


এক সময় সিনেমায় ‘তারকা’ ছিল বটে, কিন্তু সিনেমাটিও ছিল। আজ অনেক ক্ষেত্রে তারকার চারপাশে সিনেমাকে সাজানো হয়। ফলে একজন অভিনেতার সরে যাওয়া মানে শুধু একটি চরিত্রের অভিনেতা বদল নয়। বদলাতে পারে পোস্টার, বাজারমূল্য, প্রচার-পরিকল্পনা, বিদেশি পরিবেশনের চুক্তি, শুটিংয়ের তারিখ, অন্য অভিনেতাদের ডেট, সেট নির্মাণের খরচ– এমনকী, ছবির অস্তিত্বও। তাছাড়া বিপুল অর্থনৈতিক দায়ও কি জুড়ে থাকে না? অতএব অভিনেতার ‘না’ বলার স্বাধীনতার পাশাপাশি থাকা উচিত ‘আমি কখন জানাব’– এই নৈতিকতার প্রশ্নটিও।
মাঝপথে সিনেমা ছেড়ে ধাঁ! এটাই না কি বলিউডের প্যাটার্ন। যে-সে লোক নয়, খাস ফারহান আখতার এহেন মন্তব্যটি করেছেন সম্প্রতি! প্রায়শই, বাঙালি অভিনেতারা, বিশেষ করে, যাঁরা বলিউডের দাক্ষিণ্য পেয়েছেন, সাক্ষাৎকারে, ইদানীং ‘পডকাস্ট’-এ বলে থাকেন– বলিউডের মতো ‘প্রফেশনালিজম’ টালিগঞ্জের নেই। সেই ‘বলিউড’ নামক নিরেট শৃঙ্খলে এমন চপেটাঘাত করতে গিয়ে বিন্দুমাত্র টাল খাননি ফারহান আখতার।

নিছক কৌতুক নয়। টেনে এনেছেন পুরনো প্রসঙ্গও। ‘দিল চাহতা হ্যায়’-এর কথা। সে ছবির শুটিং শুরুর প্রায় এক মাস আগে নাকি সইফ আলি খানের সরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল! কী ঘটেছিল? সইফের অন্য ছবির শিডিউল গিয়েছিল বদলে! এদিকে ফারহান, সেই চরিত্রে অন্য কাউকে ভাবতেই পারছিলেন না।

নামোল্লেখ করেননি ফারহান। কিন্তু সিনেমার বাজারে নাম না-বলেও বহু কিছু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে দেওয়া যায়। ‘ডন থ্রি’র ক্ষেত্রে রণবীর সিংয়ের সরে যাওয়া, শুটিং শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত– প্রযোজকদের সঙ্গে বিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত সংগঠনের হস্তক্ষেপ– সব মিলিয়ে ফারহানের মন্তব্যের তির যে সিংহের শরীর তাক করে, তা অনুমান করতে বিশেষ সিনেমাজ্ঞান লাগে না।
কিন্তু প্রশ্নটা রণবীর বা ফারহানকে নিয়ে নয়। প্রশ্ন: সিনেমার সঙ্গে একজন অভিনেতার সম্পর্ক ঠিক কীরকম?
অভিনেতা কি সিনেমার কর্মী? শিল্পী? অংশীদার? না কি নিজের ব্র্যান্ডের মালিক, যাঁর ইচ্ছে হলে কোনও প্রকল্পে ঢুকবেন, ইচ্ছে হলে বেরিয়ে যাবেন? এই যা-ইচ্ছে-তাই প্রশ্ন ধরে এগলেই, বলিউডের অস্বস্তিকর পরিবর্তন চোখে পড়বে ঠিক। এক সময় সিনেমায় ‘তারকা’ ছিল বটে, কিন্তু সিনেমাটিও ছিল। আজ অনেক ক্ষেত্রে তারকার চারপাশে সিনেমাকে সাজানো হয়। ফলে একজন অভিনেতার সরে যাওয়া মানে শুধু একটি চরিত্রের অভিনেতা বদল নয়। বদলাতে পারে পোস্টার, বাজারমূল্য, প্রচার-পরিকল্পনা, বিদেশি পরিবেশনের চুক্তি, শুটিংয়ের তারিখ, অন্য অভিনেতাদের ডেট, সেট নির্মাণের খরচ– এমনকী, ছবির অস্তিত্বও।

একজন অভিনেতা যখন একটি ছবি থেকে সরে যান, তখন তাঁর নিজের কেরিয়ারের হিসাবটি তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়াই স্বাভাবিক। চিত্রনাট্য পছন্দ হয়নি, পারিশ্রমিক নিয়ে সমস্যা হয়েছে, সহ-অভিনেতার সঙ্গে অসুবিধা, শিডিউল সংঘাত, চরিত্র নিয়ে মতবিরোধ– অসংখ্য যুক্তিসংগত কারণ থাকতে পারে। শিল্পীর ‘না’ বলার অধিকার অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই ‘না’-এরও একটি সময় আছে।
সকলেই জানেন, সিনেমা ‘একক’ শিল্প নয়। অভিনেতার পাশে পরিচালক, সহকারী পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, ক্যামেরা বিভাগ, শিল্প নির্দেশক, পোশাকশিল্পী, মেকআপ শিল্পী, লাইটম্যান, স্পটবয়, প্রযোজনা কর্মী– অসংখ্য মানুষের শ্রম। এছাড়া বিপুল অর্থনৈতিক দায়ও কি জুড়ে থাকে না? অতএব অভিনেতার ‘না’ বলার স্বাধীনতার পাশাপাশি থাকা উচিত ‘আমি কখন জানাব’– এই নৈতিকতার প্রশ্নটিও।
মজার ব্যাপার, সইফ আলি খানের ‘দিল চাহতা হ্যায়’-এর ঘটনাটিই এর উল্টোশিক্ষা দেয়। সেই ছবিতে তাঁর চরিত্র সমীরের উপস্থিতি নিয়ে সইফ আলি খানের দ্বিধা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ছবিটি করেন, আর সেই চরিত্রই তাঁর স্মরণীয় অভিনয়গুলির একটি। ‘দিল চাহতা হ্যায়’ মুক্তির ২৫ বছর পর, আজও, সমীরকে বাদ দিয়ে ছবিটি অকল্পনীয় নয় কি?

অর্থাৎ, অভিনেতার প্রথম সংশয় সবসময় ‘ভুল’ নয়। আবার প্রযোজকের প্রথম পছন্দও সবসময় ‘শেষ কথা’ নয়। সিনেমা আসলে আজব পরিসর, যেখানে অনিশ্চয়তার মধ্যেই নিশ্চিন্তি! কিন্তু আজকের তারকা-অর্থনীতি সেই অনিশ্চয়তাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। অভিনেতার ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ যত বাড়ছে, তাঁর সিদ্ধান্তের আর্থিক অভিঘাতও তত বাড়ছে। তাই ‘চুক্তি’ এখন শুধু পারিশ্রমিকের কাগজ নয়। সেখানে থাকা উচিত নির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা, সরে যাওয়ার নিয়ম, ক্ষতিপূরণের কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত জানানোর সময়সীমা। হলিউডে যেমন ‘কমিটমেন্ট’ শব্দটি চুক্তির ভাষায় গুরুতর, ভারতীয় চলচ্চিত্রেও সেই পেশাদারিত্ব আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
অবশ্য দায় শুধু অভিনেতার নয়।
প্রযোজকরাও কি সবসময় স্বচ্ছ? অভিনেতাকে কি চিত্রনাট্য সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য দেওয়া হয়? শিডিউল কি বারবার বদলায় না? পারিশ্রমিক কি সময়মতো পাওয়া যায়? পরিচালক কি অভিনেতার সৃজনশীল উদ্বেগকে গুরুত্ব দেন? কোনও ছবির চরিত্র নিয়ে শেষ মুহূর্তে কি প্রযোজক নিজেই সিদ্ধান্ত পাল্টান না?

সুতরাং, অভিনেতারা ছবি ছেড়ে দিচ্ছেন– এই বাক্যটি দিয়ে সমস্যার গোটা ছবিটা স্পষ্ট হবে না। শিল্পে পেশাদারিত্ব দ্বিপার্শ্বীয়। তবে, তারকাদের দায়টা একটু বেশি। কারণ তাঁরা কেবল শিল্পী নন, তাঁরা ‘শিল্পের বাজার’ও। অনেক মানুষের জীবিকা নির্ভর করে থাকে তাঁদের একটি সিদ্ধান্ত বদলের ওপর।
আর, এখানেই ফারহান আখতারের মন্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হয়তো রণবীর সিংহকে উদ্দেশ করেই বলেছেন, হয়তো বলেননি। তা নিয়ে চর্চা হোক। কিন্তু তাঁর কথার মধ্যে যে বৃহত্তর প্রশ্নটি উঠে এসেছে, সেটি এড়িয়ে যাওয়া বোধহয় ঠিক হবে না।
……………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন লাইমলাইট-এর অন্যান্য লেখা
……………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved