


পাহাড় থেকে সমুদ্র নোংরা হচ্ছে পরিবেশ অথচ এমন কাণ্ডকারখানা যাঁরা দিনের পর দিন ঘটাচ্ছেন, তাঁরা ভাবলেশহীন! আমরা জেনেও ভুলে আছি, পাবলিক প্লেস পরিচ্ছন্ন রাখা শুধু প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়, সেই কর্তব্য জনসাধারণের ওপরও বর্তায়। এই উদাসীনতা আসলে টুরিস্ট স্পটকে আপন করে না-নিতে পারার মানসিকতার প্রতিফলন। এই মানসিক-বিকৃতি অপচয় ও অনিষ্ট প্রবণতার অনুঘটক।
হেলতে দুলতে সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকা ভদ্রলোক আচমকা থমকে দাঁড়ালেন। ঠিক সেইখানে, যেখানে তার নিচের তলার ফ্ল্যাটের সদর দরজা। কালবিলম্ব করলেন না। কোনও দিকে ভ্রুক্ষেপ না-করে চেনা অভ্যাসে উগড়ে দিলেন মুখ-ভর্তি পানের পিক! ঠিক প্রতিবেশীর দরজার পাশেই।
দুরারোগ্য এই অভ্যেসে অভ্যস্ত সেই ব্যক্তির ওপর স্বাভাবিক কারণেই ‘চটে লাল’ প্রতিবেশী ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। ইচ্ছে হয়, ব্যাটার গলা টিপে ধরতে! অথচ তা তিনি করেন না। না-করে বরং তিনি ফোন করেন শহরের জনপ্রিয় রেডিও স্টেশনে। আর তারপরই ঘটে এক ‘মিরাকল’! কী? তা জানতে হলে অবশ্যই দেখতে পারেন ‘লগে রহো মুন্নাভাই’। যাঁদের টাটকা স্মৃতিতে সিনেমার সেই দৃশ্য আজও অম্লান, তাঁরা মনে করে নিতে পারবেন হুবহু, কার ‘গান্ধীগিরি’তে শেষমেশ সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছিলেন অভিযোগকারী ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। ভোল পালটে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন উপরতলার সেই পানের পিকধারীর মন ও মানসিকতার।

কিন্তু মানালিতে কী হবে? সেখানে কোন মুন্নাভাই পথ দেখাবেন! কাদেরই বা দেখাবেন! যেখানে জনসাধারণ চোখে ঠুলি পরে বসে আছে! সম্প্রতি হিমাচল প্রদেশের পর্যটনের আঁতুর মানালি সোশাল মিডিয়ায় আলোচনার গোলটেবিলে। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, বরং তা চর্চায় উঠে এসেছে সেখানকার পাবলিক প্লেসে একটি ফোন চার্জিং সেন্টার, কীভাবে, কয়েক ঘণ্টায় আবর্জনাময় স্পটে পরিণত হল, সেই কারণে।
সোশাল মিডিয়ায় সেই ‘ডাম্পিং সেন্টার’-এর ভিডিও ইতিমধ্যে বেশ ভাইরাল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান ও সেই ভিডিও ঘেঁটে একবারও দেখা যায়নি, সেখানে পিসি সরকার তাঁর ফোন চার্জ দিতে গিয়েছিলেন! ফলে তাঁর ম্যাজিকে এমন ঘটনা ঘটেছে, এমন বললে ভুল বলা হবে। আসলে পুরো ‘কৃতিত্ব’টাই প্রাপ্য মানালি ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের। তাঁদের ‘উদ্ভাবনী’ ভাবনা ও ক্ষমতাবলেই চার্জিং স্পটের এমন পরিণতি। খাবারের প্লেট থেকে প্লাস্টিকের ক্যান, ডিসপোজাল কাপ থেকে টিস্যু পেপারে ভরপুর সেই চার্জিং স্টেশন। সেই নিদর্শনের আশপাশ দিয়ে মানালি ঘুরতে আসা পর্যটকরা হাসছেন, খেলছেন, যাতায়াত করছেন– এবং তাঁদের কোনও যায়-আসছে না।
নিন্দুকরাও বসে নেই! সুযোগ বুঝেই তাঁরা এমন ‘ম্যাজিক্যাল’ টুরিস্টদের দিকে সমালোচনার বন্দুক তাক করেছেন। ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’-এর মতো সরকারি উদ্যোগও পর্যটকদের ঘুণ-ধরা মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পারবে না– বলে দাবি করেছেন কেউ কেউ। দু’ধাপ এগিয়ে কয়েকজন আবার ‘উত্তম-মধ্যম’ দাওয়াইয়ের পরামর্শ দিয়েছেন। সচেতনতা গড়ে তোলা প্রশাসনের কাজ, পালনের দায়িত্ব জনসাধারণের– এমন নিম-তেতো ভাষণ সুযোগ বুঝে ভাসিয়ে দিতে ছাড়ছেন না।

সমালোচনা বা ময়লার স্রোতে মানালি যতই মশগুল থাক, রোগীর ক্রনিক ব্যামোর মতো একটা বিষয় পরিষ্কার– মন ও মানসিকতার অধঃপতনই এমন বেআব্রু পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে পর্যটকদের। যার দরুন ক্ষতি হচ্ছে পর্যটনকেন্দ্রের সুনাম-সুখ্যাতির। অথচ পর্যটননন্দ্র নিছকই ভ্রমণের নয়, বরং তার পর্যটকদের কাছে সেই জায়গা, যা তাদের মনে মানসিক শান্তি ও উদ্যমে ভরপুর করে তোলে। সেই অনুভবে এক-একটি টুরিস্ট স্পট এক-একজনের কাছে হয়ে ওঠে ‘সেকেন্ড হোম’। কিন্তু সেই দ্বিতীয়র কখনও ‘অদ্বিতীয়’ হয়ে ওঠা হয় না। হয় না, পর্যটকদের অসচেতনতা ও দায়িত্ববোধের ঘাটতিতেই।
শুধু মানালি নয়, এমন দৃশ্যদূষণ দেশে প্রায় সর্বত্র। খুব বেশি দূর যেতে হবে না, বাংলা ও বাঙালির অতি প্রিয় ‘দিপুদা’ অর্থাৎ, দিঘা-পুরী-দার্জিলিংয়ের দিকে তাকান, পরিষ্কার বুঝতে পারবেন। বাংলা ও দেশের অন্যত্র থেকে প্রতি বছর বহু পর্যটক এই তিনটি জায়গায় ভিড় জমান। এবং এই তিনটি পর্যটনকেন্দ্রে অপরিচ্ছন্নতা চোখে পড়ার মতো। টুরিস্টরা সমুদ্রতীরে ভিড় জমাচ্ছেন, লোকারণ্য হয়ে উঠছে দার্জিলিং ম্যাল। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আবর্জনার স্তূপ! পর্যটক যত্রতত্র ফেলে দেওয়া খাবারের প্যাকেট, পানীয়ের বোতলে মিশছে সমুদ্রের জলে, পাহাড়ের রাস্তায়। সেই বর্জ্য-ভরপুর ঘোলাজলে নেমে নোনাজলের স্বাদ নিচ্ছেন টুরিস্টরা।

পাহাড় থেকে সমুদ্র নোংরা হচ্ছে পরিবেশ অথচ এমন কাণ্ডকারখানা যাঁরা দিনের পর দিন ঘটাচ্ছেন, তাঁরা ভাবলেশহীন! আমরা জেনেও ভুলে আছি, পাবলিক প্লেস পরিচ্ছন্ন রাখা শুধু প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়, সেই কর্তব্য জনসাধারণের ওপরও বর্তায়। এই উদাসীনতা আসলে টুরিস্ট স্পটকে আপন করে না-নিতে পারার মানসিকতার প্রতিফলন। এই মানসিক-বিকৃতি অপচয় ও অনিষ্ট প্রবণতার অনুঘটক। তার প্রতিফলন আমরা চোখের সামনে দেখতে পাই বিহারের সারানে-তে। যেখানে রিল-কন্টেন্ট বানানোর অছিলায় ট্রেনের কামরা সিট ছিঁড়ে উদযাপন করতে দেখা যায় ‘ভাইরাল’ হওয়ার নেশায় মত্ত দুই যুবককে। এমন অনেক ঘটনাই আমাদের চোখের আড়ালে ঘটে, দিনের পর দিন। খাজুরাহো, অজন্তা-ইলোরা কিংবা কোনারকের মতো ঐতিহাসিক স্থানে, হেরিটেজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অতি উৎসাহে নিজের নাম লিখে আসেন কেউ কেউ, অবিবেচকের মতো। ইতিহাসের গায়ে প্রেমের দাবি ফুটিয়ে তুলতে, ভালোবাসার চিহ্ন আর নামের আদ্যাক্ষরে ফুটিয়ে তোলেন এমন শিল্পকর্ম, যা আদপে ইতিহাসের অবক্ষয় ডেকে আনে। ‘হস্তশিল্প’-এ বুঁদ হয়ে থাকা এহেন টুরিস্টদের কাছে স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কিংবা মাহাত্ম্য মান্যতা পায় না। কার্যত সরকারি সম্পত্তি বিনষ্ট করে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে নিজেদের ইচ্ছাপূরণ তাদের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। এ-ও আসলে এক ধরনের রুচির দৈন্যতা। অথচ এরাই নিজের বাসস্থানকে পরিচ্ছন্নতায় ‘নিট অ্যান্ড ক্লিন’ রাখেন। ঘরের ডেকোরেশন থেকে বাগানের ফুল– যত্ন-আত্তিতে সতেজ রাখতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেন। শুধু সেই দায়িত্ববোধ কর্পূরের মতো উবে যায় ঘুরতে গেলেই! টুরিস্ট স্পট তো ‘নিজের বাড়ি’ নয়, সেখানে যা ইচ্ছে তাই করলে কিছু যায় আসে না– এমন আচরণের ভূত ঘাড়ে নিয়ে ‘লঙ্কাকাণ্ড’ করে বেড়ান পর্যটকরা। এ-ধরনের মানসিকতা আসলে ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা ও অবমাননার ফল। আমরা ভুলে যাই, পর্যটন-কেন্দ্র সেখানকার স্থানীয়দের বাসস্থান। তাদের রুজি রোজগারের ভরসাস্থল। সেই অঞ্চলকে নোংরা অপরিচ্ছন্ন করে তোলা আসলে স্থানের মতো স্থানীয়দেরও অপমান করা।

এই মানসিক বিকৃতি থেকে মুক্তির উপায় কী? শিল্পী নন্দলাল বসু তাঁর ছাত্র রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পায়ে হেঁটে দেশ ঘোরার কথা বলেছিলেন। ‘ভারত আত্মা’কে উপলব্ধি করতে পরিব্রাজক রূপে ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে ছিলেন বিবেকানন্দ। সেই অনুসন্ধান আসলে দেশের মানুষকে, তাদের সংস্কৃতিকে জানার অভিপ্রায়। যে সংস্কৃতির মেলবন্ধন আমাদের বিবেককে জাগ্রত করে। সেই ইতিবাচক মানসিকতাই আমাদের রুচিবোধের উন্নয়ন ঘটায়। দুঃখের বিষয়, সেই চিন্তাধারা থেকে সরে এসেছে বর্তমান ভারত। ভ্রমণ এখন ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের ‘প্যাকেজ’, দিনের শেষে যেখানে আত্মতৃপ্তিটাই মুখ্য, বাকি সব গৌণ। সেই আবর্জনাময় চিন্তাধারায় কেবল হিমাচল নয়, আচ্ছন্ন আসমুদ্রহিমাচল।
পাহাড়-প্রমাণ সেই বর্জ্য সরাবে কে? উপায় বাতলে দেবে কে? কোন মুন্নাভাই?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved