণময় জীবনে আনন্দমোহন বহু প্রবাদপ্রতিম মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন, রাসবিহারী বসু বা নেতাজি সুভাষ ছাড়াও ভিয়েতনামের নেতা হো চি মিন, প্রবাসী ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামী রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

১৯৪৩ সালে জার্মানি থেকে পূর্ব এশিয়ায় এসে নেতাজি যখন আজাদ হিন্দ আন্দোলনের দায়িত্বভার তুলে নিলেন, তখন তিনি ছিলেন তাঁর বিশিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য এক সহচর। আজাদ হিন্দ সরকারের সচিব হিসেবে আনন্দমোহন মন্ত্রীর সমমর্যাদা লাভ করেছিলেন। স্বাধীনতার পরেও নিজের কূটনৈতিক দক্ষতা ও ব্যাপক অভিজ্ঞতার সুবাদে, বহু বছর ভারত সরকারের রাষ্ট্রদূত হিসেবে ক্যারিবিয়ান ও পূর্ব এশীয় দেশে কাজ করেছেন আনন্দমোহন।

ছয়ের দশকে যখন ভাগলপুরে জীবনের শেষ দিনগুলি কাটাচ্ছিলেন, তখন আকস্মিকভাবে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়। আজাদ হিন্দ আন্দোলনের বিভিন্ন তথ্য সম্পর্কে আমার নানা জিজ্ঞাসা নিয়ে আমি তাঁকে প্রথম চিঠি লিখি। আমি ভাগ্যবান যে, এই নবতিপ্রায় মহানুভব মানুষটি তাঁর লেটারহেডে স্বহস্তে টাইপ করে ও কলম দিয়ে স্থানে স্থানে সংশোধন করে আমার প্রতিটি প্রশ্নের যথাসাধ্য উত্তর দেন।
আমার প্রশ্নের জবাবে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘এ-কথা ঠিক যে, আমি ১৯৩০ সাল থেকে নেতাজির খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম এবং ১৯৪০ সালে তিনি যখন ভারত থেকে নিষ্ক্রমণের পরিকল্পনা করেন, তখন তাঁর সহায়তা করার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমাদের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি যাতে পূর্ব এশিয়ায় উপস্থিত হতে পারেন, সে প্রচেষ্টায়ও আমার কিছুটা হাত ছিল, যদিও জাপানি কর্তৃপক্ষের মূর্খামির জন্য ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত এ-কাজ পিছিয়ে যায়।’ (১৩.৫. ১৯৮৭ তারিখের চিঠি)

এরপর আমি এ-ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে পরের চিঠিতে (২৬.৮.১৯৮৭) তিনি যা লেখেন, এখানে তার কিছুটা অনুবাদের মাধ্যমে উপস্থিত করছি:
‘ভারত থেকে নেতাজির নিষ্ক্রমণ– এতে আমরা কিছু ভূমিকা নিয়েছিলাম। প্রকৃতপক্ষে আমার স্ত্রী এই ভূমিকাটি পালন করেছিলেন। কিন্তু এই নিষ্ক্রমণের পরিকল্পনায় আমরা কোনও অংশগ্রহণ করিনি। এ-ব্যাপারে নেতাজির ভ্ৰাতুষ্পুত্র শিশির বসু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।… আমার দিক থেকে আমি শুধু জাপানের প্রস্তুতি এবং প্রচেষ্টা সম্পর্কে এবং যুদ্ধ ঘোষণা করতে জাপান কতটা তৈরি, সে-ব্যাপারে নেতাজিকে অবহিত রাখতাম। এ-ব্যাপারে আমার স্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং আমরা এ-ব্যাপারে একটি নাটক খাড়া করার পরিকল্পনা করি।’

এই ‘নাটক’টি কী ছিল? সে-সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে গিয়ে সহায়জি লেখেন যে, তাঁর স্ত্রীকে ভারতে পাঠানো হয়, যাতে তিনি সুভাষচন্দ্রকে গোপনে এই ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে পারেন। এবং যেহেতু জাপানে এবং ভারতে তাঁর গতিবিধির ওপর ব্রিটিশরা নজর রাখত, সেহেতু তাঁকে এমনভাবে কাজ করতে হয়েছিল, যাতে সুভাষচন্দ্রকে সংবাদ দেবার উদ্দেশ্যে তাঁর স্ত্রীর ভারতে যাওয়া নিয়ে কোনও সন্দেহের উদ্রেক না-হয়। সহায়জির নিজের ভাষায় এই নাটকটি ছিল এরকম:
“আমি জানিয়ে দিলাম যে, আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমার গুরুতর মতভেদ দেখা দিয়েছে। তাই আমরা পরস্পরের থেকে ‘বিচ্ছিন্ন’ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং তিনি তাই তাঁর মায়ের কাছে ফিরে যাচ্ছেন পাকাপাকিভাবে। এরপর তিনি আমাদের ছোট ছেলে ও তৃতীয় কন্যাকে নিয়ে আমাদের রেখে চলে যান এবং আমার সঙ্গে আমার বড় দুই মেয়ে থেকে যায়। কলকাতায় গিয়ে প্রথমে কিছুদিন তিনি তাঁর মায়ের সঙ্গে থাকেন। কিন্তু সেখানে থেকে নেতাজির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা কঠিন ব্যাপার ছিল, কারণ তাঁর মা উর্মিলা দেবী, একজন সুপরিচিত কংগ্রেস নেতা হওয়ায়, তাঁর এবং তাঁর বাড়ির ওপর পুলিশের নজরদারি চলত। সুতরাং, তিনি তাঁর মার সঙ্গে একটি (ভুয়ো) কলহ তৈরি করে সেখান থেকে একটি ভাড়াবাড়িতে উঠে যান এবং সেখান থেকে তিনি নেতাজির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং জাপান থেকে আমার পাঠানো বার্তা নেতাজির কাছে পৌঁছে দিতে থাকেন।”

চিঠির পরবর্তী অংশে সহায়জি আমাকে জানান যে, এরপরে ভারত থেকে নিষ্ক্রমণের পর সুভাষচন্দ্র যখন কাবুলে গিয়ে পৌঁছন, তখন সেখানকার জাপানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে তিনি খবর পাঠান যে, তিনি জাপানে যেতে চান। কিন্তু জাপানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ সেই মুহূর্তে চাইছিল না যে, নেতাজি জাপানে আসুন এবং তারা যুদ্ধ ঘোষণা সম্পর্কে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করতে চাইছিল। এর ফলে নেতাজিকে রাশিয়ার দক্ষিণ অঞ্চল দিয়ে জার্মানির দিকে অগ্রসর হতে হয়েছিল। সবশেষে সহায়জি লিখেছিলেন, ‘আমি দুঃখিত যে এর বেশি তথ্য আপনাকে দিতে পারলাম না।’ (চিঠি শেষ করার তারিখ– ১৯.১১.১৯৮৭)
ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে নিষ্ক্রান্ত হয়ে সুভাষচন্দ্রের কাবুলে পৌঁছনো ও সেখানকার জার্মান ও ইতালীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে জার্মানির উদ্দেশ্যে যাত্রা পর্যন্ত তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিলেন যে-ভগতরাম তলোয়ার, তাঁর স্মৃতিকথাতে অবশ্য কাবুলে জাপানি দূতাবাসের সঙ্গে নেতাজির যোগাযোগের সহায়জি কথিত তথ্যের কোনও উল্লেখ নেই। এর দুটো কারণ থাকতে পারে।

প্রথমটি হচ্ছে, ভগতরাম এই তথ্যটি লিখতে ভুলে গিয়েছেন এবং দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হচ্ছে ভগতরামের অজ্ঞাতেই সুভাষচন্দ্র জাপানের দূতাবাসের সঙ্গে এই যোগাযোগ করেছিলেন। আমাদের এই দ্বিতীয় অনুমানটির কারণ, নেতাজি অনেক সময়ই তাঁর বিভিন্ন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রূপায়ণের একাধিক বিকল্প পথ ভেবে রাখতেন এবং কৌশলগত কারণে সব পরিকল্পনা সহকর্মীদের না-জানিয়ে, অন্য কারও ওপর তা সম্পন্ন করার দায়িত্ব দিতেন। ভারতের মুক্তিপ্রচেষ্টায় বিদেশি শক্তির সাহায্য নেওয়ার প্রশ্নেও সুভাষচন্দ্রের এই অভ্যাসটির নানা প্রমাণ মেলে বিভিন্ন ব্যক্তির বিবরণ থেকে।

জাপানের বিশ্বযুদ্ধে যোগদানের প্রস্তুতি সম্পর্কে তিনি যে গোপন সূত্রে সংবাদ সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন, সেটা যেমন আনন্দমোহন সহায়ের এই বিবরণ থেকে জানা যায়, তেমনি তিনি নিজেও যে অন্য সূত্রে জাপান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন, তার উল্লেখ আছে তাঁর ভাইপো দ্বিজেন্দ্রনাথ বসুর লেখাতে। ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক ‘অমৃত’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৩৮ সালে জাপানের বৈদেশিক দপ্তরের একজন উচ্চপদস্থ কূটনীতিক ওহাশি কলকাতায় এসেছিলেন। দ্বিজেন ও তাঁর দাদা ধীরেনের মাধ্যমে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর গোপন বৈঠক হয়েছিল কমিউনিস্ট আইনজীবী স্নেহাংশুকান্ত আচার্যের বাড়িতে।
দ্বিজেন বসু আরও জানিয়েছেন, সুভাষচন্দ্র ফরওয়ার্ড ব্লকের সাধারণ সচিব লালা শঙ্করলালকে ১৯৪০ সালে গোপনে জাপানে পাঠিয়েছিলেন, তাঁর হয়ে জাপানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ আলোচনার জন্য। কয়েক মাস পরে জাপান সুভাষচন্দ্রকে সবরকম সাহায্য করতে রাজি আছে, এই মর্মে সংবাদ নিয়ে তিনি যখন ফিরে আসেন, তখন সুভাষচন্দ্র গ্রেফতার হয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে আটক ছিলেন। দ্বিজেন লিখেছেন, তিনি তাঁকে এই খবর জেলের মধ্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তখন ওই জেলে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গেই বন্দি ছিলেন তাঁর সহকর্মী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী। তিনি লিখেছেন, ওই জেলে বসেই সুভাষচন্দ্র পরিকল্পনা করেছিলেন জেল থেকে মুক্তি পেলেই তিনি বিদেশি সাহায্যসন্ধানে প্রথমে সোভিয়েত রাশিয়ায় যাবেন এবং সে প্রচেষ্টা সফল না-হলে জার্মানির সাহায্যপ্রার্থী হবেন। এ-থেকে বোঝা যায়, সুভাষচন্দ্র কীভাবে একইসঙ্গে একাধিক পরিকল্পনা প্রস্তুত করে কাজে নামতেন।
যা-ই হোক, অনশন ধর্মঘট করে জেল থেকে প্যারোলে ছাড়া পাওয়ার পর গোপনে দেশত্যাগ করে সুভাষচন্দ্র যখন কাবুলে উপস্থিত হন, সে-ব্যাপারে জাপান যে ভালোভাবেই অবহিত ছিল, তার প্রমাণ কিন্তু ভগতরামের ওই বিবরণেই পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন যে, সুভাষচন্দ্রের কাবুলে সোভিয়েত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের বারবার ব্যর্থ চেষ্টায় কয়েকমাস কেটে যাওয়ার পরে জার্মানি, ইতালি ও জাপান– অক্ষশক্তিভুক্ত এই তিনটি দেশই সোভিয়েত রাশিয়াকে অনুরোধ জানিয়েছিল, সুভাষচন্দ্রকে তাদের দেশের মধ্য দিয়ে জার্মানি যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য।
আনন্দমোহন সহায় আমাকে যতটুকু জানিয়েছিলেন, তার পরবর্তী ইতিহাসের অনেকটাই আজ আমাদের জানা। সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর ব্রিটিশবিরোধী লড়াইয়ে কোনও সাহায্যের আশ্বাস না-পেয়ে অগত্যা তাঁকে নাৎসি জার্মানিতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। এরপর অচিরেই তিনি বার্লিনের জাপানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে জাপানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। অবশেষে সে-বছর (১৯৪১) ডিসেম্বরেই মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে জাপানের যুদ্ধঘোষণার খবর আসে। কিন্তু তখনও তাঁর জাপানে উপস্থিত হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। সেই সুযোগ আসে পরের বছর যখন ব্যাংককে পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়রা তাদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নেতাজিকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তাব গ্রহণ করে। রাসবিহারী বসুর পক্ষ থেকে নেতাজিকে সেই আমন্ত্রণ জানানো হল ১৯৪২ সালের আগস্টে। এরপর তাঁর সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের টেলিফোনে কথাবার্তা, পত্রবিনিময় ও জার্মান সরকারের সঙ্গে জাপানে যাওয়ার ব্যবস্থা ইত্যাদি পাকা করতে করতে সে-বছর কেটে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৩ সালের মাঝামাঝি অভূতপূর্ব ঝুঁকি নিয়ে সাবমেরিনে সমুদ্রের তলা দিয়ে অর্ধেক পৃথিবী পাড়ি দিয়ে নেতাজি জাপান পৌঁছন।

জার্মানিতে দু’বছর ও পূর্ব এশিয়ায় পরবর্তী দু’বছরে নেতাজির কার্যকলাপের দুই পর্বেই তিনি তাঁর জাপান-সংযোগকে ব্যবহার করেছিলেন ভারতে তাঁর পরিবারবর্গ ও সহকর্মীদের সঙ্গে সংবাদ আদান-প্রদানের কাজে। জার্মানির জাপানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে তিনি প্রথম তাঁর মেজদাদা শরৎ বসুকে যে-বার্তা পাঠান, সেটি নিয়ে কলকাতায় জাপানি কনসাল জেনারেল কাটসুমি ওকাজাকি শরৎচন্দ্রের রিষড়ার বাগান বাড়িতে (বোস হাউস) গোপনে দেখা করেন। ড. শিশিরকুমার বসু (শরৎচন্দ্রের ছোট ছেলে) জানিয়েছেন, এইভাবে বেশ কয়েকবার বার্লিন থেকে টোকিওর মারফত নেতাজির বেতার বার্তা ওকাজাকি ও তাঁর পরবর্তী কনসাল জেনারেল ওতা শরৎ বসুকে পৌঁছে দেন। একইভাবে শরৎচন্দ্রের বার্তাও জাপানি কনসুলেটের বেতার-বার্তার মাধ্যমে নেতাজির কাছে পৌঁছে দেওয়া হত। সেখানে বসেই জাপান কীভাবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সহযোগিতা করবে– তা নিয়েও কথা হত। ব্রিটিশরাজের নজর এড়ানোর জন্য কলকাতার বদলে এই বোস হাউসে দুই পক্ষের আলোচনার ব্যবস্থা করা হলেও এসব খবর অবশ্য শেষ পর্যন্ত কলকাতা পুলিশের অগোচর ছিল না।

ব্রিটিশ-মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে জাপানের যুদ্ধঘোষণা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা চলেছিল। পরবর্তীকালে আজাদ হিন্দ ফৌজের গুপ্তচর বিভাগের লোকদের যখন সমুদ্রপথে ভারতে পাঠানো হত, তাদের মাধ্যমে নেতাজি তাঁর সহকর্মী ও পরিবারের লোকদের জাপান থেকে বার্তা পাঠিয়েছেন। এছাড়াও ভগতরাম তলোয়ার, যিনি তখন কাবুলকে কেন্দ্র করে ভারতের নানাস্থানে ঘোরাফেরা করতেন, তাঁকেও জাপানি কনসালের মাধ্যমে বেতারবার্তা মারফত নেতাজি ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ-বিরোধী কাজের জন্য নির্দেশ পাঠিয়েছেন ও ভারতের নানা সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। সেসব অবশ্য এক একটি স্বতন্ত্র কাহিনি।
ছবি: লেখকের সংগৃহীত
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী-র অন্যান্য লেখা
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved