

আমার অলি-গলি-চলি-রাম একটা জীবন আছে, সে জীবন আমি ভালোবাসি। সে জীবন চাগিয়ে রাখার জন্য মাঝে মাঝে কয়লা লাগে, মগজে কয়লার আগুন আর ধূম লাগানোর জন্য চাই অলি-গলি-চলির বই। জুগিয়ে দিলেন মহঃ ফারুক ইকবাল। ১৯৬৫ সালে মেটিয়াব্রুজের বড়সাহেবের হাট অঞ্চলে জন্ম। পড়াশোনা উচ্চমাধ্যমিক অবধি। পেশায় দর্জি। তাঁর কথকতায় মেটিয়াব্রুজের অন্য রূপ খুলে গেল চোখের সামনে। ওয়াজেদ আলি শাহ-র শেষবেলা আর কুখ্যাত অপরাধ-প্রবণতার ছবি ডিঙিয়ে ভেসে উঠল সাধারণ বাঙালি দর্জির খাওয়া-পরার জীবন। সবই কেমন মাগ্যি-গণ্ডা হয়ে উঠছে। দাদিমা আক্ষেপ করতেন, ‘জিনিসপত্তোর এতো মাংগা হলি মানুষির চলবে কী করে? মোদের সোমায় ২০ টাকায় মাসভোরের মুদিসওদা হয়ে যেত। ১ টাকায় আস্তো গরু পাওয়া যেত। ঘরে চাল না থাকলি দোকান থেকে তিন চার রকোম চালির নমুনা আনতি বোললি দুবেলার ভাত হয়ে যেত।’ ফারুক ছেলেবেলায় মুখ টিপে হাসতেন। তবে চোখের সামনে দেখলেন দাদিমার বিলাপ অহেতুক ছিল না। জিনিসের দাম আকাশ ছোঁয়া। আর সরকার? বইটির প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৫। ‘আমাদের সরকার (রাজ্য এবং কেন্দ্র) আমাদের প্রাপ্য পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঠিক তেমনভাবেই বিড়ির পোঁদটা চেপে ধরে আছে। আমাদের বিভিন্ন দাতব্য প্রকল্পের ছেলেভোলানো যৎসামান্য ভিক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু যেগুলো দিলে আর ভিক্ষার প্রয়োজন হয় না– সেই শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যহ্রাস করা এগুলো দিচ্ছে না।’ ফারুকের লেখায় নানা টুকরো-টুকরো ছবি, টানা রাজপথের গল্প নয়। গলিগুলো একটু করে এগয়, শেষ হয়ে যায়। আবার তখন আর একটা গলিতে ঢুকতে হয়। এক এক গলি থেকে এক একটা সময়ের খবর ভাসে। মেমসাহেব বলডান্সের অনুষ্ঠানের জন্য দর্জিকে গাউন সেলাই করতে দিয়েছেন, দর্জির পাত্তা নেই! মেমসাহেব এসে ধমক দিয়ে গেলেন। দর্জি তো ভেবে অস্থির! কী করলে মেমসাহেবের গাউন অপূর্ব হবে! শেষে এক কৌটো জোনাকি নিয়ে এল। তারপর কাপড়ের নিচে হালকা করে সুতোয় টাঁকা মেরে জোনাকিগুলোকে এমনভাবে গেঁথে দিল, যাতে তারা সরেও না যায়, আবার মরেও না যায়। পার্টিতে গিয়ে মেমসাহেব ঠিক ডান্সের আগে সেই গাউন পরলেন। ধীরে ধীরে বাইরের আলো নিভে আর প্রাকৃতিক নিয়মে জ্বলে উঠল জোনাকিরা। এই আশ্চর্য আলোময় গাউনের রূপকথা সেলাই করেছিলেন সাহেবি আমলের দর্জি। সময় এগয়। স্বাধীনতার পর সাতের দশকের ভালো মাতব্বরেরা বিদায় নেয় নয়ের দশকে। ১৯৮৪-তে মঙ্গলা হাট পুড়ে যায়, আব্দুল জব্বার মালী তৎকালীন কাউন্সিলর গোলাম রসুল মণ্ডলের সহায়তায় নতুন হাট গড়ে তুললেন, আকড়া রোড ধরে আরও অনেক হাটের পত্তন হল। নয়ের দশক থেকে পুকুর বুজিয়ে প্রোমোটাররা পাড়া মাথায় তুলল। সেলাই মেশিনের আওয়াজ আর ফারুক ইকবালের সেলাই করা টুকরো-টুকরো ছবি।

সুমন কল্যাণ মৌলিকের চোখ পড়েছে রানিগঞ্জ কয়লাঞ্চলের ধস-আগুন ও মানুষের উপর। তিনি পেশায় ইতিহাসের শিক্ষক, মানবাধিকার কর্মী। ফারুক ইকবালের মতো কাহিনি বুনতে বসেননি, মানবাধিকারের প্রশ্ন ও প্রসঙ্গগুলি পরিসংখ্যানের যুক্তিসিদ্ধতায় তুলে ধরাই উদ্দেশ্য। কয়লাখনির মেয়েদের জীবনকথা উঠে আসে। কৃষিকাজে মেয়েরা শ্রমের সুযোগ পান– ঝাড়াই, মাড়াই, বাছাই, ধান সেদ্ধ কত কাজ। কোলিয়ারিতে মহিলা শ্রমিক ও কর্মচারীদের সংখ্যা কমে আসছে। কোলিয়ারির আন্ডারগ্রাউন্ডে মহিলা শ্রমিক নিয়োগ নিষিদ্ধ, খোলামুখ কয়লাখনিতে মহিলা ঠিকা শ্রমিক নেই। তবে কয়লা বা নেচার কোল কুড়োতে আসে শয়ে শয়ে মেয়ে-পুরুষ, স্কুল ড্রপ আউট ছাত্রছাত্রী, এমনকী বাচ্চা ছেলেমেয়ে। জীবন আর পরিবেশ দুই-ই নষ্ট হচ্ছে। চর্মরোগ, সর্দিকাশি, শ্বাসকষ্ট বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বইয়ের লেখা আর ভাবনা শুরু হয়েছিল ‘উদ্যোগ’ পত্রিকার হাত ধরে, সুমন কল্যাণের সহযোগী ছিলেন সুদীপ্তা পাল আর শিপ্রা চক্রবর্তী। এই যে প্রকৃতির সঙ্গে নির্বিচার তঞ্চকতা তারই ফলে ধস নামছে নানা জায়গায়। উত্তরাখণ্ডের যোশিমঠের বিপর্যয় সচকিত করে তুলেছে। তাই নতুন করে এ-বছর আবার ছাপা হল সুমন কল্যাণের বই, প্যারালাল প্রকাশনা থেকে। সুমন কল্যাণ মনে করিয়ে দিচ্ছেন ‘খনি সংক্রান্ত নতুন আইনগুলি প্রণয়নের ফলে বনাধিকার আইনের আর কোনো তাৎপর্য থাকছে না।’ আদিবাসীদের গ্রামগুলি সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত।

অলি-গলি বলতে কি কেবল অলিগলি? এক স্তরের তলায় অন্য স্তর যখন ঢাকা পড়ে যায় তখন সেই ঢাকা-পড়া জীবনও কি অলি-গলি নয়? রিপন হালদারের উপন্যাস ‘রুজভেল্টনগর’। প্রাচীন কল্যাণী আর জনপদের আখ্যান কতজন আর মনে রেখেছে? হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই ‘উদ্বাস্তু’-র নতুন সংস্করণ হয়েছে। মধুময় পাল উত্তরভাষ লিখেছেন। লোকে পড়ে কি? রিপনের উপন্যাসে একটা কাটা-মুণ্ডু কথা বলে। ‘…আপনারা ঠিকই কইছেন। ভূগোল আর ইতিহাস আমাগো বাঙাল বানাইছে। আর বাঙাল হইলেও ক্ষতিডা কী? বাঙাল হওয়া কি অপরাধ? যোগেন মণ্ডল আমাগো সবার জন্য দেশ বানাইবেন কইলেন। আমরাও ধম্ম জাত ভুইল্যা ঝাপাইয়া থাইক্যা গেলাম পাকিস্তানে। তারপর আইজ দ্যাখেন আমাগো আর ওই দেশে জায়গা নাই। আর এইদেশেও আপনারা আমাগো জায়গা দিতে চান না। আমরা এখন যামু কুথায় বলতি পারেন?’ প্রশ্নটা পাক খায়। উত্তর নাগরিক সমাজ আর রাজনৈতিক সমাজের মানুষ কি আলাদা-আলাদা ভাবে দেবেন? দু’পক্ষের উত্তর কি মিলবে? রিপনের উপন্যাসের প্রশ্নকর্তা অবশ্য মানুষ নন! ‘বলতে বলতে পিঠ নীচু হয়ে যায় বাঙালের। চাদরটা খুলে পড়ে। নিমাইসহ সবাই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে অপলকভাবে। কাঁধের উপর থেকে লোকটার মাথাটা কোথায় গেল!’ পড়তে-পড়তে মনে হয় রাজপথ আলোকিত। কত হাসিমুখের হোর্ডিং, আর গলিপথে কবন্ধ মানুষেরা চাদর ঢেকে ঘুরছেন, চুপিচুপি।

দ্য কাফে টেবল-এর কর্তা-ব্যক্তিরা ‘এক ফুটপাথ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পুরোনো বইয়ের সম্ভারে’ অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখেছিলেন রমা মহিন্তার ‘হগ মার্কেটের ইতিকথা’। পুনরায় ছেপেছেন তাঁরা কিন্তু কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েও খোঁজ পাননি লেখকের বাড়ির মানুষজনের, আগের প্রকাশকের উত্তরসূরির। ১৯৮৩-র বই ফিরে এল ২০২৫-এ। গ্রামের ছেলে রতনলাল। গ্রামের শনি-মঙ্গলবারের হাট সে দেখেছে। কিন্তু এ-কেমন বাজার? ‘বড় বড় দালান। কোঠার মত দোকানঘর। লোকেরা সব বাজার নিয়ে বসেছে সেখানে।’ এই সেই হগ মার্কেটের বাজার, নিউ মার্কেট। বাজার বসাতে হগ সাহেবকে কম কাঠ-খড় পোড়াতে হয়নি। প্রতিযোগিতার শেষ নেই। বাজারে টেনে আনার জন্য গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বাড়ি উপঢৌকন পাঠাতেন। ‘সাহেব বাজারে ক্রমে ক্রমে ভিড় জমতে লাগল। সাহেব বিবিরা আসেন, বাজারের অলি-গলিতে ঘোরেন ও দেখেন। কোপ্তা, কোর্মা, রসালো ভোজ আর সেরি স্যামপেইনের জোয়ারে ভাসেন।’ সাহেবের বাজার জমছে আর রেগে উঠছেন হীরালাল শীল। তাঁর ধর্মতলা বাজারের সঙ্গে হগ সাহেবের বাজারের লড়াই। শেষ অবধি হগ সাহেবের জয়, সুকৌশলে সাত লক্ষ টাকায় হীরালালের বাজার কিনে নিলেন স্টুয়ার্ট হগ। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ। গাঁয়ের ছেলে রতনলালের কানে আসে একটানা কিচির মিচির শব্দ। পাখির বাজার।

পাখিরা আর বাজারে ডাকে না, সে তো ভালোই। পাখিরা কি আর গলির ভেতরেও ডাকে! অলি-গলি-চলি রাম। অলি-গলি-চলি রাম! বাংলা ভাষায় কতরকম করে আজকাল ছোট ছোট ঢাকা পড়া কথা জাগে। জাগুক, জেগে থাক। বাঁচুক বা না-বাঁচুক, সেই সব কথাপাখি কিছুক্ষণ ধরে ডাকুক।
মেটিয়াব্রুজ দর্জিমহল্লার কথকতা
মহঃ ফারুক ইকবাল
কালি কলম ও ইজেল, ৩২৫্
রানিগঞ্জ কয়লাঞ্চল: ধ্বস-আগুন ও মানুষ
সুমন কল্যাণ মৌলিক
প্যারালাল, ১৫০্
রুজভেল্টনগর
রিপন হালদার
তবুও প্রয়াস, ৩৫০্
হগ মার্কেটের ইতিকথা
রমা মহিন্তা
দ্য কাফে টেবল, ২০০্
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved