

স্বরলিপি দেখেই শেখাতেন। কিন্তু বলতেন, আমার মনে হয় এই খোলা মনও দেবব্রত বিশ্বাসের শিষ্যত্বের জন্যই। আর কতভাবে যে তাঁর গানে নিহিত ছিলেন তাঁর গুরু। কাছে এখনও বাজে তাঁর শেখানো, গগনে গগনে আপনার মনে কী খেলা। ‘মেঘমল্লারে কী বলো, কী বলো, কী বলো আমারে’ তিনি যেভাবে ব্যক্ত করতেন সেটা দেবব্রত বিশ্বাসেরই ঘরানা। গানের অন্তর্লোক অদ্ভুতভাবে দৃশ্যমান হত।
১৯৮৫ সালে ৫০ সি হাজরা রোডে অর্ঘ্য সেনের কাছে আমার গান শেখা শুরু। প্রথম গান, ‘আমি জ্বালবো না মোর বাতায়নে প্রদীপখানি’। তিনি নিজে স্থায়ীটি বারকয়েক গেয়ে বললেন, ‘করুন।’ প্রথম শব্দ ‘আমি’ উচ্চারণ করতেই থামিয়ে দিলেন। ‘নিজের মতো করুন। চিন্ময়দার মতো করছেন কেন?’ একেবারে প্রথম মুহূর্তেই, যাকে বলে বিসমিল্লাতেই, গানের প্রধান পাঠটি বুঝিয়ে দিলেন। সেদিন বাসে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বারবার ভেবেছি এই কথাটি। কী অবলীলায় গানের মূল পাঠটি তিনি প্রথম ক্ষণেই দিয়ে ফেললেন। নিজের স্বরকে খুঁজে নেওয়া। এখনও গান গাইতে বসলে এই কথাটি ভুলি না।

প্রথম যৌবনের সেই অপরিণত বয়সে আমাদের ঝোঁক ছিল গান শেখা বলতে যে কণ্ঠস্বর থেকে গানটি শুনেছি, তাকেও গলায় তুলে নেওয়ার। অর্ঘ্য সেন গান শিখেছেন দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে। সারাজীবন। তবে গানই শিখেছেন, কণ্ঠস্বর নয়। দেবব্রত বিশ্বাসের উত্তরাধিকার অনেকেই কণ্ঠস্বরের সাদৃশ্যে বহন করতে চান। অর্ঘ্য সেন ছিলেন অন্য পথের পথিক। সেজন্যেই হয়তো গান শেখার সময়ে অনেক সময়ে বলেছেন, আমার মতো করতে যাচ্ছেন কেন? নিজের মতো করুন। গানের কোনও ব্যাখ্যা করতেন না। গানটাই শেখাতেন। তবে শেখার সময় শুধু সুর আর বাণীর প্রক্ষেপটাই শেখার ছিল না। দেখতাম কীভাবে একটা গানকে তিনি নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিচ্ছেন। ‘আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে’ শেখানোর সময় বললেন, ‘ডাক দিয়েছো কত’-তে ডাকটা এত ছোট করে বলছেন কেন? বন্ধু বা ইয়ারকে ডাকা নয়তো এটা। ‘ডা’ আর ‘ক’-এর মাঝখানটা একটু বড় করতে হবে। কিংবা ‘তখন ছিল না ভয়’-এ ‘ভ’-এর মহাপ্রাণ প্রগাঢ় হতে হবে।
গান শেখানোর সময় একদিন বললেন, ‘আপনি তো অনুষ্ঠান করেন মাঝেমাঝেই শুনলাম। আপনাকে এমনভাবে গান শেখাব যাতে অনুষ্ঠানে পরপর গানের ক্রম কীভাবে আসবে– যাতে আপনি নিজেই শিখতে পারেন। এটা বলে বোঝানো যাবে না। খেয়াল করবেন শুধু। গানের কথা, সুর, তাল– এইসব দিয়েই একটা ধারাবাহিকতা তৈরি করতে হয়। অনুষ্ঠানে অন্তত দুটো গান তো করতেই হয়। আমি দুটো গানের গুচ্ছ করে শেখাব।’ প্রথমে ‘জানি তোমার অজানা নাহি গো কী আছে আমার মনে’-র পরদিন শেখালেন ‘যদি জানতেম আমার কীসের ব্যথা’। দ্বিতীয় দিন এই গানটি ধরতেই ভেতরে বিদ্যুচ্চমক হয়ে গেল। এভাবেই গানের পর গান আসে!

রবীন্দ্রনাথের ১২৫-তম জন্মবার্ষিকীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক উৎসবে তাঁকে নিয়ে এসেছিলাম। গানের সুতো কী করে গাঁথতে হয় সেই অনুষ্ঠানে চাক্ষুষ দেখলাম। অনুষ্ঠান শুরু করলেন ‘কার মিলন চাও বিরহী’ দিয়ে। কোনও ছেদ না দিয়েই পরের গান ‘তোমায় গান শোনাবো’। তারপরের গান ‘কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে’। এভাবে মাঝে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ছেদ দিয়ে পরপর প্রায় এক নিঃশ্বাসে গেয়ে গেলেন বোধহয় প্রায় ১৮টি গান। কোনও বই নেই, খাতা নেই। সঙ্গী শুধু তবলা আর তাঁর হারমোনিয়াম। এক নিঃশ্বাসে বলতেই মনে পড়ছে তাঁর ব্যতিক্রমী দমের কথা। ‘বারতা পেয়েছি মনে মনে’ গানে এক দমে গাইতেন ‘কেন বঞ্চনা কর মোরে, কেন বাঁধো অদৃশ্য ডোরে’। কিংবা এক দমে ‘নিবিড় অমা তিমির হতে বাহির হল, বাহির হল জোয়ার স্রোতে চৈত্ররাতে চাঁদের তরণী’। এই অবিস্মরণীয় সক্ষমতার কোনও পাঠ তিনি দেননি। নিতেও পারিনি। শুধু সবিস্ময়ে সামনে বসে দেখেছি।
দু’বছরের স্নাতকোত্তর পড়া শেষ হওয়ার পর আমার শিলচর ফিরে যাওয়ার সময় এল। কিন্তু গান শেখা তো শেষ হয়নি। অর্ঘ্যদাকে বললাম, আমি শিলচর থেকে বছরে এক-দু’বার এসে গানের ক্লাস করতে পারি কি? আমি নিশ্চিত অর্ঘ্যদা রাজি হবেনই। অর্ঘ্যদা যদিও মুখ খুলে প্রশংসা করতেন না কখনও। ক্লাসে আমার কোনও গান বা কোনও গানের একটি কোনও লাইন গাওয়া যদি তাঁর ভালো লাগত, তবে হারমোনিয়ামে আঙুল চালাতে চালাতে অস্ফুটে বলতেন, ভালো। মৃদু একটা হাসি ফুটত মুখে। একটু বেশি ভালো লাগলে, একই অভিব্যক্তি, শুধু অতিরিক্ত একটা শব্দ যুক্ত হত, বেশ ভালো। এর বেশি প্রশংসা করতেন কি না, জানি না, তবে আমার এটুকুই জুটেছে।

যাই হোক, আমার ধারণা হল, ছাত্র হিসেবে আমি নিশ্চয়ই অপছন্দের নই। ফলে উনি নিশ্চয়ই রাজি হবেন আমাকে শেখানোটা চালিয়ে যেতে। হলেন না। মুখে ওই হাসি অটুট রেখেই নিষ্ঠুরভাবে বলে দিলেন, না। আর না। আমি সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন? বললেন, হাত ধরে হাঁটতে শেখানোর পর মা-বাবাও হাত ছেড়ে দেয়। আপনাকে স্বরলিপি দেখা শিখিয়েছি। গান শিখিয়েছি। বাকিটা নিজে করবেন। কথাগুলো নিষ্ঠুরভাবে বললেও যে গানটি শেখালেন তারপর, তা হল, ‘নাইবা এলে যদি সময় নাই, ক্ষণেক এসে বোলো না গো, যাই যাই যাই’। পরের দিন শেখালেন, ‘শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে’। অর্ঘ্যদার ভেতরের স্নেহের ফল্গুধারাটি যেন প্রত্যক্ষ করলাম। শেষদিন গান শিখে উঠে আসার সময় বললাম, একটা প্রণাম করি। আবার সেই মৃদু হাসি। মাথা নেড়ে বারণ করে দিলেন।
বেশ কয়েক বছর পর রবিবারের এক সকালে আমার আগেকার ক্লাসের সময়েই হাজরা রোডের ল কলেজের পাশের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ৫০সি আসতেই মনে হল একবার ঢুকি। কড়া নাড়তেই ওই বাড়ির ঘরণী, অর্ঘ্যদার সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করতেন যিনি– তাঁর স্ত্রী দরজা খুলে হেসে অভ্যর্থনা জানালেন। বললেন, অর্ঘ্যদা ক্লাস করাচ্ছেন। ক্লাসঘরের দরজা খুলতেই অর্ঘ্যদা হেসে ডাকলেন। বসলাম। কুশল মঙ্গল জিজ্ঞেস করলেন। আমার সঙ্গে যে ভদ্রলোক শিখতেন, দেখলাম তিনি তখনও শিখছেন। আমার খুব ইচ্ছে হল, একটু ক্লাসটা বসে শুনি। আমি বললাম, অর্ঘ্যদা, একটু বসে ক্লাসটা শুনি? সেই মৃদু হাসি মুখে ঝুলিয়ে নিষ্ঠুরভাবে বললেন, থাক। উঠে চলে এলাম। খুব অভিমান হল। এরপর আর কখনও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাইনি।

২০ বছর পর ফিরে এলাম কলকাতায়। শুনলাম অর্ঘ্যদা আমাদের পাড়াতেই থাকেন। বারবারই মনে হত, একবার যাই। যাওয়া আর হল না। একদিন আমার মেয়ে বাড়ি ফিরছে স্কুল থেকে। ফুটপাতে উল্টোদিকে অর্ঘ্যদাকে দেখেই জিজ্ঞেস করল, আপনি অর্ঘ্য সেন না? অর্ঘ্যদা অবাক। একটি স্কুলছাত্রী তাঁকে চিনেছে। বললেন, তুমি আমাকে চিনলে কী করে? ও বলল, আপনার গাওয়া গানগুলো আমি শুনি। বলে পরপর তাঁর একটি ক্যাসেটের গানগুলি বলে দিল। অর্ঘ্যদা ভীষণ খুশি হলেন। আমার মেয়ে প্রণাম করল। আপত্তি করলেন না। বোধহয় বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে না-উঠতেই ওর প্রণাম শেষ হয়ে গিয়েছিল। চলে আসার আগে ও বলল, আমার বাবাকে আপনি হয়তো চিনবেন। অর্ঘ্যদা বললেন, কী নাম তোমার বাবার? নাম বলতেই, একগাল হেসে বললেন, চিনব না কেন, ও আমার খুব প্রিয় ছাত্র। মেয়ের মুখে শোনা অর্ঘ্যদার এই কথাটিই আমার জীবনের সেরা উপহার তাঁর তরফ থেকে।
অর্ঘ্যদাকে সামনে থেকে দেখলাম প্রায় ৪০ বছর পর যাদবপুর ইন্দুমতি সভাগৃহে। তাঁর এখনকার ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে সম্বর্ধনা দিয়েছে জন্মদিন উপলক্ষে। গানও গাইবেন অর্ঘ্যদা– এমনটা শুনে চলে গেলাম অনুষ্ঠানে। কণ্ঠস্বরে বয়সোচিত দুর্বলতা স্পষ্ট, কিন্তু গান নির্বাচনে তিনি যে রাজার রাজা সে প্রথম গানেই বুঝিয়ে দিলেন। গাইলেন, ‘পুরাতনকে বিদায় দিলে না যে, ওগো নবীন রাজা’! অনেকে বলেন, অর্ঘ্যদা যে দেবব্রত বিশ্বাসের ছাত্র সেটা তাঁর গান শুনে বোঝা যায় না। আসলে তাঁরা গান শোনেন না, শোনেন কণ্ঠস্বর। অর্ঘ্যদার ওই নির্বাচনই বুঝিয়ে দেয়, তিনি দেবব্রত বিশ্বাসের ছাত্র।

গানের ক্লাসে খুব বেশি গল্প জুড়তেন না। তবে গান শেখানোর ফাঁকে কিছু কিছু কথা বলতেন, যা থেকে বুঝেছি গান নিয়ে কোনও গোঁড়ামি তাঁর ছিল না। তখন রবীন্দ্রসংগীতের শ্রোতা, শিল্পী সকলের মধ্যে একটা আতঙ্ক ছিল। বিশ্বভারতীর কপিরাইট শেষ হয়ে যাবে কিছুদিন পর। সবার আশঙ্কা, এরপর রবীন্দ্রসংগীতের সর্বনাশ হয়ে যাবে। অর্ঘ্যদার মত ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি মনে করতেন, মানুষের রুচিবোধই রবীন্দ্রসংগীতকে রক্ষা করবে। শুদ্ধতা রক্ষার নামে বিশ্বভারতীর কপিরাইট বরং ক্ষতি করছে গানের– এই ছিল তাঁর মত। খুঁজে খুঁজে অপ্রচলিত গান গাওয়ারও পক্ষপাতী ছিলেন না। একদিন বললেন, মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে গান বের করে গাওয়ার দলে আমি নেই। যে গান অপ্রচলিত সেটা সেই গানের কারণেই। আর যে গান প্রচলিত সে নিজের গুণেই প্রচলিত।
স্বরলিপি দেখেই শেখাতেন। কিন্তু বলতেন, গান কানে তুলতে হয়, চোখে নয়। জর্জদা বলতেন, গাছের সব পাতা সবুজ, কিন্তু সব সবুজ এক নয়। আমার মনে হয় এই খোলা মনও দেবব্রত বিশ্বাসের শিষ্যত্বের জন্যই। আর কতভাবে যে তাঁর গানে নিহিত ছিলেন তাঁর গুরু! কানে এখনও বাজে তাঁর শেখানো, গগনে গগনে আপনার মনে কী খেলা। ‘মেঘমল্লারে কী বলো, কী বলো, কী বলো আমারে’ তিনি যেভাবে ব্যক্ত করতেন সেটা দেবব্রত বিশ্বাসেরই ঘরানা। গানের অন্তর্লোক অদ্ভুতভাবে দৃশ্যমান হত। কি-বোর্ডে আঙুল চালাচ্ছি, মন চলে গিয়েছে ৪০ বছর আগেকার এক মেঘলা সকালে। হাজরা রোডের ওই ঘরে দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, ‘সে সোনার আলো শ্যামলে মিলালো, শ্বেত উত্তরী আজ কেন কালো, লুকালে ছায়ায় মেঘের মায়ায় কী বৈভব?’

অনুষ্ঠান শেষে মঞ্চে দেখা করতে গেলাম। ভিড়ের ভেতর থেকেই চিনে ফেললেন অর্ঘ্যদা। হাসলেন। আমি বললাম, চিনতে পেরেছেন? হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়লেন। ভিড় ঠেলে কাছে গিয়ে বললাম, কী যে ভালো লাগল। মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি। আবার হাসলেন। একটু বিষণ্ণতার ছোঁয়া কি হাসিতে? সাহস করে বললাম, কোনওদিন প্রণাম করতে দেননি। আজ একটা প্রণাম করি। দুর্বল স্বর, কিন্তু একই মেজাজ। বললেন, থাক।
গানের বিপুল বিস্তার আর এই অসমাপিকা ক্রিয়া নিয়েই আমার কাছে ফিরে ফিরে আসেন অর্ঘ্য সেন। আমার শিক্ষক।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved