


৩১ বছরের তোমোকো তাকাওকা এক জাপানি কারখানার শ্রমিক। তার কখনও বাড়ি ফিরতে দেরি হলে তারাপদ রায়ের কবিতার মতো হয়তো কু আর শিরো তাকে ঘুরেফিরে প্রশ্ন করে, ‘এত দেরি, রাত যে দুপুর?’⎯ যেমন জানতে চায় পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে যে কোনও পোষা কুকুর। ঠিক একইভাবে আমার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় আমার বাড়ির পাশের নেড়িটাও। ভালোবাসা বা স্নেহের কোনও তর-তম হয় না। আবেগের অভিধান লেখার দায়িত্ব কে নেবে!
কথায় বলে, আপনি বাঁচলে বাপের নাম! কিন্তু সেদিন বিকেলে যখন ভূমিকম্প শুরু হল, তখন সেই প্রবাদটা তোমোকো-র মাথায় ছিল না। সে প্রথমেই ভাবছিল, শিরো আর কু-এর কী হবে! ওইটুকু দুটো ছোট্ট প্রাণ, তোমোকোর কোলে একসঙ্গে উঠে পড়লেও জায়গার অভাব হয় না। বাবা বা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিল না কিছুতেই, সামান্য কিছু জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল সে। কু আর শিরোকে গাড়িতে তুলেই তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে নিরাপদ শিবিরে। দুই পোষ্যকে নিয়ে কোনওমতে শেল্টারে পৌঁছে দেখে, সেখানে কুকুর দেখেই নাক সিটকাচ্ছে সক্কলে। একেই ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসে অচেনা লোকের সঙ্গে থাকতে হচ্ছে, তারপর কুকুর-বেড়াল এনে ঢোকালে না জানি কী রোগ ছড়াবে! আর তেনাদের হাঁকডাক, দৌরাত্ম্যও তো কম নয়। তোমোকো বুঝল, সেখানে থাকতে হলে পোষ্যদু’টিকে বাইরে ফেলে রাখা ছাড়া গতি নেই। ঘটনাটি দক্ষিণ জাপানের কুমামোতো শহরের।

অনন্ত সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের মানুষ অত্যন্ত সহনশীল বলেই জানা যায়। তাঁরা যুদ্ধ দেখেছেন, ধ্বংসের যন্ত্রণা বহন করে চলেছেন আজও। জীবন হয়তো চলতে থাকত কু আর শিরোকে ছাড়াও। কিন্তু তোমোকো পারেনি তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে। আশ্রয়ের অভাবে রাত কাটল গাড়িতে, বিপর্যয়ের মধ্যেই। সোশাল মিডিয়ার দৌলতে পরের দিন খবর মিলল রুনোসুকে পশু হাসপাতালের, যেখানে এমন পরিস্থিতিতে পোষ্যদের বাইরে রেখে ঢুকতে বাধ্য নন কেউ। ২০১৬ সালের ভূমিকম্পের পর থেকেই এই সচেতনতা এবং ব্যবস্থা রয়েছে। তোমোকো মস্ত বীরাঙ্গনা হতে চেয়ে সেই রাতে নিজের জীবন বাজি রেখেছিল বলে মনে হয় না। কার কাছেই বা প্রমাণ করার ছিল তার নিজেকে! কু আর শিরোকে স্রেফ ভালোবেসেই কাছ-ছাড়া করতে পারেনি সে। কী আশ্চর্য বাঁধন পরিবারিকতার!
ভারত আর জাপানের চিরকালই নানা মিল। দুই দেশ যদি লম্বা করে হাতটা বাড়ায় তবে সহজেই ছোঁয়া যাবে একে অপরকে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের কোনও দেশের সঙ্গে প্রথম বিশ্বের দেশের বন্ধুতাও কি সম্ভব? জাপান সাজানো, পরিষ্কার, দেশ। আর আমাদের ভারতের অলিগলিতে পানের পিক⎯ তফাতটা বাইরের চাকচিক্যেই। নইলে ভাবুন, আমাদের পুরনো শহরগুলোয় বাড়ির দেওয়ালে পূর্বপুরুষের ছবি থেকে আরম্ভ করে খাট, টিনের তোরঙ্গ, এমনকী টিয়াপাখির খাঁচায় ঘর এক্কেবারে ঠাসা থাকে। সবটাই সংসারের অংশ। ভারতীয় পরিবারেও অনেককাল থেকেই পোষ্যরা বাড়ির অবিচ্ছেদ্য সদস্য। যদিও গোরারা লিখত, ‘ডগস অ্যান্ড ইন্ডিয়ানস নট অ্যালাউড’। তবে তাদের সে রোয়াবের দিন কবেই হাউইয়ের মতো নিভে গেছে। ‘ডগস অ্যান্ড ইন্ডিয়ানস নট অ্যালাউড’-এর ‘ডগমা’-কে কাঁচকলা দেখিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পোষা ল্যাব্রাডর নিয়ে তো দিব্যি ঢুকে পড়েছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী।

আমাদের দেশেও অনেক সম্পন্ন বাড়িতে পালন করা হয় বেবি ডগি কিংবা বেবি কিটির ‘হ্যাপি বাড্ডে’। যে-সে সেলিব্রেশন নয়, রীতিমতো এলাহি ব্যাপার। পেট-সেফ কেক থেকে শুরু করে পাঁঠার মাংস, লাল ওয়াইন, সবই মজুত থাকে সেই পার্টিতে। এমনকী কুকুরের বিয়েও দেওয়া হয় এখানে। লাল বেনারসিতে কনে সাজিয়ে এমন জাঁকজমক যে অগ্নিদেবও সাক্ষ্য দিতে এসে তাজ্জব বনে যান।
বাড়ির পোষ্য পরিবারেরই সদস্য, ভালো কথা। বিপদের মুহূর্তে তোমোকোর মতো ভারতের কোনও মেয়ে কি প্রাণের ঝুঁকি নেবে পোষ্যের জন্য? হয়তো নেবে। হয়তো বা, নেবে না। হয়তো জাপানেও কেউ কেউ এমন ঝুঁকি নেননি। আসলে প্রশ্নটা এটা নয় যে, কে স্পাইডারম্যান হয়ে তার পোষ্যকে রক্ষা করল আর কে নয়। প্রশ্নটা বরং এমন হতে পারে যে, বাড়ির চার-দেওয়ালের মধ্যে যে পোষ্য থাকে, শুধু তার প্রতিই কি আমাদের কর্তব্য?
কাগজ দেখাতে দেখাতে, কাজের ফিরিস্তি দিতে দিতে আমরা কর্তব্য থেকে মানবিকতাকে কোথাও আলাদা করে ফেলছি না তো? হাঙ্গার ইনডেক্সে ভারত ১২৩টি দেশের মধ্যে ১০২ নম্বরে আছে। অর্থাৎ ‘সিরিয়াস হাঙ্গার ক্যাটেগরি’-তে। তা সত্ত্বেও ‘বাবু কালচার’ ধরে রাখতে বেড়ালের বিয়েতে অনায়াসেই খরচ হয়ে যায় লাখ টাকা। আবার প্রতি সকালে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে রসিয়ে রসিয়ে বর্ণনা করা হয় গায়ে ফুটন্ত গরম জল ঢেলে রাস্তার কুকুর তাড়ানোর উপায়। কপটতাটা চোখে পড়ার মতোই।

২৪ ঘণ্টা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে আপাতদৃষ্টিতে বেশ আরামেই আছে ইমপোর্টেড চাও-চাও কিংবা স্যামোয়েডের ছানা। কিন্তু ভুললে চলবে না এরা বরফ-ঢাকা দেশের প্রাণী। ভারতের তাপপ্রবাহে এদের শরীরে হিট-স্ট্রোকের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছাড়া আর কিছু হয় না। সভ্যতার বিবর্তন আমাদের পশুপাখি, প্রকৃতি এবং আবহাওয়া নিয়ে সচেতনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। আমরা গর্ব করে বলি, পরিবার মানে আজ শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়। কিন্তু পোষ্য যদি হয়ে দাঁড়ায় কেবলই স্টেটাস সিম্বল, তবে দেশে একাধিক অ্যানিম্যাল শেল্টার থাকলেও, পশুর ওপর অত্যাচার কমে না। রোজই খাদ্যাভাব অথবা নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাদের। ভারতে অনবরত পশুর ওপর হিংস্রতার দায় নেবে কে? রাস্তার কুকুর নোংরা বলে বাচ্চার হাত ধরে টেনে সরিয়ে নেন কোনও মা, কিন্তু ভাতের খোঁজে মারামারি করে ফেরা সেই কুকুরের ঘা সারানোর দায়িত্ব কার?
৩১ বছরের তোমোকো তাকাওকা এক জাপানি কারখানার শ্রমিক। তার কখনও বাড়ি ফিরতে দেরি হলে তারাপদ রায়ের কবিতার মতো হয়তো কু আর শিরো তাকে ঘুরেফিরে প্রশ্ন করে, ‘এত দেরি, রাত যে দুপুর?’⎯ যেমন জানতে চায় পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে যে কোনও পোষা কুকুর। ঠিক একইভাবে আমার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় আমার বাড়ির পাশের নেড়িটাও। ভালোবাসা বা স্নেহের কোনও তর-তম হয় না। আবেগের অভিধান লেখার দায়িত্ব কে নেবে! তাই যত্ন নেওয়ার কথা উঠলে কোন পোষ্য পরিবারের অংশ আর কে নয়– সেই প্রশ্নই আজ অপ্রয়োজনীয়।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved