Food Culture Shapes Voting in West Bengal। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তোমরা আমাদের ভোট দাও, আমি তোমাদের মাছ খাব!

না। বাঙালি ভোটারদের মন জয়ের জন্য এমন স্লোগান কেউ দেননি। কিন্তু দিতেই পারতেন। অন্তত ঘটনাক্রম তাই-ই বলছে। কিন্তু খাদ্য সংস্কৃতিকে বাঙালির ‘পরিচয়’ হিসেবে যাঁরা ভেবে, খাদ্যরুচিতে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন, তাঁদের জানা দরকার ‘খাদ্য সংস্কৃতি’কে আত্মপরিচয় মনে করা বাঙালি অনেকটাই একই শ্রেণির। গরিব, ক্ষুধার্ত মানুষের কোনও খাদ্যসংস্কৃতি নেই। কিন্তু ভোট আছে।    

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২২, ২০২৬, ২০:০৬   
Facebook WhatsApp Messenger

মাছে-ভাতে বাঙালির মাছ খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। ভোটের ফলাফল প্রকাশ হলে বাংলা জুড়ে জারি হবে বিশুদ্ধ নিরামিষ বিধি। বাড়ির মাথায় উড়বে গেরুয়া ফতোয়া। হু হু করে হাওয়া বয়ে আসবে দক্ষিণ দিক থেকে, আয়ত্ত করে নিতে হবে দক্ষিণপন্থা!

এহেন দুশ্চিন্তায় ভরে গিয়েছে বাঙালির ভোটের মধুশালা। চিন্তায় জুড়েছে– গেরুয়া বাহিনী বাংলা দখলের পরেই বাঙালি আর ‘বাঙালি’ থাকবে না। মাছের বদলে পাতে উঠবে পালং শাক, পনির, মাশরুম! কারণ এ তো সত্যি, নানা রাজ্যেই মাছ-মাংস নিয়ে বিবিধ ফতোয়া জারি করেছে কেন্দ্রের সরকার। যদি কোনওভাবে ক্ষমতায় এসে পড়ে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গকে ছেড়ে কথা বলবে কেন! এদিকে এমন ধারণা ঘোচাতে, নিজেদের প্রমাণ করতে বিজেপির ভোট-প্রার্থীদের মাছ বাজারে যাওয়ার হিড়িক লেগেছে। কেউ আস্ত একটা মাছ নিয়ে, ধুতি-পাঞ্জাবি পরে প্রচারে যাচ্ছেন। কেউ আবার মাছ কেটে দিচ্ছেন। ক্যামেরার সামনে মাছের গুণাগুণ নিয়ে আলোচনা করছেন। মনেপ্রাণে ‘বাঙালি’ হওয়ার চেষ্টাতে মশগুল ভোটের প্রার্থীরা।

ভারতীয় রাজনীতিতে যে-বিষয়গুলো ভোটের বৈতরণি পার করাতে পারে বলে উল্লেখযোগ্য, তার মধ্যে এখন অন্যতম খাদ্য সংস্কৃতি। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট রাজ্যের খাদ্য সংস্কৃতিকে যে রাজনৈতিক দল বেশি প্রাধান্য দিতে পারবে, সেই দল বেশি ভোট পাবে– এহেন ধারণা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। যদিও সে ধারণা যে অমূলক, তেমনটা নয়। কিন্তু একটা অগ্রসর দেশের রাজনৈতিক প্রচারের ভিত্তি কেন হবে সেই রাজ্যের খাদ্য সংস্কৃতি? ঝালমুড়ি খেলেই কি বাংলার মন বোঝা যায়? বৈশাখের তপ্ত দুপুরে কাতলা মাছ হাতে নিয়ে প্রচারে গেলে কি বাংলা জয় করা যায়? খাদ্য সংস্কৃতি কেন একটি রাজনৈতিক প্রচারের ভিত্তি হবে? কর্মসংস্থান, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, সুরক্ষা এই প্রাথমিক ইস্যুগুলো কেন প্রচারের মুখ্য ভিত্তি হবে না?

ভোট-বৈতরণি পার করতে প্রচারের নানা পন্থা সামনে আসছে। কোনও প্রার্থী লোকের বাড়ি ঢুকে রান্না করে আসছেন। আবার কেউ দাড়ি কামিয়ে দেওয়া থেকে দেওয়াল রং করার কাজও করছেন! যেভাবে ভোটের ময়দানে মুনাফা লোফা যায়, সেই সব প্রচেষ্টাই করা হচ্ছে। কোনও কিছুর খামতি নেই। সেই সারিতে এবার জুড়েছে বাংলার খাদ্য সংস্কৃতি। সকাল হলেই মাছ বাজারে প্রার্থীদের ভিড়! দোকানদাররা অতিষ্ঠ! তবুও প্রার্থীরা নাছোড়বান্দা। মাছ হাতে প্রচার করলে হয়তো বাঙালি আবেগে সুড়সুড়ি দেওয়া যাবে। ভোটবাক্সে উপচে পড়বে বাঙালি সেন্টিমেন্ট। প্রধানমন্ত্রী এলেন। ঝালমুড়ি খেলেন। চলে গেলেন। বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির সঙ্গে ঝালমুড়ির সম্পর্ক প্রাচীন। সেই ঝালমুড়ি যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী রাস্তায় দাঁড়িয়ে, পকেট থেকে টাকা দিয়ে খেলেন, তখন তো সেটাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই প্রচার কি বাঙালির আবেগকে ছুঁতে পেরেছে? না কি খাদ্যরাজনীতি একটা বিভাজন রেখা টেনে দিয়েছে আরও সুস্পষ্টভাবে?

খাদ্য সংস্কৃতি রাজনীতির হাতিয়ার, আবার রাজনৈতিক ব্যর্থতার আড়াল। এটি ‘হাতিয়ার’ তখন, যখন তা মানুষের আবেগ ও পরিচয়কে সংগঠিত করে রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করে। আড়াল তখন, যখন সেই আবেগের আড়ালে বাস্তব সমস্যাগুলিকে উপেক্ষা করা হয়। যেখানে এক শ্রেণির মানুষের কাছে মাছ শুধু ‘খাদ্য’ নয়, বরং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য প্রতীক। মাছ না-পেলে তারা যেন এক ধরনের সাংস্কৃতিক আঘাত অনুভব করে। পারিবারিক স্মৃতি, উৎসব, আচার– সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই খাদ্যাভ্যাস আত্মপরিচয়েরই অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু একই সমাজের অন্য প্রান্তে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যাঁদের কাছে মাছ তো দূরের কথা, প্রতিদিনের ডাল-ভাত জোগাড় করাটাই অনিশ্চিত! তাঁদের জীবনে ‘খাদ্য’ কোনও সাংস্কৃতিক বিতর্ক নয়, বরং প্রতিদিনের সংগ্রাম; সেখানে পাতে কী উঠবে– সেটাই বড় প্রশ্ন। এই তীব্র বৈপরীত্য আমাদের বুঝিয়ে দেয়, খাদ্য নিয়ে যে-আবেগ আমরা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে তৈরি করি, তা অনেকাংশেই শ্রেণিনির্ভর এবং বাস্তবতার একটি বড় অংশকে অদৃশ্য করে দেয়। শহরের মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের কাছে যেখানে খাদ্য পরিচয়ের ভাষা, সেখানে নিম্নবিত্তের কাছে খাদ্য বেঁচে থাকার শর্ত। ফলে যখন রাজনৈতিক প্রচারে মাছ, মাংস বা নিরামিষের প্রতীকী ব্যবহার সামনে আসে, তখন তা সমাজের একাংশের আবেগকে স্পর্শ করলেও, অন্য অংশের কঠিন বাস্তবতাকে সম্পূর্ণভাবে আড়াল করে দেয়।

এই অবস্থায় খাদ্য সংস্কৃতি আর নিছক ঐতিহ্যের উদযাপন থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক ধরনের অসাম্যের আয়না, যেখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কে খাবার নিয়ে চিন্তা করতে পারে এবং কে খাবার জোগাড় করতে লড়াই করে। তাই খাদ্যকে কেন্দ্র করে যে-রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি হয়, তা যতটা না সংস্কৃতির প্রশ্ন, তার চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়ায় প্রবেশাধিকার ও বৈষম্যের প্রশ্ন। যেখানে বোঝা যায়, সমাজে সবার পাতে সমানভাবে কিছু ওঠে না, আর সেই অসমতাকেই অনেক সময় আড়াল করে দেয় খাদ্য নিয়ে তৈরি আবেগঘন রাজনৈতিক ভাষ্য।

খাদ্যরাজনীতি  ভোটে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। তার বাস্তব উদাহরণও রয়েছে, তবে সেই প্রভাব সবসময়ই সীমিত এবং পরিস্থিতিনির্ভর। যেমন, উত্তর ভারতে বহু নির্বাচনে গরুর মাংস বা নিরামিষ বনাম আমিষ ইস্যু সামনে এনে রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরির চেষ্টা হয়েছে, যা কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্ককে একত্রিত করতেও সাহায্য করেছে। কিন্তু খাদ্য নিয়ে যতই প্রচার হোক, ভোটের পর মানুষের মূল প্রত্যাশা আবার সেই পুরনো জায়গাতেই ফিরে আসে,জীবনযাত্রার উন্নতি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা মাছ না পনির, আমিষ না নিরামিষ, সেই সরল বিভাজনে আটকে থাকে না। আসল প্রশ্নটা আরও গভীরে, রাজনীতি কি আমাদের পছন্দকে সম্মান করছে, না কি সেই পছন্দকেই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে? খাদ্য যদি পরিচয়ের প্রতীক হয়, তবে সেই পরিচয়কে ব্যবহার করে আবেগ উসকে দেওয়া যতটা সহজ, মানুষের বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করা ততটাই কঠিন। তাই খাদ্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই উচ্চকিত রাজনৈতিক ভাষ্যের আড়ালে আমাদের বারবার ফিরে তাকাতে হবে সেই মৌলিক প্রশ্নগুলোর দিকে, কর্মসংস্থান, আয়, নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার মান। কারণ পাতে কী উঠছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হল, সবার পাতে আদৌ কিছু উঠছে কি না। সেই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেবে, রাজনীতি সত্যিই মানুষের পাশে আছে, না কি শুধুই মানুষের আবেগের পাশে।

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন আদিত্য ঘোষ-এর অন্যান্য লেখা

……………………

DesiPolitics Elections2026 FishAndPolitics FoodCulture RiceAndPolitics Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar VotingBehaviour

Share this article on