

যাঁরা আমাকে ট্রোল করেন, এবং মনে তখন বেশ আরাম পান, তাঁরা ‘যোনি’ শব্দটাকেই অশ্লীল ভাবেন। কী আপদ! এমন সুন্দর একটা সংস্কৃত শব্দ, এমন অপূর্ব এক গোপন পিচ্ছিল রহস্যময় পথ, যে পথ দিয়ে আমরা সকলে এসেছি পৃথিবীতে, সেই পথটাকে আমরা অশ্লীল বলব? কিংবা একটি আগ্রহী দণ্ডায়মান পুরুষাঙ্গের ওপর যোনির সেই অনিবার্য আসাযাওয়া এবং উত্তেজনার সেই ক্রমিক রোহন এবং মোচন, এর কোথায় কোন জায়গাটায় বসাব অশ্লীল শব্দটাকে? যা ছাড়া সম্ভবই হত না আমাদের জন্ম?
অলংকরণ: দীপঙ্কর ভৌমিক
আমার ভাল্লাগে। একটা খবর। খবর হল, আমি ট্রোলড (trolled) হচ্ছি। কাউকে ট্রোল করা মানে যে তার নামে মিথ্যে রটিয়ে তাকে ‘হ্যারাস’ করা, অতিষ্ঠ করা, জ্বালিয়ে মারা, উত্যক্ত করা– এই দারুণ দীক্ষা হল একেবারে শেষ বয়েসে। আমাদের যৌবনে ‘ট্রোল’ শব্দের অর্থ মনের খোলা ফুর্তিতে গান করা। সুদেষ্ণা, সুদেষ্ণা রায়, সাংবাদিক এবং চিত্রপরিচালক, দখিন হাওয়ার ছাদে হৃদয় প্রকাশের অপরূপ ট্রোলিং করতে পারত, অর্থাৎ ফুর্তির গান গাইতে পারত। প্রেমে পড়েছিলাম তার। এবং তার সেই গানের। তার সেই গানে কোনও আঘাত ছিল না, ছিল না কোনও নেপথ্য কুৎসা। আমার প্রশ্ন, ‘ট্রোল’ শব্দটার এমন শোচনীয় অবনমন ঘটল কবে এবং কীভাবে?
বরং সেই ফিলোলজিতে না গিয়ে বলি, ভাষার এই চরিত্রনষ্টের মূল কারণ, ফেসবুকের অবিশ্বাস্য অশিক্ষা! আমার ফেসবুক নেই। এই বয়সেও আমি বুকেমুখে চটকে এক হয়ে যাইনি। কিন্তু এই যুগের তরুণ-তরুণীরা চটকে বুকেমুখে এক হয়ে ফেসবুকে! ভাবনায় ভাষায় বোধে প্রকাশে তাদের বুক আর মুখ আলাদা করে বোঝা যায় না। জ্যান্ত ফেসবুক এরাই। ট্রোলের মতো আরও কত অপশব্দ এরা বেজন্মা বেইজ্জতে নিয়ে এসেছে ফেসবুকের ঘৃণ্য রৌরবে! ইজ্জতহীন জাহান্নামে! কী কষ্ট হয় আমার যখন ভাবি এই অশিক্ষা ও অবক্ষয়ের শেষ কোথায়? আমার আরও কষ্ট হয় যখন ভাবি, আমরা বিশ্বাস করতে শিখেছি, ফেসবুক আমাদের সেলিব্রিটি (অনেকে সেলিবিটি উচ্চারণে জিভে আরাম পান) হওয়ার পথ কী সহজ করে দিয়েছে! এখানে কোনও সম্পাদক নেই। ফেসবুকে যা খুশি লিখে, যা খুশি বলে, আজ নিজের পটির রং, গঠন, গন্ধ, তারল্য বা কাঠিন্য কেমন, কিংবা এই মুহূর্তে সোদপুর, যোধপুর না বোলপুরের যাত্রী আমি, সেইসব তপ্ত তথ্য জানিয়ে এবং তৎসহ ছবি সাঁটিয়ে ফেসবুকে ফেমাস হওয়ার পথে দূরের যাত্রী হওয়া যায়। এবং ক্রমে ‘সেলিবিটি’ হয়ে ওঠা যায়, থাকা যায় কনস্ট্যান্ট সার্কুলেশনে– এ ধারণা যে কত ভ্রান্ত, কেমন করে এই মানুষদের বোঝাই। তবু একটা কথা বলি, ফেসবুকে আমার ট্রোলড হতে ভাল্লাগে।

প্রশ্ন হল, আমাকে মধ্যমেধার গেরস্ত বাঙালি এত ট্রোল করেন কেন? তার প্রধান কারণ, আমার লেখায় না কি বড্ড বেশি যৌনতা। ঘুরেফিরে আমি নারীপুরুষের সম্পর্কে চলে আসি। আর সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে আমি শরীরে, সম্ভোগে, যৌনতায় ঢুকে পড়ি। মোদ্দা কথা, বিছানাই আমার প্রধান চর্চা ও চারণ ক্ষেত্র। আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আমি মেনে নিচ্ছি, কেননা বিছানার সঙ্গে আমাদের প্রত্যেকের জন্ম জড়িয়ে আছে। বিছানার সঙ্গে অধিকাংশ মানবমানবীর সঙ্গমের সম্পর্ক অনস্বীকার্য। তবে সব রকমের যৌন মিলনের জন্যে নারী ও পুরুষের বিছানা লাগে না। বাৎস্যায়ন এমন অনেক সঙ্গম পদ্ধতি বাতলেছেন– যাতে বিছানার কোনও ভূমিকাই নেই। বাৎস্যায়নের ব্রিলিয়ান্ট সিঁড়িসঙ্গমপদ্ধতি না জেনে তো প্রেম করাই উচিত নয়। বিছানাবর্জিত সেক্স যে কোন প্রলয় মোচনে পৌঁছতে পারে, বাৎস্যায়নের কামশাস্ত্রে তার বর্ণনা ও ব্যাখ্যা আছে। নরনারী, দু’জনেই দাঁড়িয়ে থাকবে সিঁড়িতে। কখনও নারী ওপরের ধাপে। কখনও পুরুষ ওপরের ধাপে। সিঁড়িসঙ্গমের স্বাদের সঙ্গে শয্যাসঙ্গমের পদ্ধতি ও স্বাদের আকাশপাতাল পার্থক্য। তবে একথাও ঠিক, মানুষই একমাত্র প্রাণী যার যৌন সম্ভোগের জন্য একটি বিছানার বড্ড প্রয়োজন। বিশেষ করে সম্ভোগ শেষে, রাগমোচনের পরে, গাঢ় আবেশ ও অশ্লেষের জন্য তো শয্যার আরাম ও বিস্তৃতি চাই-ই চাই! সুতরাং আমার প্রেম ও সম্পর্কের আখ্যানে শৃঙ্গার, শীৎকার, সঙ্গম, রাগমোচন– এইসব তো স্বাভাবিকভাবেই আসবে। এর জন্য যদি ট্রোলড হই তো জানব খাঁটি জিনিস দিতে পেরেছি। তাই বাঙালির হজম হয়নি। অপার্থিব আধ্যাত্মিক স্পিরিচুয়াল সেক্সের ধোঁকা বাঙালিকে নষ্ট করেছে। শ্রীকান্ত রাজলক্ষ্মীর অশরীরী অতৃপ্তি নিয়ে আর কতদিন চলবে বাঙালির রুগ্ন পেলবতা? শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত এবং তার সঙ্গে একাধিক নারীর ধরি মাছ না ছুঁই পানি সম্পর্ক আমার কাছে অন্তত অশ্লীল মনে হয়। অনেক বেশি স্বাভাবিক লরেন্সের নায়িকার সঙ্গে তার সবল মালির দৈহিক তোলপাড় এবং মালির দণ্ডায়মান শিশ্নের ডগায় মুক্তের মতো বীর্যবিন্দু! সেক্সুয়ালিটির এমন কাব্য আমি খুব বেশি পড়িনি।
একটা কথা, বা নালিশও বলতে পারেন, যাঁরা আমাকে ট্রোল করেন তাঁদের প্রসঙ্গে। এঁদের অধিকাংশই পুরুষ। আমার কখনও কখনও মনে হয় আমার জীবনে খোলাখুলি উতল হওয়াকে তাঁরা ঈর্ষার চোখে দেখেন। আমি এই সমাজে থেকেও উতল বাতাসকে জানলা দরজা খুলে স্বাভাবিকভাবে ঘরে ডেকেছি। এবং সেই বাতাসকে ভালোবেসেছি, মান্যতা দিয়েছি। আগ্রাসী হইনি। এবং খোলা রেখেছি বাতাসের আসা-যাওয়ার পথ। অধিকারবোধ ফলাইনি। প্রেমে ক্ষমতা দেখানো চলে না। প্রিয়তায় অবশ্যই বলা যায় তুমি আমার সম্পদ। কিন্তু কখনও বলা যায় না, তুমি আমার সম্পত্তি। প্রেম জমিদারি নয়। প্রেম তাসের ঘর। প্রণয় বিশ্বাস করে না পার্মানেন্ট ট্যাটুতে। প্রেমের বিভাজিকায় বদলে বদলে যায় উলকি। এই দ্রবতায় বেঁচে থাকে প্রিয়তা। পারে লতিয়ে এদিক সেদিক করতে। যেমন ডান ধারের ব্লাউজের কোনা থেকে বেরিয়ে আসা, একটু নিচে স্তনের তারল্যের সুযোগ নিয়ে, একেকদিন একেক রকম, অন্তত আমার চোখে। আমার ভালো লাগে এই নব নব প্রকাশ। হয়তো নব নব নয়। কিন্তু তো তাই দেখি। আর কোনওদিন জানতে চাইনি, কোন পুরুষ এঁকে দেয়। না কি পৃথক পৃথক শিল্পীর চারণভূমি তার ব্লাউজের উজানি কিনার? বরং আমি উপভোগ করি আমার উত্তর আধুনিক ভয়ারিজম!

আমার ট্রোলারদের কাছে আমার এক অবনত অনুরোধ। নারী পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে আধুনিক নারীর লেখা বেশি পড়ুন। যে সময়টা আমার লেখায় খরচ করেন, সেই সময় এই যুগের মেয়েদের লেখা পড়ে কাটান। দেখবেন পাপড়ি খুলছে। বদলাচ্ছে রং। তপ্ত পাউরুটির মতো চাঙ্গা হচ্ছে বোধ। তার ওপর লাগছে স্বাদু পাপের প্রলেপ, যেন নতুন লাবণ্যের স্প্রেডচিজ! এই ইন্দ্রিয়ঘন চাকুমচুকুম, নারীর আলস্য ও আবেশ থেকে, সত্যিই উপাদেয়।
ফেসবুকে সময় নষ্ট না করে আজই পড়ুন ২০২২-এ নোবেলজয়ী ফরাসি লেখক অ্যানি এরনো-র (Annie Ernaux) ‘সিম্পল প্যাশন’, চটি উপন্যাস। লিখছেন এরনো: It is only now that one can see this– a man’s penis and a woman’s vagina coming together, the sperm– পুরুষের লিঙ্গ। নারীর যোনি। মিলিত হচ্ছে। The man’s penis, fully erect, sliding into the woman’s vagina, সম্পূর্ণ খাড়া পুরুষাঙ্গ পিছলে ঢুকে যাচ্ছে যোনিতে, তারপর অনেকক্ষণ ধরে দু’টি যৌনাঙ্গের আসাযাওয়া চলতেই থাকে, for a long time the coming and going of the two sex organs– তারপর বীর্যপাতের পরম লগ্ন!
মারাত্মক অশ্লীল, তাই না? এবার এরনো কী বলছেন, পড়ুন: the impression conveyed by sexual intercourse, a feeling of anxiety and stupefaction, a suspension of moral judgement! যৌন মিলনের শুরুতে একটা দুশ্চিন্তার ভাব। (বিশেষ করে পার্টনার নতুন হলে)। তারপর গ্রাস করে একটা বিহ্বল হতচেতন অবস্থা। তখন ঝুলিয়ে রাখা হয় সমস্ত নৈতিকবোধ। সেক্স নিয়ে লেখাতেও এই ব্যাপারটা বজায় রাখতে হবে। যৌন মিলনের উত্তেজনার সময় নারীর মন কী অবস্থায় থাকে? জানাচ্ছেন এরনো: a hallucination, between memory and madness.

যাঁরা আমাকে ট্রোল করেন, এবং মনে তখন বেশ আরাম পান, তাঁরা ‘যোনি’ শব্দটাকেই অশ্লীল ভাবেন। কী আপদ! এমন সুন্দর একটা সংস্কৃত শব্দ, এমন অপূর্ব এক গোপন পিচ্ছিল রহস্যময় পথ, যে পথ দিয়ে আমরা সকলে এসেছি পৃথিবীতে, সেই পথটাকে আমরা অশ্লীল বলব? কিংবা একটি আগ্রহী দণ্ডায়মান পুরুষাঙ্গের ওপর যোনির সেই অনিবার্য আসাযাওয়া এবং উত্তেজনার সেই ক্রমিক রোহন এবং মোচন, এর কোথায় কোন জায়গাটায় বসাব অশ্লীল শব্দটাকে? যা ছাড়া সম্ভবই হত না আমাদের জন্ম? আপনারাই বলে দিন। আমরা কেউই নই নিষ্কাম প্রেমের সন্তান। আমরা প্রত্যেকেই অ্যানিমেল প্যাশনের আদিম সৃজন। যে প্যাশন ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব পাপপুণ্যের বাধা, থ্রু আ সাসপেনশন অফ মরাল জাজমেন্ট।

এবার এই লেখার শেষে আসছি ভগবৎ গীতায় যোনি প্রসঙ্গে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের এক অমোঘ উচ্চারণে। গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের চতুর্থ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, হে কৌন্তেয়, সকল যোনিতে যেসব স্থাবরজঙ্গমাত্মক মূর্তি বা শরীর ‘সম্ভবন্তি’, উৎপন্ন হয়, আমি তাদের বীজপ্রদ পিতা। (অনুবাদ: স্বামী লোকেশ্বরানন্দ, শ্রীমৎ ভগবৎ গীতা)। এই একটি শ্লোকে পুরুষের সমস্ত অহং হরণ করলেন শ্রীকৃষ্ণ। কোনও পুরুষের পিতা হওয়ার ক্ষমতা নেই, শ্রীকৃষ্ণের বীর্য ব্যতীত। তাই তিনি প্রতি যোনিতে বিরাজমান। তাঁর প্রদান ছাড়া জন্ম অসম্ভব। সুতরাং যোনির মতো পূণ্যস্নাত পবিত্র শব্দ নেই, যে শব্দ আমাদের নিয়ে যায় জীবনসৃজনের আদিম অপরিমেয় রহস্যঘন উৎসে! এবং যে উৎসের রহস্য ও রোমান্সের সবটুকু আমরা কোনওদিন জানব না। এবং যেন না জানি। যেন কোনও এআই নির্মিত কোনও বাৎস্যায়ন চিৎকার করে না-বলে, আমি যোনিরহস্যের সবটুকু জেনে ফেলেছি। সেই স্পর্ধার থেকে অশ্লীল আর কিছু হতে পারে না।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved