

অ্যান কারসন নিজে নক্স-কে নিছক শোকের বই হিসেবে দেখতে চাননি। এই বই তাঁর কাছে অন্য একজন মানুষকে বোঝার চেষ্টা। বিশেষত তাঁর জীবন, ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জটিলতা অনুধাবন করা ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ। শোককে কেন্দ্র করে লিখলে বইটি হয়তো কেবল লেখকের নিজের অনুভূতির বিবরণ হয়ে উঠত।
‘সাম্প্রতিক সময়ে কোন বই পড়ছেন?’ খুব শান্ত স্বরে উত্তর এল, ‘নতুন কিছুই পড়েনি। আমি পুরনো বই পড়তে বেশি ভালবাসি। আমি ক্লাসিক সব কিছু ভালবাসি।’
বক্তা অ্যান কারসন। সাক্ষাৎকারটি বেশ কিছুদিন আগের। তখন কি জানতেন তিনি ২০২৬ সালে নোবেল পুরস্কার পাবেন? যাঁরা ছকভাঙা সাহিত্যের দোসর তাঁরা ততদিনে জেনে গিয়েছেন অ্যান কারসনের প্রতিটি লেখা এক একটি ক্লাসিক। তাঁর সাহিত্যকর্মে কবিতা, গদ্য এবং প্রবন্ধ– এই তিনটি ধারারই মেলবন্ধন ঘটেছে। তাঁর লেখায় প্রায়শই উঠে আসে প্রাচীন গ্রিক জগৎ, পুরাণ এবং বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্র। লেখালিখির পাশাপাশি তিনি ধ্রুপদি সাহিত্য ও সংস্কৃতির অধ্যাপক হিসেবেও পরিচিত। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে তাঁর বক্তৃতাও সাহিত্যজগতে বিশেষভাবে সমাদৃত।

১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে জন্মগ্রহণ করেন কারসন। ১৯৮১ সালে তিনি ধ্রুপদি সাহিত্য নিয়ে তাঁর গবেষণাপত্র ‘Odi et Amo Ergo Sum’ (আমি ঘৃণা করি এবং ভালোবাসি, অতএব আমি আছি) প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে এই গবেষণাকর্মকে নতুনভাবে সাজিয়ে তিনি লেখেন ‘Eros the Bittersweet’ নামের প্রবন্ধগ্রন্থ। এই বইয়ে আকাঙ্ক্ষা, প্রেম এবং কামনার প্রকৃতি নিয়ে তাঁর যে ভাবনা প্রকাশিত হয়েছিল, সেগুলিই পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যকর্মের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। অনেক পাঠকের কাছেই কারসনের সাহিত্যজগতে প্রবেশের অন্যতম পথ হল ‘Autobiography of Red: A Novel in Verse’ (১৯৯৮)। কবিতা ও উপন্যাসের সংমিশ্রণে রচিত এই বইটি প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের অসম্পূর্ণ কবিতা ‘Geryoneis’থেকে অনুপ্রাণিত। গ্রিক পুরাণের লাল ডানাওয়ালা দানব গেরিয়নকে, যাকে বীর হেরাক্লিস হত্যা করেছিলেন। কারসন তাকে নতুনভাবে কল্পনা করেছেন এক সমকামী কিশোর হিসেবে। ডানাওয়ালা এই কিশোর প্রেমে পড়ে হেরাক্লিসের, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার প্রেম পরিণত হয় হৃদয়ভাঙার বেদনায়। প্রাচীন পুরাণের এই পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে কারসন প্রেম, পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা এবং বিচ্ছেদের মতো বিষয়গুলিকে এক আধুনিক ও ব্যক্তিগত পরিসরে নিয়ে আসেন।

কিন্তু তাঁর নোবেল পুরস্কার জয়ের সঙ্গে সঙ্গে আলোচিত হতে শুরু করেছে আরও এক অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের কেন্দ্রে রয়েছেন তাঁর বড় ভাই মাইকেল কারসন, যিনি জীবনের দুই দশকেরও বেশি সময় ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় কাটিয়েছিলেন। ভাইয়ের রহস্যময় জীবন, দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা এবং মৃত্যুর স্মৃতি নিয়েই অ্যান কারসন লিখেছিলেন তাঁর উল্লেখযোগ্য বই ‘নক্স (Nox)’ (২০১০)। মাত্র ৯৭ পাতার সেই বইয়ের রয়েছে ভারতের প্রসঙ্গ। রয়েছে কাশ্মীরের এক হোটেলের কথা। অ্যান কারসনের থেকে চার বছরের বড় ছিলেন মাইকেল। শৈশবে অ্যানের কাছে তিনি ছিলেন আদর্শের মতো। কিন্তু ১৯৭৯ সালে, ৩৩ বছর বয়সে, মাইকেল কানাডা ছেড়ে চলে যান। মাদক ব্যবসা সংক্রান্ত একটি মামলায় গ্রেফতারি এড়াতেই তিনি দেশ ছাড়েন। এরপর ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান। প্রায় ২২ বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি পরিবারকে ফোন করেছিলেন মাত্র কয়েকবার। এই বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটে ২০০০ সালে, যখন ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে ৫৫ বছর বয়সে মাইকেলের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি ফোন করেছিলেন অ্যানকে। শৈশবের ডাকনাম ‘পিনহেড’ বলে বোনকে সম্বোধন করে তাঁকে দেখা করতে আসার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। অ্যান তাঁর সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করার আশায় রওনা হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সেই সাক্ষাৎ আর সম্ভব হয়নি। তাঁর যাত্রার প্রায় এক সপ্তাহ আগেই মাইকেলের মৃত্যুসংবাদ এসে পৌঁছয়।

মাইকেলের জীবনকে পুনর্গঠনের চেষ্টা থেকেই জন্ম নেয় ‘নক্স’। বইটিতে অ্যান একত্র করেছিলেন তাঁর ভাইয়ের পুরনো ছবি, চিঠি, কবিতা, আঁকা ছবি এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত স্মারক। এই স্মৃতিচিহ্নগুলির মধ্যে রয়েছে ডেনমার্কের ডাকটিকিট, কাশ্মীরের হোটেলের একটি চিঠি, যা সম্ভবত মাইকেল কাশ্মীর থেকে লিখেছিলেন। এই সামান্য কাগজপত্রগুলি যেন এমন এক মানুষের জীবনের ছিন্নভিন্ন সূত্র, যাঁর জীবনের বড় অংশটাই পরিবারের কাছে অজানা থেকে গিয়েছিল।মাইকেলের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর মা যে চিঠিটি যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন, মৃত্যুশয্যায় সেটি অ্যানের হাতে তুলে দেন। ২০১০ সালে প্রকাশিত ‘Nox’ নামটির অর্থ লাতিন ভাষায় ‘রাত’। রোমান পুরাণে নক্স হলেন রাত্রির দেবী। তবে বইটির নামের পাশাপাশি তার নির্মাণশৈলীও অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। এটি সাধারণ কোনও বইয়ের মতো বাঁধানো নয়, যার পাতা একের পর এক উল্টে পড়তে হয়। একটি বাক্সের মধ্যে রাখা রয়েছে অ্যাকর্ডিয়নের মতো ভাঁজ করা দীর্ঘ কাগজ, যেখানে ছবি, চিঠি, অনুবাদ, হাতে লেখা নোট এবং অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন পাশাপাশি সাজানো। বইটি যেন একই সঙ্গে একটি সাহিত্যকর্ম, একটি ব্যক্তিগত আর্কাইভ এবং হারিয়ে যাওয়া জীবনের খণ্ডিত মানচিত্র।এই বইয়ের অন্যতম ভিত্তি রোমান কবি ক্যাটুলাসের ১০১ নম্বর কবিতা। নিজের মৃত ভাইকে স্মরণ করে ক্যাটুলাস এই শোকগাথা লিখেছিলেন। তাঁর ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছিল নিজের ঘর থেকে দূরে। অ্যান কারসন সেই প্রাচীন কবিতার অনুবাদ ও ভাবনাকে নিজের ভাইয়ের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এভাবেই প্রাচীন রোমান সাহিত্য এবং আধুনিক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা একই সৃজনশীল পরিসরে এসে মিলেছে।

তবে অ্যান কারসন নিজে নক্স-কে নিছক শোকের বই হিসেবে দেখতে চাননি। তাঁর কাছে অন্য একজন মানুষকে বোঝার চেষ্টা।বিশেষত তাঁর জীবন, ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জটিলতা অনুধাবন করা ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ। শোককে কেন্দ্র করে লিখলে বইটি হয়তো কেবল লেখকের নিজের অনুভূতির বিবরণ হয়ে উঠত। কিন্তু মাইকেলের জীবনকে অনুসন্ধান করার মধ্য দিয়ে তিনি এমন একজন মানুষকে বুঝতে চেয়েছেন, যিনি তাঁর অত্যন্ত কাছের হয়েও দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর নাগালের বাইরে ছিলেন। ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর নোবেল কমিটি নক্সের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করে। তাদের মূল্যায়নে, এটি এমন একটি স্মরণীয় সাহিত্যকর্ম, যেখানে গভীর বিচ্ছেদবোধ ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়েছে এবং সাহিত্যিক নির্মাণশৈলী একটি ভাস্কর্যের মতো স্বতন্ত্র রূপ পেয়েছে। পুরস্কারের জন্য অ্যান কারসনের সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের যে বৈশিষ্ট্যগুলি স্বীকৃতি পেয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে প্রাচীন ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপ এবং সমকালীন সাহিত্যের জন্য নতুন আঙ্গিক নির্মাণ।

অ্যান কারসনের ‘নক্স’ বইয়ে থাকা এই পুরোনো লেটারহেডটি তাঁর পরিবারের সঙ্গে ভারতের যোগসূত্রের এক আকর্ষণীয় সূত্র। কাগজটির উপরে বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘POTAMAC’। তার নীচে রয়েছে ‘ALI MOHMAD MAJOR’ নামটি এবং ‘DELUXE CLASS HOUSEBOATS। এটি জম্মু ও কাশ্মীর সরকারের নথিভুক্ত একটি ডিলাক্স শ্রেণির হাউসবোটের লেটারহেড। ঠিকানায় রয়েছে নাগিন লেক, নিশাত বাগ, হাজরতবল, শ্রীনগর-৬, কাশ্মীর। অর্থাৎ, এই কাগজের সূত্র ধরে অ্যান কারসনের ভাই মাইকেল কারসনের জীবনের সঙ্গে ভারতের, বিশেষত কাশ্মীরের, একটি সম্ভাব্য যোগসূত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মাইকেল জীবনের দীর্ঘ সময় পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় কাটিয়েছিলেন। একটি পুরনো লেটারহেড, একটি ঠিকানা এবং কয়েকটি অস্পষ্ট শব্দ কীভাবে হারিয়ে যাওয়া মানুষের জীবনের সূত্র হয়ে উঠতে পারে, এই ছবিটি তারই উদাহরণ। মাইকেলের জীবনের ছিন্নভিন্ন স্মৃতি একত্র করে তাঁকে বুঝতে চাওয়ার যে চেষ্টা অ্যান কারসন নক্সে করেছেন, এই কাগজটি সেই অনুসন্ধানে ভারতের উপস্থিতিকে দৃশ্যমান করে তোলে। অ্যান কারসনের সাহিত্যচর্চার বৈশিষ্ট্যই হল, তিনি ব্যক্তিগত স্মৃতিকে কখনও নিছক আত্মকথনে আটকে রাখেন না; প্রাচীন সাহিত্য, পুরাণ, অনুবাদ ও পরীক্ষামূলক আঙ্গিকের মধ্য দিয়ে তাকে পৌঁছে দেন এক বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতায়। প্রেম, বিচ্ছেদ, আকাঙ্ক্ষা কিংবা শোক তাঁর লেখায় কোনও অনুভূতিই সরল উত্তর পায় না। খুলে যায় নতুন নতুন প্রশ্নের দরজা। অটোবায়োগ্রাফি রেড থেকে নক্স, তাঁর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রচনাই প্রচলিত সাহিত্যিক শ্রেণিবিভাগকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কবিতা, গদ্য ও গবেষণার সীমানা মুছে দিয়েছে। ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয়ের মধ্য দিয়ে সেই স্বতন্ত্র সাহিত্যভাষাই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল। যে লেখক এক সাক্ষাৎকারে পুরনো বইয়ের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলেন, তাঁর সাহিত্যেই প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ঐতিহ্য নতুন করে কথা বলে সমকালীন মানুষের সঙ্গে। হয়তো অ্যান কারসনের সৃষ্টির প্রকৃত শক্তি এখানেই তিনি অতীতকে কেবল পুনরাবৃত্তি করেন না, তাকে বর্তমানের সামনে দাঁড় করান। আর সেই যাত্রায় কাশ্মীরের একটি বিবর্ণ লেটারহেডও হয়ে উঠতে পারে সাহিত্যের উপাদান, হারিয়ে যাওয়া এক জীবনের সূত্র এবং স্মৃতির গভীরে প্রবেশের দরজা। নোবেলের স্বীকৃতি তাই শুধু একজন কবির সাফল্য নয়, সাহিত্যের সেই স্বাধীন ও নিরন্তর অনুসন্ধিৎসু স্বভাবেরও উদ্যাপন, যা পরিচিত গল্পের মধ্যেও অনাবিষ্কৃত সত্যের সন্ধান করে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved