using commodities in rent is now a common case | Robbar
Robbar
  • ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৩১ আগস্ট ২০২৬

আমি যত ভাড়া জমিয়ে তুলেছি

শুধু বাড়ি কেন? গাড়ি, টিভি, সোফা, ফ্রিজ, প্রেমিক, প্রেমিকা (জাপানে খোলাখুলি পাওয়া যায়, এখানের মতো না), আর্মাডিলো, মায়ের কোল, এক মিনিটের শান্তি, বাবার শাসন মায় নিজেদের মাথাটাকেও আপন আপন রুচি অনুসারে প্রোপাগান্ডার কাছে ভাড়ায় খাটানো এখন নিও-নর্মাল। এদিক থেকে রেন্ট তুলে ওদিকে ঢালছি। ক্যালকুলেটিভ মাথায় আমিই খোকা আমিই পোদ্দার।

শেষ আপডেট: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ১৪:৫০   
Facebook WhatsApp Messenger

এককালে পাড়ার নতুন ভাড়াটে বা ভাড়াটিয়ার দিকে ট্যাঁরা চোখে তাকানোই ছিল দস্তুর। কান পাতলেই শোনা যেত নিরীহ বাড়িওয়ালার অ্যালসেশিয়ানকে ভুল বুঝিয়ে বাড়ি দখল করে নিয়েছে ‘তেরি মেহেরবানিয়া’র জ্যাকি-সদৃশ ভাড়াটে। পাড়ায় নতুন ভাড়াটে এলেই শুরু হত চাপা গুঞ্জন ও কানাকানি। পাড়ার স্বঘোষিত হামজারা নিজের হোসলা ও ইন্ধন নিজেরাই জুটিয়ে ধুরন্ধরভাবে পেড়ে আনত নানা ইন্টেল। যেমন, ওদের এত দেমাক যে রেশন দোকানের চাল খায় না। বরটা না কি কাপালিক ছিল। বৌদি না কি দুপুর হলেই হাঁক পাড়ে ‘ঠাকুরপোর ঘরে কে?’… ওদের ছেলেটার না কি চোরা পোলিও আছে। মেয়েটার না কি পালিয়ে একটা বিয়ে ছিল ইত্যাদি। এবার বর্তমানের মতোই সেই পরিবারকে পাড়াদ্রোহী ঘোষণা করে পাড়া ছাড়ানোর বন্দোবস্ত করা হবে, না কি অচিরেই তারা হয়ে উঠবে পাড়ার কূটকচালি ও তরকারির বাটি চালাচালির অংশ– তা নির্ভর করত একটি বিশেষ পরীক্ষার ওপর। পরীক্ষার কাট-অফ মার্কস, চাঁদা! মার্চে ‘শিশে কি উম্র পেয়ার কী’-র সাঙ্গোস্কিতিক সন্ধ্যা হয়ে পরের বছর জানুয়ারিতে রক্তদান শিবির মিলিয়ে মোট সাড়ে সাতাশো হাজার উৎসবের চাঁঁদা। গিভেন অ্যামাউন্ট পাড়ার দামাল-দামালিদের ভাবাবেগ ম্যাচ করলেই বদলে যেত ন্যারেটিভ।

দাদার তো বক লগ্নে জন্ম। অনেক কষ্ট করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। বৌদি অনেক কষ্ট করে সংসারের বাঁধনটা ধরে রেখেছে। ছেলেটা ওমন অসুখ নিয়েও কত কষ্ট করে মাস্টার্স পেলো বলো! আর মেয়েটার নাম ততক্ষণে কয়েকজনের কাছে– ‘তোদের বৌদি’। কিন্তু ডিমান্ড আর সাপ্লাই না ম্যাচ করলেই, আরি আরি আরি, এ ভাড়াবাড়ি ফুল ফালতু।

কিন্তু সেই একই সময়ে যখন মিমোদের বাড়ি ভেঙে গজিয়ে ওঠা ফ্ল্যাটে যে নতুন পরিবার এল তাদের গায়ের রং, কথা বলার ধরন, পরিবারে কর্তার হাতের একফুট লম্বা, দু’ফুট টাওয়ারওয়ালা কালো মোবাইলের গা ঘেঁষাঘেঁষি স্কোয়াডের অংশ হতে চাইল সবাই। কারণ ও ভাড়া না, রেন্টে এসেছে। উপরন্ত আবার চাঁদা চাওয়া হলে কর্তা বললেন শুধু চাঁদা না, এবারে ঠাকুরটাই উনি দেবেন। পাড়ার ৪০ বছরের ইতিহাসে সেই প্রথমবার এক প্রাচীন জেঠুর বদলে বসে আঁকোর জাজ করা হল মোবাইল টাওয়ারকে। স্বাভাবিক, স্যামখুড়ো আমার বন্ধু হলে খামোকা সুভাষকে বুঝতে যাব কেন? এমনিতেও ওনাকে বোঝা শক্ত। সেই রূপকথাগুলুগুলু আবহেই আমরা জানতে পেরেছিলাম রেন্ট আর ভাড়া সম্পূর্ণ আলাদা দুটো জিনিস। দুটোর মানে আলাদা। সামাজিক অবস্থান আলাদা। অবিশ্যি এ সবই সেই সময়ের কথা যখন শক্তিমান আর মুকেশ খান্না আলাদা মানুষ ছিলেন। এখন কী পরিস্থিতি বলা যাচ্ছে না। তবে এটুকু নিশ্চিত মোবাইল বড় থেকে ছোট হয়ে আবার বড় হয়ে গিয়েছে। তাই বাসে দিতে হবে ভাড়া আর গাড়ি করতে হবে রেন্ট।

সাধারণত যে সমস্ত মহিয়সীও পাঠিকার কথা কল্পনা করে আমি লিখি, তারা নিশ্চয়ই এতক্ষণে ধরে ফেলেছেন যে বাস, অটো, মেট্রোতে যে ভাড়া দিতে হয়, সেটার মানে ইংরিজি ফেয়ার। ফেয়ার আর রেন্ট তো এক জিনিস নয় বাপু। তাই যে ভাবে আমার ভাসুরপোর বাংলাটা ঠিক… জোনে চলে যাচ্ছ ভাই, সামলাতে পারবে তো? হে পাঠিকা, প্রথমত ‘ভাই’ ডাকবেন না। দ্বিতীয়ত, ফেয়ার এনাফ! সহজ করে বললে ‘ফেয়ার’ মানে যাতায়াত ভাড়া আর ‘রেন্ট’ মানে জমি, বাড়ি, গাড়ি, জাতীয় কিছু জিনিস ও মউ তুমি জানো না সেদিন কোর্টে চুক্তি-ফুক্তি করে কয়েকটা দিনের তরে ভোগ করা। এই তো! আসলি সমস্যা এই কয়েকটা দিনগুলোতেই! সময়েই সবটা নেড়ে-ঘেঁটে লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের ভিতরটার মতো হয়ে যায়। ডেইলি পদার্থবিদ্যা দিয়ে দাঁত না মাজলে বোঝার কোনও উপায় নেই কী চলছে। কারণ, ‘টাইম’ শব্দটার কোনও ভাষাতেই বিশেষ কোনও ফ্যাচাং নেই। টাইম মানে সময়। আর সময় হল উৎপল দত্ত মহাজন বা জমিদার ভিলেন সাজলে তার নায়েব সাগরেদের মতো। যে কানে কানে এসে বলে নৌকোটা এতদিন আপনার ঘাঁটে বাঁধা আছে, ওটা তো এখন আপনারই ঠাকুর। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এই বগলদাবামর্মী অধিকারবোধ-সর্বস্ব মনটা সব সময় ধরে রাখা যায় না। মায়া নামক সুচারু তাড়না মাঝেমধ্যেই সন্ধ্যাবেলা গা ধুয়ে এসে তার পাশে এলিয়ে বসে। বন্ধুবর সম্বিতের কাছে একফালি গপ্পো শুনেছিলাম এ-বিষয়ে।

সাহিত্যিক শ্যামল গাঙ্গুলি শেষ জীবনে যেখানে থাকতেন সে বাড়ির সমস্ত জিনিসপত্র মায় মশারিটাও ছিল ভাড়ার। শ্যামলবাবু এত বছর ধরে জিনিসগুলোর ভাড়া দিয়েছেন যে, ওর জায়গায় নতুন জিনিস কিনলে খরচ হত ঢের কম। কিন্তু নিজের জিনিসে যে মায়া বেশি পড়ে…

তাই মায়াহীনতার উদযাপনের এই বাস্তবতায় আমরা সকলে, এক স্টেটাস ডিস্টেন্স মেইনটেইন করে, ম্যাঁওওও নাদে বলিয়ান হয়েছি।

কলকাতার শহরেই এমন লাখ লাখ অ্যাপার্টমেন্ট আছে, যার সব ক’টা ফ্ল্যাট ভাড়ায় দেওয়া। সরি, রেন্টে দেওয়া। বাড়ির মালিক বাইরে থাকে। বেশিরভাগ কেসে বিদেশে। আর শুধু বাড়ি কেন? গাড়ি, টিভি, সোফা, ফ্রিজ, প্রেমিক, প্রেমিকা (জাপানে খোলাখুলি পাওয়া যায়, এখানের মতো না), আর্মাডিলো, মায়ের কোল, এক মিনিটের শান্তি, বাবার শাসন মায় নিজেদের মাথাটাকেও আপন আপন রুচি অনুসারে প্রোপাগান্ডার কাছে ভাড়ায় খাটানো এখন নিও-নর্মাল। এদিক থেকে রেন্ট তুলে ওদিকে ঢালছি। ক্যালকুলেটিভ মাথায় আমিই খোকা আমিই পোদ্দার। অ্যাটাচেমন্ট তো বাচ্চা রে আমার। আর এটা ডিঙ্কের যুগ। ডবল ইনকাম। নো কিড। তাই এই যুগ ভাড়ার যুগ। এই যুগ রেন্টের। কারণ এই যুগ ডিল্যুশনাল স্বাধীনতার যুগ।

আমি জানি, আমার মোবাইল সব দেখছে, সব শুনছে। কিন্তু আমি এটাও জানি যে, সবার মোবাইলই শুনছে। তাহলে আমরা সবাই স্বাধীন না কি সবাই পরাধীন? এই প্রশ্নটা কিন্তু আসছে মোবাইলটা কিনেছি বলে। রেন্টের হলে দোকানে গিয়ে বলতাম চেঞ্জ করে অন্য কান দে, কারণ এই ফোনটার প্রতি আমার কোনও দায়িত্ব নেই! রেন্ট দায়িত্বজ্ঞানহীনতার স্বাধীনতা দেয়। বাড়ি জানলা ভেঙেছে, বাড়িওয়ালার দায়। ফ্রিজ, টিভি খারাপ হয়েছে, যে ভাড়া দিয়েছে তার দায়। সে বুঝুক। না আমাকে চোদ্দবার করে কাস্টমার কেয়ারে ফোন করতে হবে না, জিনিস নিয়ে ছুটতে হবে। বেস্ট অপশন গায়ে লাগবে না। তাছাড়া শরীর ভাড়ার চলখানা যে আদিমতম, সে-কথা অস্বীকার করতে পারবে তো ইতিহাস? ঠিক যেমন অস্বীকার করতে পারবে না যে ভাড়া করা শরীরটা ছাপিয়ে প্রায়শই অন্তরের গন্ডগোল হয়েছে। সে গন্ডগোল জন্ম দিয়েছে নগরের বেশ কিছু প্রবাদের। ঠিক যেভাবে মোবাইল টাওয়ারের মেয়ে আর বক-লগ্নের ছেলের বিয়েতে ভাড়া করা বিয়েবাড়ি গিয়ে কবজি ডুবিয়ে চব্যচোষ্য গিলেছিল গোটা পাড়া।

zoom
চারমূর্তি ছবির একটি দৃশ্য

আসলে যারা কখনও না কখনও ভাড়াবাড়িতে থেকেছে তারা জানে, সমস্ত আসবাব গাড়িতে উঠে যাওয়ার পর ফাঁকা, হাঁ করে থাকা ঘরগুলো শেষ একবার ‘চেক’ করতে গিয়ে মানুষ আসলে দেখে আসে কোথাও কোনও স্মৃতি পড়ে রইল কি না। ভাড়ার জিনিসেই এই! নিজের হলে তো শ্রোডিংগারের বেড়ালটা বাক্স থেকে বেরিয়ে এসে বলত– মন খারাপ করিস না ভাই! এই আমায় দ্যাখ! ইনফাইনাইট প্রবাবিলিটিতে ঘুরে বেড়িয়ে বুঝতে পেরেছি যে, পুরো ওয়ার্ল্ডটাও ঢপ, আসলে সত্যিটা হল– সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই।

নিজেরও। ভাড়ারও। রেন্টেরও।

……………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন সৌমিত দেব-এর অন্যান্য লেখা

……………………..

Rent Rent House Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on