

ভাষার প্রাঞ্জলতার চাইতেও যা এই বইতে নজর কাড়ে তা হল বারবার ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিধির মধ্যে লেখিকার অনায়াস যাতায়াত। যেন দুই ভিন্ন ক্ষেত্র নয়, কেবল এ ঘরের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পাশের ঘরটিকে দেখা। ধর্ম, সমাজ, নারীর অধিকার– কোনও কিছুই বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করে না অনিতা অগ্নিহোত্রীর লেখায়। বরং খালি চোখে দেখা আপাত অমিলের মাঝে যে আদতে মিলের অংশই বেশি, এক ইস্যু থেকে অন্য ইস্যুতে লাফিয়ে পড়া নয়, বরং অনিবার্যভাবেই যাত্রা করতে হয়, সে ধারণা স্পষ্টতর হয়।
প্রচ্ছদের চিত্র: দীপঙ্কর ভৌমিক
‘এত যুদ্ধপ্রবণতা, তার প্রচার, এত পণ্য যার বিপণন শক্তিশালী করে সমরাস্ত্রের বাজারকে, তা সত্ত্বেও যদি আমাদের মনের মধ্যে জমে থাকে মেঘ, বিষণ্ণতা, তবে বুঝতে হবে সংবেদনশীলতাকে নষ্ট করতে সক্ষম হয়নি এই বাজার অর্থনীতি। অর্থাৎ বদল যদি কখনও আসে, আসবে আমাদেরই হাতে। আজ যারা আপাতদৃষ্টিতে ক্ষমতাহীন, অথচ যাদের সংবেদন আছে, তাদেরই হাতে।’ একথা বলছেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক অনিতা অগ্নিহোত্রী, তাঁর সদ্যপ্রকাশিত ‘আগুনের বর্ণমালা ও অন্য লেখা’ প্রবন্ধ সংকলনের ‘মুক্তির ম্যানিফেস্টো’তে।

অনিতা অগ্নিহোত্রী যেন পৃথিবীকে অনেকটাই দেখছেন মহাশ্বেতা দেবীর লেন্স দিয়ে। সচেতনভাবে বহন করছেন তাঁর উত্তরাধিকার। প্রথম প্রবন্ধ ‘মহাশ্বেতার স্বদেশ’ শুরু হচ্ছে মহাশ্বেতার লেখা ‘অগ্নিগর্ভ’র ভূমিকার একাংশ দিয়ে– ‘বহু সমস্যা, বহু অবিচার, বহু জাতি, বহু লোকাচার-সংবলিত দেশের লেখকরা লেখার উপাদান দেশ ও মানুষ থেকে পান না, এর চেয়ে বিস্ময়কর আর কী হতে পারে?’ বলপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া কোনও আঙ্গিক নয়, এই প্রশ্নই হয়ে উঠছে বইটির মূল সুর। ভিন্ন স্বাদের ২০টি প্রবন্ধকে গেঁথে রাখছে এক সুতোয়। এই সুর অবিচল থাকে বইয়ের শেষ প্রবন্ধ ‘আগুনের বর্ণমালা’ পর্যন্ত, যা শেষ হয় ‘মহাশ্বেতা দেবী একটি বড় শিরীষ গাছের মতো আমার ধুলোর গন্ধমাখা মাথায় ছায়া ফেলে জেগে আছেন’– প্রাবন্ধিকের এহেন উপলব্ধিতে।
এই প্রবন্ধের একাংশে তিনি বলছেন ‘মধ্যবিত্তের দৃষ্টিকোণ যখন সাহিত্যের কপালে ত্রিনয়ন এঁকে দিচ্ছে আর বাণিজ্যিক সংবাদপত্র হয়ে উঠছে তার অভিভাবক, সেই সময় মহাশ্বেতা আমাদের চেনাচ্ছেন ভারত, মেলে ধরছেন অরণ্যনির্ভর জনগোষ্ঠীর বিপুল শোষণ ও প্রতিরোধের ইতিহাস…’ কেবল মহাশ্বেতা নন, একই চেষ্টায় ব্রতী হয়েছেন প্রাবন্ধিকও। তাই তো এ বই সামাজিকের পাশাপাশি ব্যক্তিগত লেখার সমাহার বলার পরেও, প্রতিটি ব্যক্তিগত গদ্যের পথ অলিগলি পেরিয়ে এসে থামে সমাজের অপেক্ষাকৃত কম আলোকিত কোনও এক অংশে। ব্যক্তিমানুষ যে কখনওই সমাজ-বহির্ভূত নয়, তার একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতিও যে আদতে সমাজের বৃহত্তর ছবিরই প্রতিফলন, এ দাবি বইয়ের সর্বত্র।

হয়তো তাই ‘অশ্রুজল আর বৃষ্টিতে ধোয়ার রথের ছবি’ প্রবন্ধটির সিংহভাগ তাঁর নিজের ছোটবেলার রথ দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতার বর্ণনা হলেও, প্রবন্ধ যত এগয়, তত বাড়ির ভিতরের বারান্দা থেকে ঝুঁকে রথ দেখার বদলে যেন রাস্তায় নেমে আসেন প্রাবন্ধিক। রবীন্দ্রনাথের ‘রথযাত্রা’-কে আশ্রয় করে প্রশ্ন ছুড়ে দেন ‘রথের রশির অধিকার পায় খেটে খাওয়া মানুষের হাত?’
চাইলেই এই একই বই থেকে সম্পূর্ণ দুই রকমের পাঠ পাওয়া যায়, বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলির এ বুঝি অন্যতম। জটিল সামাজিক ঘাত-প্রতিঘাতের মাঝে রিলিফ ব্রেকের মতো ভেসে আসে কৈশোরবেলার টুকরো-টুকরো স্মৃতিচারণ। যেমন ‘আমার যা সর্বাধিক প্রিয়’-তে তিনি বলছেন ছোটবেলা থেকে রবীন্দ্রপ্রীতিতে মজেও রবীন্দ্রগান আয়ত্ত করে উঠতে না-পারার আক্ষেপ তাঁর সারাজীবন রয়ে যাবে। আবার ‘কিশোরী-হৃদয়– নায়ক হে কবি মধুসূদন’-এ তাঁর অকপট উপলব্ধি, কেবল ‘মধুসূদন দত্ত’ হলে কবি কখনওই এতখানি জায়গা করে উঠতে পারতেন না, যতখানি বাড়তি চমক তিনি ‘মাইকেল’ হওয়ার দরুন জাগাতে পেরেছেন প্রাবন্ধিকের কিশোরী-হৃদয়ে।

কেবল সুখস্মৃতি নয়, সমকালের যা কিছু ঘটনা লেখকের হৃদয়কে বিদারিত করেছে, তা সে খাস কলকাতার তথাকথিত হেডলাইনচিত নিউজই হোক না কেন, তার হাত ধরে তিনি বারবার ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন সমস্যার গোড়ায়। ‘মুক্তির ম্যানিফেস্টো’-তে বলছেন ‘বাংলার দুর্দশা দেখতে দেখতে আমরা অসহায় বোধ করি এই ভেবে যে এখানেই আমাদের কণ্ঠ অশ্রুত, আমরা গাজার শিশুদের মৃত্যুর কীভাবে নিজেদের শোক কীভাবে ব্যক্ত করব? কীভাবে আমাদের সম্মিলিত নিন্দা প্রকাশ করব আমেরিকার ইরানের ওপর অকারণে যুদ্ধ ঘোষণার? পৃথিবী অশান্ত হয়ে আছে, মলিনতায় নিমজ্জিত হয়ে আছে আমাদের নিজেদের আঙিনা। কোথায় মুক্তি? আমরা যদি সারা পৃথিবীতে ঘটে চলা ঘটনার বিন্যাসের দিকে তাকাই, তাহলে মনে হতে পারে আজ সর্বত্র ঘটছে তা-ই ভবিতব্য। সারা পৃথিবীতে দক্ষিণপন্থা ও বৈষম্যপন্থী ক্ষমতাবানেদের উদ্দাম নৃত্য, সাম্প্রদায়িক শক্তির সম্প্রসারণে খণ্ডিত সংখ্যালঘুর মর্যাদা।’
এ চেতনার ব্যাপ্তি বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে স্থান-কাল নির্বিশেষে দেশের সর্বত্র। হয়তো জীবনের ১৩টি বছর ছোটনাগপুর ও ওড়িশার নানা জায়গায় কাটানোর সুবাদেই প্রান্তিক নারী তথা মানুষের যন্ত্রণার শরিক হতে পেরেছেন প্রাবন্ধিক। আত্মস্থ করতে পেরেছেন। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস ‘মহুলডিহার দিন’ থেকেই দেখা যায় এই চেতনার প্রকাশ। এরপর একে একে ‘মহানদী’, ‘অকালবোধন’, ‘কাস্তে’, ‘উন্নয়ন ও প্রান্তিক মানুষ’, ‘দেশের ভিতর দেশ’, ‘বঞ্জরি’– সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কথা বলার সুযোগ বারে বারেই খুঁজে নেয় তাঁর কলম।
‘আমার ছোটগল্পের ভুবন: ফিরে দেখার পাওয়া– না-পাওয়া’ প্রবন্ধে তিনি বলছেন, ‘ব্যক্তিগত জীবনে বাংলার বাইরে আমার স্বামী-গৃহকে অল্প অল্প করে চিনে নিচ্ছি, অন্য ভাষা, অন্য সংস্কৃতিকে দেখছি বাঙালি মেয়ের মন নিয়ে। হয়তো পুরুষ লেখকদের ক্ষেত্রে এমন হয় না, বা হলেও তা কলমে আসে না, আমার জীবনের নতুন অনুভূতি, তা ব্যক্তিগত হোক বা সামাজিক উঠে এসেছে কলমের ঠোঁটে। আমার মধ্যে যে লেখে সে পুরোটাই আমি।’

আর এ দাবিতে কিছুমাত্র জল নেই। ‘প্রতিমাশিল্প ও আড়ালের মানুষজন’, ‘নগ্নপদ সত্যাগ্রহী’, ‘আন্দোলনের সাক্ষী নর্মদা উপত্যকা’য় ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির মানুষদের জীবনসংগ্রামের কথা উঠে এসেছে। যেন চুলচেরা বিচার নয়, সিনেমা-দেখা দর্শকের মতো কেবল বাইরে থেকে সেসব আত্মস্থ করে যাওয়া। ঠিক-ভুল নির্ধারণের বহু আগে কেবল ক্ষমতাহীন প্রত্যক্ষদর্শীর চিরাচরিত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া। খড়ের গায়ে মাটি, তার উপর আবার মাটির প্রলেপ মেখে ধীরে ধীরে দেহাবয়ব পাওয়ার ঢঙেই সযত্নে বাস্তব দৃশ্যের নির্মাণ ও বিনির্মাণ করে গিয়েছেন লেখিকা। টুকরো টুকরো দৃশ্য জুড়ে গড়ে তোলা ছবির উলটোদিকে বসিয়ে রেখেছেন আচ্ছন্ন পাঠক নয়, বরং দর্শককে। যে কোনও ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বারবার নিজস্ব বক্তব্য দিয়ে পাঠককে বিদ্ধ করেন না তিনি, বরং নিজের মতো করে অনুধাবনের সুযোগ করে দিয়ে, স্বেচ্ছায় বিচার করতে দেন।
যদিও কেবল প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে থাকার এই ফোর্থ ওয়াল মাঝেমধ্যে ভাঙেন। ‘রক্তকরবী’-তে তিনি স্পষ্টতই জানাচ্ছেন, ‘আজ যখন ধনতান্ত্রিকতা সারা দেশে, সারা বিশ্বে হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রব্যবস্থার চালক, আর সংগঠিত ধর্মব্যবসা হয়ে উঠেছে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হিতাধিকারী, বিজ্ঞানকে কুসংস্কার ও মিথ্যে দিয়ে আচ্ছন্ন করে তারা নাগরিক সমাজকে পরিণত করতে চায় প্রজায়; এমন প্রজাবৃন্দ যারা স্থিতাবস্থাকে প্রশ্ন করবে না, তার জয়গান গেয়ে পরমায়ু দীর্ঘায়িত করবে।’
নারীর অধিকার চেয়ে তিনি সরব হয়েছেন বারবার। তা দাবি করেছেন বইয়ের ভূমিকায়। ‘বৈষম্যের অর্থনীতি ও মেয়েদের লড়াই’ প্রবন্ধে তিনি বলছেন, ‘কারা চায় স্থিতাবস্থা?/ তবে কি মনে করব নারীর বৈষম্যের মুনাফা বইছে আমাদের শাসনব্যবস্থার শিরাধমনীতে, তাই বৈষম্য তীব্রতর হয়? তাই দমনের সংস্কৃতি কোথাও বলে না নারীর প্রতি হিংসার ভাষায়?’

আবার ‘রাম ও সীতা: যুগল জীবনের বিচ্ছেদকথা’-এ যখন বলছেন, “আজ থেকে এক শতাব্দী আগে রবীন্দ্রনাথ বা দ্বিজেন্দ্রলাল কল্পনা করতে পারেননি, বহু বিসর্জিতা সীতার ত্যাগ, রামচন্দ্রকে কবির সৃষ্টি থেকে একদিন উত্তীর্ণ করবে ‘মর্যাদাপুরুষোত্তমে’র রাজনৈতিক অবতারে। রামকে হিন্দু হৃদয়সম্রাট বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায় রাষ্ট্র হয়ে উঠবে সংঘবদ্ধ ধর্মের নিয়ামক। ‘সিয়ারাম’ আজ হয়ে গিয়েছেন ‘রাজারাম’। স্বামীর বামপাশের স্থান হারিয়ে পাতালে অদৃশ্য হয়ে গেছেন চিরদুঃখিনী সীতা”, তখন সীতাও হয়ে দাঁড়াচ্ছেন নেহাতই নশ্বর এক নারী, স্বামীর সঙ্গলাভ যার জীবনের মুখ্য চাহিদাগুলির অন্যতম।
প্রাবন্ধিকের এমন সাহসী রিমার্ক যে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চূড়ান্ত প্রাসঙ্গিক তা বলার অপেক্ষা রাখে না, তবে তারই সঙ্গে এ কথাও বলতেই হয় যে এই অনুধাবন কেবলমাত্র ধর্ম-রাজনীতিতে সীমিত নয়। ‘বৈষম্যের অর্থনীতি ও মেয়েদের লড়াই’ প্রবন্ধে পাটকল বা চা-বাগানে কর্মরত যে নারীদের দুর্দশার কথা তিনি বলছেন, তাঁদের যন্ত্রণাও কি সীতার সঙ্গে একই সুতোয় গাঁথা পড়ে যাচ্ছে না?
ভাষার প্রাঞ্জলতার চাইতেও যা এই বইতে নজর কাড়ে তা হল বারবার ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিধির মধ্যে লেখিকার অনায়াস যাতায়াত। যেন দুই ভিন্ন ক্ষেত্র নয়, কেবল এ ঘরের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পাশের ঘরটিকে দেখা। ধর্ম, সমাজ, নারীর অধিকার– কোনও কিছুই বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করে না অনিতা অগ্নিহোত্রীর লেখায়। বরং খালি চোখে দেখা আপাত অমিলের মাঝে যে আদতে মিলের অংশই বেশি, এক ইস্যু থেকে অন্য ইস্যুতে লাফিয়ে পড়া নয়, বরং অনিবার্যভাবেই যাত্রা করতে হয়, সে ধারণা স্পষ্টতর হয়।

তবু বিচার করতে বসলে বলতে হয়, বই জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুদ্রণপ্রমাদ, প্রুফরিডিংয়ের শিথিলতার বিষয়টি। ওটুকু শুধরে নেওয়া গেলে, নদীর মতোই বহমান হয়ে উঠতে পারে এই বইয়ের আগুনে বর্ণমালা।
—————————————————
আগুনের বর্ণমালা ও অন্য লেখা
অনিতা অগ্নিহোত্রী
এবং অধ্যায়
৩০০ টাকা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved