Robbar

বিজ্ঞাপনে ভোট, ভোটের বিজ্ঞাপন

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 29, 2026 4:53 pm
  • Updated:April 29, 2026 4:53 pm  

১৯৭৭ সালে– ‘ভারতের নির্বাচনের ইতিহাসে এই প্রথম জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলিকে আকাশবাণী এবং দূরদর্শন থেকে তাদের নির্বাচনী বক্তব্য প্রচারের সুযোগ দেওয়া হয়।’ ১৯৭৭-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রচারের ব্যবস্থা হয়। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘প্রত্যেকটি দল দুবার আকাশবাণীতে এবং একবার দূরদর্শনে প্রচারের সুযোগ’ পাবেন। ‘প্রতিবারের সময় ১৫ মিনিট করে।’ ২০ মে ১৯৭৭-এর আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘২৫ মে থেকে ৭ জুনের মধ্যে প্রচার সীমাবদ্ধ থাকবে। কোন দল আগে প্রচার করবেন তা স্থির করা হবে লটারির সাহায্যে।’

আবীর কর

১৯৬৯ সাল। ‘কুকমী’ গুঁড়ো মশলার বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন বার্তায় নজরকাড়া বক্তব্য– ‘এবারের নির্বাচনে কুকমীকে ভোট দিন!’ কাফী খাঁ-র আঁকা অনবদ্য ছবিতে স্পষ্ট। নানা দাবি-যুক্ত ব্যানার নিয়ে পথে নেমেছে কড়াই, কুকার, ফ্রাই-প্যান, সসপ্যান। তাদের সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়ে আছে মাছ-মুরগি-মাটন, আছে বিভিন্ন শাকসবজি, আনাজপাতি। ‘কুকমী’র হয়ে মিছিলে হাঁটা সেইসব পাত্রর কারও হাতে হাতা-খুনতি, কারও কারও হাতে নানা দাবিদাওয়া-যুক্ত প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা– ‘কুকমী ছাড়া অন্য কাউকে বিশ্বাস করবেন না’, ‘কুকমী মোদের চির আপন’, ‘কুকমী সবারই স্বাস্থ্য রক্ষা করে’, ‘আমরা কুকমীকেই জানি’, ‘কুকমীই একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য’। এছাড়াও প্ল্যাকার্ডে লেখা– ‘কুকমীর পেছনে রয়েছে ১০০ বছরেরও ওপরের অভিজ্ঞতা।’

শিল্পী: কাফী খাঁ

বাস্তবিক, ১৮৪৬-এ, হুগলির সপ্তগ্ৰামের বাসিন্দা শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র দত্তর হাত ধরে কুকমীর পথ চলা শুরু। তখনও সিপাহি বিদ্রোহ হয়নি। তখন ছিল গোটা মশলা। সপ্তগ্ৰাম থেকে সেদিনের সুতানুটির ধর্মহাটায় মশলার পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত। তারপর তাঁর ছেলে নটবর দত্ত এবং পরবর্তীতে মূলত নাতি যুধিষ্ঠির দত্তর তত্ত্বাবধানেই বাঙালির রান্নাঘরে কুকমী গুঁড়ো মশলার আধিপত্য বেড়ে চলে। গোটা মশলাকে শিলনোড়ায় বেটে গুঁড়ো করার শ্রম ও সময় বাঁচাতে ১৯৫৮ সালে ‘ইনস্ট্যান্ট মশলা’র আইডিয়া যুধিষ্ঠির দত্তর মস্তিষ্কপ্রসূত। এবং ১৯৬৯-এর নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘এবারের নির্বাচনে কুকমীকে ভোট দিন’ এই ভিন্নমাত্রার আহ্বান তথা এক ভিন্নধর্মী বিজ্ঞাপনের চিত্র ও ভাষ্য প্রচারিত হয়েছিল যুধিষ্ঠির দত্তর সময়কালেই।

তবে ১৯৬৯-এর ভোটের হাওয়াকে শুধু যে কুকমী তাদের পণ্যের প্রচার-প্রসারে কাজে লাগিয়েছিল, তা নয়। প্রাক্-নির্বাচন কালে আনন্দবাজার পত্রিকায়, সেই সময়ের খ্যাতনামা রেডিও ইন্ডাস্ট্রি তাদের ‘রক্সি’ রেডিওর বিজ্ঞাপনে লেখে– ‘যত বেশি লোক আপনার কথা শুনবে/ তত বেশি ভোট আপনি পাবেন।’ এখানে সম্ভবত সংবাদে উঠে আসা ভোটপ্রার্থীদের নাম-ধাম, বিধানসভার খবর, যা সংবাদ-পাঠের মধ্য দিয়ে বেতার মারফত দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়বে। মনে রাখতে হবে, সময়কাল ১৯৬৯। তখনও দূরদর্শন অনেকের থেকে অনেক দূরে। গণমাধ্যম বলতে নিউজপেপার এবং রেডিও। আর ভোটপ্রার্থীদের প্রচারমাধ্যম হল সংবাদপত্র ও পাড়ার দেওয়াল। এই প্রসঙ্গে জানা যায়, ১৯৭৭ সালে– ‘ভারতের নির্বাচনের ইতিহাসে এই প্রথম জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলিকে আকাশবাণী এবং দূরদর্শন থেকে তাদের নির্বাচনী বক্তব্য প্রচারের সুযোগ দেওয়া হয়।’ ১৯৭৭-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রচারের ব্যবস্থা হয়। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘প্রত্যেকটি দল দুবার আকাশবাণীতে এবং একবার দূরদর্শনে প্রচারের সুযোগ’ পাবেন। ‘প্রতিবারের সময় ১৫ মিনিট করে।’

২০ মে, ১৯৭৭-এর আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘২৫ মে থেকে ৭ জুনের মধ্যে প্রচার সীমাবদ্ধ থাকবে। কোন দল আগে প্রচার করবেন তা স্থির করা হবে লটারির সাহায্যে।’ তখনও দূরকে নিকট করার বন্ধু বলতে ওই রেডিও এবং টেলিভিশন। আজকের মতো নিজস্ব দলীয় চ্যানেল, মুখপত্র, ও আকছার সোশাল মিডিয়া-বাহিত উপচার-সজ্জিত প্রচারের ধূম ছিল না। সেই বিচারে বিজ্ঞাপনে ভোট বিষয়টি পুরনো, তুলনায় ভোটের বিজ্ঞাপন নবীন। তারপর তো দিনে দিনে ভোটের বিজ্ঞাপন আড়ে-বহরে বাড়তে বাড়তে, আজ ভোট হয়ে উঠেছে বিজ্ঞাপন-সর্বস্ব।

আপাতত, ভোটের বিজ্ঞাপনকে সরিয়ে রেখে, অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর বিজ্ঞাপনে কীভাবে ভোটের হাওয়া ঢুকে পড়ে, তার কিছু দৃশ্য-ভাষ্য দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। একথা তো সবাই জানেন ও মানেন, যে কোনও পণ্যের বিজ্ঞাপনও সেই সময়ের ধারক-বাহক। আর যে কোনও পণ্য বিকিকিনির বৃহৎ বাজারে বিজ্ঞাপনের মূল উদ্দেশ্য বিক্রয়যোগ্য পণ্যের প্রতি ক্রেতার নজর কাড়া এবং তার মনের মধ্যে আস্থা জাগানো। আর এই আস্থা ও বিশ্বাসের মূলে যুক্তির পাশাপাশি আরও বেশি উজ্জ্বল থাকে আবেগ। এবং বিজ্ঞাপন নির্মাতারা সুকৌশলে ওই আবেগের চৌকাঠে এসে তাঁদের বিপণন সামগ্ৰীটিকে সাজিয়ে দেন। আমাদের বাংলার আঙিনায় নববর্ষ, পঁচিশে বৈশাখ, দুর্গাপুজোর গুরুত্ব তো আছেই। তার সঙ্গে আছে আরও নানাবিধ আনন্দ-আয়োজন। আছে নির্বাচন নামক এক সর্বস্তরের মানুষের যোগদানে আয়োজিত সুবিশাল প্রক্রিয়া। তার গালভরা নাম ‘ভোট-পরব’ বা ‘নির্বাচনী-উৎসব’। তাই সেই জনগণমনের পার্বণকে যে জনসংযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে– এ তো স্বাভাবিক। এবার যেমন ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে টিভি নিউজের বিরতিতে– ‘গগন টিএমটি বার’-এর পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপন-ভাষ্যে ফুটে উঠছিল: ‘ভোট ফর গগন’, কিংবা লেখা হচ্ছিল ‘জন-গণ-মন/ চাইছে গগন’। তলায় আরও স্পষ্ট আহ্বান– ‘গগনকে ভোট দিন/ জিতবেন আপনিই।’ যে ‘গগন টিএমটি’ রডের বিজ্ঞাপনী বক্তব্য ছিল– ‘নির্মাণের নির্ভরযোগ্য শক্তি’, ‘বেড়ে ওঠার অটুট বুনিয়াদ’ কিংবা ‘আগামীর ভিত হোক আরও মজবুত’ কিংবা ‘প্রতিকূলতায় প্রতিরোধ গড়ে’– সেই সংস্থা দুর্গোৎসবের আবহে তৈরি বিজ্ঞাপনে নিজেদের পণ্যের পরিচয় বদলে লেখে: ‘দুর্গতিনাশিনী’। আর ভোটের আবহাওয়ায় ‘ভোট ফর গগন’।

প্রসঙ্গত মনে পড়ছে ২০১৪ লোকসভা ভোট, ‘বার্জার’ রঙের বিজ্ঞাপন– দেওয়াল জুড়ে ‘ক্রাইম’, ‘কোরাপশন’, ‘রেপ’-এর মতো নানা শব্দ লেখা; তারপরই ‘বার্জার’ রঙের পক্ষ থেকে বক্তব্য: ‘দেশ থেকে এই দাগ উঠুক না-উঠুক, বার্জার ইজি ক্লিন দিয়ে এই দাগ সহজেই উঠে যাবে।’ এবং টেলিভিশনে ফুটে উঠে এক ঝলমলে দেওয়াল। সম্ভবত সেই নির্বাচনেই ‘ব্রেনোলিয়া’র তরফ থেকে টিভির পর্দায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল বুদ্ধিদীপ্ত বিজ্ঞাপন-ভাষ্য– ‘চল, এবার ট্যালেন্টকে সাপোর্ট করি।’ আবার, অনেকের স্মরণে থাকতে পারে, ভোটের প্রেক্ষাপটে ‘ডলার-বস’ কোম্পানির স্যান্ডো গেঞ্জির বিজ্ঞাপন-চিত্র, যেখানে নানারকম ভোটপ্রার্থী– হুমকি, থ্রেট, চোখ রাঙিয়ে ভোট চাওয়ার মুখে ‘ডলার-বস’ স্যান্ডো পরিহিত এক স্মার্ট যুবা নিজের ঘর্মাক্ত জামা ছুড়ে দিয়ে ভোটপ্রার্থীর মুখের উপর স্পর্ধাভরে জানিয়ে দেয়– ‘পাঁচ বছর কম সময় নয়’। অর্থাৎ বক্তব্য স্পষ্ট– কোনওরকম হম্বিতম্বি, গা-জোয়ারি মেনে নেবে-না ‘ডলার-বস’ স্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত নির্ভীক যুবক। আবার ‘আইডিয়া মোবাইল’-এর একটি বিজ্ঞাপন ছিল, যেখানে এক ভোটপ্রার্থী এলাকার পানীয় জলের সমস্যা মেটানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন; সেখানে মোবাইল ক্যামেরায় তোলা গতবারের ছবি দেখিয়ে গ্ৰামের ছেলের আত্মপ্রত্যয়ী জবাব– ‘ওটা গতবারের মন্ত্রীমশাই, বোকা বানাবেন না!’ নেপথ্যে ‘আইডিয়া’ মোবাইলের এই বিজ্ঞাপনী আইডিয়া। অর্থাৎ, সেই একই প্রতিশ্রুতিতে চিঁড়ে আর ভিজবে না। এইভাবে ভোটকে কেন্দ্র করে নানা পণ্যসামগ্রী তাদের বিজ্ঞপ্তি ও বিজ্ঞাপন সাজানো, নির্বাচনের আবহে পণ্যসামগ্রীর বিজ্ঞাপনে ভোট হয়ে ওঠে এক ইস্যু। অন্যদিকে ভোটের বিজ্ঞাপন তো নানা রঙের, নানা রকমের। সেই রঙিন ভোট বিজ্ঞাপনের জগতে ঢোকার আগে, আর একবার ১৯৬৯-এর আর একটি ফুরনো বিজ্ঞাপনে চোখ ফেরাই। বিজ্ঞাপনটি ‘পাওয়ার’ কোম্পানির ফ্যান তথা পাখার বিজ্ঞাপন। যেখানে বিজ্ঞাপনী বার্তা– “জনগণের অবিসংবাদী প্রার্থী ‘পাওয়ার ফ্যান’কে নিশ্চিন্তে আপনার ভোটটি দিন।” গরমে ঠান্ডা থাকতে আমাদের ফ্যানের সুইচ টেপা ছাড়া গত্যন্তর নেই। এইভাবেই পণ্যসামগ্রীর বিজ্ঞাপনে জায়গা করে নিয়েছে ভোট। বা বলা ভালো, ,নির্বাচনী-উৎসবে ঘর-গেরস্থালির দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহার্য জিনিসপত্রে ভোটের ছোঁয়া লেগেছে। যাতে বিজ্ঞাপনটি আমজনতার মনে লাগে।

এবার আসা যাক, ভোটের বিজ্ঞাপনে। ১৯৭৭-এ প্রথম বেতার ও দূরদর্শন মারফত ভোটের প্রচার শুরু। তারপর ২০০১ থেকে বৈদ্যুতিন চ্যানেলের ক্রমবৃদ্ধিতে ২০০৬ বিধানসভা, ২০০৯ লোকসভা, ২০১১ বিধানসভার নির্বাচনে টিভিতে ভোট-প্রার্থী ও তার প্রতীকচিহ্ন যোগে বিজ্ঞাপন হয়েছে। সেখানে শাসকদল হলে ‘কী কী হয়েছে’ তার ফিরিস্তি থেকেছে, আর বিরোধী দল হলে শাসকদলের নিন্দেমন্দ ও ভুলভ্রান্তি উল্লেখের পাশাপাশি থেকেছে আগাম প্রতিশ্রুতি। তবে ভোটের বিজ্ঞাপনে এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে ২০১৪ লোকসভা নির্বাচন। সেবার থেকে বৈদ্যুতিন চ্যানেলে, সোশাল মিডিয়ায় ভোট প্রচারের জোয়ার লেগেছে। দৈনন্দিন সংবাদপত্র ও সাবেকি দেওয়াল লিখনের পাশাপাশি ইদানীং সোশাল মিডিয়ার মধ্য দিয়ে দলীয় প্রচার জুড়ে থাকে প্রায় সারা বছর। এখন তো প্রায় সব দলেরই আইটি সেল, যার মধ্য দিয়ে সোশাল মিডিয়া, নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ এবং ডিজিটাল প্রচার চলছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পেশাদার ভোটকুশলী ব্যক্তিবর্গ বা প্রতিষ্ঠান। সরেজমিনের ভোটযুদ্ধ এখন খানিক সরে গিয়ে ডিজিটাল-যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। সেখানে ভোটের জন্য দলের এবং দলীয় প্রার্থীর বিজ্ঞাপন তো আছেই, তার সমান্তরালে আছে প্রতিপক্ষের ভুলত্রুটি, অন্যায়কে কথায়, কবিতায়, কাহিনিতে মুখরোচক করে পরিবেশন করা। অনেক সময় ঝোঁকের বশে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে অলঙ্ঘনীয় অপরাধমূলক বিকৃত বিজ্ঞাপনও ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এইসব ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ঘটনা বাদ দিলে, জনমত তৈরিতে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

নো দাগ, নো ধাপ্পা: বার্জার ইজি ক্লিন-এর বিজ্ঞাপন

২০০১-এ অটলবিহারীর নেতৃত্বে বিজেপি স্লোগান তুলেছিল– ‘আব কি বারি/ অটল বিহারী।’ যার হুবহু আদলে ২০১৪-তে লোকসভা ভোটে টিভি খুললেই শোনা যেত– ‘আব কি বার/ মোদি সরকার।’ সঙ্গে তার লেজুড়-বার্তা ছিল– ‘আচ্ছে দিন আনে ওয়ালে’ অর্থাৎ ‘সুদিন আসছে’। বলাই বাহুল্য যে, এটি একটি বিশুদ্ধ ‘বিজ্ঞাপন’। সেবার বাংলার ভোট আদায়ে বিজেপির পক্ষ থেকে তৈরি হয়েছিল বিজ্ঞাপন-সিরিজ। সারদা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে থাকা তৃণমূলকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে দূরদর্শনের পর্দায় প্রদর্শিত হয়েছিল ছোট-ছোট স্টোরি। যেমন, এক সেলাই দিদিমণির আক্ষেপ– ‘মনে হচ্ছে টাকাগুলো সব গেল’। সর্বস্বান্ত হতাশ সেই মহিলাকর্মীর পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন তার মহিলা বস, তাঁর জিজ্ঞাসা– ‘কী? তুইও চিটফান্ডে টাকা রেখেছিলি?’ এবং সেই সূত্র ধরেই বক্তব্য– ‘শুধু তুই না, বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ এইভাবে সর্বস্বান্ত হয়েছে। তাই এবার চাই পরিবর্তন। পদ্মফুলে ভোট দেব।’

আর একটি স্টোরিতে ছিল, জনৈকের দোকান বন্ধ, একজনের জিজ্ঞাসা, ‘এই তোদের দোকান বন্ধ কেন?’ –‘আর খুলবে কী করে? লাল থেকে সবুজে এসেছে, তাতে আমাদের হল-টা কী?’ তার এই জিজ্ঞাসার সদুত্তর ভাসিয়ে দেওয়া হয় সমস্বরে: ‘তাই এবার ঠিক করেছি, বিজেপিকে ভোট দেব।’ বিজ্ঞাপনের চিত্রভাষ্যে এই সমস্বরের কোরাসটি জনমত বা জনরব। এইভাবেই বিজ্ঞাপনে বানানো জনরবকে খবর-কাগজের পাতায় ছাপিয়ে, টিভির পর্দায় ভাসিয়ে দিয়ে জনমত তৈরি করাই এর মূল উদ্দেশ্য। এইভাবে ট্যাক্সিচালকদের কথাবার্তায়, গ্ৰামের পুকুরপাড়ে মহিলাদের অন্তরঙ্গ আলোচনায়, পথচলতি মানুষের সংলাপে স্বল্পদৈর্ঘ্যের চিত্রনাট্যে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরেছিল বিজেপি; এবং তার শেষ কথা ছিল বিজেপিকে ভোট দেওয়ার অঙ্গীকার।

২০২৬ নির্বাচনে বিজেপি-র প্রচার: ভয় নয়, ভরসা

এবার, ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনেও ভোটের বিজ্ঞাপনে অন্যান্য দল থেকে অনেক অনেক কদম এগিয়ে পদ্ম প্রতীক। ফ্লেক্সে, ব্যানারে, ফেস্টুনে এমনকী, রেডিমেড-দেওয়াল-লিখনেও উঠে এসেছে এবারের ভোটে বিজেপির মূল স্লোগান– ‘পালটানো দরকার/ চাই বিজেপি সরকার’ পাশাপাশি ‘ভয় Out ভরসা In/ BJP কে ভোট দিন।’ এই দু’টি স্লোগান এবারের বিধানসভায় বিজেপির ধ্রুবপদ। এছাড়াও আছে ‘ভরসার শপথ’ শিরোনামে ‘বিজেপির ১৫ প্রতিশ্রুতি’ ওরফে ‘মোদিজির গ্যারান্টি’। পরিবর্তন যাত্রার গানে গানে গাওয়া হয়েছে ‘বিকশিত পশ্চিমবঙ্গ/ বিজেপির গ্যারান্টি’। বিজেপির প্রতিশ্রুতির বিপ্রতীপে তৃণমূলের তরফে আছে ‘দিদির দশ প্রতিজ্ঞা’– যেখানে ছন্দে-বন্ধে নানা কথাঞ্জলি– ‘যুবদের পাশে/ জীবিকার আশ্বাসে’, ‘বাজেটে কৃষি/ কৃষকের হাসি’, ‘প্রবীণদের পাশে/ যত্নের আশ্বাসে’। এরকম নানা প্রতিজ্ঞার মধ্যে উল্লেখযোগ্য– ‘শিক্ষাই সম্পদ/ ভবিষ্যৎ নিরাপদ’। খুবই আশ্বাসের বিষয়। যেমন আস্থা জোগাচ্ছে ‘মোদিজির গ্যারান্টি’– ‘পাঁচ বছরে যুবদের এক কোটি কর্মসংস্থান’ কিংবা ‘ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে সমস্ত সরকারি শূন্যপদে স্বচ্ছ নিয়োগ’; উল্টোদিকে লক্ষ্মীর ভান্ডারের পাল্টা চাল ‘মাতৃশক্তি ভরসা কার্ড’ কিংবা ‘প্রতি মাসে ৩০০০ টাকা’। এখানেই শেষ নয়, প্রচার-প্রসারের বিজ্ঞাপনে জনগণের মন ছুঁয়ে যেতে ভিন্নমাত্রার বিজ্ঞাপনও মজুত আছে। সুকৌশলে ক্রিকেটের পরিভাষাকে ব্যবহার করে বিজেপির বিজ্ঞাপন– ‘নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ Cought behind, বেকারত্ব হবে Sweep, দুর্নীতি Clean bowled।’ অন্যদিকে তৃণমূলের প্রচারপত্রে উঠে এসেছে জনপ্রিয় ঘরোয়া খেলা ‘সাপলুডো’– যেখানে সরকারি প্রকল্পগুলিকে সাফল্যের সিঁড়ি চিত্রে রেখে সাপের মুখে আঁকা হয়েছে বিজেপি নেতাদের মুখাবয়ব।

‘দিদির দশ প্রতিজ্ঞা’

পণ্যসামগ্রীর বিজ্ঞাপনেও সংকেতে, ইঙ্গিতে, প্রতিপক্ষকে ঠুকে, ঠেস দিয়ে বিজ্ঞাপনী বিবৃতি দেওয়ার চল আছে। তারপরও কিছু পণ্যসামগ্রীর বিজ্ঞাপন মানুষের মনে গেঁথে যায়, থেকে যায়। এবার বিধানসভার ভোটে বামেদের ডিজিটাল প্রচারে স্থান পেয়েছে সেই রকমই কিছু চিরচেনা বিজ্ঞাপন। রায়গঞ্জ বিধানসভার বাম নেতৃত্ব– ‘লাইফবয়’ সাবান, ‘স্প্রাইট’ কিংবা ‘কুড়কুড়ে’র আদলে তৈরি করেছে মজাদার বিজ্ঞাপনী বক্তব্য।

রায়গঞ্জ বিধানসভার বামেদের প্রচার কৌশল

নির্বাচনী উৎসবে সব দলেরই মোদ্দাকথা যেনতেনপ্রকারেণ ভোটারদের মন জয় করা। এই জন-মন-রঞ্জনে ভোটপ্রার্থী তথা প্রতীকের বিজ্ঞাপন চলে। ভোটের প্রচারপত্র বা ইস্তাহারও আদতে বিজ্ঞাপনই। ক্ষমতায় আসার আগাম মুদ্রিত প্রতিশ্রুতি। ভোট আদায়ে ভোটপ্রার্থীর জনসংযোগে দাড়ি কামানো, সাবান মাখানো, ঘুঁটে দেওয়া, মাছ কুটে দেওয়া, রুটি বেলে দেওয়া– এই সবেতেই প্রার্থীর ‘উৎকট’ বিজ্ঞাপন: ‘আমি তোমাদেরই লোক’। আর এই ধারারই জনসংযোগমূলক উচ্চমার্গীয় বিজ্ঞাপন হল ঝালমুড়ি খাওয়া, চপ ভেজে দেওয়া, গরিবের দাওয়ায় বসে ডালভাত খাওয়া। যার মূল বার্তা আমরা সাধারণ, আমরা ‘মাটির কাছাকাছি’। আর সব দলেরই বিজ্ঞাপনে প্রান্তিক গরিব মানুষদের কল্যাণে নানা প্রচেষ্টার কথা, কৃষি ও শিল্পের কথা, সঙ্গে প্রভূত কর্মসংস্থানের কথা, অন্যদিকে শিক্ষিত বেকারদের চাকরির কথা অবশ্যই থাকবে, আর থাকবে শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উন্নতিকল্পে নানা প্রতিশ্রুতি। স্বাধীনতা লাভের পর সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

প্রতি পাঁচ বছর অন্তর তিনটি নির্বাচন। যে নির্বাচনী উৎসবে শামিল হন সমাজের সব স্তরের পরিণত মানুষজন। এই জনমত, এই ভোটদানও তো আদতে এক বিজ্ঞাপনই। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের এক অতি উত্তম বিজ্ঞাপন।

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন আবীর কর-এর অন্যান্য লেখা

……………………