


রবীন্দ্রনাথ প্রায়শই আসতেন বসুদের বাড়িতে, সরাসরি ওপরের তলায় জগদীশচন্দ্রের পড়ার ঘরে চলে যেতেন তিনি। বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে নানান কর্মকান্ডের সাক্ষী ছিল এই বাড়ি। ১৯৩৭ সালের নভেম্বর মাসে জগদীশচন্দ্রের প্রয়াণ ঘটলে অবলা বসুকে সান্ত্বনা দিয়ে চিঠি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
অবলা বসু জন্মগ্রহণ করেছিলেন অবিভক্ত ভারতে, পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে তেলিরবাগের বিখ্যাত দাশ পরিবারে। যে-পরিবারের সন্তান সর্বজনপরিচিত চিত্তরঞ্জন দাশ, রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী অমলা দাশ, গোখলে মেমোরিয়ালের স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সরলা রায়, দুন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সতীশরঞ্জন দাস, সুপ্রিম কোর্টের পঞ্চম প্রধান বিচারপতি সুধীরঞ্জন দাস প্রমুখ। বিদূষী অবলা পরিচিত হওয়ার অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা শুনেছেন, তাঁকে তা জানিয়েওছিলেন এক চিঠিতে। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ এবং জগদীশচন্দ্র বসুর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সুবাদে অবলা বসুর সঙ্গেও খানিক বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের। তবে শুধু অবলা-জগদীশচন্দ্রই নয়, অবলার দিদি সরলা রায়ের সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ আলাপ এবং চিঠিপত্রে যোগাযোগ ছিল। সরলাকে তিনি গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা রূপকথা আর ছড়া সংগ্রহের জন্য উৎসাহ দেন। সরলার সংস্কৃত ভাষা চর্চাতেও তিনি আনন্দিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের বড়দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী প্রতিষ্ঠিত ‘সখী সমিতি’-র একজন অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন সরলা। সরলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রেই ‘সখী সমিতি’-তে অভিনয়ের জন্য ‘মায়ার খেলা’ নাটকটি রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ। উৎসর্গও করেন সরলাকে। ‘সখী সমিতি’র সক্রিয় সদস্য ছিলেন সরলা-অবলার ছোটবোন শৈলবালাও। সুধীরঞ্জন দাস ছিলেন শান্তিনিকেতনের প্রথমদিকের ছাত্র। চিত্তরঞ্জনের দ্বিতীয়া ভগ্নী খ্যাতনামা রবীন্দ্রসংগীত-শিল্পী অমলা দাশ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর প্রিয় সখী। এই সখীত্বের সুন্দর বর্ণনা আছে রবীন্দ্রনাথের বোনঝি সাহানা দেবীর স্মৃতিচারণায়:
কবিপত্নীর সঙ্গেই ছিল মাসিমার সবচেয়ে বেশি ভাব। তাঁকে কাকীমা বলে ডাকতেন। এই দুই সখীর একত্র অন্তরঙ্গ ভাবে গল্প আলাপাদির একটি চিত্র আছে রবীন্দ্রনাথের গানে, গানটি হচ্ছে—
ওলো সই, ওলো সই,
আমার ইচ্ছে করে তোদের মতো মনের কথা কই।
…এ গানটির কথা মাসিমার মুখেই শুনেছি, আর গানটিও তাঁকে অনেকবার গাইতে শুনেছি।

চিত্তরঞ্জন কন্যা অপর্ণা তাঁর পিতৃস্মৃতিকথায় জানিয়েছেন, তাঁদের রসা রোডের বাড়িতে গানের আসরে যাঁরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অমলা দাশের সমবেত সঙ্গীত শুনেছেন তাঁরা জীবনেও সে অপূর্ব সঙ্গীতের কথা ভুলতে পারবেন না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জগদীশচন্দ্র বসু ছিলেন পরস্পরের একমাত্র সমমাপের বন্ধু। জগদীশচন্দ্রের সূত্রে অবলা বসুর সঙ্গেও হার্দ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের। অবলার স্নেহময় রূপটি দেখলে তাঁর ছেলেবেলায় হারানো বৌঠানের কথা মনে পড়ে যেত। অবলার কাছেও তিনি অল্পদিনেই নিকট বন্ধু হয়ে ওঠেন।
স্কুলপালানো রবি আর এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ জগদীশ দুজনেই ছিলেন সেন্ট জেভিয়ার্সের ছাত্র। রবীন্দ্রনাথের থেকে এক ক্লাস ওপরে পড়তেন জগদীশচন্দ্র। কিন্তু তখন তাঁদের মধ্যে সখ্য হয়নি। তাঁদের যোগাযোগ হয় যখন জগদীশচন্দ্র ফোনোগ্রাফের মাধ্যমে ব্রাহ্ম সমাজের বিভিন্নজনের কণ্ঠ রেকর্ড করছিলেন। তবে সেই আলাপ তাঁদের মনে হয়তো দাগ কাটেনি।

ইউরোপে প্রথম বৈজ্ঞানিক মিশন শেষ করে ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে দেশে ফিরেছেন সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র। উঠেছেন ভগ্নীপতি আনন্দমোহন বসুর ১৩৯ ধর্মতলা স্ট্রিটের বাড়িতে। ইতিমধ্যে রয়্যাল সোসাইটির জার্নালে তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। বিলেতের বড় বড় কাগজে তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রতিভার প্রভূত প্রশংসা-সহ লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। সে খবর বেরচ্ছে এদেশের সংবাদপত্রেও। মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই লিখলেন, ‘বিজ্ঞান-লক্ষ্মীর প্রিয় পশ্চিমমন্দিরে/ দূর সিন্ধুতীরে,/ হে বন্ধু, গিয়েছ তুমি; জয়মাল্যখানি/ সেথা হতে আনি/ দীনহীনা জননীর লজ্জানত-শিরে, পরায়েছ ধীরে।’
কালক্রমে রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশচন্দ্র পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন। এই বন্ধুত্বের সূচনাকালের কথা আরও নির্দিষ্ট করে জানা যায় ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ২ নভেম্বর লন্ডন থেকে রবীন্দ্রনাথকে লেখা জগদীশচন্দ্রের পত্রে –
তিন বৎসর পূর্ব্বে আমি তোমার নিকট একপ্রকার অপরিচিত ছিলাম। তুমি স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া ডাকিলে। তার পর একটি একটি করিয়া তোমাদের অনেকের স্নেহবন্ধনে আবদ্ধ হইলাম। তোমাদের উৎসাহধ্বনিতে মাতৃস্বর শুনিলাম।
আর প্রবাসী-তে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ-জগদীশচন্দ্র বসুর পত্রের সূচনায় রবীন্দ্রনাথ লিখলেন –
সেই তাঁর ধর্ম্মতলার বাসা থেকে আরম্ভ করে আমাদের নির্জ্জন পদ্মাতীর পর্য্যন্ত বিস্তৃত বন্ধুলীলার ছবি।
ইউরোপ থেকে ফেরার খবর পেয়ে ম্যাগনোলিয়া ফুল নিয়ে রবীন্দ্রনাথ অভিনন্দন জানাতে গেলেন জগদীশচন্দ্রকে। কিন্তু সেদিন সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র কোথাও গিয়েছিলেন। তাঁর টেবিলের ওপর ফুলটি রেখে আসেন কবি। তারপর আবার যান, এবারে সঙ্গে ছিলেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ।
‘পিতৃস্মৃতি’ গ্রন্থে রথীন্দ্রনাথ স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, তাঁর কথাবার্তা কিছু মনে নেই। এতই ছোট ছিলেন তখন। কিন্তু এটা বুঝেছিলেন যে, জগদীশচন্দ্র উচ্ছ্বসিতভাবে ইউরোপ-ভ্রমণের কাহিনি অনর্গল বলে যাচ্ছেন আর রবীন্দ্রনাথ সাগ্রহে তা শুনছেন এবং মাঝে মাঝে দু’-জনে মিলে খুব হেসে উঠছেন।
জগদীশচন্দ্রের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের এই যাতায়াত প্রায় জগদীশচন্দ্রের মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। কোনও কোনওদিন রবীন্দ্রনাথ রয়ে যেতেন জগদীশ-অবলার কাছেই, রাতের খাওয়া সেরে যাবেন বলে, ওপরের তলার খোলা বারান্দায় বসে অনুরোধক্রমে গান গেয়ে শোনাতেন।

১৩৯ ধর্মতলা স্ট্রিটের বাড়িতে ত্রিপুরার মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্য-কে নিয়ে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ জগদীশচন্দ্রের বিদ্যুৎ-তরঙ্গীয় পরীক্ষাগুলি দেখাতে। ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে এই আলাপ পরবর্তীতে জগদীশচন্দ্রের জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের সূত্রেই রাধাকিশোর ও জগদীশচন্দ্রের মধ্যে এক হার্দ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞানসাধনায় মহারাজা অকৃপণভাবে অর্থসাহায্য করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও বন্ধুত্ব গভীর হল জগদীশচন্দ্রের। শুরু হল উভয়পক্ষের মধ্যে চিঠিপত্র দেওয়া-নেওয়া।
শিলাইদহে রেশমগুটি চাষে উৎসাহী হয়ে উঠছেন রবীন্দ্রনাথ। এ বিষয়ে তিনি জগদীশচন্দ্রকে জানালে তিনি আগ্রহী হয়ে শিলাইদহে যান এবং কিছু রেশমগুটি চাষের জন্য সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। রেশমগুটিগুলির পরিণতির কথা লিখছিলেন তাঁর চিঠিতে। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশচন্দ্র উভয়ের চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিল। তবে তাঁদের চেষ্টা ব্যর্থ হলেও পরবর্তীকালে ঝাড়গ্রামে অবলা রেশমগুটির চাষকে বড় আকারে করে সিল্ক উৎপাদনের ব্যবস্থা করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের পুত্র-কন্যাদের সঙ্গেও জগদীশচন্দ্রের স্নেহের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তা জানা যায় রথীন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণ থেকে। রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে যেমন গল্প করতেন, নানারকম খেলা খেলতেন, তেমনি ছয় বছরের ছোট্ট মীরা ছিল তাঁর ‘ক্ষুদ্র বন্ধু’। তার সঙ্গে ঠাট্টা করে সম্পর্ক পাতাতেন রবীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠিতে।
পরের বছর জগদীশচন্দ্র শিলাইদহে যান এপ্রিল মাসে, রোজ একটি করে গল্প লিখে পড়াতে হবে এমনই ছিল বন্ধুর কাছে জগদীশচন্দ্রের আবদার। এবারে অবলা সঙ্গে গিয়েছিলেন বলে আন্দাজ করা যায়, কারণ অন্যান্যবারের মতো তাড়াতাড়ি না ফিরে কয়েকদিনের জন্য শিলাইদহে ছিলেন জগদীশচন্দ্র।
রবীন্দ্রনাথ যেমন বিজ্ঞানের কাজে জগদীশচন্দ্রকে উৎসাহিত করতেন, জগদীশচন্দ্র তাঁকে অনুপ্রাণিত করতেন লেখালিখির বিষয়ে। তাঁর অনুরোধেই ‘কর্ণ-কুন্তী সংবাদ’ কবিতাটি রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ একসময় পুরীতে জমি কিনে, দুই বন্ধু মিলে বাড়ি তৈরির পরিকল্পনা করেছেন।

১৯০০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে বৈজ্ঞানিক মিশনে দ্বিতীয়বার ইউরোপে গেলেন সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র। সম্ভবপর হল রবীন্দ্রনাথের প্রচেষ্টায়। ত্রিপুরার মহারাজের দেওয়া বিজ্ঞানাগারের জন্য সংগৃহীত অর্থই পাথেয় হল জগদীশচন্দ্রের।
কবি নবীনচন্দ্র সেনের পুত্র নির্মলচন্দ্র এইসময় ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিলেতযাত্রা করবেন বলে স্থির হয়েছিল। নবীনচন্দ্র পুত্রের জন্য কয়েকটি পরিচয়পত্র চাইলে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে চিঠিতে লেখেন যে আশুতোষ চৌধুরীর ভাই অমিয়নাথ এবং জগদীশচন্দ্র বসুর স্ত্রীকে তিনি বিষয়টি জানিয়ে চিঠি লিখেছেন। বন্ধুপত্নীর সঙ্গেও ক্রমে চিঠিপত্র আদানপ্রদান শুরু হয়েছে কবির।
ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডে এলেন সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র। সেপ্টেম্বর মাসে ব্রাড্ফোর্ডে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের পদার্থবিজ্ঞান শাখায় একটি নিবন্ধ পাঠ করেন। তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গগ্রহণের যন্ত্র কিভাবে কাজ করে, তা নিয়ে পূর্বে জগদীশচন্দ্র ও ইংল্যান্ডের খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিক অলিভার লজের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। ব্রাড্ফোর্ড সম্মেলনেই লজ-এর ধারণা পরিবর্তিত হয় এবং তিনি জগদীশচন্দ্রের প্রভূত প্রশংসা করেন। সেকথা তিনি রবীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানান।
এর ঠিক পরে পরেই অধ্যাপক ব্যারেটের কাছ থেকে ইংল্যান্ডে অধ্যাপনার কাজ নিয়ে থেকে যাওয়া ও গবেষণা করার প্রস্তাব নিয়ে চিঠি আসে জগদীশচন্দ্রের কাছে। ভারতবর্ষ ছেড়ে বেশিদিন বাইরে থাকার কথা ভাবতে পারেন না জগদীশচন্দ্র। অন্যদিকে গবেষণা করার এমন সুযোগ দেশে নেই। এই টানাপোড়েনে তিনি বন্ধু রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হন। রবীন্দ্রনাথ জগদীশচন্দ্রের বিদেশে থেকে কাজ করারই পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁকে আর্থিক সহায়তাও করছিলেন। শেষপর্যন্ত জগদীশচন্দ্রই রাজি হননি।
ইংল্যান্ডে জগদীশচন্দ্রের কাছে ‘গল্পগুচ্ছ’ পাঠান রবীন্দ্রনাথ। এইসময়ের চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের গল্প অনুবাদ করে বিদেশি পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আগ্রহও দেখান জগদীশচন্দ্র। নিবেদিতাকে দিয়ে সে কাজ কিছুটা করিয়েওছিলেন।
ইতিমধ্যে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লেন জগদীশচন্দ্র। ডাক্তার ক্রম্বি জানালেন সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য জরুরি শীঘ্র অপারেশন। দূর থেকে আশ্বাস দেন রবীন্দ্রনাথ। জগদীশচন্দ্রকে এও লেখেন যে, তিনি যদি লিখতে অসমর্থ হন, তাহলে যেন অবলা চিঠি লিখে তাঁদের খবরাখবর দেন। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ১১ ডিসেম্বর নিউ ক্যাভেন্ডিস স্ট্রিটে অপারেশন হল। সারা বুল, নিবেদিতা ও অবলা বসুর অক্লান্ত সেবাযত্নে সুস্থ হয়ে ওঠেন জগদীশচন্দ্র। সুস্থ হয়ে উঠে জগদীশচন্দ্র অবলার রান্না করা মাছের ঝোলের বিশেষ প্রশংসা করেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। রবীন্দ্রনাথও এরপর একাধিক চিঠিতে কলকাতায় জগদীশচন্দ্রের বাড়িতে অবলার হাতের মাছের ঝোল খাওয়ার স্মৃতি সকৌতুকে উসকে দেন।

কন্যা মাধুরীলতাকে দিয়ে কপি করিয়ে ‘নৈবেদ্য’ কবিতার খাতা রবীন্দ্রনাথ পাঠিয়েছিলেন জগদীশচন্দ্রকে। অবলা চিঠিতে ‘নৈবেদ্য’ পড়ার প্রতিক্রিয়ায় তাঁদের মুগ্ধতার কথা জানান কবিকে:
নৈবেদ্যের কবিতাগুলি পড়িয়া আমরা বিশেষ আনন্দ ও উপকার লাভ করিয়াছি, এত ভাল লাগিয়াছে যে ভুলচুকের নানা আশঙ্কা সত্ত্বেও আপনাকে তাহা না জানাইয়া পারিলাম না।
১৯০১ সালের মে মাসে রয়্যাল ইন্স্টিটিউশনের সান্ধ্য সম্মেলনে ‘যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক তাড়নায় জড়পদার্থের সাড়া’ সম্পর্কে জগদীশচন্দ্র বক্তৃতা দিলেন। বিভিন্ন পরীক্ষার সাহায্যে প্রমাণ করলেন যে জীব ও জড়ের সাড়ালিপি একই ভঙ্গিতে লেখা।
নিবেদিতা ও অবলা বসু দুজনেই রবীন্দ্রনাথকে লিখেছেন রয়্যাল সোসাইটির সান্ধ্যবক্তৃতায় জগদীশচন্দ্রের সাফল্যের কাহিনি। লিখেছিলেন জগদীশচন্দ্র নিজেও। নিবেদিতা ও অবলা বসু দুজনেই রবীন্দ্রনাথকে লিখেছেন রয়্যাল সোসাইটির সান্ধ্যবক্তৃতায় জগদীশচন্দ্রের সাফল্যের কাহিনি। লিখেছিলেন জগদীশচন্দ্র নিজেও। অবলা চিঠিতে লিখছেন–
আপনিও যদি সেই বৈজ্ঞানিকমন্ডলীর মধ্যে এই ক্ষুদ্র ভারতবর্ষীয়ের নির্ভীক সত্যপ্রচার দেখিতেন তাহা হইলে স্তম্ভিত হইতেন। – সেদিন আর লোকে কি বলিবে সে ভয় ছিল না, “আমি সত্য লইয়া আসিয়াছি তোমরা শ্রবণ কর” এই ভাবই প্রকাশ হইতেছিল।
বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ‘আচার্য জগদীশচন্দ্রের জয়বার্ত্তা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ সেদিনের সভার একটি ছবির মতো বর্ণনা দিয়েছিলেন। অবলা-র চিঠির উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লেখেন –
আমার গর্ব্ব আমি গোপন করিতে পারিতেছি না– আমি সকলকে জয়সংবাদ জানাইয়া বেড়াইতেছি। ত্রিপুরার মহারাজকে কাল টেলিগ্রাফ করিয়া দিয়াছি।
এইসময় রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠাকন্যা মাধুরীলতার বিবাহ আসন্ন ছিল। সেখানে উপস্থিত থাকতে পারবেন না বলে জগদীশচন্দ্র জোয়ান অফ আর্ক গ্রন্থটি উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছিলেন। অবলা চিঠিতে জানালেন –
বেলার শুভবিবাহ ও স্বামীসৌভাগ্যের সংবাদ পাইয়া আমরা আহ্লাদিত হইয়াছি।

ইংল্যান্ডের বৈজ্ঞানিকসমাজের শ্রেণীবিভাজনের চাপ এসে পড়ল জগদীশচন্দ্রের ওপরও। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুন, রয়্যাল সোসাইটিতে ‘অন দি ইলেকট্রিকাল রেসপন্স অফ ইনঅরগানিক সাবস্টেন্সেস’ শীর্ষক বক্তৃতা দেন। বক্তৃতায় উপস্থিত সার বার্ডন স্যান্ডারসন বলেন, পদার্থের অনুভূতি সম্পর্কে গবেষণা শারীরবিজ্ঞানীদের এক্তিয়ারভুক্ত, অতএব সে-বিষয়ে জগদীশচন্দ্রের চর্চা করার অধিকার নেই। তিনি জগদীশচন্দ্রকে তাঁর নিবন্ধটিতে কিছু পরিবর্তনের পরামর্শও দেন। জগদীশচন্দ্র তা মেনে নেননি। এই বক্তৃতার ফলে স্যান্ডারসন ও ওয়ালার দুই বিজ্ঞানীই জগদীশচন্দ্রের প্রতি অসন্তুষ্ট হন। বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় জগদীশচন্দ্র যখন বিষণ্ণ ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন, তাঁকে নিয়ত উৎসাহ দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। চিঠিতে উৎসাহ দেওয়া ছাড়াও, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় জগদীশচন্দ্রের সম্বন্ধে নিজে লিখেছেন বা অন্যদের লিখতে উৎসাহিত করেছেন। জগদীশচন্দ্রের আর্থিক অবস্থা তখন বেশ খারাপ। আবার ত্রিপুরারাজের কাছে হাত পাতলেন রবীন্দ্রনাথ, টাকা পাঠালেন জগদীশচন্দ্রকে। বিলেতে কতিপয় বিজ্ঞানী যে জগদীশচন্দ্রের বিরূপতা করছেন সে বিষয়ে রবীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানিয়েছিলেন অবলাও।
রবীন্দ্রনাথের কন্যা রেণুকার বিবাহ হয় সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে। সত্যেন্দ্রনাথকে হোমিওপ্যাথি শিক্ষার জন্য আমেরিকা পাঠানোর বন্দোবস্ত করেন রবীন্দ্রনাথ। অবশেষে সত্যেন্দ্রনাথ লন্ডনে আসেন পড়াশোনা করতে। বসুদম্পতি তখন ইয়েলিং-এ ছিলেন। জগদীশচন্দ্রের আমন্ত্রণে সেখানে যান সত্যেন্দ্রনাথ।
রয়্যাল সোসাইটিতে বক্তৃতা দিলেন জগদীশচন্দ্র। অন্য কোনও বিজ্ঞানসংস্থার অধিবেশনে পরিবেশিত তথ্যাবলী সাধারণত রয়্যাল সোসাইটি প্রকাশ করতেন না। কিন্তু রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে জগদীশচন্দ্র যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেই নিবন্ধ প্রকাশের ব্যাপারে তাঁরা চিরাচরিত রীতির ব্যতিক্রম করেছিলেন। শুধু শর্ত দিয়েছিলেন যে প্রকাশের আগে নিবন্ধটি সোসাইটির অধিবেশনে পাঠ করতে হবে। শারীরবিজ্ঞানীদের পক্ষ থেকে যদি কোনও আপত্তি না তোলা হয়, তাহলে নিবন্ধটি প্রকাশ করা হবে। ইতিমধ্যে জগদীশচন্দ্রের বিরোধী শারীরবিজ্ঞানী ওয়ালার লন্ডনের একটি বিজ্ঞান পত্রিকায় এক নিবন্ধ প্রকাশ করেন যা প্রায় রয়্যাল সোসাইটিতে পঠিত জগদীশচন্দ্রের নিবন্ধের হুবহু প্রতিলিপি। বিষয়টি লিনিয়ান সোসাইটি জগদীশচন্দ্রের গোচরে এনে এ-ব্যাপারে আলোকপাত করতে অনুরোধ করেন। তবে এই সোসাইটির সম্পাদকের কাছে জগদীশচন্দ্র রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তার একটি প্রতিলিপি ছিল। তিনিই প্রথম বিরোধী জীববিজ্ঞানীদের দুরভিসন্ধির সন্ধান পান। শেষপর্যন্ত লিনিয়ান সোসাইটির উদ্যোগে প্রকৃত ঘটনা সর্বসমক্ষে আসে। এই ঘটনায় গভীরভাবে আহত হয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র। চিঠিতে অবলা বিষয়টির কিছু কিছু রবীন্দ্রনাথকে জানাচ্ছেন। যদিও তিনি লিখেছেন যে, জীববিজ্ঞানীরা জগদীশচন্দ্রের থিওরি মেনেছেন, বাধা দিচ্ছেন পদার্থবিজ্ঞানীরা। জগদীশচন্দ্রের অনুপস্থিতিতে এক বিজ্ঞানপাগল যুবক অবলাকেই টানা দু’ঘণ্টা উৎসাহব্যঞ্জক কথা শুনিয়ে গিয়েছেন বলে জানাচ্ছেন। বন্ধু রবীন্দ্রনাথকে তাঁদের সঙ্কটের সময়ের যাবতীয় কথা জানাতে আগ্রহী হয়ে রয়েছেন অবলা। যদিও ব্যস্ততায় তা সবটুকু সম্ভব হচ্ছে না।

তাঁদের ফেরার খবর পেয়ে ১৯০২ সালের ১৩ অক্টোবর হাওড়া স্টেশনে সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্রকে অভ্যর্থনা করার জন্য হাজির হন রবীন্দ্রনাথ। এইসময় রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী খুব অসুস্থ ছিলেন।
১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ২৯ নভেম্বর মৃণালিনী দেবীর জীবনাবসান হল। স্ত্রীর মৃত্যুর চারদিন পর রবীন্দ্রনাথ পার্শিবাগানে জগদীশচন্দ্রের বাড়িতে যান।
বিলেত থেকে ফিরে শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র। পৌষ উৎসবের কিছুদিন পরে তাঁর এই প্রথম শান্তিনিকেতন ভ্রমণে সঙ্গী ছিলেন অবলাও।
১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি লর্ড কার্জনের শাসনকালে ব্রিটিশ সরকার সি.আই.ই.(Companion of the Indian Empire) উপাধিতে ভূষিত করল জগদীশচন্দ্রকে। ২ ফেব্রুয়ারি সংগীত সমাজের পক্ষ থেকে সফল পাশ্চাত্য সফর ও সি. আই. ই. উপাধিলাভ উপলক্ষ্যে জগদীশচন্দ্রকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। এই অনুষ্ঠানের জন্য রবীন্দ্রনাথ ‘জয় তব হোক জয়’ গানটি রচনা করেন।
এইসময় শান্তিনিকেতনে ভর্তি হলেন আনন্দমোহন বসুর পুত্র ও জগদীশচন্দ্রের ভাগ্নে অরবিন্দমোহন।
রবীন্দ্রনাথের কন্যা রেণুকা অসুস্থ হয়ে পড়লে তার শ্বাসকষ্ট নিবারণের জন্য বিশেষ যন্ত্র তৈরি করে দেন জগদীশচন্দ্র। রেণুকার স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য আলমোড়ায় যাওয়ার ব্যবস্থা করতে রবীন্দ্রনাথ একাধিকবার গেলেন পার্শিবাগানে জগদীশচন্দ্রের কাছে। শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মাচর্যাশ্রমের জন্য কমিটি তৈরি করে তাতে জগদীশচন্দ্রকে অন্তর্ভুক্ত করলেন।
১৯ মার্চের চিঠিতে জগদীশচন্দ্র সন্তান-সম্ভবা অবলার খবর জানাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথকে। যে সন্তানটি মারা যায় জন্মানোর আগেই। কন্যার জন্মের সময়ে প্রাণসংশয় হয়েছিল অবলারও।
১৪ সেপ্টেম্বর রেণুকার মৃত্যু হল। রবীন্দ্রনাথের নিজেও তখন বেশ অসুস্থ। তারই মধ্যে বেশ পরপর কয়েকদিন জগদীশচন্দ্রের বাড়িতে গিয়েছিলেন তিনি। বন্ধুত্ব আর শান্তিনিকেতনের আশ্রমের কাজ এবং প্রিয়জনের বিয়োগব্যথা– তাঁদের বন্ধন তখন সর্বতই। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের বড়দিনের সময় শিলাইদহে কাটিয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র-অবলা। তখনও সন্তানবিয়োগের বেদনায় বিহ্বল অবলা। নিয়ত স্বজনহারানো রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শে এসে তাঁর শোকতপ্ত মন শান্ত হয়।
১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ থেকে জগদীশচন্দ্রকে চিঠিতে মনে করিয়ে দেন যে তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একবার বেড়াতে যাবেন বলে প্রতিশ্রুত রয়েছেন। বছর চারেক পরে ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে সেই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয় বুদ্ধগয়া ভ্রমণে। ৮ অক্টোবর শনিবার তাঁরা সদলবলে বুদ্ধগয়া রওনা হন।
১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে জগদীশচন্দ্র ও অবলা রবীন্দ্রনাথের কাছে শিলাইদহে যান এবং পদ্মার ওপর বোটে থাকেন।
স্বদেশি আন্দোলনের শুরু থেকেই রবীন্দ্রনাথ এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ আগস্ট বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কলকাতার টাউন হলে যে বিরাট সভা হয় রবীন্দ্রনাথ সেখানে ‘অবস্থা ও ব্যবস্থা’ বক্তৃতাটি দেন। এরপরে প্রায়শই নানা জায়গায় বিভিন্ন জনসভাতে রবীন্দ্রনাথ বক্তৃতা দিয়েছেন। এইসময় স্বদেশি সংগীত রচনা করেছেন নিয়মিতই। সেইসব গান গাওয়া হত জনসভাগুলিতে। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর থেকে বঙ্গভঙ্গ কার্যকরী হবে বলে সরকার থেকে ঘোষণা করা হলে ওই দিনটিতে রাখীবন্ধন উৎসব পালন করা হবে বলে স্থির করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ও রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী মিলিতভাবে এই উৎসবের পরিকল্পনা করেন। ১৬ অক্টোবর সকালবেলায় রবীন্দ্রনাথ গঙ্গার ঘাটে স্নান করে এসে রাখীবন্ধনের সূচনা করেন। রাখীবন্ধন উৎসবের পর ফেডারেশন হল প্রাঙ্গণে এক বিরাট জনসভা হয়।
রবীন্দ্রনাথ কখনও দলগত রাজনীতি করেননি। বরং নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে যাঁরা সেতু হিসেবে কাজ করেছেন, তাঁদেরই একজন ছিলেন।
১৯০৫ সালের অক্টোবর মাসে জগদীশচন্দ্র-অবলা দার্জিলিং যান। সেখান থেকে ১৫ অক্টোবরের চিঠিতে জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে লিখছেন, ‘তোমার রাখী সঙ্গীত পড়িলাম। তোমার লেখনী স্বর্ণময়ী হউক।’ ১৬ অক্টোবর, বঙ্গভঙ্গের দিন সারা কলকাতা জুড়ে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালন করা হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ প্রায়শই আসতেন বসুদের বাড়িতে, সরাসরি ওপরের তলায় জগদীশচন্দ্রের পড়ার ঘরে চলে যেতেন তিনি। বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে নানান কর্মকান্ডের সাক্ষী ছিল এই বাড়ি। নতুন কোনও স্বদেশি গান রচনা করলেই রবীন্দ্রনাথ চলে আসতেন এখানে, জগদীশচন্দ্রের ড্রয়িং রুমে রাখা নতুন প্যাথেফোন-এ হেমেন্দ্রমোহন বসু রেকর্ড করে রাখতেন সেইসব গান।

স্বদেশি আন্দোলন প্রসঙ্গে ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ের সেইসময়ের ছাত্রী পুণ্যলতা চক্রবর্তী স্মৃতিচারণ করেছেন–
তারপরে এল স্বদেশী আন্দোলন– মেরী কার্পেন্টার হলে মহিলাদের অনেক সভা দেখলাম। পাশের পার্কে (তখন নাম ছিল গ্রীয়ার পার্ক) বড় বড় জনসভায় নেতাদের বক্তৃতা শুনবার জন্যও ব্রাহ্মবালিকা শিক্ষালয়ে অনেক মহিলাদের সমাগম হত। বঙ্গ ভঙ্গ বা রাখীবন্ধনের দিনে তো মহিলাদের ভিড়ে স্কুল বাড়ীর ঘরে, বারান্দায়, ছাতে ও প্রাঙ্গণে তিল ধারণের স্থান ছিল না। আন্দোলনের উত্তেজনায় লিপ্ত না হয়েও নারীদের দেশসেবা ও সমাজসেবার সব কাজে অংশ নিতেন শ্রীযুক্তা বসু। তাঁর বাড়িতেই মেয়েদের স্বদেশী গান শেখার ক্লাস বসতো– রবীন্দ্রনাথ নিজে এসে স্বরচিত নূতন নূতন গান শিখিয়ে যেতেন।
ইতিমধ্যে অরবিন্দমোহন যে শান্তিনিকেতন আশ্রমে ভালো আছেন তা বোঝাতে চিঠিতে অবলাকে আশ্বস্ত করছেন রবীন্দ্রনাথ। অবলার মধ্যে স্নেহের প্রাচুর্য ছিল। তারই কিছু ভাগ চেয়েছেন কবিও। দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী, কবির বৌঠান কাদম্বরী দেবীর স্নেহশীল আচরণের উল্লেখে আন্দাজ পাওয়া যায় অবলা-জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতা কতটা নিবিড় হয়ে উঠেছিল।

১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়। অন্যসূত্রে সংবাদ পেয়ে জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে সান্ত্বনা জানান লন্ডন থেকে লেখা ১৯ ডিসেম্বর তারিখের চিঠিতে। কিন্তু এর উত্তরে রবীন্দ্রনাথ জানান যে, মানুষ এত কষ্টে আছে যে সেখানে ব্যক্তিগত দুঃখের জায়গা আর নেই। কবি তখন ‘আপন হতে বাহির হয়ে’ স্বদেশের পরিস্থিতির বিষয়ে গভীরভাবে ভাবছেন। কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশনে অন্তর্দ্বন্দ্ব তথা কংগ্রেস দলের ভাঙন তাঁকে বিচলিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথের এই চিঠি পড়ে অবলা বিনম্র শ্রদ্ধায় তাঁকে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে লিখছেন –
আমাদের হৃদয় আপনার সমুদয় শোকদুঃখে আন্দোলিত ও ব্যথিত। আপনার বিপদে আমরা যেমন কষ্ট পাই, আপনার ধৈর্য্য ও ঈশ্বর প্রীতি দেখিয়া আমরা সেইরূপ আশ্বস্ত হই। আপনি যে সব গুরুতর আঘাত পাইতেছেন, তাহা সাম্লাইয়া প্রকৃত ঈশ্বরপ্রেমিকের মত আরও গভীরতমভাবে সাধু কার্য্যে ও চিন্তাতে মনোনিবেশ করিতেছেন। ইহাকেই প্রকৃত ঋষিভাব বলা যায়। আপনার অসামান্য সহ্যগুণ দেখিয়া আমি স্তম্ভিত হইয়াছি।
অন্যদিকে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে জগদীশচন্দ্রকে লেখা চিঠিতে কবি স্মরণ করেছেন বৌঠাকরুণ অবলাকে। তিনি লিখছেন–
শরৎ বহু দিনের পর তোমাদের ওখানে দিশি রান্না খাইয়া এবং বৌঠাকুরাণীর শাড়িপরা স্নিগ্ধমূর্তি দেখিয়া ভারি খুশি হইয়া বেলাকে চিঠি লিখিয়াছে।… বৌঠাকরুণকে আমার কথাটা স্মরণ করাইয়া দিয়ো– সমুদ্রের এপারের কালো বন্ধুদের ভাগে হৃদয়ের একটা অংশ রাখিয়া দেন যেন।
২০ মার্চ ১৯০৮ তারিখের চিঠিতে অবলা রবীন্দ্রনাথকে জানাচ্ছেন–
প্রাদেশিক অধিবেশনে আপনার বক্তৃতা পড়িয়া সকলে চমৎকৃত হইয়াছে, ইহাতে আমাদের হৃদয় আনন্দে নৃত্য করিতেছে। আপনি এই সঙ্কটের সময় দেশবাসী সকলকে একমন্ত্রে দীক্ষিত করিয়া বঙ্গদেশকে সকলের শীর্ষস্থানীয় করিয়াছেন।
গ্রামপ্রধান দেশ ভারতবর্ষ। পল্লীগ্রামের শ্রীবৃদ্ধি না করলে এদেশের উন্নতিসাধন হবে না এ কথা অবলা বারবারই বলেছেন ও লিখেছেন এবং নিজের কর্মের ভেতর দিয়েও তা করার চেষ্টা করে গিয়েছেন। পল্লীসমিতি গঠনের দিকে নজর দেন রবীন্দ্রনাথও। তাঁর মনে হয়েছিল গ্রামের মানুষের সঙ্গে প্রকৃত যোগাযোগ না গড়ে তুললে দেশের জন্যে কোনও বড় কাজ সম্ভব নয়। এ বিষয়ে তিনি অবলার সঙ্গে পত্রালাপও করেছেন।

আমেরিকা পৌঁছানোর কিছুদিন পর ২০ নভেম্বর অবলা রবীন্দ্রনাথকে লিখছেন –
লণ্ডন ছাড়িয়া আপনাকে পত্র লিখি নাই বটে, কিন্তু সর্ব্বদাই আপনার কথা ভাবিতেছি এবং আমরা কত সময় আপনাকে নিকটে পাইবার জন্য উৎসুক হইয়াছি। এ সময় আপনি আমাদের সঙ্গে আমেরিকা থাকিতে পারিলে কত সুখী হইতাম। রথীদের ত যাইবার সময় হইয়াছে, আপনি কি আসিতে পারেন না?
নতুন দেশ দেখে নানা কথা জানাতে ইচ্ছা করছে, অথচ চিঠিতে কি সব লেখা সম্ভব? তাই অবলা লিখছেন:
এত কথা জমিতেছে, যে, আপনি এখানে থাকিলে খুব সুখে থাকা যাইত। চিঠিতে কিছু লেখা যায় না।
একথা বলেও নানা কথা জানাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথকে। তাঁরা এক মাস নদীর পাড়ে মিসেস বুলের একটা বাড়িতে থাকতেন। সেখানে নদী দেখে অবলার গঙ্গার কথা মনে পড়ত। তবে রথীন্দ্রনাথ নিশ্চয় তাঁর পিতাকে আমেরিকার নানা কথা লিখেছেন, এই বলে নিজের কথা সংক্ষিপ্ত করছেন অবলা।
রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেইসময় উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত ছিলেন। সেখানে তিনি জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতার ব্যবস্থা করে দেন। পরীক্ষানিরীক্ষার কাজেও জগদীশচন্দ্রের সহকারীর ভূমিকায় নামেন রথীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথের পঞ্চম গীতিসংকলন গান প্রকাশিত হয় ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে। গ্রন্থটিতে রবীন্দ্রনাথের একটি সাম্প্রতিক আলোকচিত্র ছাপা হয়েছিল। একের পর এক প্রিয়জনের মৃত্যু, রাজনৈতিক সংকট, অসুস্থতা ও অন্যান্য নানাকিছু রবীন্দ্রনাথকে মানসিকভাবে দীর্ণ করে ফেলেছিল। তারই ছাপ পড়েছিল ছবিটিতে। পুস্তকটির এক কপি তিনি আমেরিকায় জগদীশচন্দ্র বসুর কাছে পাঠালে ছবিটি দেখে চিঠিতে অবলা দুঃখিত হয়ে লিখছেন যে তিনি দেশে থাকলে এমন ছবি ছাপাতে দিতেন না। ছবিটি দেখে তাঁর জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন বন্ধু জগদীশও। এই চিঠিতেই অবলা প্রথম মেয়েদের জন্য কাজ করার কথা লিখছেন এবং সে বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহায্য চাইছেন।
১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে চৈতন্য লাইব্রেরির উদ্যোগে মিনার্ভা থিয়েটারে হীরেন্দ্রনাথ দত্তের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘পথ ও পাথেয়’ প্রবন্ধটি পাঠ করেন। রবীন্দ্রনাথ উগ্র জাতীয়তাবাদের কুফল বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করে দেন।
এ কথা যদি সত্যই হয় তবে বিদ্বেষের কারণটি যখন চলিয়া যাইবে, ইংরেজ যখনি এ দেশ ত্যাগ করিবে, তখনই কৃত্রিম ঐক্যসূত্রটি তো একমুহূর্তে ছিন্ন হইয়া যাইবে। তখন দ্বিতীয় বিদ্বেষের বিষয় আমরা কোথায় খুঁজিয়া পাইব? তখন আর দূরে খুঁজিতে হইবে না, বাহিরে যাইতে হইবে না, রক্তপিপাসু বিদ্বেষবুদ্ধির দ্বারা আমরা পরস্পরকে ক্ষতবিক্ষত করিতে থাকিব।…
নানাদিগাভিমুখী মঙ্গলচেষ্টার বৃহৎ জালে স্বদেশকে সর্বপ্রকারে বাঁধিয়া ফেলো, কর্মক্ষেত্রকে সর্বত্র বিস্তৃত করো– এমন উদার করিয়া এত দূর বিস্তৃত করো যে, দেশের উচ্চ ও নীচ, হিন্দু মুসলমান ও খৃস্টান, সকলেই যেখানে সমবেত হইয়া হৃদয়ের সহিত হৃদয়, চেষ্টার সহিত চেষ্টা সম্মিলিত করিতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের এরকম মন্তব্য অবলার পছন্দ হচ্ছিল না। তিনি সরাসরি রবীন্দ্রনাথকে না লিখে পালিতপুত্র অরবিন্দমোহনের কাছে তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করলেন। এই চিঠি অরবিন্দমোহন দেখিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথ খুবই দুঃখ পেয়ে ১৯ নভেম্বর অরবিন্দমোহনকে অবলার যুক্তির ভুলগুলি দেখিয়ে লিখলেন,
একথা নিশ্চয় মনে রাখতে হবে দেশ আমাদের দেবতা নয়– অর্থাৎ ঈশ্বরের পরিবর্ত্তে আমরা দেশকে বরণ করতে পারিনে। দৈশিকতা (প্যাট্রিয়টিজ্ম্) আমাদের আত্মাকে চরম আশ্রয় দিতে পারবেনা, আমি মনুষ্যত্বকে বরণ করে নিয়েছি– আমি হীরের মূল্যে কাচ কিনব না– দৈশিকতা যে মনুষ্যত্বকে লঙ্ঘন করবে এত আমি আমার জীবনে ঘটতে দিতে পারব না– সেই পথে দু পা বাড়িয়েই দেখলুম পারলুম না – দেশকে ছাড়িয়ে যদি ধর্ম্মকে যদি বিশ্বমানবকে না দেখতে পাই, যদি দেশের সংস্কারে আমার ঈশ্বরকে আচ্ছন্ন করে তাহলে আমি আমার আত্মার খাদ্য হতে বঞ্চিত হই।
এরপর অবলার যে চিঠি পাওয়া যায় তা ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিলের। ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ের দায়িত্ব নিয়েই অবলার মনে হয়েছে মেয়েদের শিক্ষার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরামর্শের কথা।
এর উত্তরে ১৩ এপ্রিল রবীন্দ্রনাথ তাঁকে একটি বড় চিঠি লেখেন। ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রতি অরবিন্দমোহনের অতিরিক্ত আগ্রহ অবলা পছন্দ করেননি। রবীন্দ্রনাথ লেখেন –
অরবিন্দ সম্বন্ধে আপনি আমাকে কিছু বলবেন একথা আমি অনেকদিন থেকে প্রত্যাশা করে আছি। কারণ অরবিন্দকে যখন আমার হাতে মানুষ হবার জন্যে আপনি দিয়েছিলেন তখন তার সঙ্গে আমার চিরন্তন মঙ্গলের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। এখন থেকে অরবিন্দকে নিয়ে যখন যাই করুন না কেন আমাদের এই সম্বন্ধটিকে হিসাবের মধ্যে আন্তেই হবে।
… বোলপুর বিদ্যালয়ের সঙ্গে অরবিন্দের একটি সত্যকার যোগ স্থাপনা হয়েছে তবে সে জন্যে কিছুমাত্র উদ্বিগ্ন হবেন না, বরঞ্চ অরবিন্দের জন্য আনন্দিত হবেন।

নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির পর ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ২৩ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথকে শান্তিনিকেতনে সম্বর্ধনা দেওয়া হয় জগদীশচন্দ্রের সভাপতিত্বে। কিন্তু সভাস্থ কিছু ব্যক্তির আচরণে ক্ষুব্ধ রবীন্দ্রনাথ বিরূপতাপূর্ণ মন্তব্য করেন। সভার শেষে সকলেই অভিমান করে জলযোগ না করে বোলপুরে দাঁড়িয়ে থাকা স্পেশাল ট্রেনে উঠে পড়েন। রবীন্দ্রনাথ পরে ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় প্রকাশ্যে এবং রামানন্দ, জগদীশচন্দ্র প্রমুখের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন।

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর জগদীশচন্দ্রের ঊনষাটতম জন্মদিনে বসু বিজ্ঞানমন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন হয়। জগদীশচন্দ্রের অনুরোধে ‘আবাহন’ শিরোনাম দিয়ে ‘মাতৃমন্দির পুণ্য অঙ্গন’ গানটি লিখে পাঠান রবীন্দ্রনাথ। তবে শারীরিক ক্লান্তির কারণ জানিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থেকে আগের দিন কলকাতা ত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ। কবির জীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল লিখেছেন সম্ভবত তিনি অবলাকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের খবর পেয়ে নাইটহুড ত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ। ২ জুনের চিঠিতে জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে লিখলেন, ‘বন্ধু তুমি ধন্য।’
১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২৬ ডিসেম্বর আবার রবীন্দ্রনাথকে লেখা অবলা বসুর চিঠি পাওয়া যায়। চিঠিতে বিদ্যাসাগর বাণীভবনের জন্য অর্থসংগ্রহের চেষ্টার প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি নাটক অভিনয়ের অনুমতি চেয়েছেন অবলা।
১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে অসুস্থতার জন্য রবীন্দ্রনাথ অবলার আমন্ত্রণে বাণীভবনে আসতে পারেননি। এই খবর জানানোর জন্য অবলাকে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিতে হয়েছিল। অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে খানিক রূঢ় ভাষাতেই লিখেছিলেন অবলা। তবে চিঠির শেষে কবি যে সুস্থ হলে আসবেন সে আশাও করেছেন।
১৯৩৭ সালের নভেম্বর মাসে জগদীশচন্দ্রের প্রয়াণ ঘটলে অবলাকে সান্ত্বনা দিয়ে চিঠি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২ জুলাই অবলা বসু প্রতিষ্ঠিত কলকাতার নারী শিক্ষা সমিতিতে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই সম্ভবত কলকাতায় কবির শেষ ভাষণ।
১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগস্ট বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের জীবনদীপ নির্বাপিত হল। ১৬ আগস্ট হেমলতা ঠাকুরকে চিঠিতে লিখছেন অবলা –
বড় ইচ্ছা করে আপনার সঙ্গে বসিয়া গত জীবনের কথা বলি। কতদিনের পরিচয় ও বন্ধুত্ব আপনাদের সঙ্গে, কেবল কবির সঙ্গে নহে কিন্তু আপনাদের সকলের সঙ্গে। বাঙ্গলাদেশ ত অন্ধকার– জোড়াসাঁকোর বাড়ীও নূতন করিয়া যেন পুরাতন কাহিনী ঘরে ঘরে প্রকাশ করিতেছে। সমুদয় স্মৃতি যেন নূতন করিয়া জাগ্রত হইয়া শরীর গ্রহণ করিয়াছে।

অবলার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বন্ধুত্বকে কোনও কোনও গবেষক ভিন্ন আলোকে ব্যাখ্যা করলেও তার মধ্যে সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথ অবলার থেকে বছর তিন-চারেকের মাত্র বড় ছিলেন। অবলার শিক্ষিত মননে বন্ধুর যে অভাব ছিল, তা অনেকটাই পূরণ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায়। আবার চিরকালই স্নেহের কাঙাল রবীন্দ্রনাথ জগদীশচন্দ্র-অবলার মধ্যে হয়তো খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর অগ্রজপ্রতিম বন্ধু আর বৌঠানকে। তবু বন্ধুত্বের থেকেও অবলার কাছে বড় ছিল পরিবার। তাই পালিতপুত্রের প্রতি ভালবাসার জন্য চিড় ধরেছিল সেই বন্ধুত্বেও।
জগদীশচন্দ্র ও অবলা অরবিন্দমোহনকে পুত্রস্নেহে বড় করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাবশত তাঁকে পড়তে পাঠিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। কিন্তু পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতন ও রবীন্দ্রনাথের প্রতি অরবিন্দমোহনের শ্রদ্ধার আতিশয্য জগদীশচন্দ্র, বিশেষত অবলার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কে তিক্ততা তৈরি করে। কবির আন্তরিক উদ্যোগে জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠলেও ‘বৌঠাকুরাণী’ অবলার সঙ্গে সেই মধুর সম্পর্ক আর ফিরে আসেনি। রবিজীবনীকার প্রশান্ত কুমার পাল লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত এর পিছনে নিবেদিতার প্ররোচনা দেখতে পেয়েছিলেন।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved